১৭ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যন্ত্রনির্ভর কৃষি

যন্ত্রযুগে প্রবেশ করছে বাংলাদেশের কৃষি। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দেশের কৃষি ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত মানুষ তথা কৃষকদের ওপর নির্ভরশীল। এতে পুরুষের পাশাপাশি নারী ও শিশুর অবদানও কম নয়। যদিও এর অর্থনৈতিক মূল্য প্রায়ই হিসাব করা হয় না। মানুষের শ্রমনির্ভর তথা এনালগ কৃষি ব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতার দিকটি সর্বাধিক প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে কয়েক বছর ধরে। গত দশ বছরের মধ্যে এবারে দেশব্যাপী ধানের আশাতীত ফলন হয়েছে। প্রায় সর্বত্র কৃষকের ক্ষেতে উপচে পড়েছে সুপক্ব সোনালি ধান। সেই ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যায় না বললেই চলে। বাম্পার ফলন হওয়ায় বাজারে ধানের দাম গেছে নেমে, প্রতিমণ সাকল্যে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। অথচ একজন কৃষি শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৮০০ থেকে হাজার টাকা। তাকে আবার তিনবেলা খাবারও দিতে হয়। অনেক স্থানে কৃষি শ্রমিকের অভাবে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ার উপক্রম হয়েছে কৃষকের। অনেকটা এই প্রেক্ষাপটেই কৃষির যান্ত্রিকীকরণ তথা প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি জরুরী ও অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী চার বছরের মধ্যে প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থাকে পরিণত করা হবে প্রযুক্তিনির্ভর তথা ডিজিটাল কৃষিতে। এর জন্য গ্রহণ করা হয়েছে ৪১৫ কোটি টাকার পরিকল্পনা। সেচ এবং জমি তৈরির ক্ষেত্রে বর্তমান কৃষির যান্ত্রিকীকরণ প্রায় শতভাগ সম্পন্ন হলেও পিছিয়ে আছে চারা রোপণ ও ধান কাটার ক্ষেত্রে। সে অবস্থায় ধানের চারা রোপণ তথা ট্রান্সপ্ল্যান্ট এবং ধান কাটা তথা হারভেস্টিংয়ের জন্য ভতুর্কি মূল্যে কৃষকদের দেয়া হবে ৫ হাজার ৩০০টি যন্ত্র। কৃষি শ্রমিক থেকে মুক্তি এবং উৎপাদন খরচ কমাতে কৃষকদের সহায়তার জন্য দেয়া হবে তিন ধরনের যন্ত্রপাতি। এতে অন্তত ৬০ শতাংশ ভতুর্কি দেবে সরকার তথা কৃষি মন্ত্রণালয়। বাকিটা দেবে কৃষক। আগামী দু’ মাসের মধ্যেই কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে এসব যান্ত্রিক উপকরণ। চলতি বোরো মৌসুমে ধান কাটার মাধ্যমে শুরু হবে কৃষির প্রযুক্তি যাত্রা।

গত কয়েক বছরে দেশে বিপ্লব ঘটে গেছে কৃষিতে। ডিজিটাল কৃষিসহ হাইব্রিড পদ্ধতি চালুর ফলে একেবারে বীজতলা থেকে শুরু করে সার, সেচ, কীটনাশক, আবহাওয়া, জলবায়ু, ফসল উৎপাদন, বাজার পরিস্থিতিসহ অন্যবিধ সমস্যা নিয়ে খোলামেলা মতবিনিময়, পরামর্শ ও প্রতিকারের সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে। এর অনিবার্য ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি ব্যবস্থাপনায়, সুফল পাচ্ছে কৃষক, বেড়েছে ফসল উৎপাদন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সর্বাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি। বগুড়ার সান্তাহারে নির্মিত হয়েছে দেশের প্রথম সৌর শক্তিচালিত অত্যাধুনিক বহুতল বিশিষ্ট খাদ্যগুদাম। প্রতিবছর উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্যসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক খাদ্যগুদামের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

বিশ্বে চাল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, মাছ উৎপাদনে চতুর্থ, ফল উৎপাদনে সপ্তম। উন্নতমানের প্রযুক্তি, বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক ইত্যাদি ব্যবহার করে এই উৎপাদন আরও বাড়ানো যায়। এখন নজর দেয়া উচিত বিভিন্ন ও বহুমুখী খাদ্যশস্য উৎপাদন এবং সংরক্ষণে। সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো সব মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা। গমের ঘাটতি এখনও আছে। এর পাশাপাশি ডাল, তেলবীজ, ডিম, মাংস, দুধ, মাছ, মসলা উৎপাদনেও ঘাটতির বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া বাঞ্ছনীয়। মনে রাখতে হবে, শুধু ভাতে পেট ভরে বটে, তবে পুষ্টি ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত হয় না। এদিকে সবিশেষ ও সমন্বিত দৃষ্টি দিতে হবে কৃষি, খাদ্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে। সর্বোপরি তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক চাহিদা ও যোগাননির্ভর ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক বাজার ব্যবস্থা অপরিহার্য। এর পাশাপাশি অত্যাবশ্যক অত্যাধুনিক খাদ্যগুদাম নির্মাণের পাশাপাশি মানসম্মত খাদ্য সংরক্ষণ, বিপণন ও ব্যবস্থাপনা। তা হলেই বহুমুখী খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি নিশ্চিত হবে সবার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা।