১৭ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যান্ত্রিক যুগে কৃষি ॥ বোরো মৌসুমেই নতুন যাত্রা

যান্ত্রিক যুগে কৃষি ॥ বোরো মৌসুমেই নতুন যাত্রা
  • চার বছরের মধ্যেই প্রচলিত পদ্ধতির চাষাবাদ অবসান ঘটানোর টার্গেট ;###;এই যান্ত্রিকীকরণের আওতায় এ বছর ভর্তুকি মূল্যে কৃষকদের ৫৩০০ যন্ত্র দেয়া হবে ;###;সরকারের ব্যয় হবে ৪১৫ কোটি টাকা ;###;আমন ধান কাটার মধ্য দিয়ে হবে যান্ত্রিকীকরণের ‘টেস্ট রান’

কাওসার রহমান ॥ আসন্ন বোরো মৌসুমেই কৃষি যান্ত্রিকীকরণের নতুন যুগে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ। তার আগে চলমান আমন মৌসুমের ধান কাটার মধ্য দিয়ে এই যান্ত্রিকীকরণের ‘টেস্টরান’ করা হবে। এই চ্যালেঞ্জ সামনে নিয়ে এখন দিনরাত কাজ করছে কৃষি মন্ত্রণালয়। যাতে আগামী ৪ বছরের মধ্যেই দেশের প্রচলিত পদ্ধতির কৃষিকে যন্ত্রনির্ভর কৃষিতে পরিণত করা যায়।

মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, সেচ এবং জমি তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রায় শতভাগ কাছাকাছি চলে গেলেও চারা রোপণ তথা ট্রান্সপ্লান্ট এবং ধান কাটা তথা হারভেস্টিংয়ে যান্ত্রিকীকরণে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে। এখন এই দুটি ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণেই মাঠে নেমেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এই যান্ত্রিকীকরণের আওতায় এ বছর ভর্তুকি মূল্যে কৃষকদের ৫ হাজার ৩০০ যন্ত্র দেয়া হবে। শ্রমিক সঙ্কট থেকে মুক্তি ও উৎপাদন খরচ কমাতে চারা রোপণ ও ধান কাটার জন্য তিন ধরনের যন্ত্র দেয়া হবে কৃষকদের। এগুলো হলো কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার ও রাইস ট্রান্সপ্লান্টার। এ সকল যন্ত্র ক্রয়ে কৃষকদের সরাসরি ৬০ শতাংশ ভর্তুকি প্রদান করবে সরকার। এতে সরকারের ব্যয় হবে ৪১৫ কোটি টাকা। এই টাকা রাজস্ব বাজেট থেকে সংস্থান করা হবে।

আগামী দুই মাসের মধ্যে অর্থাৎ আসন্ন বোরো মৌসুমেই এসব যন্ত্র কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে। এর মধ্যে চলতি আমন মৌসুমেই কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার ও রিপার দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে ধান কাটা হবে এবং বোরো মৌসুমে চারা রোপণ ও ধান কাটা উভয়ই যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে। এর মধ্য দিয়ে দেশের ধান আবাদের সব কাজ অর্থাৎ জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, সেচ, ধান কাটা সব কাজই যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে কৃষি সচিব মোঃ নাসিরুজ্জামান বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে আমরা কৃষকদের কাছে ভর্তুকি মূল্যে কৃষিযন্ত্র পৌঁছে দেব। এ ব্যাপারে আমরা সারাদেশে কৃষকদের কৃষি যন্ত্রের চাহিদা নিরূপণ করেছি। কোন এলাকার কৃষক কেমন যন্ত্র চায় তা আমরা নিরূপণ করেছি। এখন সেই চাহিদা অনুযায়ী আমরা কৃষকদের কাছে চারা রোপণ ও ধান কাটার যন্ত্র পৌঁছে দেব।

তিনি বলেন, ‘আমরা জমিতে সেচদান ও জমি প্রস্তুতের ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণে শতভাগে পৌঁছে গেছি। কিন্তু ধানের চারা রোপণ ও ধান কাটার ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণে অনেক পিছিয়ে আছি। তাই এখন আমরা প্লান্টিং (চারা রোপণ) ও হারভেস্টিংয়ে (ধান কাটা) সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছি। আমাদের টার্গেট হচ্ছে কৃষকদের কাছে ট্রান্সপ্লান্টার, হারভেস্টার ও রিপার পৌঁছে দেয়া। যাতে কৃষকদের ধানের চারা রোপণ ও ধান কাটার সময় শ্রমিক সঙ্কটে পড়তে না হয়।’

তিনি বলেন, এই মেশিন চালানোর বিষয়ে কৃষকদের কী ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় তা আমরা সার্ভে করে জেনেছি। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এই সার্ভে করেছে। আমরা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদেরও এই সার্ভেতে কাজে লাগিয়েছি। এর মাধ্যমে আমরা কৃষি যন্ত্রের ব্যাপারে কৃষকদের পছন্দ জেনেছি। সে অনুযায়ী আমরা কৃষকদের কৃষিযন্ত্র সরবরাহ করব।

নতুনভাবে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের আওতায় সরকার কৃষি যন্ত্রে ভর্তুকির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এনেছে। বর্তমানে হাওড় এলাকার জন্য ৭০ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকার জন্য ৫০ শতাংশ ভর্তুকি বিদ্যমান আছে। এ দুটিকে সরকার একটিতে নিয়ে এসেছে। এখন থেকে সব এলাকার জন্য কৃষি যন্ত্রে ৬০ শতাংশ ভর্তুকি দেবে সরকার।

গত বোরো মৌসুমে (২০১৮-১৯) কৃষক ধান কাটা নিয়ে চরম দুর্বিপাকে পড়ে। এবার বোরো মৌসুমে ধানের ফলন ভাল হলেও উৎপাদন খরচের চেয়ে বাজার মূল্য অস্বাভাবিক কম হওয়ায় চরম বিপাকে পড়ে কৃষক। এমনিতেই দেশের গ্রাম-গঞ্জে এখন আর আগের মতো কৃষি শ্রমিক পাওয়া যায় না। শিল্পে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাওয়ায় দিন দিন কৃষি শ্রমিক কমে যাচ্ছে। তার তীব্র প্রভাব পড়েছে এবার বোরো মৌসুমে। কৃষি শ্রমিক সঙ্কটের কারণে দিন মজুরের দৈনিক মজুরি অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। ধান কাটার মৌসুমের শুরুতে এই মজুরি ৪৫০-৫০০ টাকা থাকলেও, ব্যাপকভাবে ধান কাটা শুরু হলে জনপ্রতি এই মজুরি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় উঠে যায়। কোথাও কোথায় কৃষি শ্রমিকের মজুরি ৯০০ থেকে ১ হাজার গিয়ে দাঁড়ায়। তাও আবার দিনমজুর পাওয়া যায়নি। অথচ বিপরীতে ধানের দাম শুরুতে ৫০০-৬০০ টাকার মধ্যে থাকলেও ধান কাটা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ধানের দাম অস্বাভাবিক কমে যায়। কোথাও কোথাও এই মণপ্রতি এই দাম ৪০০ টাকায় নেমে আসে। অথচ জমি ও বীজ তৈরি থেকে শুরু করে ঘরে তোলা পর্যন্ত এক মণ ধানে খরচ পড়ে ৭৫০-৮০০ টাকা। এতে ধান উৎপাদন কমে কৃষককে চরম লোকসানের মুখে পড়তে হয়।

ধানের দাম কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, ২০১৭ সালে বোরো মৌসুমে হাওড় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সরকারী হিসেবেই এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ টন। সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবেলায় সরকার চাল আমদানি সিদ্ধান্ত নেয় এবং পূর্বে আরোপিত ২৮ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়। এরই প্রেক্ষিতে শুরু হয় অবাধ চাল আমদানি। আমদানি শুরুর পর দেড় বছরে দেশে প্রায় ৬০ লাখ টন চাল আমদানি হয়! যদিও সরকার নবেম্বর মাসে ২৮ শতাংশ আমদানি শুল্ক পুনর্বহাল করে তারপরও এখনও দেশে চাল আমদানি অব্যাহত থাকে।

পাশাপাশি গত তিন মৌসুমে দেশে ধানের বাম্পার ফলন অব্যাহত থাকায় সরবরাহ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়। চাহিদার তুলনায় দেশে মজুদ বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ২০১৮ সালে আমন মৌসুমে বাম্পার ফলনের পর মজুদ ও বাজারে চালের সরবরাহ যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। ফলে বোরো মৌসুমে ধান কাটা শুরু হলে ধানের দাম আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।

এ অবস্থায় সরকার কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে সিদ্ধান্ত নেয়। এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিক গ্রহণ করেন কষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। তারই নির্দেশে চলতি বছর থেকেই কৃষি যান্ত্রিকীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে এ নিয়ে মন্ত্রণালয় ও অঙ্গ সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন কৃষিমন্ত্রী। তার নির্দেশে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাজস্ব বাজেটের আওতায় ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ শীর্ষক ৫৬২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এ নিয়ে সর্বশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর কৃষিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে কৃষকের চাহিদা, যন্ত্র ব্যবহারে সমস্যা, সুবিধা ইত্যাদি বিষয়ে জরিপ সমীক্ষা রিপোর্ট তুলে ধরা হয়। এর আগে ২১ আগস্ট কৃষিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় যান্ত্রিকীকরণের আগে সারাদেশে কৃষি যন্ত্রের চাহিদা নিরূপণের জন্য জরিপ সমীক্ষা পরিচালনার নির্দেশ দেন কৃষিমন্ত্রী। একই সঙ্গে আসন্ন বোরো মৌসুম থেকেই ভর্তুকিতে কৃষি যন্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন মন্ত্রী।

সারাদেশকে মোট ১৪টি অঞ্চলে ভাগ করে এই সমীক্ষা চালানো হয়। এতে দেখা যায়, কৃষকের চাহিদা অনযায়ী চারা রোপণ ও ধান কাটার জন্য বিদ্যমান কৃষি ব্যবস্থা যান্ত্রিকীকরণ করতে মোট ১৭ হাজার ৭৩৪টি যন্ত্রের প্রয়োজন। এর মধ্যে ধান কাটার জন্য বিভিন্ন দামের কম্বাইন্ড হারভেস্টার প্রয়োজন ৯ হাজার ৭০৯টি। ধান কাটার জন্য রিপার প্রয়োজন ৭ হাজার ৪১টি এবং চারা রোপণের জন্য রাইস ট্রান্সপ্লান্টার প্রয়োজন ৯৮৪টি। প্রতি বছর ধাপে ধাপে এই যন্ত্র কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেবে সরকার। এর মধ্যে এ বছর (২০১৯-২০) কৃষকদের দেয়া হবে ৫ হাজার ৩০০টি যন্ত্র। এর মধ্যে রয়েছে ৩ হাজার কম্বাইন্ড হারভেস্টার, ২ হাজার রিপার এবং ৩০০ রাইস ট্রান্সপ্লান্টার। এসব যন্ত্র কৃষকদের মাঝে পৌঁছে দিতে ৬০ শতাংশ সরকারের ভর্তুকি বাবদ খরচ হবে ৪১৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন দামের কম্বাইন্ড হারভেস্টারে খরচ হবে সর্বোচ্চ ৩৮৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা, রিপারে খরচ হবে ২১ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং রাইস ট্রান্সপ্লান্টারে খরচ হবে ৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। তবে কৃষকদের পছন্দমতো মডেল ও ব্র্যান্ডের যন্ত্র সরবরাহ করা হবে বিধায় যন্ত্র সংখ্যা ও ভর্তুকির অর্থ ভর্তুকি সমন্বয় কমিটির অনুমোদনক্রম পরিবর্তন হতে পারে।

এসব যন্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে ৪টি বিষয়ের প্রতি তীক্ষè নজর রাখা হবে। এগুলো হলো মানসম্পন্ন কৃষিযন্ত্র ও বিক্রয়োত্তর সেবা নিশ্চিত করা হবে, আকারে ছোট এবং গুনগত মানসম্পন্ন যন্ত্র অগ্রাধিকার দেয়া হবে, যন্ত্র ব্যবহারকালে উদ্ভূত সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে যন্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে বিক্রয়োত্তর গ্যারান্টি দিতে হবে এবং মাটি ও জমির উপযোগী কৃষিযন্ত্র কৃষকদের কাছে সরবরাহ করা হবে।

এ প্রসঙ্গে কৃষি সচিব মোঃ নাসিরুজ্জামান বলেন, ‘কৃষিযন্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে আমরা কৃষকদের পছন্দকে অগ্রাধিকার দেব। তাদের পছন্দসই কৃষিযন্ত্রই আমরা ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহ করব। এক্ষেত্রে আমরা সার্ভের মাধ্যমে কৃষকদের পছন্দ অপছন্দগুলো জেনেছি।’

তিনি বলেন, রিপার নিয়ে কৃষক খুব বেশি সন্তুষ্ট নয়। কৃষক মনে করে, রিপার দিয়ে ধান কেটে জমিতে ফেলে রাখতে হয়। দিনমজুর দিয়ে তা বাড়িতে এনে আবার মাড়াই করতে হয়। আবার আমন মৌসুমে ধান কেটে জমিতে রাখা গেলও বোরো মৌসুমে ধান কেটে রাখা যায় না। কারণ বৃষ্টিতে ওই ধান নষ্ট হয়ে যায়। তাই কৃষক মনে করে, রিপার দিয়ে তাদের কাজ চলছে, তবে কম্বাইন্ড হারভেস্টার হলে ভাল হয়।

কৃষি সচিব বলেন, কম্বাইন্ড হারভেস্টারের ক্ষেত্রেও তাদের আবার পছন্দ-অপছন্দ আছে। তারা আমনে চায় খড় বা নাড়া আস্ত থাকুক, আবার বোরোতে চায় টুকরা টুকরা খড়। বেশিরভাগ কম্বাইন্ড হারভেস্টারই খড় টুকরো টুকরো করে দেয়। তাই আমরা দুই ধরনের কম্বাইন্ড হারভেস্টারেই প্রাধান্য দিচ্ছি। যেগুলো খড় টুকরো টুকরো করে না, আবার খড় টুকরো টুকরো করে। বাজারে বিভিন্ন দামের এই মেশিন পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে আমরা মাঝামাঝি মূল্যের মেশিনে প্রাধান্য দিচ্ছি।

কৃষিযন্ত্রের ক্ষেত্রে কৃষকদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো খুচরা যন্ত্রাংশের অভাব। এক্ষেত্রে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের সেবা খুবই দুর্বল। সরবরাহকারীরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে কৃষকদের যন্ত্র প্রদান করে, পরবর্তীতে সেই বিক্রয়োত্তর সেবা কৃষক পায় না। তাছাড়া খুচরা যন্ত্রাংশও সহজলভ্য নয়। তাই কৃষকদের কৃষি যন্ত্র সরবরাহের পাশাপাশি খুচরা যন্ত্রাংশের অভাব পূরণেরও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এক্ষেত্রে এসএমই ফাউন্ডেশনকে যন্ত্রাংশ সরবরাহে যুক্ত করতে যাচ্ছে। এসএমই ফাউন্ডেশনের আওতায় বগুড়া ও যশোর অঞ্চলে খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির অনেক কারখানা রয়েছে। ঋণ ও প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে এসব কারখানায় কৃষিযন্ত্রের খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদন করে সরবরাহ করা হবে। এতে কৃষকদের কাছে তাদের কৃষিযন্ত্রের খুচরা যন্ত্রাংশ সহজলভ্য হবে।

এ প্রসঙ্গে মোঃ নাসিরুজ্জামান বলেন, কৃষিযন্ত্রের পাশাপাশি কৃষকদের খুচরা যন্ত্রাংশের অভাব পূরণেরও আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। কৃষকদের এই অভাব পূরণে আমরা ঠিক করেছি, মেশিন কেনার সময় কৃষকদের ১-২ সেট খচরা যন্ত্রাংশ দেয়া হবে। এছাড়া কৃষকদের কাছে খুচরা যন্ত্রাংশের প্রাপ্তি সহজলভ্য করার জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। এ ব্যাপারে আমরা এসএমই ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কথা বলেছি। এই সংস্থার আওতায় অনেক খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা আছে। তাদের যদি ঋণ দেয়া হয় তাহলে কারখানাগুলো কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি করে দিতে পারবে। তাই খুচরা কৃষি যন্ত্রাংশ উৎপাদন ও সরবরাহের দায়িত্ব আমরা এসএমই ফাউন্ডেশনকে দিতে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, ‘যশোর ও বগুড়ায় খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির অনেক কারখানা আছে। আমরা ঋণ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সেসব কারখানাকে কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরিতে সক্ষম করে তুলব।’

নষ্ট হয়ে যাওয়া মেশিন মেরামত প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কৃষি সচিব বলেন, কৃষি অন্যান্য যন্ত্র যেমন সেচ যন্ত্র, পাওয়ার ট্রিলার ইত্যাদি মেরামতের জন্য সরাদেশেই একটি সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এসব মেশিন মেরামতের জন্য সারাদেশেই মেকানিক দাঁড়িয়ে গেছে। কম্বাইন্ড হারভেস্টার, রিপার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার মেরামতের জন্য তাদের আমরা প্রশিক্ষণ দেব। এছড়া যারা মেশিন কিনবে তাদের ছোটখাটো প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মেশিন সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রদান করা হবে। আবার মেশিন ঠিক করার জন্য তাদের টুলসও দেয়া হবে। যাতে ছোটখাটো সমস্যা মেশিন মালিকরা নিজেরাই সাড়াতে পারেন। এছাড়াও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদেরও (এসএও) এ বিষয়ে দক্ষ করা হবে, যাতে তারা তাৎক্ষণিক কৃষকদের সহায়তা করতে পারেন। তিনি বলেন, ‘কৃষিযন্ত্র সম্পর্কে এসএও’দের প্রশিক্ষণ থাকলে প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ওঠা যাবে।’

যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে একই মেশিন সব এলাকায় প্রদান করা হবে না। দেশের ১৪টি কৃষি অঞ্চলের যে এলাকার জন্য যে ধরনের মেশিন প্রয়োজন, সেই এলাকার জন্য সেই ধরনের মেশিন প্রদান করা হবে। এজন্য সরকার একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে। কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী কোন এলাকার জন্য কত দামের কোন মেশিন প্রয়োজন তা ওই কমিটি নির্ধারণ করবে।

এ প্রসঙ্গে কৃষি সচিব বলেন, সব এলাকায় আমরা একই মেশিন দেব না। এ ব্যাপারে আমরা একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করেছি। কোন এলাকায় কোন মেশিন উপযোগী সেই এলাকায় সেই মেশিন দেয়া হবে। এ বিষয়টি টেকনিক্যাল কমিটি দেখবে। তিনি বলেন, কৃষকের পছন্দ আমনে খড় আস্ত থাকুক, আর বোরোতে টুকরা খড় চায়। আবার খড় আস্ত রাখতে গেলে মেশিন ধান কম কাটতে পারে। এ বিষয়গুলোও টেকনিক্যাল কমিটি দেখবে।

তিনি বলেন, সমীক্ষায় আমরা দেখেছি, কম্বাইন্ড হারভেস্টার, রিপার ও রাইস ট্রান্সপ্লান্টার- তিন ধরনের মেশিনেই কৃষকদের চাহিদা আছে। তবে কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও রিপারের তুলনায় রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের চাহিদা একটু কম। এর কারণ হলো রাইস ট্রান্সপ্লান্টারে চারা রোপণের ক্ষেত্রে একটি থেকে অন্যটির দূরত্ব কৃষক বেশি মনে করে। এই বিষয়টিও আমরা অদূর ভবিষ্যতে সমাধান করব।

নাসিরুজ্জামান বলেন, এ বছর বোরোতেই আমরা এসব কৃষিযন্ত্র কৃষকদের দিতে পারব। তার আগে আমরা আমনে ধানা কাটার মেশিন ব্যবহার করব। অর্থাৎ আমনের মধ্য দিয়ে আমরা কৃষিযন্ত্রের পরীক্ষা চালাব। বিশেষ করে, আমান ধান অনেক স্থানে শুয়ে পড়ে। শুয়ে পড়া ধানও মেশিন কাটতে পারে কিনা সেটিরও পরীক্ষা হবে আমনে। আর বোরোতে চারা রোপণ ও ধান কাটার কাজটিও যন্ত্রের মাধ্যমে করা হবে। এর মধ্য দিয়ে দেশের ধান আবাদের সব কাজ অর্থাৎ জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, সেচ, ধান কাটা সব কাজই যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে সম্ভব হবে বলে আশা করছি।

এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষিযন্ত্র বর্তমান সরকারের অগ্রগণ্য বিষয়। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, কৃষিজমির পরিমাণ দিন দিন কমছে, কৃষি শ্রমিক শহরমুখী হয়ে অন্য কাজে সম্পৃক্ত হচ্ছে। সেক্ষেত্রে শুধু উন্নত জাত ও সার ব্যবহার করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ধরে রাখা সম্ভব হবে না। সেজন্য ফসল উৎপাদন, ধান কাটা ও কর্তন-পরবর্তী কাজগুলোয় সঠিক যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে অপচয় রোধ করে বাংলাদেশের জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষি যন্ত্র বর্তমান সরকারের অগ্রগণ্য বিষয়।

তিনি বলেন, আমরা কৃষকদের বেশি দামের গুণগত মান সম্পন্ন মেশিন দেব। যাতে কৃষক দীর্ঘদিন ব্যবহার করতে পারে। এক্ষেত্রে আমরা ভর্তুকি বাড়িয়ে দেব। বেশি দামের মেশিন হলে কৃষককে দুর্ভোগে পড়তে হবে না। তাছড়া আমরা কৃষকদের মান সম্পন্ন যন্ত্রের পাশাপাশি বিক্রয়োত্তর সেবাই নিশ্চিত করব। এক্ষেত্রে যন্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে বিক্রয়োত্তর গ্যারান্টি দিতে হবে।