২০ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আপনার গ্রামের বাড়িতেও একটা কাঠের সিন্দুক ছিল, মনে পড়ে?

আপনার গ্রামের বাড়িতেও একটা কাঠের সিন্দুক ছিল, মনে পড়ে?
  • আধুনিক ব্যাংকিংয়ের যুগে বিলুপ্তপ্রায় গ্রামীণ ঐতিহ্য

মোরসালিন মিজান ॥ গানে, কবিতায় এখনও বেশ আছে সিন্দুক। কবি এবং শিল্পীরা মনের সিন্দুকের কথা বার বারই বলেছেন। সেই সিন্দুকে ভালবাসার মানুষটিকে বন্দী করে রাখার তীব্র বাসনার কথা আমরা জানি। কিন্তু দারুশিল্পের যে নিদর্শন নিয়ে এত গান, কবিতা, বর্তমানে এর কি কোন অস্তিত্ব আছে?

ঢাকার একাধিক প্রবীণ ও মাঝবয়সীর সামনে প্রসঙ্গটি তুলতেই এর বর্তমান অবস্থা অনুমান করা গেল। অন্যের আচারে অভ্যস্ত নাগরিক জীবন আর আধুনিক ব্যাংকিংয়ের যুগে বিষয়টি শতভাগ ভুলেছিলেন তারা। হঠাৎ শুনে কেউ কেউ চমকে উঠলেন। স্মৃতি হাতড়ে বললেন, আরে, আমাদের গ্রামের বাড়িতেই তো একটা কাঠের সিন্দুক ছিল। কোথায় গেল সেটা? কেউ কেউ ত্বরিৎ অনুসন্ধানে নেমে গেলেন। তারপর বললেন, আমাদের ছিল যৌথ পরিবার। সবাই মিলে একসঙ্গে থাকতাম। ভাই-বোনেরা আলাদা হওয়ার সময় সিন্দুকটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল! কার ভাগে পড়েছে, কেউ সেটি সংরক্ষণ করছে কিনা, খোঁজ নিয়ে দেখার সময়-সুযোগ এখন আর হয় না বলে জানান তারা। গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, বড় অংশটিই সিন্দুকের ব্যবহার ভুলেছে। এভাবে বিলুপ্তপ্রায় গ্রামীণ ঐতিহ্য। অথচ এই কিছুকাল আগেও গ্রামের ঘরে ঘরে কাঠের সিন্দুক দেখা গেছে। অপেক্ষাকৃত সচ্ছল গৃহস্থবাড়িতে এক বা একাধিক সিন্দুক কে-না দেখেছেন? ব্যবহারিক দিক তো ছিলই। সেই সঙ্গে গ্রামের মানুষের কাছে আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল সিন্দুক। কারুকাজ করা কাঠের সিন্দুক বাংলার দারুশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

বাংলাদেশের সমাজে কাঠের সিন্দুকের ব্যবহার ঠিক কবে শুরু হয়েছিল তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে গ্রামে সিন্দুকের ব্যবহার, যে কেউ স্মৃতি হাতড়ে বলবেন, অনেক পুরনো। সম্পদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার স্বার্থে প্রাচীনকাল থেকে এর ব্যবহার হয়ে আসছে।

যতদূর জানা যায়, উনিশ শতকে ব্যাংকে আমানত রাখার কোন ব্যবস্থা ছিল না। বিশ শতকের মাঝামাঝিও সীমিত আকারে ব্যাংকিং হতো। বিশ শতকের গোড়া থেকে মধ্যভাগ পর্যন্ত ব্যাংকের কাজ করত পোস্ট অফিসগুলো। তার আগ পর্যন্ত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা সিন্দুকেই ভরসা করতেন। নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, জমির দলিলসহ মূল্যবান যা কিছু রাখা হতো এর ভেতরে। বাইরে ভারি তালা ঝুলিয়ে দেয়া হতো। গ্রামে তখন চুরির ঘটনা যেমন ঘটত তেমনি সংঘটিত হতো দুর্ধর্ষ ডাকাতি। এ ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সম্পদ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখত সিন্দুক। আজকের যারা তাদের জন্য বলা, সিন্দুক কাঠের বড় এবং উঁচু বাক্সের মতো দেখতে। ছোট আকারের সিন্দুকে চারটি পায়া থাকে। বড়গুলোতে ছয়টি। সিন্দুক ব্যাংকের ভোল্টের মতো কাজ করত। জোতদার, জমিদার এবং গৃহস্থরা নিজেদের সম্পদ এই ভোল্টে রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাতেন।

সিন্দুকের ভেতরে রাখা সম্পদের নিরাপত্তার স্বার্থে খুব মজবুত ও ভারি কাঠ দিয়ে তৈরি করা হতো এর কাঠামো। বলা হয়ে থাকেÑ সিন্দুকের গায়ে কুপালে এমনকি কুড়াল দূরে ছিটকে পড়ত। সিন্দুক থাকত অক্ষত। মূল্যবান সম্পদের নিরাপত্তায় অনেকে আবার খাটের সমান করে সিন্দুক তৈরি করতেন। বাংলার দারুশিল্পীরা কাঠের সিন্দুক এবং খাটের নির্মাণ কৌশল অবলম্বন করে সিন্দুক-খাটের প্রবর্তন করেন। পালঙ্ক জাতীয় সিন্দুকের ওপর থাকত ঘুমানোর ব্যবস্থা। সামান্য শব্দ হলে, শক্ত হাতে সিন্দুকের গায়ে কেউ হাত রাখলে মুহূর্তেই চোখ কচলে ঘুম থেকে উঠে পড়তেন গৃহস্থ! ফলে চোররা কোন সুবিধা করতে পারত না।

সম্পদ সুরক্ষার পাশাপাশি, কাঠের সিন্দুকের গায়ে চমৎকার কারুকাজ করা হয়। পালঙ্ক জাতীয় সিন্দুকের চার কোণে প্রায়শই চারটি ফুলকলি নক্সা দেখা যেত। জমিদার ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর ব্যবহৃত সিন্দুকগুলো ছিল আধুনিক কারুকাজম-িত। সাধারণ পরিবারের কর্তারাও সিন্দুকে নিজ নিজ রুচি অনুযায়ী নক্সা করিয়ে নিতেন। বাটালির সাহায্যে সিন্দুকের কাঠ খোদাই করে ফুল, লতা-পাতা, বাঘ, সিংহ, পাখি, পৌরাণিক কাহিনীর বিভিন্ন চরিত্র, মসজিদ, মন্দির, দেব-দেবীর ফিগার ইত্যাদি আঁকা হতো। কখনও দুই দিকে, কখনও তিনদিকে কারুকাজ করা হতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উলম্ব আয়তকার খোপে বিভিন্ন নক্সা করে তা সিন্দুকের গায়ে বসানো হতো। এভাবে দারুণ নান্দনিক হয়ে উঠত একেকটি সিন্দুক।

বাংলাদেশের দারুশিল্প নিয়ে অল্পবিস্তর কাজ করেছেন জাতীয় জাদুঘরের সাবেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। তিনি জানান, সাধারণত সিন্দুকের দৈর্ঘ্য হয় ৬ থেকে ৭ ফুট পর্যন্ত। প্রস্থে তিন থেকে চার ফুট। উপরিভাগ দরজার কপাটের মতো বড় ঢাকনা দিয়ে আটকানো থাকে। মাঝখানে থাকে বর্গাকৃতির একটি ছোট ঢাকনা। ভেতরে জিনিসপত্র সংরক্ষণ করার জন্য ছোট ছোট খোপ বা কুঠুরির ব্যবস্থা করা হয়। তিনি জানান, সিন্দুক সাধারণত দুই ধরনের হয়। একটি চার থেকে ছয় পায়াবিশিষ্ট, আয়তকার। পায়া ৪ থেকে ২০ ইঞ্চি পর্যন্ত উঁচু হয়। আরেক ধরনের সিন্দুকে পায়ায় জুড়ে দেয়া হয় কাঠের চাকা।

দুই ধরনের সিন্দুকই বর্তমানে প্রদর্শিত হচ্ছে জাতীয় জাদুঘরে। মঙ্গলবার তৃতীয় তলায় গিয়ে দেখা যায়, দারুশিল্পের চমৎকার প্রদর্শনী চলছে এখানে। স্থায়ী গ্যালারির একপাশে চারটি বড় কাঠের সিন্দুক রাখা হয়েছে। আকারের দিক থেকে পালঙ্কের সমান।

জাদুঘরের কীপার নূরে নাসরীন জানান, উনিশ শতকের একটি সিন্দুক সংগ্রহ করা হয়েছে ফরিদপুর থেকে। একই সময়ের অপর সিন্দুক সংগ্রহ এসেছে যশোর থেকে। পুরনো সিন্দুক আজকের প্রজন্ম দেখে এখনও অবাক হচ্ছেন বলে জানান তিনি।

গ্রামের পুরনো বাড়িতে খোঁজাখুঁজি করলেও সিন্দুকের অস্তিত্ব চোখে পড়ে। এমনকি রাজধানী শহরেও সন্ধান মিলল সিন্দুকের। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দীন ইউসুফ ও শিমুল ইউসুফের ঢাকার বাসায় আছে কাঠের তৈরি দুটি বিশাল সিন্দুক। নাসির উদ্দীন ইউসুফ জানান, পারিবারিকভাবে পাওয়া একটি সিন্দুকের বয়স প্রায় দেড়শ’ বছর! অপরটির বয়স হবে প্রায় ১২৫ বছর! সিন্দুকগুলো এখন আর ব্যবহার করা হয় না। এত বড় জায়গা নেই। আবার ফেলে দেয়াও কষ্টের। অমূল্য নিদর্শন হিসেবে স্টোররুমে সংরক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এভাবে কিছু সিন্দুক টিকে আছে। গভীর-গোপন বাক্সটি এখন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। শুকনো কাঠের গায়ে খোদাই করা শিল্পকর্ম বাংলার সমৃদ্ধ দারুশিল্পের প্রতিনিধিত্ব করছে।

আপনার শহর বা গ্রামের বাড়িতেও কি আছে সিন্দুক? খোঁজ করুন। বেছে থাক পুরনো স্মৃতি।

নির্বাচিত সংবাদ