২০ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্লেষণে-পর্যবেক্ষণে বঙ্গবন্ধু

  • মুহাম্মদ ফরিদ হাসান

উইলিয়াম শেক্সপিয়ার বলেছিলেন, ‘এ জগতে কেউ কেউ জন্মগতভাবে মহান, কেউ মহত্ত্বের লক্ষণ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন, আবার কেউ স্বীয় প্রচেষ্টায় মহানুভবতা অর্জন করেন।’ কথাটি বঙ্গবন্ধুর জীবনের সঙ্গেও মিলে যায়। তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম বলেছেন, শেখ মুজিব ছিলেন ‘ঐশ্বরিক আগুন’। তিনি তাঁর নেতৃত্বে এ দেশের মানুষকে সেই মুক্তির পথ দেখিয়েছেন, যে পথ পূর্বে আর কেউ দেখাতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগ, আজন্ম লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন তাঁকে ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠানে, দেশ থেকে বিশ্বে, কাল থেকে মহাকালের শাশ্বত পথের দিকে ধাবিত করেছে। অন্যায়কে প্রতিরোধ, অবিচারকে প্রতিহত, শৃঙ্খলকে বন্ধনহীন করার মধ্য দিয়ে তাঁর ঐশ্বরিক আগুন জ্বলে উঠেছে বারংবার। যার ফলে বাঙালী জাতি পেয়েছে তাদের বহুল প্রতীক্ষিত নেতাকে, স্বাধীনতাকে।

২০২০ সাল বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ। জাতি মহাসমারোহে তাঁর জন্মশতবর্ষ যথাযোগ্য মর্যাদায় উদ্যাপন করবে। এ জন্য সর্বত্র চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বহুমাত্রিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে চলছে। জাতির জনককে নিয়ে রচিত বেশকিছু গ্রন্থের পাঠ পর্যালোচনা এর অন্যতম একটি উদ্যোগ। এ আয়োজনের প্রথম পর্বে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখিত শত গ্রন্থের পর্যালোচনা করেন ২০ লেখক। এখানে তিনটি গ্রন্থের পাঠ পর্যালোাচনা দেয়া হলো।

বঙ্গবন্ধু আজ যদি বেঁচে থাকতেন ॥ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী আমাদের প্রতিথযশা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কেবল অন্যতমই নন, তিনি অগ্রগণ্যও। তাঁর যাপন ও অভিজ্ঞতার ব্যাপ্তি ব্রিটিশ শাসন থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল হয়ে অধুনা বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনি নিজেই তাঁর কলামসমগ্রের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘...আমি বাংলাদেশের গত অর্ধশতকের বেশি সময়ের ইতিহাসের একজন জীবিত সাক্ষী। আমি মহাযুদ্ধ দেখেছি। মহাদুর্ভিক্ষ দেখেছি। ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখেছি। ভারত ভাগ দেখেছি। দেখেছি লাখ লাখ বাস্তুহারা মানুষের বিপর্যয়। দেখেছি ভাষা আন্দোলন, দেখেছি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ।’ এখানে কেবল ‘দেখেছেন’ বললে ভুল হবে, তিনি এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্তও ছিলেন। সে কারণেই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক ক্ষণে তিনি লিখতে সক্ষম হলেন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারির মতো কালজয়ী গান। বায়ান্নের পূর্ব থেকে দীর্ঘ ৭ দশক ধরে তিনি তীক্ষè চোখে মানুষ-সমাজ-রাষ্ট্রের প্রকাশ্য ও অন্তর্নিহিত সঙ্গতি-অসঙ্গতি লেখায় প্রকাশ করছেন। এখনও প্রতি সপ্তাহে তাঁর একাধিক লেখা জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়। এটি নিঃসন্দেহে পাঠক হিসেবে আমাদের জন্য সৌভাগ্যের।

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য ও ¯েœহ পেয়েছেন। তাঁর লেখার বিশাল অংশজুড়েও বঙ্গবন্ধু আছেন। ‘বঙ্গবন্ধু আজ যদি বেঁচে থাকতেন’ গ্রন্থটি এই বিপুল অংশের ভাগীদার। বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত গাফ্ফার চৌধুরীর ২৬টি লেখা নিয়ে এ গ্রন্থটি ২০১৯ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে। এতে উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনা, বাহাত্তরের সংবিধান, বুদ্ধিজীবী হত্যা ও জামায়াতের ভূমিকা, জেলহত্যা, রবীন্দ্রনাথ, বিশ^ রাজনীতি, ৭ মার্চ, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, নগরজীবন বিষয়ক নানামুখী পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ। গ্রন্থের শুরুতে ‘প্রকাশকের উক্তি’ পর্বে ওসমান গনি বলেছেন, ‘নির্ভীক কলমসৈনিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী যে কারো দিকে তাকিয়ে, কাউকে সমীহ করে লেখেন নাÑবঙ্গবন্ধু আজ যদি বেঁচে থাকতেন গ্রন্থে সে সত্যটি অনুধাবন করা যাবে।’ এ গ্রন্থ তো বটেই, গাফ্ফার চৌধুরী অন্য গ্রন্থগুলোও এই বৈশিষ্ট্য থেকে ব্যতিক্রম নয়।

পূর্বেই উল্লেখ করেছি আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পেয়েছেন। আজ জাতির পিতা বেঁচে থাকলে দেশের কী কী পরিবর্তন হতো, বঙ্গবন্ধুই বা কতখানি পরিবর্তন হতেনÑ ‘বঙ্গবন্ধু আজ যদি বেঁচে থাকতেন’ রচনায় এ নিয়ে নিজের ভাবনার কথা উপস্থাপন করেছেন লেখক। গাফ্ফার চৌধুরী কাছ থেকে দেখেছেন যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুর যুগোপযোগী পথচলা। ব্যক্তিক অভিজ্ঞতা থেকে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তাঁর ধারণা, ‘তিনি বদলাতেন, যুগের পরিবর্তনের হাওয়াকে মেনে নেওয়ার দুর্দান্ত সাহস ও প্রজ্ঞা তাঁর ছিল। তাই সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি থেকে অসাম্প্রদায়িকতার রাজনীতিতে এবং অসাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি থেকে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে সহজেই উত্তরিত হতে পেরেছিলেন। কিন্তু মৌলিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।’ অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের কী পরিবর্তন হতো তাও এ লেখায় উদাহরণসহ তুলে ধরা হয়েছে। গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু আজ বেঁচে থাকলে শুধু বাংলাদেশের নয়, গোটা উপমহাদেশেরই অবস্থা বদলে যেত এবং ভারত মহাসাগরীয় একটা জোন অব পিস তৈরি হতো।’ অন্যত্র লিখেছেন, ‘মালয়েশিয়ায় মাহাথির এবং সিঙ্গাপুরে লি কুয়ান তাঁদের দেশের যে অবিশ^াস্য উন্নতি ঘটিয়েছেন, তার চেয়ে বাংলাদেশের বহুগুণ উন্নতি ঘটাতে পারতেন বঙ্গবন্ধু, যদি তিনি দীর্ঘজীবন পেতেন।’ লেখকের এ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগ নেই। কেননা, বঙ্গবন্ধুর সামগ্রিক কর্মকা-ই জানান দেয় তিনি বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ বহু আগেই বিশে^ একটি মডেল রাষ্ট্রে পরিণত হতো।

আলোচ্য গ্রন্থের একটি বিশেষ লেখা ‘বাহাত্তরের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র রক্ষা করা কেন অত্যাবশ্যক?’। এ লেখায় তিনি গুরুত্বসহকারে জানিয়েছেন, কেবল ধর্ম দ্বারা জাতীয়তা তৈরি হয় না। আবার একক ধর্ম দিয়ে রাষ্ট্রীয় বন্ধন স্থায়ী করা যায় না। যদি এরকম জাতীয়তা বা রাষ্ট্রের চেষ্টা করা হয় তবে এর ফল হবে ধ্বংসাত্মক। গাফ্ফার চৌধুরী প্রমাণ হিসেবে ইরান, ইরাকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থা এবং সৌদি আরবের ঘৃণিত রাজনীতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। আবার আধুনিক তত্ত্ব ও আদর্শ দিয়েও যে এক জাতি এক রাষ্ট্র গঠন করা যায় না, সোভিয়েত ইউনিয়নকে তাঁর বড় প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন লেখক। ঐতিহাসিক আরও নানা ঘটনা বিশ্লেষণ করে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, ‘সকল রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলেই গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা একটি প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে’। তাই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। কিন্তু ’৭৫ পরবর্তীতে স্বৈরাচারী সরকার ও শাসকরা ‘ধর্ম নিয়ে ক্ষমতার রাজনীতি’ করায় রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তির ক্ষতি সাধন হয়েছে। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সঙ্গে আমরাও একমত যে, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার উচিত অবিলম্বে বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র পুনরুদ্ধার করা। তাহলেই রাষ্ট্রের বিভিন্ন সঙ্কট থেকে দ্রুত উত্তরণ সম্ভব হবে।

‘বঙ্গবন্ধু আজ যদি বেঁচে থাকতেন’ গ্রন্থের মূল বিষয় বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ। ‘বাঙালীর জীবনে মার্চ মাসের স্বাতন্ত্র্য ও গুরুত্ব কেন বেশি’ শীর্ষক রচনায় লেখক উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার অনানুষ্ঠানিক ঘোষণার দিন ৭ মার্চ। তাঁর কাছে ২৬ মার্চের চেয়ে ৭ মার্চের গুরুত্ব অনেক বেশি। কেননা, ৭ মার্চেই বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল। লেখক মনে করেন, বাঙালীর ভাষা, সংস্কৃতি উপড়ে ফেলার চেষ্টাই পাকিস্তানী শাসকদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একাত্তরে জাতীয়তা রক্ষার্থে বাংলার জনগণ সবচেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়ে সকল ষড়যন্ত্র ও অশুভ শক্তিকে নস্যাৎ করে দিয়েছিল। ‘বাঙালীর এই সাংস্কৃতিক ও অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবোধ থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের জন্ম। ইতিহাস তাকে জন্ম দিয়েছে। সেই ইতিহাস তিনি পুনর্নির্মাণ করেছেন।’ লেখক মনে করেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হলেও অর্থনৈতিক মুক্তি ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এখনো বিপদমুক্ত হয়নি। তাঁর মতে, ‘দেশী কায়েমি স্বার্থ, ধর্মান্ধ জঙ্গীবাদ এবং বিদেশী আধিপত্যবাদÑএই ত্রিশক্তি সংঘবদ্ধ হয়ে বাঙালীর অসাম্প্রদায়িক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব হরণের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।’ এ ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করতে লেখক সাতই মার্চের ‘মহাকাব্য ও মহাকবির’ কাছে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।

‘বুদ্ধিজীবী হত্যার নেপথ্যে কারা এবং কেন?’ রচনায় লেখক বুদ্ধিজীবীদের ঘাতক ও তাঁদের হত্যার কারণ বিশ্লেষণ করেছেন। সত্তরের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর ভুট্টো ইয়াহিয়া খানকে দমননীতির পরামর্শ দেন। ভুট্টোর ধারণা ছিল ‘হাজার বিশেক বাঙালীকে হত্যা করা হলে আওয়ামী লীগকে দমন করা যাবে’। গণহত্যা শুরুর আগে গোপন বৈঠকে জামায়াত নেতা মিয়া তোফায়েল ও গোলাম আযম বলেন, বিশ হাজার মানুষ হত্যা করে কোন ফল হবে না। এ জন্য বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা প্রয়োজন। তাদের হত্যা করলেই এই ভূখ-ের মানুষের আন্দোলন-সংগ্রাম নিঃশেষ হয়ে যাবে। জামায়াত নেতারা পরবর্তীতে বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের তালিকা প্রণয়ন করেন। ওই তালিকা ধরেই মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে এবং শেষ ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়। কিন্তু পাকিস্তানী ও রাজাকাররা চূড়ান্ত সফল হয়নি। বাংলাদেশ মুখ থুবড়ে পড়েনি। একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের রেখে যাওয়া চিন্তা ও প্রেরণায় বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। গাফ্ফার চৌধুরীর দৃষ্টিতে ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, কিন্তু এসবকিছুকে ছাপিয়ে উঠেছে তার সঙ্গে যুদ্ধ করে সামনে এগোবার দুঃসাধ্য প্রয়াস।’

এই যে বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে জামায়াত নেতাদের নির্মম ভূমিকা, তা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সামরিক শাসকরা তাদের বিচার করা দূরে থাক, উল্টো তাদের ক্ষমতায় বসিয়েছেন। যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, যারা একাত্তরে ঘাতক-দালাল ছিলো তাদের গাড়িতেই উঠেছে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া পতাকা। এটি নিঃসন্দেহে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অবমাননা এবং শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি। রাজাকার-আলবদররা সামরিক শাসনামলে বীরদর্পে দেশে ফিরে এসেছিল। ভেবেছিল তাদের আর বিচার হবে না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তাদের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করেছেন। তিনি দেশকে কলঙ্কমুক্ত করতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেন। ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি সোমবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রথম রায় ঘোষিত হয়। প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী পরদিন ২২ জনুয়ারি ‘ওরে হত্যা নয় আজ সত্য-গ্রহ শক্তির উদ্বোধন’ শিরোনামে কলাম লিখেন। ওইসময় তিনি প্রত্যাশা করেছিলেন যুদ্ধাপরাধী অন্যদের রায় প্রদানও দ্রুততর হবে এবং জাতি ‘সার্বিক কলঙ্কমুক্তি’ লাভ করবে।

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী প্রতিটি লেখায় তাঁর বক্তব্যকে পাঠকের কাছে সুস্পষ্ট করতে প্রচুর উদাহরণ টেনেছেন। কখনো কখনো তিনি আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশীয় রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করেছেন। দলমত নির্বিশেষে যার বিষয়ে যতটুকু বলা প্রয়োজন ততটুকুই বলেছেন। ফলে লেখাগুলো পাঠে ইতিহাস, বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি উত্তরণের বিষয়ে করণীয় সম্পর্কেও ধারণা লাভ করা যায়। এটা সত্যি যে, বাংলাদেশে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মতো প্রাজ্ঞ, প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী খুব বেশি নেই। তাঁর পর্যবেক্ষণ গুরুত্বের সঙ্গে দেখলে নিঃসন্দেহে শেষ পর্যন্ত সমাজ ও রাষ্ট্রই উপকৃত হবে।

‘বঙ্গবন্ধু আজ যদি বেঁচে থাকতেন’ গ্রন্থটির প্রচ্ছদ করেছেন নির্ঝর নৈঃশব্দ্য। প্রকাশ করেছে আগামী প্রকাশনী। ১৩৬ পৃষ্ঠার মূল্য রাখা হয়েছে ৩০০ টাকা।

খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু ॥ বদিউজ্জামান চৌধুরী

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এ পর্যন্ত প্রচুর গ্রন্থ রচিত হয়েছে, ভবিষ্যতেও যে হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু অধিকাংশ লেখকই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি বৃত্তে আবর্তিত হন। ফলে বঙ্গবন্ধুর জীবনের অনেক বিষয় রয়ে গেছে, যেসব বিষয় নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। খুব কম লেখকই আছেন, যারা বঙ্গবন্ধুর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শ্রমসাধ্য কাজ করেছেন। এ শ্রেণীর লেখকদের বই অন্যদের মতো গৎবাঁধা হয়নি। বদিউজ্জামান চৌধুরী তাদেরই একজন, যিনি গবেষণার পথে হেঁটে আলোকিত গন্তব্যে পৌঁছেছেন। তাঁর গবেষণাগ্রন্থ ‘খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু’। বিষয় বৈচিত্র্যের কারণে গ্রন্থটি অন্য বইয়ের চেয়ে আলাদা।

লেখক বদিউজ্জামান চৌধুরী বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছেন; আবার শেখ পরিবারের সঙ্গে তাঁর ছিল আত্মীয়তার সম্পর্ক। এটা ঠিক যে, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কারণে বঙ্গবন্ধুকে বিশ্লেষণ করার সুযোগ তাঁর বেশি ছিল। বদিউজ্জামান চৌধুরী সেই সুযোগের যথার্থ প্রয়োগও করেছেন। ‘খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু’ গ্রন্থে তিনি ‘টুঙ্গিপাড়া : শেখ পরিবারের বংশচরিত ও বংশলতিকা’ নামে একটি বিশেষ অধ্যায় সংযুক্ত করেছেন। যা বইটিকে অন্য গ্রন্থাবলির চেয়ে ব্যতিক্রম করে তুলেছে। আলোচ্য গ্রন্থের ভূমিকা লিখে দিয়েছেন বরেণ্য ইতিহাসবিদ জাতীয় অধ্যাপক ড. সালাহউদ্দীন আহ্মদ। তিনি লিখেছেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জীবনীর বিভিন্ন দিক নিয়ে রচিত ‘খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু’ শুধু ঐতিহাসিক তথ্যনির্ভর দালিলিক গ্রন্থই নয়, এতে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের পরিচিতি।... লেখক প্রায় দুই দশক শ্রম দিয়ে শেখ পরিবারের বংশচরিত ও বংশলতিকা রচনা করে এ বইয়ে সংযোজন করে বইটিকে অনন্যসাধারণ করে তুলেছেন। বঙ্গবন্ধুর পরিবার নিয়ে বদিউজ্জামান চৌধুরীর এ প্রয়াসই বাংলাদেশের লেখকদের মধ্যে সর্বপ্রথম বলে আমি মনে করি।’ তাঁর এ মন্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয় বঙ্গবন্ধুর বংশ নিয়ে বদিউজ্জামান চৌধুরী বিশেষ গবেষণা করেছেন। বইটি পাঠের পর লেখকের গবেষণা যে সফল হয়েছে তা দৃঢ়ভাবেই বলা যায়। পরবর্তীতে কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুর বংশলতিকা নিয়ে কাজ করেছেন। আবার অনেকে আলোচ্যগ্রন্থের তথ্য ব্যবহার করেছেন।

‘খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু’ গ্রন্থের প্রারম্ভে বিস্তারিতভাবে টুঙ্গিপাড়া শব্দের উৎপত্তি, শেখ পরিবারের আগমন, তাদের প্রথম বাড়ি, টুঙ্গিপাড়ায় শেখ পরিবারের প্রথম পুরুষের আগমন, পরবর্তী বংশধরগণ, আত্মীয়তা, সামাজিক অবস্থানের বর্ণনা রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর পূর্বপুরুষদের নিয়ে প্রচুর তথ্য উপস্থাপনের ফলে শেখ পরিবারের ঐতিহ্য ও বিকাশ সম্পর্কে পাঠক সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারবেন। লেখক একই সঙ্গে একাধিক গবেষক ও গ্রন্থকারের মতামত তুলে ধরেছেন। সাল, তারিখ, প্রতিষ্ঠাতা নিয়ে অনেকক্ষেত্রে গবেষকগণ একমতও হতে পারেননি। পাশাপাশি বদিউজ্জামান চৌধুরী অনেকের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণা ত্রুটিও চিহ্নিত করেছেন। এম আর আখতার মুকুল ‘মহাপুুুরুষ’ গ্রন্থে লিখেছেন, ১৪৬৩ সালে হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রঃ)-এর সাথে বাগদাদ থেকে তাঁর শিষ্য শেখ আউয়াল বাংলাদেশে আসেন। তিনি বিয়ে করে সোনারগাঁয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর সন্তান শেখ জহিরউদ্দিন, জহিরউদ্দিনের সন্তান শেখ জান মাহমুদ, জান মাহমুদের পুত্র ছিলেন শেখ বোরহান উদ্দিন। তিনি ব্যবসার সুবাধে গোপালগঞ্জের গিমাডাঙ্গায় যাতায়াত করতেন। গিমাডাঙার কাছের গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় কাজী বাড়িতে তিনি বিয়ে করেন। পরবর্তীতে এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। শেখ বোরহান উদ্দিনের চতুর্থ পুরুষ ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। অন্যদিকে বদিউজ্জামান চৌধুরী বিশ্লেষণ করে দেখাচ্ছেন, শেখ আউয়ালের অষ্টম পুরুষ শেখ মুজিব নন। তাঁর মতে, ‘দি আমেরিকান জার্নাল অফ হিউম্যান জেনেটিক্স বইয়ে এক পুরুষ থেকে অপর পুরুষের ব্যবধান ধরা হয় ৩০ বছর। সেই হিসেবে দরবেশ শেখ আউয়াল যদি বায়েজীদ বোস্তামীর সাথে এদেশে এসে থাকেন তবে তিনি শেখ মুজিবের অষ্টম পূর্বপুরুষ হবেন না, হবেন ১৪-১৫তম পূর্বপুরুষ। আর যদি তিনি অষ্টম পূর্বপুরুষই হন তবে তিনি মোগল আমলের শেষদিকে এদেশে এসেছিলেন, হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ)-এর সঙ্গে নয়।’

‘খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু’ গ্রন্থের দ্বিতীয় পর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্ম তুলে ধরা হয়েছে। খোকার বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার ঘটনাক্রম ও উপস্থাপন গ্রন্থের শোভা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতিসমূহও তুলে ধরা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বদিউজ্জামান চৌধুরীর পরিচয় সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘তখন আমি বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি। কিন্তু ইতিপূর্বে শেখ মুজিবুর রহমান-এর সঙ্গে আমার সরাসরি কোনো পরিচয় ছিল না। ফরিদপুর ছাত্রলীগের সে সময়ের সিনিয়র নেতা মোঃ দেলোয়ার হোসেন আমাকে নেতার সামনে নিয়ে পরিচয় করিয়ে দিতে আরম্ভ করতেই শেখ মুজিব বলে উঠলেন, আমার কি সৌভাগ্য! আমার আত্মীয়কে তোরা পরিচয় করে দিচ্ছিস। ও ফুলসূতির আবুল হাসেম চৌধুরী মোক্তারের ছেলে।’ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে লেখকের এমন আরো অনেক স্মৃতি রয়েছে। এই স্মৃতিগুলো ব্যক্তি শেখ মুজিবকে জানতে সহযোগিতা করবে।

‘খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু’ গ্রন্থের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো বঙ্গবন্ধুর জন্ম থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর প্রজন্ম পর্যন্ত লেখক তথ্য উপস্থাপন করেছেন। বঙ্গবন্ধুসংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিশেষ ঘটনা গুরুত্বসহকারে এ গ্রন্থে বর্ণনা করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশী ও বিদেশী সংবাদমাধ্যম বঙ্গবন্ধুকে কীভাবে বিশ্লেষণ করেছেন তার উল্লেখও রয়েছে। বিখ্যাত সাংবাদিক ডেবিড ফ্রস্টকে দেয়া বঙ্গবন্ধুর সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটির উল্লেখ, ১৫ আগস্টের প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা, মার্কিন দলিলপত্র, বেগম মুজিবের অবদান আলোচ্য গ্রন্থকে সমৃদ্ধ করেছে। বইয়ের শেষাংশে শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ আবু নাসের, শেখ ফজলুল হক মণি, লায়ন শেখ কবির হোসেন এমজেএস, শেখ শহীদুল ইসলাম, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শেখ হেলাল উদ্দিন, শেখ ফজলে নূর তাপস-এর জীবনপঞ্জি তুলে ধরা হয়েছে। বইটি পাঠে এ কথা জোর দিয়ে বলা যায় যে, বঙ্গবন্ধু নিয়ে রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে বদিউজ্জামান চৌধুরীর এ গ্রন্থটি বিশিষ্টতার দাবি রাখে। সচেতন পাঠককে এ গ্রন্থটি পাঠের আমন্ত্রণ জানাই। ‘খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে কথামালা প্রকাশন। প্রকাশ সাল বইমেলা ২০১৩। ২১৮ পৃষ্ঠার মূল্য রাখা হয়েছে ৩০০ টাকা।

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ ॥ আকবর হোসেন

‘আমি বাংলার ইতিহাস। আমার বুকে কত ভাঙা-গড়ার ইতিহাস লেখা আছে। আমার সোনার বাংলা বলার পর চোখের পাতা ভিজে ভারি হয়ে উঠে।’ প্রকৃতঅর্থেই প্রিয় বাংলাদেশ অসংখ্য ভাঙা-গড়ার ইতিহাসে লেখা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলেছে এ ভাঙা-গড়ার ইতিহাস। সেই পরাধীন জাতির মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর কীর্তি ও কর্ম গড়লো এক যুগান্তকারী অধ্যায়। স্বাধীনতা লাভের পর নূতনমাত্রায় শুরু হলো জাতির পথচলা। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাসকে ধারণ করে এ পর্যন্ত অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলোর প্রসঙ্গ, ঐতিহাসিক তথ্য এক হলেও ভিন্নতা রয়েছে উপস্থাপন ও বিশ্লেষণে। মোঃ আকবার হোসেনের এমন একটি বই ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’। সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি বইটি লিখেছেন। গ্রন্থটি কেন এবং কীভাবে লিখেছেন বইয়ের ভূমিকায় তিনি সেকথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘এই ইতিহাস পাঠ করে যেন বাংলার ভবিষ্যৎ বংশধর সম্প্রদায় তাদের গৌরবময় অতীতের পরিচয় পেয়ে গর্ব অনুভব করতে পারে এবং বিশ^বাসীর কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করে, আমি যতদূর সম্ভব নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে, মূল্যবান গ্রন্থরাজি বিভিন্ন পত্রপত্রিকার বিষয়বস্তু আহরণ করে সর্বান্তকরণে স্বাধীনতা-উত্তর যুগে ও পরে এ যাবৎকাল এই ইতিহাসকে হুবহু ডায়েরি আকারে লেখার চেষ্টা করছি।’

‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’ বইতে উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর জন্মকথা, তাঁর পিতামাতার জীবনযাপন, বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা জীবন, কিশোরকাল, রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়া, জনতা ও বঙ্গবন্ধু এক এবং অভিন্ন হওয়ার ইতিহাস। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন লেখক। এ কারণে গ্রন্থে উল্লেখ আছে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামীদের নামের তালিকা, ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো ও ভারতের ভূমিকার বিস্তারিত বর্ণনা। গ্রন্থের শেষে তারিখ অনুযায়ী ঘটনাক্রমও সাজানো হয়েছে।

নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধু ছিলেন আপামর মানুষের সবচেয়ে প্রিয় নেতা। জনগণের জন্যে বঙ্গবন্ধু, একইভাবে বঙ্গবন্ধুর জন্যে ছিল জনগণ। লেখক গ্রন্থের ৩৬নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবের মামলার অর্থ জোগাড় করতে জনসাধারণ, স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। ঘটনার পরিধি ছোট হলেও এর সামগ্রিক বিস্তার দীর্ঘ। উল্লেখ করার মতো এমন ঘটনা বঙ্গবন্ধুর জীবনে আরও অনেক রয়েছে। বঙ্গবন্ধু যখন দেশের জন্যে লড়ছেন, তখন দেশের অনেক ঘৃণ্য রাজনীতিবিদ তাঁর বিরোধিতায় নেমেছিলেন। লেখক লিখেছেন, ‘মুসলিম লীগের ভাড়াটিয়া জামায়াত ইসলামীর মাওলানা মওদুদী, মওলানা মতিউর রহমান নিজামী, অধ্যাপক গোলাম আযম, মুজাহিদ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামের অন্য নেতাগণ পূর্ব বাংলার ভুখা মানুষকে শুধু ইসলামের ফুক দেওয়া পানি গিলিয়ে আর ইসলামী তাবিজ বুকে বেঁধে মুসলিম জাতীয়তাবাদ আদর্শকে বুকে বেঁধে নির্বাচনী সভায় ঝালাই করাতে লাগলেন। আর পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের গরিব-দুঃখী মানুষের গণদাবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির সনদ ছয় দফা আর ছাত্রদের এগারো দফা দাবির ঘোর বিরোধিতা করতে থাকলেন।’ দেশ স্বাধীনের পরেও তাদের এই ঘৃণিত ও নির্মম ভূমিকার পরিবর্তন হয়নি। সে কারণেই ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে আজ তারা নিক্ষিপ্ত।

স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে ভ্রষ্ট বুদ্ধিজীবী ও বিএনপিপন্থীরা অহেতুক বিতর্ক করেছেন বহুদিন। এখনো কেউ কেউ জিয়াউর রহমানকে প্রবলভাবে ঘোষক বলতে চান। আকবার হোসেন বইটির ৯নং পৃষ্ঠায় জানাচ্ছেন, জিয়াউর রহমান জীবদ্দশায় কখনো এমন দাবি করেননি। তার আমলে লেখা ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থসমূহ আজও এ সাক্ষ্য দেয়। এ প্রসঙ্গে লেখক হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ১৫ খ-ের ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ-দলিলপত্র’ গ্রন্থের উদাহরণ দেন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালে এ গ্রন্থ সম্পাদিত হলেও তিনি ইতিহাসকে বিকৃত করেননি। অথচ ২০০১ সালের নবম-দশম শ্রেণীর সমাজবিজ্ঞান বইয়ে লেখা হয়েছিল : ২৬ মার্চ সন্ধ্যাবেলায় জিয়াউর রহমান প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা করেন! এমন মিথ্যাচার যে বেশিদিন টিকতে পারেনি তা আজ সকলেরই জানা।

আলোচ্য গ্রন্থের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো বইটিতে প্রচুর ছবি সংযুক্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে অনেক ছবি দুর্লভও। ফলে লেখার পাশাপাশি উঠে এসেছে সচিত্র ইতিহাস। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ঘটনার সঙ্গে মিল রেখে উদাহরণ হিসেবে কবিতার উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে। এটিও গ্রন্থটিকে বৈচিত্র্যময় করেছে। তবে একটি বিষয় না বললেই নয়। সেটি হলো বানান বিভ্রাট। ভুল বানান একই সঙ্গে পাঠপ্রতিবন্ধক ও দৃষ্টিকটু। বইটির পরের সংস্করণে যাতে বানান বিভ্রাট না থাকে সে বিষয়টি অবশ্যই লেখক ও প্রকাশক দেখবেন বলে আমি বিশ^াস করি। ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে সালাউদ্দিন বইঘর। প্রকাশ সাল বইমেলা ২০১৯। প্রচ্ছদ করেছেন শ্যামলী মুক্তার। ১৭৮ পৃষ্ঠা বইয়ের মূল্য রাখা হয়েছে ৩০০ টাকা।

নির্বাচিত সংবাদ