১৭ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শুদ্ধি অভিযান

বিষয়টি অনুমিত হচ্ছিল গত কয়েকদিন ধরেই। প্রধানমন্ত্রীও আকারে-ইঙ্গিতে একাধিকবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু ওই যে কথায় বলে চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী! বেপরোয়াদের অবস্থা হয়েছে অনেকটা তাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বখরা আদায় তথা দুর্নীতিকে ঘিরে নালিশ যায় প্রধানমন্ত্রীর বরাবর। মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত নিতে আর দেরি করেননি প্রধানমন্ত্রী। নীতিনির্ধারক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনার পর হার্ডলাইনে গিয়েছে সরকার। প্রথমে শোভন-রাব্বানীকে দল থেকে বহিষ্কার এবং অনতিপরেই যুবলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগের দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে প্রায় সর্বাত্মক অভিযানে নেমেছে সরকার। এরই অংশ হিসাবে প্রথমে অবৈধ জুয়া তথা ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এতে কেঁচো খুুঁড়তে বেরিয়ে এসেছে একাধিক বিষধর সাপ। এক সময়ে যেসব ক্লাব ছিল ফুটবল-ক্রিকেটের মতো বড় দলীয় খেলার জন্য সুখ্যাত ও প্রতিষ্ঠিত, র‌্যাব-পুলিশের অভিযানে দেখা যায় যে, সেগুলো বর্তমানে পরিণত হয়েছে ক্যাসিনো রয়ালে। নানারূপ জুয়া খেলা হয় সেসব ক্লাবে, যা পুরোটাই অবৈধ। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন হয় এসব স্থানে। এর পাশাপাশি চলে অবৈধ বার ব্যবসা, মদ্যপান, ইয়াবা ইত্যাদি। নারীদের যাতায়াতও ঘটে। দুঃখজনক হলো, এসবই গড়ে উঠেছে থানা-পুলিশের নাকের ডগায় গত কয়েক বছর ধরে। প্রতিবেশী দেশ নেপাল থেকে এসেছে ক্যাসিনোর সরঞ্জামাদি, জনবল ইত্যাদি। তদুপরি প্রায় প্রতিটির পেছনে মিলেছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা তথা গডফাদারদের সংশ্লিষ্টতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশের মৌন সমর্থন থাকাও বিচিত্র নয়। আর এসবই চলছে বিশেষ করে সরকারের নাম ভাঙ্গিয়ে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কারও কারও প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা ও ছত্রছায়ায়। অনেকেই আবার নিকট অতীতে ছাত্রদল, যুবদলও করতেন বলে অভিযোগ আছে। এর পাশাপাশি ধরা পড়েছে বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ, এফডিআর, বৈদেশিক মুদ্রা, একাধিক পাসপোর্ট, মদের বোতলসহ নির্মাণ কাজের ঠিকাদার। ঠিকাদারের আছে একাধিক সশস্ত্র দেহরক্ষী, বিলাসবহুল গাড়ি, আলিশান বাড়ি ইত্যাদি। প্রায় সব বড় বড় সরকারী নির্মাণ কাজ নাকি তাদের কব্জায়। এসব ধরপাকড়ে একে একে বেরিয়ে আসছে বড় বড় গডফাদারের নাম। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক ও সেতুমন্ত্রী বলেছেন, যত বড় গডফাদারই হোক কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। দুর্নীতি, অপকর্ম ও শৃঙ্খলা ভঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে যথাযথ ব্যবস্থা তথা শাস্তি দেয়া হবে। জনসাধারণ সরকারের এই কঠোর অবস্থানকে অকুণ্ঠচিত্তে সাধুবাদ ও সমর্থন জানিয়েছে।

বর্তমান সরকার সব রকম দুর্নীতি, মাদক ও জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। সেটা যে কোন মূল্যে বাস্তবায়ন করতে সরকার বদ্ধপরিকর এবং দেশ ও জাতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। জাতির পিতা বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘুষ-দুর্নীতিকে কখনই প্রশ্রয় দেননি। তাঁর সুযোগ্য কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ বিষয়ে অনড় ও অনমনীয়। কথা নয়, কাজেও এর একাধিক প্রমাণ মিলেছে ইতোমধ্যে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে যথেষ্ট শক্তিশালী করা হয়েছে। দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ডিআইজি মিজান, ডিআইজি (প্রিজন) পার্থ বণিক, ফেনীর সোনাগাজীর ওসি মোয়াজ্জেম, এমনকি দুদকের পরিচালক এনামুল বাছিরকে পর্যন্ত কারাগারে যেতে হয়েছে। নৈতিক স্খলনের দায়ে জামালপুরের ডিসিকে করা হয়েছে ওএসডি। আইনশৃঙ্খলা সূত্রের খবর, অর্ধশতাধিক গডফাদারের তালিকা প্রস্তুত। নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে ধরা হবে প্রত্যেককে। যে কোন মূল্যে দেশকে দুর্নীতি, মাদক ও জঙ্গীমুক্ত করতে হবে। ত্রিশ লাখ শহীদ ও তিন লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে রাখতে হবে অমলিন ও কলুষমুক্ত। মুষ্টিমেয় দুর্নীতিবাজের জন্য দেশের অর্জন তথা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিকে ভূলণ্ঠিতে হতে দেয়া যাবে না কোন অবস্থাতেই। বাংলাদেশের স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখার স্বার্থে সেটাই প্রত্যাশিত।