২০ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বৃদ্ধ পিতামাতাকে সঙ্গে রাখা ও ভরণপোষণে আইনী বাধ্যতা আসছে

  • অবহেলায় থাকবে শাস্তি

তপন বিশ্বাস ॥ বৃদ্ধ পিতামাতাকে সঙ্গে রাখা এবং ভরণপোষণ আইনী বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনা হচ্ছে। আইনে পিতামাতার প্রতি অবহেলায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থাকছে। ‘পিতামাতার ভরণপোষণ’ শিরোনামে এই আইনে এক লাখ টাকা জরিমানা ও তিন মাস জেলের বিধান রাখা হয়েছে। বর্তমানে আইনটির বিধিমালা তৈরির কাজ প্রক্রিয়াধীন। ইতোমধ্যে একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। কিছু সংশোধনের পর তা চূড়ান্ত করা হবে। সমাজকল্যাণমন্ত্রী নূরুজ্জামান আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের দেশে অধিকাংশ সন্তানই পিতামাতার দায়িত্ব নিয়ে থাকেন। তাদের জন্য আইনের কোন প্রয়োজন হয় না। কিছু কিছু সন্তান আছেন যারা বৃদ্ধ পিতামাতার দায়িত্ব নিতে চান না। তাদের অসহায় পিতামাতার কথা বিবেচনায় রেখেই আইনটি কঠোর করা হচ্ছে। খসড়া বিধিমালাটিতে আরও কিছু সংশোধনী এনে শীঘ্রই তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।

গত বছরের শেষ নাগাদ ‘পিতামাতার ভরণপোষণ’ শীর্ষক আইনটি প্রণয়ন করা হয়। আইনটি কার্যকর করার জন্য বিধিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু হয় তখনই। বর্তমানে বিধিমালার খসড়া সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। এর মধ্যে আইনের কিছু দুর্বলতা ধরা পড়েছে। এসব দুর্বলতা কাটানোর জন্য খসড়া বিধিমালায় কিছু সংশোধন করে তা চূড়ান্ত করা হবে।

আইনের যেসব দুর্বলতা রয়েছে তার মধ্যে, আইনে শাস্তির বিধান থাকলেও শাস্তি মেনে নিয়ে কেউ বৃদ্ধ পিতামাতাকে প্রতিপালনে রাজি না হলে, কে তাদের দেখভাল করবে এমন কোন দিকনির্দেশনা আইন বা খসড়া বিধিমালায় নেই। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা চালু থাকলেও সে ক্ষেত্রেও বঞ্চিত থাকার অসংখ্য নজির রয়েছে। এমনকি প্রতিবন্ধী ভাই-বোন থাকলে তাদের ভরণপোষণ কে, কিভাবে করবে তার কোন কথাই আইন বা বিধিতে রাখা হয়নি। এছাড়া নিঃসন্তান বৃদ্ধদের কি হবে তাও কোথাও বলা হয়নি। এ ব্যাপারে সমাজকল্যাণমন্ত্রী নূরুজ্জামান আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা উচিত। বিধিমালাতে এগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তিনি বলেন, আমরা বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা চালু করেছি। এখন সন্তান কর্তৃক বয়স্ক পিতামাতার ভরণপোষণেরও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বিধিমালায় এসব বিষয় সুনির্দিষ্ট করা হবে।

প্রসঙ্গত, ভারতের অসম সরকার এই সমস্যা প্রতিকারে সম্প্রতি একটি আইন পাস করেছে। সেখানে কোন চাকিরজীবী সন্তান বৃদ্ধ পিতামাতাকে প্রতিপালন না করলে তার বেতনের ১০ শতাংশ কর্তন করে পিতামাতার এ্যাকাউন্টে প্রদানের বিধান রেখেছে। এছাড়া প্রতিবন্ধী ভাই-বোনদের জন্য বেতনের পাঁচ শতাংশ কর্তনের বিধান রাখা হয়েছে।

খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, সন্তান পিতামাতাকে সঙ্গে রাখতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে পিতামাতা যার সঙ্গে বসবাস করতে চান তা প্রাধান্য দিতে হবে। অন্য সন্তানরা সমভাবে পিতামাতার ভরণপোষণ ব্যয় বহন করবেন। একমাত্র সন্তান যৌক্তিক কারণে পিতামাতাকে সঙ্গে রাখতে না পারলে তাদের ভরণপোষণ ব্যয় ব্যাংকিং চ্যানেলে তাদের হিসাব নম্বরে পাঠাবেন। একাধিক সন্তান থাকলে এবং যৌক্তিক কারণে পিতামাতাকে সঙ্গে রাখতে না পারলে তারা সম্মিলিতভাবে নির্ধারিত অর্থ সরাসরি অথবা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে তাদের দিতে হবে। যেসব সন্তান পিতামাতার প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের প্রণোদনা হিসেবে সম্মাননা প্রদান করা হবে। উপেজেলা, জেলা এবং জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় দিবসে অতিথি হিসেবে তাদের আমন্ত্রণ করা হবে। পিতামাতার ভরণপোষণে স্থায়ী ও চলতি তহবিল গঠন করা হবে। চলতি তহবিল জাতীয়, জেলা, উপজেলা ও সমাজসেবা অধিদফতরের আওতায় পরিচালিত হবে। স্থায়ী তহবিল জাতীয় পর্যায়ে পরিচালিত হবে। খসড়া বিধিমালার দ্বিতীয় অধ্যায়ে জাতীয়, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, শহর এবং পিতামাতার ভরণপোষণ সহায়ক কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। বিধিমালাটির খসড়া চূড়ান্ত করে তা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অপর এক সূত্রে জানা গেছে।

খসড়া বিধিমালায় পিতামাতার আচরণের বিষয়ে বলা হয়েছে, তাদের প্রয়োজন ও অনুভূতিগুলো সন্তানদের একত্রিতভাবে অথবা আলাদাভাবে অবহিত করবেন। সব সমস্যা নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। সমস্যা সামাধান না হলে বর্ধিত পরিবারের সদস্য অথবা স্থানীয় ভরণপোষণ কমিটির সহায়তা নেবেন। তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সুরক্ষার চেষ্টা করবেন। তাদের ভবিষ্যত সুরক্ষায় সঞ্চয় করবেন। নিজ নিজ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং নৈতিকতা বিষয়ক শিক্ষা সন্তানসহ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরবেন। তাদের শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী নিজেদের সেবাযতœ নিজেরাই নেয়ার চেষ্টা করবেন। সন্তান পিতামাতার কোন প্রয়োজন তাৎক্ষণিকভাবে মেটাতে না পারলে যথাসম্ভব ধৈর্যধারণ করবেন। সন্তানদের আচরণ বিষয়ে খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, পিতামাতার সঙ্গে সর্বাবস্থায় মর্যাদাপূর্ণ আচরণ ও যতœসহকারে দেখভাল করবেন। পিতামাতার মতামতকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। পিতামাতার শারীরিক ও মানসিক, স্বাস্থ্যগত বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখবেন। প্রয়োজনীয় সেবাশুশ্রƒষা, পথ্য ও অন্যান্য উপকরণ যথাসম্ভব দ্রুত সরবরাহ করবেন। পিতামাতার নিজস্ব সম্পদ বিনষ্ট করা যাবে না। তাদের আইনগত অধিকার, উত্তরাধিকার, সম্পত্তি ও মোহরানা সমুন্নত রাখতে হবে। পিতামাতার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করবে। কোন প্রকার ছলচাতুরির মাধ্যমে পিতামাতার সম্পদের যথেচ্ছা ব্যবহার করা যাবে না। পিতামাতার সম্পদে অন্য উত্তরাধিকারিগণের অংশ আত্মসাৎ করা যাবে না। পিতামাতার নিজস্ব সম্পদ না থাকলে তাদের কোনরূপ দোষারোপ করা যাবে না। পিতামাতার সুনাম, মর্যাদা ও পারিবারিক ঐতিহ্য বজায়ে রাখতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক আচার, অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকা-ে পিতামাতার অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। পিতামাতার ভোটাধিকার, ধর্মাচার, নাগরিক অধিকার প্রতিপালন নিশ্চিত করতে হবে। পিতামাতাকে দৈনিক তিনবার খাদ্য সরবরাহ, বয়স,অসুস্থতা ও প্রতিবন্ধিতা বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসা এবং পুষ্টিবিদের পরামর্শে পুষ্টিমান নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষ দিবসে বা অনুষ্ঠানে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করে উন্নতমানের খাবার দিতে হবে। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তামাক, ধূমপান, মাদকদ্রব্য ইত্যাদি পরিহারে পিতামাতার সঙ্গে কাউন্সেলিং করতে হবে। ঋতু বিবেচনা করে পিতামাতার পছন্দমতো আরামদায়ক বস্ত্রের ব্যবস্থা করতে হবে। বছরে অতিরিক্ত একসেট নতুন পোশাক দিতে হবে। পিতামাতার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে তাদের জন্য বিছানাপত্র, আসবাবপত্রের সংস্থান, শৌচাগার ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা এবং প্রবীণবান্ধব জিনিসপত্রের ব্যবস্থা করতে হবে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে বছরে কমপক্ষে একবার চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পিতামাতার বিশেষ রোগের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ এবং পথ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় কাগজপত্র, পরীক্ষা নিরীক্ষার রিপোর্ট ও প্রেসক্রিপশন সংরক্ষণ করতে হবে। সন্তানের অনুপস্থিতিতে তাদের স্ত্রী-সন্তান বা পরিবারের অন্য সদস্যরা পিতামাতার উপযুক্ত পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। নাতি,পুত্রবধূ বা নিকটআত্মীয়রা পরিচর্যা করতে না পারলে কেয়াগিভারের মাধ্যমে পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। তা সম্ভব না হলে পরিচর্যা কেন্দ্রের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করতে হবে। পরিচর্যাকেন্দ্রে নিয়মিত বিরতিতে পিতামাতার সঙ্গে সাক্ষাত করতে হবে।

সঙ্গ প্রদান ॥ সন্তান ও পরিবারের সদস্যরা পিতামাতার সঙ্গে নিয়মিত সঙ্গ দিতে হবে। সন্তানের চাকরি বা অন্য কারণে নিয়মিত দেখা করা সম্ভব না হলে বছরে কমপক্ষে দুবার পিতামাতার সঙ্গে সাক্ষাত করতে হবে। প্রবাসী সন্তান বা সন্তানরা প্রয়োজনে আধুনিক যোগাযোগ পদ্ধতির মাধ্যমে পিতামাতার নিয়মিত খোঁজখবর নিতে হবে। বিনোদনকে গুরুত্ব দিয়ে পিতামাতাকে টেলিভিশন, কম্পিউটার দেখার, ক্লাব, পাঠাগার, পার্ক ঘোরার, খবরের কাগজ, বই ইত্যাদি পড়ার জন্য নিয়মিত সরবরাহ করতে হবে। তাদের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে সন্তানদের সার্মথ্য অনুসারে ভ্রমণের আয়োজন করতে হবে। পিতামাতা মৃত্যুবরণ করলে সব সন্তান সশরীরে উপস্থিতি থেকে তাদের দাফনকাফন, সৎকারের ব্যবস্থা করতে হবে এবং তাদের দায়দেনা পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে। কোন সন্তান বিদেশে অবস্থান করলে বা যৌক্তিক কোন কারণে অনুপস্থিত থাকলে উপযুক্ত প্রতিনিধির মাধ্যমে পিতামাতার দাফনকাফন ও সৎকারের ব্যবস্থা করতে হবে।

পরিচর্যাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ॥ সরকার পিতামাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে পরিচর্যাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করবে। সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনমূলে যে কোন প্রতিষ্ঠানকে পিতামাতার পরিচর্যা কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করতে পারবে। সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানে কোন প্রতিষ্ঠান, সংস্থাকে পিতামাতার পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনার অনুমতি প্রদান করবে। সেই ক্ষেত্রে বেসরকারী উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত পরিচর্যা কেন্দ্রকেও প্রণীতমালা অনুসরণ করতে হবে। সরকারী, বেসরকারী, উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত পরিচর্যা কেন্দ্র দিবাপরিচর্যা কেন্দ্র, রাত্রিকালীন পরিচর্যা কেন্দ্রে পৃথক কর্নার থাকবে। বেসরকারী যেসব সংস্থা পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা করতে চায় তাদের জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার মাধ্যমে সমাজসেবা অধিদফতরের মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করতে হবে। আবেদনের সঙ্গে সংস্থাটির নিবন্ধন সনদের সত্যায়িত কপি, অনুমোদিত গঠনতন্ত্রের সত্যায়িত কপি, কার্যকরী কমিটির সত্যায়িত কপি, বার্ষিক কার্যক্রম প্রতিবেদন, হালনাগাদ বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং জেলা প্রশাসকের সুপারিশ থাকতে হবে। থাকতে হবে তফসিলী ব্যাংকের দেয়া হালনাগাদ অর্থিক সচ্ছলতার সনদ, আয়ের উৎসের বিবরণী, সংস্থাটির নামে সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাইরে দশ শতক জমির দলিল, সিটি কর্পোরেশনের ভেতরে হলে তিন কাঠার ওপর স্থাপিত বাড়ি ভাড়ার চুক্তিপত্র।