১৭ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ হযরত আলী রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু সম্পর্কে প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন : আমি হচ্ছি ইলমের নগরী আর আলী তার দরওয়াজা। তিনি আরও বলেছিলেন : মুসার সঙ্গে হারুনের যে সম্পর্ক ছিল আমার সঙ্গে আলীর সেই সম্পর্ক।

হযরত আলী করমাল্লাহু ওয়াজহাহুকে বীরত্বের কারণে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম আসাদুল্লাহিল গালিব-আল্লাহর বিজয়ী সিংহ উপাধিতে ভূষিত করেন। তাঁকে আবুল হাসান-হাসানের বাপ, আবু তুরাব-মাটির বাপ নামেও অভিহিত করা হয়। আবু তুরাব নামটির পেছনে একটি ঘটনা রয়েছে। একদিন তিনি তাঁর স্ত্রী খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমাতুয্ যাহ্রা রাদিআল্লাহু তায়ালা আন্হার সঙ্গে কথা কাটাকটি করে মনোক্ষুণœ হয়ে মসজিদের কাঁচা মেঝেতে এসে শুয়ে ছিলেন, এমন সময় হযরত রসূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাললাম এসে তাঁর মাটিমাখা দেহ দেখে তাঁর মনোকষ্ট বুঝলেন। তিনি তাঁকে উৎফুল্ল করার জন্য বললেন : হে মাটির বাপ (আবু তুরাব) কি হয়েছে, ওঠো! হযরত আলী (রা)-এর সমস্ত অভিমান-ক্লেশ হযরত রসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লামের মধুমাখা স্বরে, আদরের ডাকে নিমিষে উবে গেল। তিনি ত্বরিত উঠে দাঁড়ালেন, মুখে তাঁর হাসি। হযরত আলী (রা) আবূ তুরাব নামটিকে অন্তরে গেঁথে নিয়েছিলেন। তিনি আরও যে সব উপাধিসূচক নামে পরিচিত ছিলেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য : মুরতাযা-আল্লাহ যার প্রতি খুবই সন্তুষ্ট, হায়দারে কারবার-বারবার হামলাকারী প্রচ- শক্তিধর সিংহ, শাহেবিলায়াত-ওলিত্বের সম্রাট (আল্লাহর ওলীদের রাজা), বাদশাহে আউলিয়া, শেরে ইয়াযদান-আল্লাহর বাঘ। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁকে বলা হতো : আমীরুল মুমিমীন, খলীফাতুল মুসলিমীন। তিনি ওয়ালীউল্লাহ, মওলা আলী হিসেবেও অভিহিত হয়ে আসছেন।

হযরত আলী করমাল্লাহু ওয়াজহু জন্মগ্রহণ করেন ৫৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৩ রজব সবচেয়ে অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত বনু হাশিমে। তাঁর সম্মানিত আব্বা হযরত আবু তালিব ছিলেন হেজাজের প্রধান শায়খ এবং কাবা শরীফের রক্ষণাবেক্ষণ করা থেকে শাসনকার্য পরিচালনা এবং মক্কা নগরীর প্রধান হিসেবে তদানীন্তন জানা পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র সম্মানিত ও সর্বশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ৮ বছর বয়সে দাদাকে হারালে এই চাচা আবু তালিবের অভিভাবকত্বে বড় হন। ১২ বছর বয়সে চাচার বাণিজ্য কাফেলার সঙ্গে তিনি সিরিয়া, বসরা প্রভৃতি অঞ্চলে যান। হযরত আলী (রা)-এর বংশ লতিকা হযরত ইসমাঈলে গিয়ে মিশেছে, যে হযরত ইসমাঈল আলায়হিস সালাম নিজের গলা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এবং পিতা হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালামের স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করার জন্য এগিয়ে দিয়ে নিজেকে কুরবান করবার অদ্বিতীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেনÑ যার প্রতীকী কোরবানি আজও মুসলিম দুনিয়ায় ঈদ-উল-আজহা হয়ে থাকে।

জানা যায়, হযরত আলী করমাল্লাহু ওয়াজহাহু ভূমিষ্ঠ হন বায়তুল্লাহ্্ শরীফে। তাঁর আম্মাজান হযরত ফাতিমা বিনতে আসাদ ইবনে হাশিম প্রায় ২৮০ দিনের গর্ভবতী অবস্থায় কাবা শরীফ তওয়াফ করছিলেন। এমন সময় তাঁর প্রসব বেদনা শুরু হয়ে গেলে উপস্থিত অন্য মহিলারা কাবা শরীফের অভ্যন্তরে তাঁকে নিয়ে যান এবং সেখানেই শাহে বিলায়াত বাদশাহে আউলিয়া ভূমিষ্ঠ হন।

হযরত আবু তালিবের আর্থিক অবস্থা সচ্ছল ছিল না। তাই হযরত মহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম শিশু আলীকে লালন-পালনের ভার নেন, উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা) তাঁর লালন-পালনে মায়ের মতো যতœবান হন।

৬১০ খ্রিস্টাব্দের ২৭ রমাদান রাতে হেরা গুহায় প্রথম ওহী পেয়ে গৃহে ফিরে এসে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম খাদীজাকে (রা) তা জানান। হযরত খাদীজা (রা)-ই সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন, তারপর যিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তিনি হযরত আলী। তখন তাঁর বয়স দশ বছর কয়েক মাস। ইসলামের খেদমতের জন্য তিনি সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকতেন।

আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে নির্দেশ দিলেন : ওয়া আন্যির আশীরাতাকাল আক্রাবীনÑ (হে রসূল) আপনি আপনার নিকটাত্মীয়স্বজনকে সতর্ক করুন। (সূরা শু’আরা : আয়াত ২১৪)।

প্রথম ওহী প্রাপ্তির প্রায় তিন বছর পর এই নির্দেশ নাজিল হলে প্রিয়নবী (সা) তেরো বছরের কিশোর আলী করমাল্লাহু ওয়াজহাহুকে বনু হাশিমের ৪০ বিশিষ্ট ব্যক্তিকে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য দাওয়াত দিতে বলেন। দাওয়াত পেয়ে সবাই এলো। খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে প্রিয়নবী (সা) সমবেত সবাইকে বললেন : আমি তোমাদের কাছে এক উত্তম কালাম নিয়ে এসেছি, যার চেয়ে উত্তম কালাম অন্য কেউ কখনও তাঁর নিজ কওমের জন্য নিয়ে আসেনি। তোমাদের মধ্যে কে কে আমাকে সহযোগিতা করবে?

এ কথা শুনে সবাই নিশ্চুপ থাকল। তখন হযরত আলী (রা) দাঁড়িয়ে বললেন : আমি বয়সে আপনাদের সবার চেয়ে ছোট, সেদিক দিয়ে আমি দুর্বলও বটে, তবুও হে রসূল, আমি সর্বাবস্থায় আপনাকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছি।

এরপর থেকেই প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার শুরু হয়। কাফির-মুশরিকরা মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা প্রিয়নবী (সা) ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের জুলুম-নির্যাতনে জর্জরিত করে দেয়, বয়কট পর্যন্ত করে। হযরত আলী (রা) সব সময় হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর পাশে থেকেছেন।

৬২২ খ্রিস্টাব্দে কাফির মুশরিকরা হযরত মুহম্মদ (সা)-কে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য রাতের অন্ধকারে তাঁর গৃহ ঘেরাও করলে তিনি আমানতের মালসামান, ধন-সম্পদ মালিকদের ফিরিয়ে দেয়ার জন্য হযরত আলী করমাল্লাহু ওয়াজহাহুকে তাঁর বিছানায় শুইয়ে রেখে মদিনা মনওয়ারায় হিজরত করেন। পরে হযরত আলী (রা) আমানতের মাল আমানতকারীদের নিকট ফিরিয়ে দিয়ে মদিনায় যান। মদিনায় এসে প্রিয়নবী (সা) আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে একটা উখ্ওয়াত (ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক) স্থাপন করেন। এই ভ্রাতৃত্ব সংঘের সদস্য হিসেবে হযরত আলীকে (রা) প্রিয়নবী (সা) নিজের ভাগে রাখেন।

হযরত আলী (রা) তাবুক অভিযান ছাড়া সব যুদ্ধেই শরিক হয়ে বীরত্বের স্বাক্ষর স্থাপন করেন। ওহুদ যুদ্ধের সময় কেবল তিনি শত্রুর তীরের আঘাত পেয়েছিলেন, তার ফলে তাঁর দেহের ১৬টি স্থানে জখম হয়। তাঁর পায়ে একটি তীরের ফলা এমনভাবে বিদ্ধ হয় যে, যা খুলে ফেলা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন সবাই গোপনে স্থির করলেন হযরত আলী (রা) নামাজে রত হলে তীরটি খুলে ফেলা সম্ভব হবে। তাই করা হলো। তীর টেনে খোলার সময় তিনি একটুও উহ্-আহ্ করলেন না। এতে এটাই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সালাতে ও ইবাদতে এবং রিয়াযতে তিনি কত একাগ্রচিত্ত ছিলেন! হাদিস শরীফে আছে যে, যখন তুমি সালাতরত হবে তখন মনে করবে তুমি আল্লাহ্কে দেখছ; যদিও তুমি আল্লাহ্কে দেখছ না, আল্লাহ্ তোমাকে দেখছেন। হযরত আলী (রা)-এর সালাত সেদিন সেটারই বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।

হযরত আলী রাদিআল্লাহু তায়ালা আন্হুর সঙ্গে হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর কন্যা খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমাতুয যাহ্রা রাদিআল্লাহু তায়ালা আন্হাকে বিয়ে দেন। তখন হযরত আলী (রা)-এর বয়স ২৪ আর হযরত ফাতিমা (রা)-এর বয়স ১৯। তাঁদেরই সন্তান জান্নাতের যুবকদের সরদার হযরত ইমাম হাসান আলায়হ্সি সালাম ও হযরত ইমাম হুসাইন আলায়হিস সালাম।

হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ৬৩১ খ্রিস্টাব্দে তাবুক অভিযানকালে হযরত আলীকে (রা) মদিনা রাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি করে যান। তিনি ইয়েমেনের গবর্নরও নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর বীরত্বের এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে খাইবার যুদ্ধের সময়। ইয়াহুদীরা কামুস দুর্গে এমন শক্ত ফটক এঁটে অবস্থান নিয়েছিল যে, এক মাস অবরোধ করে থেকে ওই দুর্গের ফটক ভাঙ্গা যাচ্ছিল না। হুজুর হযরত মুহম্মদ (সা) ঘোষণা দিলেন : লা আ’তীন্নার রইয়াতা গাদান রাজুলান ইয়াফতাহুল্লাহু আলা ইয়াদায়হিÑআগামীকাল এক ব্যক্তিকে পতাকা দেয়া হবে যাঁর হাতে আল্লাহ্ বিজয় দান করবেন। (বুখারী শরীফ)।

এই ঘোষণা শুনে সব সাহাবায়ে কেরাম আগ্রহ ভরে রাতযাপন করতে লাগলেন। সেই ভাগ্যবান ব্যক্তি কে তা দেখার ঔৎসুক্য নিয়ে রাত কাটালেন। ফজরের সালাতের পর প্রিয়নবী (সা) পতাকা নিয়ে হযরত আলী (রা)-এর হাতে তুলে দিলেন। হযরত আলী (রা) তখন চক্ষুরোগে আক্রান্ত হয়ে যন্ত্রণায় ভুগছিলেন; হুজুর (সা) নিজের মুুখের থুথু মুবারক আলী (রা)-এর চোখে লাগাতেই তাঁর চোখ সুস্থ হয়ে গেল। হযরত আলী (রা) আল্লাহ্ আকবার তকবির দিয়ে কামুস দুর্গের ফটক ধরে টান দিতেই তা মড়মড় করে ভেঙ্গে গেল। তিনি তা দূরে ছুড়ে মারলেন। পরে অনেক লোক ফটকটি একত্রে ধরে অন্যত্র নেয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এতে বোঝা যায়, ফটকটি কত ভারি ছিল। সেদিন হযরত আলী (রা)-এর বীরত্বের কারণেই আল্লাহর রহমতে কামুস দুর্গে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন হয়েছিল।

৬৩১ খ্রিস্টাব্দে হজের বিধান নাজিল হলে তাবুক অভিযান থেকে ফিরে এসে প্রিয় নবী (সা) হযরত আবু বকর (রা)-এর নেতৃত্বে তিন শ’ সাহাবীর একটি হজ কাফিলা পাঠান। এটিই ছিল তৌহিদভিত্তিক হজের প্রথম কাফিলা। হজ কাফিলা রওনা হয়ে যাওয়ার পর পরই সূরা তওবার প্রথম দিককার কয়েকখানা আয়াতে কারিমা পাঠ করে কাফির মুশরিকদের শোনানোর জন্য হযরত আলীকে (রা) পাঠানো হয়। তিনি মিনা, আরাফাত মুযদালিফা প্রভৃতি স্থানে আয়াতগুলো উচ্চৈঃস্বরে আবৃত্তি করে শোনান। আয়াতগুলো হচ্ছে : সম্পর্ক ছিন্ন করা হলো আল্লাহ্ ও তার রসূলের পক্ষ হতে সেই সব মুশরিকের সঙ্গে যাদের সঙ্গে তোমরা পারস্পরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলে। অতঃপর তোমরা দেশে চার মাসকাল বিচরণ কর এবং জেনে রাখ যে, তোমরা আল্লাহ্কে হীনবল করতে পারবে না এবং নিশ্চয় আল্লাহ্ সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের লাঞ্ছিত করে থাকেন। মহান হজের দিনে আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের পক্ষ হতে মানুষের প্রতি এটা এক ঘোষণা যে, নিশ্চয়ই মুশরিকদের ব্যাপারে আল্লাহ্ দায়মুক্ত এবং তাঁর রসূলও। তোমরা যদি তওবা কর তবে তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রাখ যে, তোমরা আল্লাহ্কে হীনবল করতে পারবে না। সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও। (সূরা তওবা : আয়াত ১-৩)। তিনি ২৮ নম্বর আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করে শোনালেন। এই সূরার ২৮ নম্বর আয়াতে ঘোষিত হয়েছে : হে মুমিনগণ! মুশরিকরা তো অপবিত্র; সুতরাং এই বছরের পর তারা যেন মসজিদুল হারামের নিকট না আসে।

হুজুর সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর রফিকুল আলার কাছে চলে গেলে তাঁর গোসল করানো থেকে যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা ছিল হযরত আলী (রা)-এর। তিনি প্রথম তিন খলিফার আমলে খিলাফত পরিচালনায় প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁরই পরামর্শে হযরত উমর (রা) হিজরী সনের প্রবর্তন করেন। হযরত উসমান (রা) ইয়াহুদী থেকে মুসলিম হওয়া আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবার চক্রান্তে শহীদ হলে নিজের ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও তিনি বিশিষ্ট সাহাবায়ে কেরামের অনুরোধে, বিশেষ করে বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণের অনুরোধে খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং মদিনাকে রাজনৈতিক ডামাডোল থেকে মুক্ত রাখার জন্য রাজধানী কুফা নিয়ে আসেন। ইয়াহুদী চক্র গভীরভাবে মুসলিম শক্তির মধ্যে অনুপ্রবেশ করে এবং হযরত উসমান হত্যার বিচারের দাবি তুলে অরাজকতার সৃষ্টি করে। এদের উস্কানিতে উগ্র খারেজী সম্প্রদায় গড়ে ওঠে। লা হুকমা ইল্লালিল্লাহÑআল্লাহর হুকুম ছাড়া কিছু মানিনে সেøাগান নিয়ে এরা ময়দানে নামে অতিসন্তর্পণে। মূলত এরা ইসলামের নামে ইসলামের ক্ষতি সাধনে লিপ্ত হয়। উল্লেখ্য, এদের প্রেতাত্মারা আজও আছে।

ইয়াহুদীদের মদদপুষ্ট খারেজীরা আল্লাহর আইন কায়েম ও সৎলোকের শাসন কায়েমের ধুয়া তুলে হযরত আলী (রা) হযরত মুআবিয়া (রা) ও হযরত আমর ইবনুল আসকে (রা) হত্যার পরিকল্পনা এঁটে কুফা, দামেস্ক ও ফুস্তাতে গুপ্তঘাতক নিযুক্ত করে।

হযরত আলী (রা) কুফা মসজিদে গুপ্তঘাতক ইবনে মলজুমের বিষমাখানো তরবারির আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি ৬৩ বছর বয়সে শহীদ হন্ তাঁর মাজার শরীফ কোথায় তা আজও অজ্ঞাত।

ইরাকের নাজাফে বিশাল মাশ্হাদ তাঁর স্মৃতি বহন করছে। মদিনা মনওয়ারার মসজিদুন্নববীর দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে তাঁর বাসভবনের স্থানে মসজিদে আলী রয়েছে। পাকিস্তানের খাইবার পাসের একটি মসজিদ তাঁর নাম বহন করছে। আলী-আলী হায়দারী হাঁক বিপ্লবী চেতনায় ভাস্বর।

তিনি উঁচু স্তরের কবি ছিলেন, তাঁর নাহজাতুল-বালাগা ও দীওয়ান জ্ঞান-বিজ্ঞান ইলমে তাসাওফ এবং রুহানী উন্নয়নের ক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট গ্রন্থ। কুরআন মজিদের হরকত ও নুকতা এবং আরবী ব্যাকরণ তাঁরই অবদান। ইলমে তাসাওউফের মূল ধারা প্রিয়নবী (সা) থেকে তাঁর মাধ্যমেই বিকশিত হয়েছে। একবার প্রিয়নবী (সা) আলী, ফাতিমা, হাসান ও হুসাইনকে একটি চাদরের নিচে নিয়ে তাওয়াজ্জুহু ও ফয়েয দেন। এরই প্রেক্ষিতে কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে : আল্লাহ্ চান তোমাদের কলুষমুক্ত করে সম্পন্নভাবে পবিত্র করতে। (সূরা আহযাব : আয়াত ৩৩)।

লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ