১৭ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ বাঙালী জাতিসত্তার ‘জাত্যাভিমান এবং জাতীয়তাবাদ’

  • হায়দার মোহাম্মদ জিতু

জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞায় অধ্যাপক সালাউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জাতীয়তাবাদ হলো একটি ভূ-ভিত্তিক চেতনা। যেখানে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষ নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং জাত্যাভিমান (শ্রেষ্ঠত্ব) নিয়ে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান করেন। দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশকালীন বঙ্গবন্ধুর বাংলা ছিল অধ্যাপক সালাউদ্দিন আহমদের সংজ্ঞায়িত জাতীয়তাবাদী চেতনার পুণ্যস্থান।

যদিও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সেই বাংলাদেশকেই এখন যুদ্ধ করতে হচ্ছে জাতীয়তাবাদের হারানো ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার করতে। যার প্রমাণ দেশের চা-চক্র থেকে শুরু করে বদ্ধ এসির কামরা পর্যন্ত কিছু সুযোগ-সন্ধানীরা ছোট ছোট বিদ্রƒপে বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হয়ে কি লাভ হয়েছে?’ আবার কেউ কেউ তো ‘ব্রিটিশ শোষকরাই ভাল ছিলেন’ বলেও দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন!

বিষয়টিকে একেবারে তুচ্ছ মনে হলেও আদতে এটা চক্রান্তকারী চক্রের ভবিষ্যত ‘দুরভিসন্ধিতার’ ক্ষুদ্র ফল। ‘ভবিষ্যত প্রজন্মকে’ ‘বাঙালী’ জাতিসত্তার ‘জাত্যাভিমান এবং জাতীয়তাবাদের’ চেতনায় ‘আত্মবিশ্বাসহীন এবং অশ্রদ্ধাশীল’ করার ছক। তবে শঙ্কার বিষয় হলো তাদের এই ধরনের কূটকৌশল পার পেয়ে যাচ্ছে সহজেই। যেখানে ‘বঙ্গবন্ধুর’ নেতৃত্বেই ভূমিষ্ঠ ‘বাংলাদেশ’ পথ চলতে শুরু করেছিল পূর্ণ দাপটে।

তবে আশার কথা হলো, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যে গতিতে এগিয়ে চলছে তাতে পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনামূলক হিসেবে গেলে পাকিপ্রেমীরা নিশ্চিত বিনা মেঘে শরীর ভিজিয়ে ঘরে ফিরবেন। কারণ, আন্তর্জাতিক হিসেবে পাকিস্তান এখন বিশ্ব মানচিত্রের একটি বিপজ্জনক ‘জঙ্গী রাষ্ট্র’। যেখানে জানমালের বিন্দুমাত্র কোন নিরাপত্তা নেই। যার অর্ধেক উগ্রবাদী তালেবান আর অর্ধেক ভিনদেশীদের দখলদারদের দখলে।

উল্টোদিকে বাংলাদেশের কথা বলতে গেলে বিস্তৃত কোন সূচক কিংবা পরিসংখ্যানের প্রয়োজন নেই। শুধু একখানা উদাহরণই যথেষ্ট। খোদ, পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং বুদ্ধিজীবীরাই তাদের রাজনীতিবিদদের আহ্বান করছেন-পাকিস্তানকে বাংলাদেশের মতো সমৃদ্ধ এবং উন্নত করে দিতে।

অন্যদিকে ব্রিটিশ শোষকদের তোয়াজ করতে গিয়ে যারা প্রতিনিয়ত জিহ্বা দিয়ে লালা ছাড়ছেন তারা হয়ত জানেনই না যেÑ ডিজিটালাইজেশনের এই জামানায় যে কেউ যে কোন সময় এক ক্লিকেই ইতিহাস জেনে নিতে পারেন। আর ইতিহাস বলে ঔপনিবেশিক বেনিয়ারা নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ-সংস্কৃতি এবং লুণ্ঠন ছাড়া কখনই ভিন্ন কিছু চিন্তা বা বাস্তবায়ন করেননি। ইতিহাসের ‘বাক চ্যাপ্টার’ও যার সাক্ষী। কাজেই এর পরও যারা যুক্তিহীনভাবে ভিনদেশী প্রভুত্ব কিংবা হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা যে শুধু বাংলার সহজিয়া ‘সংস্কৃতি এবং উন্নয়ন’কেই রুখতে চান সেটা স্পষ্ট।

অর্থনীতির হিসেবে বিশ্ব বাজারের ‘উন্নয়ন সূচক বা সম্মান’ ধার্য করা হয় সে দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় হিসাব করে। সে হিসাবে বাংলাদেশের বর্তমান মাথাপিছু আয় প্রায় ১৭০২ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ জনগণ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথেই আছে এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এও সত্য এই উন্নয়ন কখনই টেকসই হবে না যদি না তার জনগণের মনোভাব সমৃদ্ধ হয়। অর্থাৎ বাঙালীকে মনমানসিকতার উন্নয়নেও ধনী হতে হবে। তাকে খুঁজতে হবে ‘যুক্তির আলোকে মুক্তির পথ।’

ইতিহাস মতে মনোজাগতিকভাবে বাঙালী পূর্বাপরই ধনী। যার দলিল তার হাজার বছরের সহজিয়া সংস্কৃতি। যেখানে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান ছাড়াও সব ধর্মের মানুষ বাধাহীনভাবে বিচরণ এবং চর্চা করে। আবার ফরিদ জাকারিয়ার ‘দ্য পোস্ট আমেরিকান ওয়ার্ল্ড’ গ্রন্থবোধও বলে সেই জাতিই সমৃদ্ধ, যার আছে হরেক ধর্ম-সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ এবং মুক্ত চিন্তার মানুষ। পাশ্চাত্যের দেশগুলোই যার অনন্য উদাহরণ।

বাঙালীর জীবনবোধও এ রকম বহুমাত্রিক এবং উন্মুক্ত। কারণ এখানকার মানুষদের মাঝে ইসলামের প্রচার হয়েছে ‘হযরত শাহজালাল (র.), খান জাহান আলী প্রমুখ সুফী দরবেশদের হাত ধরে। আর সুফিবাদ কখনই উগ্রবাদিতা সমর্থন করে না। আর এ কারণেই জন্মলগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত এই তল্লাটের মানুষ ধর্মভীরু, ধর্মান্ধ নয়। তবে সাম্প্রতিক ধর্মকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চোরাবালি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেখানে সংখ্যালঘুদের আক্রমণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা দেখা গেছে। যদিও শেষতক রাষ্ট্রযন্ত্রের অটল এবং আপোসহীন চেষ্টায় ‘মৌলবাদী ও অস্থিরতা চাষকারীদের’ পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। তবে এও সত্য, এই তল্লাটের একটা অংশ চায় এখানে সব সময়ই ‘অস্থিরতা এবং নৃশংসতা’ চলমান থাকুক।

আর এ কারণেই নতুন ফন্দি হিসেবে সংখ্যালঘুদের খানিক বিশ্রাম দিয়ে প্লান ‘বি’ হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের মাঝে ‘সুন্নি এবং শিয়া’ দ্বন্দ্বকে উস্কানি দেয়ার টার্গেট করেছে। যার প্রমাণ বিগত সময়ে ‘তাজিয়া মিছিল’, ‘শিয়া মসজিদে’ হামলা এবং মসজিদ-মন্দিরে ইমাম-পুরোহিতকে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা। অথচ সাধারণ জ্ঞান মোতাবেক, কোন মানুষই ধর্মীয় বিভেদ অঞ্চল নিয়ে জন্মায় না। সমাজ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রই তাকে বিভক্ত করে পারিবারিক নিয়ম-শৃঙ্খলে। আর এই সমাজ-রাষ্ট্র কোন বায়বীয় বিষয়বস্তু নয়। মানুষ নিয়েই এর কাঠামো। যার নেতৃত্বে থাকে সমাজ ব্যবস্থার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা।

সে হিসেবে বর্তমান রাষ্ট্র ব্যবস্থার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যার ম্যান্ডেড গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করা। তবে এই লড়াইয়ে তাঁকে এককভাবে সাহস যুগিয়ে যেতে হবে বাংলার জনগণকে। কারণ, এই মাটির চরম দুর্ভাগ্য যেÑ মুক্তিযুদ্ধে জাতিকে নেতৃত্বদানকারী এবং সংগঠিতকারী একমাত্র দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ছাড়া কেউই ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশ’কে হৃদয়ে আলিঙ্গন করতে পারেনি।

ফলাফল শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ব্যতীত যেই রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে সেই-ই দেশকে বাধ্য করেছেন সাম্প্রদায়িকতার আফিমে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার’ বিপরীত পথে হাঁটতে। যা দেশের বর্তমান এবং ভবিষ্যত রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য ভয়ঙ্কর এবং শঙ্কাজনক।

লেখক : ছাত্রনেতা

haiderjitu.du@gmail.com