০৮ অক্টোবর ২০১৯

উপড়ে ফেলুন বিষবৃক্ষ

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলই থাকে শাসকের ভূমিকায়। তবে সবার ওপরে দেশ ও দেশের মানুষ। তাই নাগরিকদের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ শাসকদলকে দলের বিধিবদ্ধ তথাকথিত সীমানা থেকে বেরুতে হয়। উত্তীর্ণ হতে হয় দলনিরপেক্ষ অবস্থানে, যেখানে থাকে না অন্ধ দলপ্রীতি ও অন্যায়কে প্রশয়দানের প্রথাগত বাধ্যবাধকতা। নীতিবর্জিত অথচ রাজনৈতিক তকমা লাগানো প্রবল প্রতাপশালীদের বিরুদ্ধে চলমান অভূতপূর্ব অভিযানে একে একে বাঘা সব ‘ডন’ আটক হয়ে চলেছে। আইনের শাসনে বিশ্বাসী দেশপ্রেমিক যে কোন নাগরিকের কাছেই বিষয়টি স্বস্তিকর। ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ নয়, গোটা দেশের মানুষের জন্য যারা রাজনীতি করেন এমন নেতানেত্রীর সংখ্যা অত্যন্ত কম হলেও স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পালনের অব্যবহিত আগে আমাদের মাতৃভূমি যে আরও একবার পরিশুদ্ধ হয়ে উঠছে অপরাধীদের পরাস্ত করে তার দৃষ্টান্ত ক্রমশ উজ্জ্বলতর হয়ে উঠতে শুরু করেছে। আইন অন্ধ। সে দেখে না কে গরিব কে বিত্তবান; কে ক্ষমতাহীন আর কে মহাক্ষমতাধর। তাই অপরাধজগতের অধিবাসীদের হাতে হাতকড়া পরে। ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠনের ডাকসাইটে নেতারা তাদের কৃতকর্মের জন্য ফল ভোগ করবেন এমনটা গত পঞ্চাশ বছরে খুব একটা দেখা শোনা যায়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। অন্যায়কারীদের আর রেহাই নেই, সে অন্যায়কারী যদি একান্ত আপনজনও হয়, এমন ন্যায্যতার দিকেই যাত্রা করেছে বাংলাদেশ।

দুর্নীতিবিরোধী চলমান অভিযানের প্রেক্ষাপট দেশবাসীর জানা। প্রধানমন্ত্রীও আকারে-ইঙ্গিতে একাধিকবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু ওই যে কথায় বলে না চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী! বেপরোয়াদের অবস্থা হয়েছে অনেকটা তাই। নীতিনির্ধারক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনার পর হার্ডলাইনে গিয়েছে সরকার। প্রথমে শোভন-রাব্বানীকে দল থেকে বহিষ্কার এবং অনতিপরেই যুবলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগের দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে প্রায় সর্বাত্মক অভিযানে নেমেছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে প্রথমেই অবৈধ জুয়া তথা ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে নাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এতে কেঁচো খুুঁড়তে বেরিয়ে এসেছে একাধিক বিষধর সাপ। এক সময়ে যেসব ক্লাব ছিল ফুটবল-ক্রিকেটের মতো বড় দলীয় খেলার জন্য সুখ্যাত ও প্রতিষ্ঠিত, র‌্যাব-পুলিশের অভিযানে দেখা যায় যে, সেগুলো বর্তমানে পরিণত হয়েছে ক্যাসিনো রয়ালে। নানারূপ জুয়া খেলা হয় সেসব ক্লাবে, যা পুরোটাই অবৈধ। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন হয় এসব স্থানে। এর পাশাপাশি চলে অবৈধ বার ব্যবসা, মদ্যপান, ইয়াবা ইত্যাদি। দুঃখজনক হলো, এসবই গড়ে উঠেছে থানা-পুলিশের নাকের ডগায় গত কয়েক বছর ধরে। প্রতিবেশী দেশ নেপাল থেকে এসেছে ক্যাসিনোর সরঞ্জামাদি, জনবল ইত্যাদি। প্রতিটির পেছনে মিলেছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা তথা গডফাদারদের সংশ্লিষ্টতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশের মৌন সমর্থন থাকাও বিচিত্র নয়।

বর্তমান সরকার সব রকম দুর্নীতি, মাদক ও জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। সেটা যে কোন মূল্যে বাস্তবায়ন করতে সরকার বদ্ধপরিকর এবং দেশ ও জাতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। জাতির পিতা বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘুষ-দুর্নীতিকে কখনই প্রশ্রয় দেননি। তাঁর সুযোগ্য কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়ে অনড় ও অনমনীয়। কথা নয়, কাজেও এর একাধিক প্রমাণ মিলেছে ইতোমধ্যে। জাতির প্রত্যাশা এই অভিযান আরও জোরদার হবে এবং লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত দেশের স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলার কাজে সমূলে উপড়ে ফেলা হবে বিষবৃক্ষ।