১৫ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্থাপত্যের নিদর্শন সমৃদ্ধ জেলা রাজশাহীতে

  • মোঃ মাসুদ হোসেন

সময় তখন আশ্বিন মাস। ভ্রমণ পিপাসু এই যাযাবর মন সবসময় তৈরিই থাকে যে কোন সময় বেরিয়ে পড়ার। ইচ্ছে হচ্ছিল কোথাও ঘুরতে যাব। ঠিক এমন সময় এক বন্ধু বলল রাজশাহীর কথা। ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর থেকে এলাকার বন্ধুর ছোট ভাই সঞ্জয় পরীক্ষা দিতে যেতে হবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সঙ্গে যাওয়ার জন্য আমরাও মনে মনে বেশ প্রস্তুত হয়ে আছি আমাদের বলার অপেক্ষায়। কারণ সে বন্ধুটি আমাদের ছাড়া কাউকে তেমন একটা বিশ্বাস করেন না। যেই ভাবা সেই কাজ। এতদূর জার্নি সে একা করা অসম্ভব বিধায় বন্ধুর অনুরোধে সেসহ আমরা তিনজন যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শনসমৃদ্ধ জেলা রাজশাহীতে। তারিখ ও সময় মতো লঞ্চযোগে রওনা দিলাম যানজটের শহর ঢাকার উদ্দেশ্যে। লঞ্চে উঠে প্রথমেই চেয়ারের টিকেট কাটলেও বসা হয়ে উঠেনি বরাদ্দকৃত সেই আসনে। নৌভ্রমণে বিভিন্ন নদীর হাওয়ায় মন জুড়ানো দেহ আরও বিলিয়ে দিতে আমাদের নির্দিষ্ট আসন রেখে চলে গেলাম দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায়। সেখানের কেবিনগুলোর মনোরম পরিবেশে আমাদের অনেকটা মুগ্ধ করে দেয়। তার কারণ হলো বিভিন্ন নিপুন কারুকাজে সাজানো হয়েছে কেবিনগুলোর বাইরের অংশ। তৃতীয় তলায় ডেকে গিয়ে কিছুক্ষণ নদীর শীতল হাওয়া উপভোগ করে নেমে এলাম দ্বিতীয় তলায়। এখানে এসে কাটল কিছু মজার সময়। কেবিনগুলোর মধ্য থেকে ৪-৫ বছের একটি ফুটফুটে মেয়ে শিশুকে নিয়ে বারান্দায় আড্ডা দেয়া, ছবি তোলার মধ্য দিয়ে তিন বন্ধু চলে এলাম আমাদের গন্তব্য সদরঘাটে। সাড়ে তিন ঘণ্টার এই লঞ্চ ভ্রমণটিও ছিল অসাধারণ। লঞ্চ থেকে নেমে কমলাপুর রেলস্টশনে গিয়ে পরের দিনের রাজশাহী যাওয়ার ৪টি ট্রেনের টিকেট সংগ্রহ করে সিএনজিযোগে চলে সেই পরীক্ষার্থী সঞ্জয়ের মেস ফার্মগেটে। সেখানে এক রাতযাপনের পর দুপুর ৩টায় রাজশাহীর উদ্দেশে যাওয়া আন্তঃনগর সিল্কসিটি এক্সপ্রেস ট্রেনে অবস্থান নিলাম ও যথাসময় রাত ৯টা বাঝে গিয়ে গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছালাম পদ্মার তীরে অবস্থিত প্রায় ৯৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিভাগীয় শহর রাজশাহী রেল স্টেশনে। ট্রেন ভ্রমণের মধ্যে উপভোগ করলাম অজানা অনেক কিছু। দেখতে পেলাম টিভি কিংবা মোবাইলের পর্দায় দেখা অসাধারণ দৃশ্য। তার কয়েকটির মধ্যে প্রথম ব্রডগেজ ট্রেনে ওঠা, বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু দেখা ও চলাচল করা, রেল লাইনের দু’প্রান্তে বিশাল বিশাল আম বাগানসহ অনেক কিছু। যা হোক ফিরে আসি সেই রাজশাহী রেলস্টেশনে। আমাদের প্রথমত থাকার প্রয়োজন ও রাতের খাবার। অচেনা এই রাজশাহী শহরে কোথায় কি তা সব অজানা। চোখ পড়ল প্লাটফর্মের দ্বিতীয় তলায়। দেখতে পেলাম আবাসিক হোটেল। উপরে গিয়ে হোটেল ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে ভাড়ার বিষয়ে জানতে পেয়ে নিজেরা একটু বিস্মিত হয়ে গেলাম। যার কারণ আমাদের বাজেটের চেয়ে অনেক গুণ বেশি ভাড়া গুনতে হবে। এগুলো একমাত্র ধনাঢ্যরাই থাকতে পারবে বলে মনে হয়েছে আমাদের সবার। ম্যানেজারকে ধন্যবাদ জানিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে কাছাকাছি কয়েকটি হোটেল খোঁজাখুঁজির পর মোটামুটি সাধ্যের মধ্যে হয়ে গেল থাকার একটি ব্যবস্থা। এতক্ষণে সময় হয়ে গেছে রাত ১১টা। হোটেল কক্ষে প্রবেশ করে ফ্রেশ হয়ে এবার খাবারের পালা। এত রাতে কোনমতে অচেনা শহরের খাবারের হোটেল খুঁজে বের করে খাবারের অর্ডার করে টেবিলে বসলাম। হোটেল বয় কাক্সিক্ষত খাবার সামনে দিয়ে যাওয়ার পর ভাতে হাত দিতেই দেখি ভাতের মধ্যে গুড়ি গুড়ি পোকা আর তরকারিতে তো আছেই। এমন দৃশ্য দেখতে পেয়ে খাবার না খেয়ে বিল পরিশোধ করে হালকা নাস্তা নিয়ে চলে গেলাম থাকার যায়গায়। পরের দিনও অন্য রেস্টুরেন্টে খাবারের প্রায় একই অবস্থা। চলে গেলাম রাজশাহী শহরের পাশে অবস্থিত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। এর ছায়া ঘেরা ক্যাম্পাস ঘুরে দেখতে দারুণ ভাল লেগেছে। ভেতরে প্রবেশ করতেই মনোরম দৃশ্য। রাস্তার দু’প্রান্তে সারি সারি গাছের সমারোহ। ক্যাম্পাসে আম গাছ। আর বাইরে বের হতেই চোখে পড়ল শাবাশ বাংলাদেশ ভাস্কর্য। ১৯৯২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ‘শাবাশ বাংলাদেশ’ উদ্বোধন করেন। এই স্মৃতিস্তম্ভে আছে দু’জন মুক্তিযোদ্ধার মূর্তি। একজন অসম সাহসের প্রতীক, অন্য মুক্তিযোদ্ধার হাত বিজয়ের উল্লাসে মুষ্টিবদ্ধ হয়েছে পতাকার লাল সূর্যের মাঝে।

সঞ্জয়ের পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত দিনগুলোর মধ্যে ঘুরে দেখলাম রাজশাহী শহরেই অবস্থিত রাজশাহী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পদ্মা নদীর কোল ঘেঁষে স্থাপিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, আম বাগানসহ অনেক স্থাপনা ও নিদর্শন। যেভাবে যাবেন- বাংলাদেশের সব জেলা থেকেই রাজশাহীর যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। ঢাকা থেকে রাজশাহী জেলায় সড়ক ও রেল উভয় পথেই যাতায়াত করা যায়।