১৭ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মরছে বুড়িগঙ্গা ॥ দূষণ-দখলে ইতোমধ্যেই মরা গাঙ

মরছে বুড়িগঙ্গা ॥ দূষণ-দখলে ইতোমধ্যেই মরা গাঙ
  • ট্যানারি সরিয়েও লাভ হচ্ছে না, সাভারে এটিপি কার্যকর না থাকায় প্রাণ হারাচ্ছে ধলেশ্বরীও ;###;আগে দূষণ হতো পয়োবর্জ্য, এখন হচ্ছে রাসায়নিক ও শিল্পবর্জ্যে ;###;বিপর্যয়ের মুখে ঢাকা

শাহীন রহমান ॥ বিশ্বের দূষিত নদীর তালিকায় বুড়িগঙ্গার নাম উঠেছে অনেক আগেই। দূষণরোধে এর পাড় থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে ট্যানারি শিল্পও। এরপরও বিন্দুমাত্র কমেনি দূষণের মাত্রা। বরং ক্রমেই অপরিশোধিত শিল্প ও পয়োবর্জ্যে মৃত্যুর মুখে ধাবিত হচ্ছে এককালের ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা। একই অবস্থার শিকার হচ্ছে ঢাকার পাশের বাকি তিন নদী- তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা। সবগুলোর পরিণতি একই দিকে ধাবিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুদূর অতীতকাল থেকে বুড়িগঙ্গা দূষিত হয়ে আসছে। কালের আবর্তে দখল-দূষণে ইতোমধ্যেই মরা গাঙে পরিণত হয়েছে। আগে ময়লা আবর্জনা ফেলে বুড়িগঙ্গা দূষিত করা হতো। আর এখন ফেলা হচ্ছে অপরিশোধিত শিল্প ও পয়োবর্জ্য। তবে দুই কালের এই দূষণের মধ্যে পার্থক্য কিছুটা থাকলেও আগেও যেমন ময়লা আবর্জনা ফেলে দূষিত করা হতো, এখনো তেমনি সিটি কর্পোরেশনের কঠিন বর্জ্য ওয়াসার তরল পচা বর্জ্যরে মাধ্যমে দূষণের সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে কেবল শিল্পবর্জ্য ও বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক দূষণ, যা নদীকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে নদীর হাত ধরে গড়ে উঠেছে ঢাকা শহর, সেই নদী যদি তিলে তিলে ধ্বংসের মুখে পতিত হয় তাহলে রাজধানী বাঁচবে কেমন করে? এর আগে আদালতের এক রায়ে উল্লেখ করা হয়েছিল ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা বাঁচাতে না পারলে রাজধানীর পরিণতি হবে ভয়াবহ। ২০০৯ সালে ঢাকার চার নদীর ওপর দেয়া আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে বুড়িগঙ্গা বাঁচাতে না পারলে ঢাকার ওপর নেমে আসবে বিপর্যয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বুড়িগঙ্গাকে ঘিরে গড়ে ওঠা ঢাকা শহর একদিকে যেমন চরম উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছে অন্যদিকে উল্টো নানা ধরনের শিল্প ও রাসায়নিক ও গৃহস্থালি বর্জ্যে ঢাকার চার নদীই মরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদফতরের সমীক্ষায় দেখা গেছে এখনও প্রতিদিন রাজধানীর চারপাশের নদীতে সাড়ে ৪ হাজার টন বর্জ্য ও ৫৭ লাখ গ্যালন দূষিত পানি মিশছে। রাজধানীর বাইরে আশুলিয়া সাভারে গড়ে ওঠা নতুন চামড়াশিল্প নগরীর বর্জ্যে দূষণ বাড়ছে। টঙ্গীতে শিল্পকারখানা বাড়ছে। এসব কারখানায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বর্জ্য পরিশোধন যন্ত্র ব্যবহার করা হয় না। বিশেষত শুষ্ক মৌসুম নবেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত নদীর পানির দূষণ বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছেছে। বর্ষায়ও নদী দূষণ রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। মৎস্য অধিদফতর ও মৎস্য উন্নয়নবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশ নয়টি নদীর ১১ স্থান থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে। রাজধানীর চারপাশের পাঁচ নদী অর্থাৎ বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যার পানি এতটাই দূষিত হয়ে পড়েছে এসব এলাকার বেশিরভাগ স্থানে মাছের পক্ষে বেঁচে থাকা কঠিন। এই বর্ষায় স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ঢাকার আশপাশের পাঁচটি নদী- বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষা ও বালু নদীর ১৯ স্থানের পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। এসব পরীক্ষায় পানির আদর্শ মান মাত্রার সঙ্গে চরম অসামঞ্জ্যতা পাওয়া গেছে। পানি ব্যবহারের একবারেই অনুপযোগী। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, নদী পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে শিল্প দূষণ, পৌর বর্জ্যরে উপস্থিতি, রাসায়নিক বর্জ্য, নদীর পাশে গড়ে ওঠা মানুষের অপরিকল্পিত স্যানিটেশন ব্যবস্থা, গৃহস্থালি বর্জ্য, নদী দখল করে গবাদি পশুর বাসস্থান নির্মাণ, নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা অসংখ্য ইটভাটা এবং নৌযান হতে নির্গত ইঞ্জিনের তেলের দূষণে পানি ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ সেন্টার ফর এ্যাডভান্সড স্টাডিজের এক জরিপে বলা হয়েছে, মাত্রা ৪০ ভাগ কারখানা থেকে পানি শোধিত হয়ে নদীতে পড়ছে। বাকি কারখানা থেকে অপরিশোধিত পানি সরাসরি নদীতে পড়াই নদী দূষণের অন্যতম কারণ। এ ছাড়া শিল্পকারখানার ৬০ ভাগ বর্জ্য ছাড়া ওয়াসা ও সিটি কর্পোরেশনের ৩০ ভাগ বর্জ্য নদীতে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প সাভারে স্থানান্তর করে কোন লাভ হচ্ছে না। এটিপির পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় দূষণ বাড়ায় বুড়িগঙ্গার বদলে এখন এই শিল্পের বর্জ্য দূষণে ধলেশ্বরী দূষিত হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে। এশিয়ান ওয়াটার ডেভেলপমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৪৮ দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূষিত বাংলাদেশের নদীর পানি। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সব নদীর পানিই দূষিত। কারণ বেশিরভাগ শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে। তারা বলছেন, কারখানায় নদীর পানি পরিশোধন করা না গেলে নদী দূষণ রোধ করা যাবে না।

আগেও দূষিত হতো বুড়িগঙ্গা ॥ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বুড়িগঙ্গাকেন্দ্রিক ঢাকা শহর গড়ে ওঠায় শহরের অর্থনীতির মূলকর্মকা- পরিচালিত হতো এই নদী ঘিরে। সুদূর অতীতকাল থেকেই বুড়িগঙ্গা দূষিত হয়ে আসছে, এখন হচ্ছে বুড়িগঙ্গার পাড়ে রয়েছে অসংখ্য কলকারখানা, সেখান থেকে নামছে অপরিশোধিত বর্জ্য।

বুড়িগঙ্গার দূষণের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় বুড়িগঙ্গাভিত্তিক ঢাকা শহরের বিকাশ যখন থেকে শুরু তখন থেকেই দূষণের ইতিহাসও শুরু। ১৮৬৬ সালে বুড়িগঙ্গা দূষণের কারণ অনুসন্ধানের জন্য একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিশনের রিপোর্টে বুড়িগঙ্গা দূষণের জন্য দুটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, বুড়িগঙ্গার মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এর প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে। ফলে বিভিন্ন স্থান থেকে আবর্জনা, গলিত পদার্থ মিশে দূষিত করছে বুড়িগঙ্গা। দ্বিতীয় কারণে বলা হয়, নদীর স্রোতে গলিত আবর্জনা ভেসে ভেসে তীরবর্তী এলাকায় দূষণ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানেও দূষণের এই ধারা অব্যাহত আছে। তবে বর্তমান দূষণ হচ্ছে ভিন্নভাবে, আরও বেশি গভীরভাবে।

১৮৯৬ সালে পত্রিকায় প্রকাশিত এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় ‘বুড়িগঙ্গা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঢাকার বাণিজ্যের বিষম অনিষ্ট হইতেছে। ঢাকায় যাহাদের বাড়িঘর প্রভৃতি আছে, বর্তমানে তাহাদের বিশেষ কিছু ক্ষতি অনুভব না হইলেও ভবিষ্যতে সর্ব্বনাশের সূচনা হইতেছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তার ‘ঢাকা/স্মৃতি-বিস্মৃতির নগরী গ্রন্থে বুড়িগঙ্গার দূষণ নিয়ে সে সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত তুলে ধরেছেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তিনি উল্লেখ করেছেন বর্তমানের মতো সে সময়েও প্রায় এক মাইল দূর থেকে বুড়িগঙ্গার দূষণ নাকে এসে লাগত। বর্তমানেও বুড়িগঙ্গা এত দূষিত যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকেই এ দূষণ নাকে এসে লাগে। বিশেষজ্ঞদের মতে ঢাকা শহরের পত্তন যেমন হয়েছিল বুড়িগঙ্গা নদী ঘিরে, আজ শহরের সর্বনাশের মূলেও রয়েছে এই বুড়িগঙ্গা। ঢাকার চারদিকের নদীগুলো আজ এতটাই দূষিত যে নদীর কারণে ঢাকায় বিপর্যয় সৃষ্টির উপক্রম হয়ে দেখা দিয়েছে।

১৮৬৬ সালে পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় ক্রমেই বুড়িগঙ্গা অপ্রশস্ত হয়ে যাচ্ছে পলির কারণে। একটি পত্রিকায় রিপোর্টে বলা হয় ‘বুড়িগঙ্গার মুখে চড় পড়াতে পুর্ব্বাপক্ষা ইহার জলের স্বল্পতা হইয়াছে এবং তদৃশত: যে যে অসুবিধা ঘটিবার সম্ভাবনা...অতএব বুড়িগঙ্গার গভীরতা ও প্রবাহ প্রবর্ধনে সদুপায় বিধান করিয়া সেই অসুবিধা নিবারণ করা যায়।’ এরও ৪০ বছর আগে ঢাকা নীল ব্যবসায়ী ওয়াইজ বলেছিলেন, ‘বুড়িগঙ্গায় হাঁটুজল থাকে’।

প্রায় একই সময়ে কবি নবীনচন্দ্র সেন লেখেন, ‘শ্রীমতি বুড়িগঙ্গা দেবীকে দেখিয়া আমার হাসি পাইয়াছিল। পুর্ব্ববঙ্গবাসী গামলায় করিয়া বুড়িগঙ্গা পার হয় বলিয়া দীনবন্ধু যে বিদ্রƒপ করিয়াছিলেন তাহা পূর্বে বুঝিতে পারি নাই। তখন বসন্তকাল, শ্রীমতির কলেবর এত সংকীর্ণ যে তখন তাহাতে অতিক্রম করার জন্য গামলারও প্রয়োজন ছিল না।’

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন সে সময়ে বুড়িগঙ্গা এত দূষিত ছিল যে এক মাইল দূর থেকে দূষণের গন্ধ নাকে এসে লাগতো। এ কারণে ১৮৬৬ সালে ঢাকার সিভিল সার্জন ডাঃ বিটসন ও কমিশনার বুড়িগঙ্গা দূষণের কারণ অনুসন্ধান করেছিলেন। বুড়িগঙ্গার বর্তমান পরিস্থিতি যে এমন হতে পারে তা ১৮৯৬ সালের একটি পত্রিকার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই রিপোর্টেই উল্লেখ করা হয় বুড়িগঙ্গার দূষণ এবং প্রবাহ কমে যাওয়া রোধে স্বয়ং নবাব আহসানউল্লাহ বুড়িগঙ্গা থেকে তুরাগ পর্যন্ত নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে ১৫ হাজার টাকা খরচ করে ড্রেজিং করিয়েছিলেন। কারণ নবাব পরিবারের লোকেরা তখন তাদের স্টিমার নিয়ে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ হয়ে ঢাকার বাইগুনবাড়ির বিলাস ক্ষেত্রে যেতেন, তাদের যাওয়ার জন্যই তখন খনন করেছিলেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী দূষণের শতকরা ৮৮ ভাগ কারণ হলো ঢাকার বর্জ্য নদীতে ফেলা। এছাড়া দুই পাড় চলে যাচ্ছে প্রভাবশালীদের দখলে শুধু তীর নয়, নদীর মাঝ পর্যন্ত দখল করা হয়েছে। নদীর তীরের দূষণ গত চার দশক ধরে তীব্র হচ্ছে। এখন অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিশ্বের দূষিত নদীর তালিকায়ও এই বুড়িগঙ্গার নাম উঠেছে। তারা বলেন, বিশ্বের এখন যে ১০ নদী সবচেয়ে বেশি দূষিত, তার মধ্যে বুড়িগঙ্গার অবস্থান ছয় নম্বরে।