১৯ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পদ্মা যমুনার প্লাবন ভূমি চলন বিল আজ পানিশূন্য

  পদ্মা যমুনার প্লাবন ভূমি চলন বিল আজ পানিশূন্য
  • কৃষক ও জেলে পেশা পাল্টে হয়েছে কামলা

সমুদ্র হক ॥ একদার প্রমত্তা নদী পদ্মা-যমুনার সমন্বিত প্লাবনভূমি চলনবিলকে আজ খুঁজে পাওয়া যায় না। ইতিহাসখ্যাত সেই বিল আজ দূর অতীত। পানি শুকিয়ে বিস্তীর্ণ বিল কোন স্থানে ঠা ঠা কোন স্থানে ফসলি জমিতে পরিণত। নিকট অতীতের অথৈ পানি সরে গড়ে উঠেছে ঘরবসতি। ভরে গিয়েছে গাছ গাছালিতে। শুকনো বিলের বুকচিরে নির্মিত হয়েছে পাকা সড়ক। বিলদহর, চামারি, চাটমোহর, গুরুদাসপুর, সিংড়ার যে এলাকাগুলো ছিল দুর্গম বন্ধুর পথ সেখানে এখন যন্ত্র চালিত যানবাহনের সরাসরি প্রবেশ। মানবসৃষ্ট দুর্যোগের আঘাতে চলনবিল আজ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন।

চলনবিলের প্লাবন ভূমির কৃষক ও জেলেদের মাছধারা ছিল অন্যতম পেশা। সেই জেলেরা জলের আধার খুঁজে না পেয়ে কংক্রিটের বনে (শহর ও নগরী) আশ্রিত। পেশা পাল্টে হয়েছে মজুর কামলা। বিলের পুরুষ স্থানান্তরিত হওয়ায় অস্তিত্ব রক্ষায় জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ ভূমিতে সকল ধরনের ফসল ফলাচ্ছে নারী। বিলের আয়তন কমে যে অংশ এখনও জলাশয়ের চিহ্ন রেখেছে সেখান থেকে মাছ ধরে শুকিয়ে শুঁটকি বানানো হচ্ছে। যার বেশিরভাগই নারী শ্রমিক। এই শুঁটকি দেশে সরবরাহ হয়ে বিদেশেও রফতানি করছে। আরেক দিকে যে বিল ছিল ঝিনুক চাষে মুক্তা আহরণের উর্বর আধার তাও আর রক্ষা করা যাচ্ছে না। ঝিনুক থেকে মুক্তা আহরণের আগেই তা হাঁস-মুরগির (পোলট্রি) খাবার ও চুন শিল্পে চলে যাচ্ছে।

প্লাবনভূমি চলনবিলের আয়তন ব্রিটিশ শাসনামলের নথিতে যা ছিল আজও তাই উল্লেখ করা হয়। কতটা কমে গিয়েছে তা বিলপাড়ে গেলে সাদা চোখেই দেখা যায়। উত্তরাঞ্চলের তিন জেলার ৮ উপজেলার মধ্যদিয়ে বয়ে যাওয়া বিলের আয়তন গত শতকের শুরুর দিকে ছিল প্রায় নয়শ’ বর্গমাইল (১ হাজার ৪শ’ ৪০ বর্গ কিলোমিটার)। একবিংশ শতকে আয়তন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র প্রায় ৮৫ বর্গকিলোমিটার। সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে চলনবিলের ওপর দিয়ে নাটোরের বনপাড়া পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার নির্মিত সড়কের দুই ধারে ফসলের মাঠ। অতীতের বর্ষাকালে স্বাভাবিক বাতাসে চলবিলের জলরাশির মোহনীয় ঢেউ দেখে মনে হতো এ যেন নদী। ঝাপটা বাতাসে উথলে ওঠা সেই ঢেউ আর চোখে পড়ে না।

দূর অতীতের স্মৃতির পাতা মেলে ধরলেন চাটমোহরের আব্দুল মান্নান পলাশ- গত শতকের পঞ্চাশের দশকে বিলের ভূখন্ড বছর জুড়ে জলমগ্ন থাকত। কিছু অংশ দু’চার বছর পর জেগে উঠলে রোপা আমনের আবাদ হতো। পরবর্তী দফায় জমি জেগে ওঠার আগে পর্যন্ত নাড়ায় গজিয়ে ওঠা কুশিতেই ধান গাছ জন্মাত। ফলে নৌকা ও কোথাও সামান্য জায়গায় পায়ে হেঁটে যাতায়াত ছাড়া আর কোন বিকল্প ছিল না। জীববৈচিত্র্যের এই বিলের সুস্বাদু মাছ কলকাতায় নেয়ার জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ঈশ্বরদী থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন করে। গত শতকের ৮০’র দশকে বিল শুকিয়ে যাওয়ার পালা শুরু হয়। পলি বিধৌত জমি এতটাই উর্বরতা এনে দেয় যে ধান পাট গম যব ভুট্টা সবজি ফলতে বেশিদিন সময় নেয় না। বছরে কয়েকটি ফসল ফলতে থাকে। একই সঙ্গে যোগাযোগ অবকাঠামোর বিস্তৃতি ঘটতে থাকে।

প্রমত্তা এই বিলে মুক্তা আহরণ ছিল অন্যতম পেশা। নিকট অতীতেও বছরে প্রায় ৫০ হাজার মণ ঝিুনক মিলত বিলে। ঝিনুকের বয়স দুই থেকে আড়াই বছর হলে অন্তত ৩০ ভাগ ঝিনুকের ভেতরে মুক্তা খুঁজে পাওয়া যেত। জুয়েলারির মালিকরা মুক্তা কিনতে অর্থ লগ্নি করত চাষীদের। মুক্তার আধারও আর নেই। যে ঝিনুক মেলে তা বাড়তে দেয়া হয় না। চলে যায় চুন শিল্প ও পোলট্রি ফার্মে।

চলনবিলের জলের আধার ছিল এ রকম- পদ্মা নদীর পানি বড়াল নদী হয়ে ঢুকত চলনবিলে। করতোয়া, আত্রাই, ইছামতি, মাথাভাঙ্গাসহ অন্তত ১৬টি ছোট ও বড় নদীর পানি চলনবিলে প্রবেশ করত শাখা প্রশাখা দিয়ে।

এ ছাড়াও ৩৯টি বিল ও ২২টি জলাশয়ের সম্মিলিত পানির আধার ছিল চলনবিল। পদ্মার পানি যে বড়াল নদী দিয়ে প্রবেশ করত বিলে সেই নদীর (বড়াল) ওপর স্লুইজ গেট বানিয়ে নদীর গতি রুদ্ধ করা হয়। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে স্লুইজ গেট বানালে করতোয়ার গতি রুদ্ধ হয়। কয়েকটি নদী শুকিয়ে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি পড়ে চলনবিলে।

আরেক দিকে বর্ষায় চলনবিলের পানি নামতে থাকে যমুনায়। ফলে দ্রুত পানিশূন্য হয়ে শুকনো ভূমিতে পরিণত হতে থাকে প্লাবনভূমি। বর্তমানে চলনবিলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ নদী প্রবাহ প্রায় বন্ধ। মানবসৃষ্ট দুর্যোগে চলনিবলের পানি প্রবাহ রুদ্ধ হয়ে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন। দূর অতীতের পদ্মা-যমুনার প্লাবনভূমি মুক্তার চলনবিল হারিয়ে আজ শুধুই স্মৃতিময় অধ্যায়।