১৭ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ইংরেজী অনুবাদ প্রসঙ্গে

  • আনিসুর রহমান

একজন পাঠকের কাছে গদ্য আর পদ্যের পার্থক্যটা কোথায়? বোধগম্যতা আর উপলব্ধিতে। ইংরেজীতে বললে prose is to understand গদ্য বোঝার জন্য আর poetry is to feel কবিতা হচ্ছে অনুভব করার জন্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ আর ‘কারাগারের রোজনামচা’ বই দুটি এই উভয় আবেদন ধারণ করে।

কেননা বঙ্গবন্ধুর লেখা সাহিত্যকর্ম একই সঙ্গে গদ্য আর পদ্যের বৈশিষ্ট্যে ভরা। গদ্য যেমন সরাসরি সত্যকে প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধুর লেখায় সেই ধার রয়েছে। একই সঙ্গে কবিতায় যেমন গূঢ় সত্যকে পরোক্ষ ও যে গভীর অনুভূতির প্রকাশ, উপমাও প্রতীকে থাকে সে দিকটাও আছে। তিনি সত্যকে বলে গেছেন সহজে। হৃদয়ের রক্ত যেমন ঝরেছে তেমন সূর্যের কিরণে শিশিরে সত্য জ্বলজ্বল করেছে ৫৬ হাজার বর্গমাইল জুড়ে। তার লেখার জমিন ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ভূখ-। ভূখ-ের মানুষের হাজার বছরের বঞ্চনা, বঞ্চিত মানুষের আরাধ্য স্বপ্ন, মুক্তির আকুলতা, নিজস্ব জমিন আর দেশের ব্যাকুলতা এসবই তাঁর লেখায় এসেছে; যতটা গদ্য ততটা কবিতার আদলে স্বপ্ন আর কল্পনার কি অপূর্ব চাষ, কষ্ট আর যন্ত্রণা আনন্দ আর বেদনার এক মহাকাব্যিক আখ্যান। তাঁর লেখা একদিকে আধুনিক গদ্য মহাকাব্য বা উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে একই সঙ্গে মহাকাব্যের দাবিও মেটায়। তাই এই সাহিত্যকর্ম যারা অনুবাদে হাত দিচ্ছেন তাদেরকে প-িতির গ-ি পেরুলেই হবে না। দাবি আরও বেশি।

এ প্রসঙ্গে আরও বিশদ আলোচনায় যাবার আগে বিশ্বমানের কয়েকজন নেতা, মনীষী বা লেখকের সাহিত্যকর্ম অনুবাদ নিয়ে কয়েকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করতে চাই।

রবীন্দ্রনাথ বিলেতে পড়ালেখা করার পরও এবং ইংরেজীতে যথেষ্ট পাকা হাত থাকা সত্ত্বেও তাঁর অনুবাদ ঘষামাজা করেছেন ইংরেজী ভাষাভাষী দুই প্রথিতযশা লেখক সম্পাদক রতেনস্টেইন আর উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস। এর পরের গল্প কম আর বেশি আমরা প্রায় সকলেই জানি।

মহাত্মা গান্ধীর আত্মজীবনী গুজরাটি ভাষা থেকে ইংরেজীতে অনুবাদ করেছেন লেখক মহাদেব দেশাই, প্রকাশ হয়েছে ১৯২০ এর দশকের শেষের দিকে। যার হদিস বিশ্বের প্রায় সকল দেশের গ্রন্থাগারের ক্যাটালগে মেলে। এই অনুবাদকর্ম ওই সময় তো বটে প্রায় একশ বছর পরেও আজ আলোচিত।

নরওয়ের লেখক ইবসেন শতবর্ষ পূর্বে দেড় লাখ লোকের ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর লেখক হয়ে কেবল যথার্থ অনুবাদ আর অন্য ভাষার নিজ নিজ লেখক অনুবাদকের অনুবাদের কল্যাণে আজও সারা দুনিয়ার সকল দেশের সকল প্রান্তের মানুষের লেখক। তাঁর লেখা কিন্তু নরওয়েজিয়ান ভাষাভাষীর কারো ইংরেজীতে করা অনুবাদের কারণে নয়, তিনি সমাদৃত হয়েছেন ইংরেজী ভাষাভাষী জাত লেখকের অনুবাদের কারণে।

সুইডিশ নাট্যকার অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গ ১৯২৯ সালের আগে ইংরেজী ভাষাভাষী দুনিয়ার কাছে অপরিচিতই ছিলেন। ১৯২৫ সালে আইরিশ নাট্যকার বার্নার্ড শ’র নাম নোবেল পুরস্কারের জন্য ঘোষণা করা হলে তিনি বেঁকে বসলেন। তিনি পুরস্কার নেবেন না। এই প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক চ্যানেলে বার্নার্ড শ’র সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কয়েকটি শর্তে এই পুরস্কার নিতে রাজি হলেন। শর্তগুলোর একটি ছিল সুইডিশ নাট্যকার অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গের লেখা তিনি তাঁর নোবেল পুরস্কারের টাকার একটা অংশ দিয়ে ইংরেজীতে অনুবাদ করাবেন। বার্নার্ড শ’ তাঁর কথা রেখেছিলেন। এখন অগাস্ট স্ট্রিন্ডাবার্গও একজন আন্তর্জাতিক নাট্যকার।

এত কথা বলার উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ইংরেজী অনুবাদ নিয়ে আমার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা। এই অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে ২০১২ সালে। এখন পর্যন্ত ইংরেজী ভাষাভাষী কোন দেশে বইটি নিয়ে উল্লেখ করার মতো কোন আলোচনা হয়নি। তাদের গণমাধ্যম কিংবা সাহিত্য পরিম-লেও না। বিদেশের গ্রন্থাগারগুলোর ক্যাটালগেও বইটির হদিস খুব একটা মেলে না। কিন্তু কেন? অথচ বঙ্গবন্ধু যে মাপের বিশ্বনেতা, আর তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, আন্তর্জাতিক মানদ-ে যে উঁচুমানের সাহিত্যকর্ম তা অবশ্যই একজন ইংরেজী ভাষাভাষী পেশাদার লেখক যিনি দেশে বিদেশে সমাদৃত, যার অনুবাদ আর সম্পাদনার কল্যাণে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ইংরেজী অনুবাদ নিয়ে ইংরেজী ভাষাভাষী দেশে বড় বড় পত্রিকায় আলোচনা হবে আর তাবৎ দুনিয়ার গ্রন্থাগারে, নিদেন পক্ষে জাতীয় গ্রন্থাগারের ইংরেজী বইয়ের ক্যাটালগে স্থান করে নেয়ার দাবি রাখে।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপনকে সামনে রেখে এই চাওয়া তো খুব বেশি চাওয়া না। এই জন্য আমাদের যা করা দরকার তাই করতে হবে। যেমনটা রবীন্দ্রনাথ করেছিলেন তাঁর স্বীকৃত গীতাঞ্জলির ইংরেজী অনুবাদ নিয়ে। তা না হলে আমাদের অধ্যাপক ফকরুল আলমকৃত বঙ্গবন্ধুর সাহিত্যকর্মের অনুবাদ নিয়ে আমরা গদগদ হলেও ইংরেজী ভাষাভাষী দুনিয়ায় তা উল্লেখ করার মতো কোন আলোচনা যেহেতু গত অর্ধযুগে হয়নি, অনাগত দিনেও সে সম্ভাবনা আছে এরকম মনে করার কোন কারণ নেই।সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন।