১৫ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই ঘন্টায়    
ADS

হাসিনা-মোদি বৈঠক

দিল্লীতে শনিবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আনুষ্ঠানিক বৈঠকটি ছিল রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচারের বাইরেও আন্তরিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ। স্বীকার করতে হবে যে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক, পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসে পরিপূর্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ সর্বোপরি সুনিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ। নিছক দেয়া-নেয়ার কেতাবি হিসাব-নিকাশ এবং কূটনৈতিক নিয়মে এর মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। বরং দু’দেশের পারস্পরিক ‘উইন উইন’ অবস্থানই এই সম্পর্কের মূলমন্ত্র। দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে দুই দেশ মোট ৫৩ অনুচ্ছেদের যে দীর্ঘ বিবৃতি প্রকাশ করেছে তাতে তিনটি প্রকল্প ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধনের পাশাপাশি সাতটি অনুচুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের উল্লেখ রয়েছে। এবারের তিনটিসহ গত এক বছরে ভিডিও লিঙ্ক মারফত মোট ১২টি প্রকল্প উদ্বোধন করা হলো যৌথভাবে। এসব প্রকল্প যথাসম্ভব দ্রুত বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে দেয়া আর্থিক ঋণের অর্থ দ্রুত ছাড় করার ক্ষেত্রেও সমঝোতা হয়েছে। এর বাইরেও বাংলাদেশে আশ্রিত ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার জন্য আরও পুনর্বাসন সামগ্রী সরবরাহসহ মিয়ানমারের রাখাইনে তাদের পুনর্বাসনে সহায়তার অঙ্গীকার করেছে ভারত। সমুদ্রসম্পদ তথা ব্লু-ইকোনমিসহ বিভিন্ন মেরিটাইম সহযোগিতা, বঙ্গোপসাগরে নিরাপত্তাজনিত নজরদারি, পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, মহাকাশ গবেষণা, ইন্টারনেট, ব্যান্ডউইথ রফতানি, সাইবার নিরাপত্তা সহায়তাসহ সেদেশে এলপিজি সরবরাহ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এরফলে বাংলাদেশের রফতানি বাড়বে, কমবে বাণিজ্য ঘাটতি। সব ছাপিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে তিস্তা পানি চুক্তি না হওয়ার প্রসঙ্গটি, যেটির জন্য ২০১১ সাল থেকে বহু আকাক্সক্ষা নিয়ে অপেক্ষারত বাংলাদেশের জনগণ। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন যে, যতশীঘ্র সম্ভব তিস্তাসহ সাতটি অভিন্ন নদীর পানি সমস্যার সুরাহা করা হবে। আপাতত ত্রিপুরার সাবরুমে পানীয় জলের চাহিদা মেটানোর জন্য ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি নেবে ভারত। এর বাইরে চট্টগ্রাম, মংলা ও পায়রা বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারত দক্ষিণ এশিয়ার দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দুটি দেশ একইসঙ্গে সার্ক, বিমসটেক, আইওয়া এবং কমনওয়েলথের সাধারণ সদস্য। বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ত্রিপুরা রাজ্যে বাংলা ভাষা ব্যবহার হয়ে থাকে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী জোটের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের এক কোটি উদ্বাস্তুকে আশ্রয়দান ও স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ ২৫ বছরমেয়াদী বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি, ১৯৭৪ সালের ১৬ মে মুজিব-ইন্দিরা সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক উদারীকরণের সূত্রপাতের সঙ্গে তা বৃহত্তর প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্যের উদ্ভব ঘটায়। বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশই জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখছে। তারা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় এলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে নবদিগন্তের সূচনা হয়। বন্ধুদেশ হিসেবে ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে সক্ষম হয়। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লীর হায়দরাবাদ হাউসে দেশ দুটির মধ্যে ৩০ বছরমেয়াদী গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান সম্পর্ককে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার রোল মডেল হিসেবে আখ্যায়িত করা চলে। ২০১৫ সালের মাঝামাঝিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় প্রতিশ্রুত ১১টি উন্নয়ন সহযোগী উদ্যোগের অধিকাংশ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সর্বশেষ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে নিঃসন্দেহে। দক্ষিণ এশিয়ায় বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল ও ভারত (বিবিআইএন)-এর উদ্যোগসহ দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক বহুমাত্রিক হচ্ছে। দেশবাসীর প্রত্যাশা, দুই দেশের সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং উভয় দেশই এই সুসম্পর্ক থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান ও সমৃদ্ধ হবে।