১০ অক্টোবর ২০১৯

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ হায়াতুদ্ দুনিয়া বা পার্থিব জীবন

হায়াতুদ্ দুনিয়া বা পার্থিব জীবন অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : তোমরা পার্থিব জীবনকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছ, কিন্তু আখিরাতের জীবনই হচ্ছে অনেক ভাল এবং স্থায়ী। (সূরা আ’লা : আয়াত ১৬-১৭)।

একজন মানুষের পৃথিবীতে আগমন এবং এখান থেকে নির্গমনের মধ্যবর্তী কালটাতে যে জীবন সেটাই পার্থিব জীবন। এই পৃথিবীর জীবনের বিভিন্ন মেয়াদী সময় নির্ধারিত থাকে। এই সময়সীমা সবার এক থাকে না। পৃথিবীতে থাকার জন্য যে সময়সীমা থাকে তা আয়ু নামে অভিহিত হয়। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু যার জন্য যতটুকু আয়ু নির্ধারণ করে দেন সে ততদিন পৃথিবীতে থাকতে পারে। অনেকেই অকালে ঝরে যায়, আবার অনেকের আলো-হাওয়ার এই মায়াঘেরা পৃথিবীতে আসারই সুযোগ হয় না, মাতৃগর্ভেই তারা নিঃশেষ হয়ে যায়।

এই যে পৃথিবীতে আগমন ও নির্গমন কিংবা আগমনের পূর্বেই শেষ হয়ে যাওয়া- এসব রহস্য কেবলমাত্র আল্লাহ্ জাল্লা শানুহুই জানেন। আমরা যতই বুদ্ধিমান হই না কেন, যতই যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করি না কেন, যতই যুক্তির কষ্টিপাথরে কিংবা বৈজ্ঞানিক বিচার-বিশ্লেষণ দ্বারা যাচাই করার চেষ্টা-তদ্বির করি না কেন, জন্ম ও জীবনরহস্য উদ্ঘাটন করতে যথার্থভাবে সমর্থ হব না। শুধু এতটুকু বলতে পারব, ওয়া আল্লাহু আ’লম-আল্লাহ্ই ভাল জানেন।

কুরআন মজীদে পার্থিব জীবনের সুন্দর মিসাল বা উপমা দিয়ে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : বস্তুত পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত এরূপ : যেমন-আমি আসমান হতে পানি বর্ষণ করি, ফলে তা দ্বারা মাটিতে উদ্ভিদ ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে উদগত হয়, যা হতে মানুষ ও জীবজন্তু আহার করে থাকে। অতঃপর যখন ভূমি তার শোভা ধারণ করে ও নয়নাভিরাম হয় এবং তার অধিকারীরা মনে করে তা তাদের আয়ত্তাধীন, তখন দিবসে অথবা রজনীতে আমার নির্দেশ এসে পড়ে এবং আমি তা এমনভাবে নির্মূল করে দেই যেন গতকালও তার অস্তিত্বই ছিল না। এভাবে আমি নির্দেশনাবলী বিবৃত করি চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য। (সূরা ইউনুস : আয়াত ২৪)।

মানুষ ভূমিষ্ঠ হয় একদম অবুঝ শিশু অবস্থায়। পৃথিবীতে আগমনের পূর্বে মাতৃগর্ভে সে কম-বেশি ২৮০ দিন ধরে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্দু আকৃতি থেকে একটা ক্ষুদ্র মনুষ্য আকৃতিতে আল্লাহ্র নির্ধারিত নিয়মে গঠিত হয়। মাতৃগর্ভেই আল্লাহ জাল্লা শানুহু তার জীবিকার সুব্যবস্থা করে দেন। তার ভূমিষ্ঠ হওয়ার কালে মাকে অসহ্য যন্ত্রণা পেতে হয়। পৃথিবীতে এসেই সে যাতে সুষম খাদ্য অনায়াসে পায় সে জন্য আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু মায়ের স্তনে দুগ্ধ সঞ্চারিত করে দেন। আব্বা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, ভাই-বোনসহ আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, নিকটজন তথা সবার অন্তরে শিশুর প্রতি খাস দরদ সঞ্চারিত করে দেন।

মাতৃগর্ভাশয়ে তার আগমন ঘটে পিতার থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায়। আলমে আরওয়া বা আত্মার জগতে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু সব মানুষের প্রাণ বা রুহুকে বহু পূর্বেই সৃষ্টি করেছেন। এ সবই আল্লাহ্র কুদ্রতের অপূর্ব নিদর্শন।

বিশ্বজগত সৃষ্টির রহস্য, জগত সংসারের তাবত রহস্য, আল্লাহ্ জাল্লা শানুহুর কুদ্রতের নিগূঢ়তত্ত্ব, আল্লাহর, মারিফাত জানবার একমাত্র উপায় হচ্ছে ইল্মে তাসাওউফ চর্চা করা। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ দ্বারা এর কিছু কিছু উদ্ঘাটন করা সম্ভব হলেও সামগ্রিক জ্ঞান প্রত্যক্ষণের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব হয় ইল্মে তাসাওউফের এতদ্সংক্রান্ত সবক যথাযোগ্য পীরের কাছ থেকে তা’লীম গ্রহণ করে।

কুরআন মজীদে মানব সৃষ্টির বিভিন্ন স্তর এবং বিকাশের ধারাবাহিকতার বিবরণ বিবৃত করে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন, আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকার উপাদান থেকে, অতঃপর আমি সেটাকে শুক্রবিন্দুরূপে (নুত্ফা) স্থাপন করি এক নিরাপদ আঁধারে, পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি ‘আলাক্-এ (জমাট রক্তপি-) অতঃপর আলাককে পরিণত করি পি-ে এবং পি-কে পরিণত করি অস্থি-পঞ্জরে, অতঃপর অস্থি-পঞ্জরকে ঢেকে দেই গোশ্ত দ্বারা, অবশেষে সেটাকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টিরূপে। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ্ কত মহান! এরপর তোমরা অবশ্যই মারা যাবে, অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমাদের উত্থিত করা হবে। (সূরা মু’মিনূন : আয়াত ১২-১৬)।

আরও ইরশাদ হয়েছে : যিনি (আল্লাহ) তাঁর প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে সৃজন করেছেন উত্তমরূপে এবং কর্দম হতে মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন। অতঃপর তিনি তার বংশ উৎপন্ন করেন তুচ্ছ তরল পদার্থের নির্যাস হতে। পরে তিনি সেটাকে করেছেন সুঠাম এবং তাতে ফুঁকে দিয়েছেন তার রুহুকে এবং তোমাদের দিয়েছেন কর্ণ, চক্ষু ও অন্তঃকরণ, তোমরা অতি সামান্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (সূরা সাজ্দা : আয়াত ৭-৯)। বল, তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও অন্তঃকরণ, তোমরা অল্পই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। বল, তিনিই তোমাদের ছড়িয়ে দিয়েছেন পৃথিবীতে এবং তারই নিকট তোমাদের সমবেত করা হবে। (সূরা মুলক : আয়াত ২৩-২৪)।

মানুষের হায়াত বা জীবন থাকে বলেই মানুষও হায়ওয়ান। মূলত মানুষকে আল্লাহ্ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন সুন্দর অবয়ব বা সুরতে। তাকে বুদ্ধি-বিবেক এবং নানামাত্রিক কর্মশক্তি দিয়েছেন যাতে মানুষ আল্লাহ্র প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবী আবাদ করতে পারে।

মানুষের পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও এই জীবন তার আল্লাহ্র খলিফা ও বান্দা হিসেবে দায়িত্ব অনেক। সে আল্লাহ্র ইবাদত করবে এবং শান্তির পৃথিবী, সমৃদ্ধির পৃথিবী, হানাহানি ও সংঘাতমুক্ত একটা নিরাপদ পৃথিবী গড়ায় যথাসাধ্য চেষ্টা করবে, কায়িক ও বৌদ্ধিক পরিশ্রম দিয়ে একটা সুখের পৃথিবী গড়ে তুলবে, এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর বান্দা হিসেবে গোটা পৃথিবীর মানুষ একটা বৃহত্তর, উচ্চতর এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হবে। ফলে শোষণহীন, শ্রেণীবিহীন, আধিপত্যহীন ইনসাফ ও আদলভিত্তিক সামাজিক ন্যায়বিচারসম্পন্ন সত্যিকার কল্যাণকর পৃথিবী মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। আর এমন পৃথিবী সবার কাম্য হওয়া উচিত।

চলবে...

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ