১৭ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পরিবেশ টিকিয়ে রাখা ব্যাঙ অস্তিত্ব রক্ষায় লুকিয়ে বেড়াচ্ছে

 পরিবেশ টিকিয়ে রাখা ব্যাঙ অস্তিত্ব রক্ষায় লুকিয়ে বেড়াচ্ছে
  • দু’শ’ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে

সমুদ্র হক ॥ বিশ্ব পরিবেশ টিকিয়ে রাখা উভচর (এ্যম্ফিবিয়াস) প্রাণী ব্যাঙও ইদানীং ঠাহর করতে পারে না প্রকৃতির মতিগতি।

জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে, শিকারির থাবা থেকে রক্ষা পেতে নিজেকে লুকোতে হচ্ছে। আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টিতে যৌবন আসে ব্যাঙের। নবধারা জলের সঙ্গিনীর আদর পেতে ডাকে সোনা ব্যাঙ। ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর সুর তোলা হলুদ বরণ গায়ক দলের কণ্ঠ আজ রুদ্ধ। বৃষ্টিভেজা রাতে জলাশয়ে এমন সুর শোনা যায় না। অন্তরা চৌধুরীর কণ্ঠে কোলা ব্যাঙ ও সোনা ব্যাঙ গানের একাংশে আছে, ‘সম্মেলনে গাইবেন খাঁ সাহেব কোলা ব্যাঙ, সঙ্গত করবেন পন্ডিত সোনা ব্যাঙ....’ এই পন্ডিত ব্যাঙ লুকিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রকৃতিপ্রেমী রায়হানা ইসলামের ফুলের টবে একটি সোনা ব্যাঙ খুঁজে পাওয়া গেছে। লাফিয়ে পালানোর আগেই ওই ব্যাঙ রায়হানার সেলফোনের কয়েকটি ক্লিকে আশ্রয় পেল এলইডি মনিটরে।

কবিগুরু ‘রক্তকরবী’ নাটকের একটি চরিত্রে ব্যাঙকে টেনে এনেছেন। ব্যাঙ কীভাবে পৃথিবীর পরিবেশ টিকিয়ে রাখে সেই বর্ণনা আছে নাটকে। নন্দিনীর এক প্রশ্নের উত্তরে নেপথ্যে ভেসে আসে কণ্ঠ। ‘এটা একটি ব্যাঙ। একদিন পাথরের কোটরের মধ্যে ঢুকেছিল। সেখানেই টিকে ছিল তিন হাজার বছর। কীভাবে টিকে থাকতে হয় ব্যাঙ তা জানে। অস্তিত্ত্ব রক্ষায় পাথরের আড়াল থেকে মুক্ত করা হয় ব্যাঙকে।’ রবীন্দ্রনাথ রক্তকরবী নাটকে মানব জাতিকে প্রকৃতির মধ্য থেকেই বাঁচতে শিখিয়েছেন। হৃদয়ের গভীরের আনন্দকে ব্যাঙের ডাকের সঙ্গে তুলনা করেছেন ব্রিটিশ কবি আরথার সায়মন্সের ‘দ্য এ্যাকসটেসি’ (পরমানন্দ) কবিতায়। তিনিও ব্যাঙ নিয়ে একই অনুভব এনেছেন।

এখন গ্রামে ব্যাঙের দেখা মেলে কম। নগরীতে ব্যাঙের প্রবেশ বুঝি নিষিদ্ধ! একটা সময় মানুষের ঘরে মেটে রঙের ডোরাকাটা ব্যাঙ ঢুকে পড়ত। আদুরে ডাকে ডাকা হতো ‘সোনা ব্যাঙ’। সেই ব্যাঙ কালে ভদ্রে কোন ফুল গাছের টবে পাতার আড়ালে রক্তকরবীর ওই ব্যাঙের মতো আশ্রয় নেয়। বাগানে তো ব্যাঙের ভয় নেই। তবে ঘরের বাইরে- ঝাউবনে জলাশয়ে ও পুকুরপাড়ে নিরাপদ নয়। ছোট্ট এই প্রাণী বধ শুরু হয়েছে অনেক আগেই। বিদেশে ব্যাঙ রেঁধে নানা উপাদেয় খাবার বানিয়ে পরিবেশন করা হয় তারকাখচিত বড় বড় হোটেলে, কাঁকড়াও বধ হয় ব্যাঙের মতোই।

সব দেশেই এই এ্যাম্ফি প্রাণীটি (ব্যাঙ) বিপন্ন। বিশ্বে ব্যাঙের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার প্রজাতির মধ্যে দু’শ’রও বেশি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বেশি বিলুপ্ত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়। ব্রিটিশ পরিবেশবিদরা আশঙ্কা করছেন আগামী বিশ বছরের মধ্যে অন্তত দুই হাজার প্রজাতির ব্যাঙ পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে। উভচর এই প্রাণী রক্ষায় বছর দশেক আগে ব্রিটেনে একদল গবেষক ব্যাঙ শুমারি করেছিলেন। কত ব্যাঙ প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে আছে সেই হিসাব বের করতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে এক পর্যায়ে ব্যর্থ হয়ে তারা শুমারি বন্ধ করে দেন। গবেষকদের প্রধান লিন্ডা বলেছিলেন, উভচর প্রাণীকূলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ব্যাঙ। একদিকে দুই ধরনের ভাইরাসে বহু ব্যাঙ মারা যাচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাঙ চলে যাচ্ছে মানুষের খাবারের টেবিলে। জীবিত অনেক ব্যাঙের বংশবিস্তার ঘটছে না। যে প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে সেই প্রজাতি রক্ষার কোন উদ্যোগ নেই। আরেকদল গবেষক বলেন, ধরিত্রী উষ্ণ হওয়ায় ব্যাঙ এক ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে যা মহামারী হয়ে বিস্তার ঘটছে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে। এই ভাইরাসে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে উপমহাদেশের ব্যাঙ। উপমহাদেশে ব্যাঙ নিধন হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। এক শ্রেণীর ব্যাঙ চোরাচালানি দেশের সব অঞ্চল হতে ব্যাঙ সংগ্রহ করে পাচার করে দিচ্ছে, কখনও কখনও যাচ্ছে চিংড়ির ছদ্মাবরণে। দেশে কত প্রজাতির ব্যাঙ আছে তার হিসাব মেলে না। একটি সূত্রের মতে, এই সংখ্যা ৪০।

আগে গাঁও-গেরামের জলাশয়ের ধারে ঝাউবনে অনেক ধরনের ব্যাঙ দেখা যেত। শহরে পুকুরের ধারেও ব্যাঙের ডাক শোনা যেত বৃষ্টি ও বর্ষার রাতে। বৃষ্টি না হলে আগের দিনে গাঁয়ের লোকেরা এক জোড়া ব্যাঙ (নারী-পুরুষ) ধরে এনে প্রতীকী বিয়ে দিত (এই কুসংস্কার লোকজনের মনে পৌরাণিক উপাখ্যান)। আজও কোন কোন অঞ্চলে এ রীতি চালু আছে। কালেভদ্রে ব্যাঙের ডাক শোনা গেলে কারও মনে হতে পারে পরিবেশ আর অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যাঙেরা দল বেঁধে স্লোগান দিচ্ছে।