২০ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অধিকারহীন মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইলা মিত্র

  • নাজনীন বেগম

কৃষক আন্দোলনের বিপ্লবী নেত্রী ইলা মিত্র বাংলাদেশ তথা অবিভক্ত বাংলার সংগ্রামী ইতিহাসের এক অনন্য যোদ্ধা। নির্বিত্ত, অসহায় ও বঞ্চিত কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো এক লড়াকু সহযোদ্ধা যিনি আজও আমাদের ধারাবাহিক আন্দোলনের ঐতিহ্যে অকুতভয় নায়ক ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকের চাপিয়ে দেয়া আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার আলোকপাত ছাড়া এই অনন্য মুক্তি সেনানির যথার্থ অবদান স্পষ্ট হবে না। প্রাচীনকাল থেকে সর্বভারতীয় ভূমি ব্যবস্থার যে চিত্র প্রতিভাত হয় তা মূলত সমকালীন অনেক নথিপত্র, যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই উপমহাদেশের মালিকানা স্বত্বের সঙ্গে অনেক জ্ঞানীগুণী বিদগ্ধ জনের সমৃদ্ধ লেখায়। ভারতের ভূমি ব্যবস্থার ওপর মার্কস এঙ্গেলসের মিলিত বক্তব্য ছিলÑ প্রাচীন ভারতের ভূমি ব্যবস্থায় ছিল ব্যক্তিগত মালিকানার অনুপস্থিতি। এমনকি তা প্রাচ্যের স্বর্গদ্বারের চাবি কাঠিও। ঊনবিংশ শতাব্দীর এই ধারণায় হরেক রকম বিপরীত তথ্যও আসতে থাকে বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই। এম, এন, রয় এবং ইরফান হাবিবের মতো অনেক বিজ্ঞ সমাজ পর্যবেক্ষক পুরনো অনেক তথ্য উপাত্তের সাহায্যে এই ধারণাও ব্যক্ত করেন যে, এক ধরনের মিশ্রমা মালিকানা স্বত্ব ভূমিনির্ভর এই ব্যবস্থায় প্রচলন ছিল। মুদ্রা অর্থনীতি এখন সেভাবে গড়ে না ওঠার কারণে দ্রব্যের সঙ্গে দ্রব্যের বিনিময় ছিল ভোক্তা শ্রেণীর সাধারণ জীবন যাপনের প্রধান ব্যবস্থা। অর্থাৎ যে কৃষক ধান উৎপাদন করত সে ধানের বিনিময়ে তার সন্তানের লেখাপড়ার ব্যয় নির্বাহ করত। কিন্তু ইংরেজ আধিপত্যের অব্যবহিত পরে ব্রিটিশ পূর্ব ভারতের আর্থ-সামাজিক চেহারায় বৈপ্লবিক রদবদল আসে। ভূমিনির্ভর সমাজ ব্যবস্থায় তৈরি হয় এক সুদূরপ্রসারী মালিকানা স্বত্ব। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ২/৩ দশক থেকে এই নতুন ভূমি কাঠামোর অবয়ব তৈরি হতে থাকে। প্রথমে ৫ বছরের জন্য কোন জমিদারকে জমির বন্দোবস্ত দিয়ে নতুন একটি শ্রেণীর অভ্যুদয় ঘটানো হয়। পরবর্তীতে দশ শালা এবং সর্বশেষে ১৭৯৩ খৃঃ লর্ড কার্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত উপমহাদেশের শুধু ভূমি ব্যবস্থায়ই নয় পুরো আর্থ-সামাজিক চেহারাকে পাল্টে দেয়। জমির সঙ্গে সম্পৃক্ত কৃষকদের প্রতিদিনের জীবনেও আসে এর বৈপ্লবিক সূচনা। এরই ধারাবাহিকায় গোটা উনিশ শতক জুড়ে চলে হতদরিদ্র কৃষি শ্রমিকদের ওপর অন্যায়ভাবে চাপানো শুধু মহাজনি প্রথাই নয় তার উৎপাদিত ফসলের অধিকার থেকে ক্রমাগত বঞ্চনার শিকার হওয়ার এক করুণ আখ্যানও। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ১১৭৬ সালের মহামনন্বতর আজও সাড়া জাগানো দুর্ভিক্ষ যাতে অসংখ্য গণমানুষ প্রায় ১/৩-এর মৃত্যু হয়। এর পর থেকে অবিভক্ত বাংলার বিত্তহীন কৃষকদের ওপর যে দুর্বিসহ অবস্থা নেমে আসে সেখান থেকে পরিত্রাণের কোন উপায় তাদের জানা ছিল না। প্রায় অর্ধশত বছর চলে আসা এই অন্যায় শোষণ আর বঞ্চনায় জর্জরিত নিঃস্ব কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়ায় কতিপয় সমাজ-সচেতন রাজনৈতিক কর্মী। এদের মধ্যে ইলা মিত্রের নাম আজও ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর জন্ম নেয়া এই বীর বিপ্লবীর শৈশব, কৈশোর অতিক্রান্ত হয় কলকাতায়। বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরিজীবী ছিলেন। পরিবার থেকে হাতেখড়ি হলেও স্কুল জীবনের পাঠ শুরু করেন বেথুন বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজে। সেখান থেকে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পাস করে ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মেধা ও মননের মিলিত সহযোগে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রী অর্জন করেন সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিভাগে। জ্ঞানার্জনে পারদর্শিতা প্রদর্শন করা ছাড়াও খেলাধুলায়ও ছিলেন এক সাহসী, লড়াকু ক্রীড়াবিদ। সাঁতার, বাস্কেটবল ও ব্যাডমিন্টন খেলায় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় কৃতিত্বের সঙ্গে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতেন। এর পুরস্কারস্বরূপ ১৯৩৫-৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন রাজ্য জুনিয়র এ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়ন। শুধু তাই নয় ১৯৪০ সালে জাপানে অলিম্পিক খেলার যে আয়োজন করা হয় সেখানেও তার নাম লিপিবদ্ধ ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে খেলাটি বাতিল হয়ে যায়। ছড়া, গান, অভিনয়েও নিজের সফলতা তুলে ধরতে তার সময় লাগেনি। সঙ্গত কারণে ইলা সেনের খ্যাতি অবিভক্ত বাংলায় বিশেষভাবে স্বীকৃতিও লাভ করে। বিভিন্ন কর্মযোগে নিজেকে শাণিত করতে গিয়ে রাজনৈতিক সচেতনতাও তাকে নানা মাত্রিকে উদ্বেলিত করে। ব্রিটিশ রাজশক্তির অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে শুধু সোচ্চার হওয়া নয় পাশাপাশি বিভিন্ন সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় নিজের অংশীদারিত্ব প্রমাণ করে সাধারণ মানুষের অধিকারও দাবির প্রতি সজাগ দৃষ্টি নিবন্ধ করেন। নারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পর্যায়ক্রমিকভাবে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবেও নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। এরপর আর পেছনের দিকে তাকানো নয়। এক সাহসী যোদ্ধার ভূমিকায় শুধু সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

ইতোমধ্যে ঘটে যায় জীবনের আর শুভযোগ। বিপ্লবী কমিউনিস্ট নেতা রমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে শুভ পরিণয়। সম আদর্শিক চেতনা ধারণ করা স্বামীর সাহচর্যে যাপিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে ওঠে অতি সাধারণ হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক উদ্দীপ্ত মানবিক দায়বদ্ধতা। সে দায় বহন করার কারণে কত মহাদুর্যোগ সুশৃঙ্খল জীবনকে তছনছ করে দেয় তা ভাবনায় আসলে শিহরিত হওয়া ছাড়া বিকল্প কোন পথও থাকে না। রামচন্দ্রপুর জমিদার পরিবারের বধূমাতা হওয়ার কারণে বিয়ের পর কলকাতা ছেড়ে চলে আসতে হয়। গ্রামাঞ্চলে এসে অতি সাধারণ মানুষকে কাছ থেকে দেখার যে সৌভাগ্য হয় সেখানেই তিনি হয়ে যান গণমানুষের একেবারে কাছের জন। সদ্য প্রতিষ্ঠিত স্কুলে শিক্ষকতা থেকে শুরু করে জোতদার, জমিদার ও মহাজনদের অত্যাচারে নিষ্পেষিত কৃষকদের অকৃত্রিম সহযোদ্ধার ভূমিকায় তাদের পাশে এসে দাঁড়ান। কৃষকের মালিকানার দাবিতে তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন আন্দোলন আর সংগ্রামে ইলামিত্রের নিঃস্বার্থ আর নিঃশর্ত সহযোগ আজও কিংবদন্তির আসনে তাকে বসানো হয়। জমিদার বাড়ির গৃহবধূ হয়েও এই প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সত্যিই এক অসম সাহসিকতার ব্যাপার। ততদিনে স্বামী রমেন্দ্র মিত্র ও পারিবারিক ঐতিহ্য আর সম্পদকে পিছনে ফেলে সহায় সম্বলহীন শ্রমজীবী কৃষকদের পাশে দাঁড়ান। ফলে স্ত্রী ইলা মিত্রের অসুবিধা হয়নি সাধারণ মানুষের কাতারে নিজেকে একাত্ম করতে। বিংশ শতাব্দীর ৪০-এর দশকের সূচনাকালে আবারও অবিভক্ত বাংলায় দেখা দেয় আর এক সাড়া জাগানো দুর্ভিক্ষ। তিন ভাগের দু’ভাগ ফসল কৃষকদের ন্যায্য দাবি নিয়ে তেভাগা আন্দোলনের যে যাত্রা শুরু সেখানে রামচন্দ্রপুর অঞ্চলের স্বামীর পারিবারিক জমিদারি এলাকায় এই লড়াইয়ে একেবারের সামনের সারিতে ছিলেন এই দীপ্ত নারী। ’৪৭-এর দেশ বিভাগেও এর কোন সুরাহা হতে পারেনি। বরং তা তীব্র সংগ্রামে পরিণত হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়। পাকিস্তান সরকার কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করলে এই আন্দোলন আরও সংগঠিত হয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে এগুতে থাকে। সংগ্রাম চালাতে হতো সব সময়ই গোপন জায়গায় মিলিত হয়ে। সেখানে নেতা হিসেবে ইলা মিত্রের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয় আর যুগান্তকারী।

ইলা মিত্রের প্রতিপক্ষ শুধু সরকার নয়, জমিদার, জোতদার এবং মহাজনরাও। ফলে চতুর্মুখী আক্রমণে ইলা মিত্র তার অসংখ্য কৃষক সহযোদ্ধা নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পতিত হতেন। নাচোল অঞ্চলের এই তেভাগা আন্দোলন আজ শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংঘবদ্ধ লড়াকু অভিযান। ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি এক পতাকায় সমবেত হয়ে যে সশস্ত্র অভিযান চালায় সংগ্রামী সহযোদ্ধারা সেখানে পুলিশ কর্মকর্তাসহ ৬ জনকে হত্যা করা হয়। এর পরের ইতিহাস আরও করুণ আর ভয়াবহ। পুলিশ কর্মকর্তারা এর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে যে নৃশংস তা-ব শুরু করে তা যেমন লোমহর্ষক একইভাবে মানবিক বোধ বুদ্ধি বিবর্জিত। নাচোল অঞ্চলের ঘর বাড়ি বিধ্বস্ত করা ছাড়াও ধর্ষণ, হত্যা এবং জুলুমের মহাসঙ্কটে পড়ে সম্পৃক্ত সহযোদ্ধারা, সাঁওতাল বেশে পালাতে গিয়ে ইলা মিত্র আটক হন। এই সাহসী নেত্রীর ওপর যে অমানুষিক অত্যাচার আর নিপীড়ন চালায় পাকিস্তান সরকারের পুলিশ বাহিনী তা আজও ইতিহাসের ন্যক্কারজনক অধ্যায়। তার পরেও এই অদম্য নারীর কাছ থেকে কোন ধরনের স্বীকারোক্তি আদায় করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার টানাপোড়েনে ১৯৫৪ সাল ইতিহাসের এক অনন্য পর্ব। শের-ই-বাংলা একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের স্মরণীয় বিজয়। ফলে পাকিস্তানী দুঃশাসন থেকে ইলা মিত্রের সসম্মানে চিকিৎসা এবং প্যারোলে মুক্তির বিভিন্ন সম্ভাবনা তৈরি হয়।

যুক্তফ্রন্ট সরকারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় ইলা মিত্রের চিকিৎসার কারণে কলকাতায় চলে আসার সুযোগ তৈরি হয়। ক্রমান্বয়ে সুস্থ হয়ে ওঠায় নিজেকে নতুন উদ্যোমে জাগিয়েও তোলেন। কলকাতার সিটি কলেজে শিক্ষকতার পেশায় যোগ দেন। এক সময় অবসরও গ্রহণ করেন। আর রাজনীতির ক্ষেত্রে রাখলেন অনন্য ভূমিকা জেলা ও প্রাদেশিক কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন কমিউনিস্ট পার্টি থেকে। চারবার বিধান সভার সদস্য এবং শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে পাঁচবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কলকাতার শরণার্থীদের জন্য তার কর্মযোগ আজও স্মরণীয়। শুধু তাই নয় স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এলে বঙ্গবন্ধু তাঁকে এদেশের নাগরিকত্ব দিতে চাইলে তিনি তা গ্রহণ করেননি, সপরিবারে শেখ মুজিব হত্যার বিস্ময় এবং শোক তার কখনও কাটেনি। এই মহীয়সী নারী ২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর মারা যান।

নির্বাচিত সংবাদ