০৮ অক্টোবর ২০১৯

ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যাল

রীতিমতো লজ্জাবনত হতে হয় এই ভেবে যে, রাজধানী ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত অটো তথা আধুনিক তথা ডিজিটাল হলো না! অথচ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়মিত প্রদক্ষিণ করছে পৃথিবীর কক্ষপথ। বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য ও ধ্যান-জ্ঞান যথার্থ অর্থে একটি আধুনিক এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং তার রাজধানী ঢাকাকে যথোপযুক্ত করে গড়ে তোলা। বাস্তবে রাজধানীর কোথাও কোন ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা আদৌ যে কাজ করছে না তা না বললেও চলে। প্রায় সর্বত্রই যানবাহনের চলাচল ও গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা হয় এ্যানালগ পদ্ধতিতে, হাতের সাহায্যে, যার মালিক অগণিত ট্রাফিক পুলিশ। জানি না এর মাধ্যমে এত বিপুলসংখ্যক ট্রাফিক পুলিশের চাকরির সুরক্ষা অপরিহার্য ও সুনিশ্চিত হয় কিনা। অন্যদিকে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে ট্রাফিক সিগন্যালগুলোর লাল-সবুজ-হলুদ বাতি অযথা ও অহেতুক জ্বলে-নিভে বিদ্যুত অপচয়ের ভ্রুকুটিসহ। মূলত এবং প্রধানত এ কারণেই বুঝি রাজধানীর যানজট এক কথায় অসহনীয় অবর্ণনীয় চরম ও পরম এক দুুর্ভোগের নাম। নিত্যদিন যেখানে নারী-পুরুষ-বয়োবৃদ্ধ-শিশু-প্রতিবন্ধী ও রোগীসহ প্রায় সবারই ঘটে অনিবার্য আয়ু ক্ষয়। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগ, দুই সিটি কর্পোরেশন, সর্বোপরি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আদৌ কোন চিন্তা-ভাবনা আছে বলেও মনে হয় না, বাস্তবিক কার্যক্রম ও পদক্ষেপ গ্রহণ তো দূরের কথা। অথচ একটি আধুনিক শহর তথা রাজধানী গড়ে তোলার জন্য বিজ্ঞানসম্মত সিগন্যাল ব্যবস্থা তথা অটো সিগন্যাল অত্যন্ত জরুরী ও অপরিহার্য। তদুপরি ট্রাফিক ব্যবস্থা কার নিয়ন্ত্রণে থাকবেÑ পুলিশ বিভাগের হাতে, নাকি দুই সিটি কর্পোরেশনের তা নিয়েও রয়েছে দোলাচল, দ্বিধাদ্বন্দ্ব। সর্বশেষ ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক সিগন্যাল ব্যবস্থা কার্যকরের দায়িত্ব পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত হলেও তা সম্পন্ন হয়নি অদ্যাবধি। অথচ অচিরেই চালু হতে যাচ্ছে মেট্রোরেল, উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত।

রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাঠামোতে নতুন করে ‘ট্রাফিক কারিগরি ইউনিট’ গঠন করা হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই ইউনিট কার্যকর হলে পর্যায়ক্রমে পুরো মেট্রোপলিটন এলাকায় স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু হবে বলে আশা করা যায়। ফলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসার ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি সাধিত হবে। তবে কবে নাগাদ হবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংক এক্ষেত্রে সহায়তা করতে প্রস্তুত। ঢাকা শহরের আয়তন ও লোকসংখ্যা অনুযায়ী যে পরিমাণ রাস্তা থাকা উচিত তার অভাব ও গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধিকে যানজটের স্বাভাবিক কারণ হিসেবে ধরে নেয়া হয়। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির বিষয়টিও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা কার্যকর করতে পারেনি ট্রাফিক পুলিশ। ঢাকা শহরের যানবাহনের সংখ্যা, কোন্ মোড়ে মিনিটে কি পরিমাণ গাড়ি অতিক্রম করে- এ ধরনের নানা পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ব্যাপক আয়োজন করে ঢাকায় স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু এর পর আমরা দেখলাম একই সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ও ট্রাফিক পুলিশের হাত- দুটোই চলছে। সবুজ বাতি জ্বলে আছে, এর পরও গাড়ি থেমে আছে বা ট্রাফিক পুলিশ গাড়ি আটকে রেখেছে। আবার লাল বাতি জ্বলা অবস্থায় পুলিশ গাড়ি যেতে ইশারা করছে। কোন সভ্য দেশ বা আধুনিক নগরে এমনটা অকল্পনীয়। এখন তো অটো সিগন্যাল প্রায় অকার্যকর।

বিদেশীরা ঢাকায় এসে বিস্মিত হন। বিশ্বের সব আধুনিক শহরেই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রয়েছে এর ব্যতিক্রম। যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশকে উন্নত দেশের মতো প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলার আবশ্যকতা রয়েছে। ঢাকাবাসীর প্রত্যাশা, ‘ট্রাফিক কারিগরি ইউনিট’ দায়িত্বশীল ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে সড়ক পরিস্থিতি বদলে যাবে।