১৬ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফাইভ জি কবে কেন কি জন্য

  • মোস্তাফা জব্বার

সারা বিশ্বের প্রযুক্তি বিশ্বে এখন সর্বাধিক আলোচিত বিষয়টির নাম ফাইভ জি। এরই মাঝে সবাই এই শব্দটির সঙ্গে পরিচিত হলেও এটি বলে দেয়া উচিত যে, এটি একটি মোবাইল প্রযুক্তি। এটি নিয়ে আমাদের দেশেও কম আলোচনা হয়নি। সভা-সেমিনার, সাংবাদিক সম্মেলন সব কিছুতেই মোবাইল প্রযুক্তির প্রসঙ্গ আসলেই ফাইভ জি নিয়ে আলোচনা হয়। সেপ্টেম্বর মাসে একটি দৈনিক পত্রিকায় ফাইভ জি কতটা বাস্তবসম্মত শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটির প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়টি ছিল এরকম : ‘দেশে মানসম্পন্ন থ্রি-জি বা ফোর-জি সেবা নিশ্চিত না করেই সরকার নতুন করে এ খাতের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ‘ফাইভ-জি’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় এ সেবা দেয়া সম্ভব নয় জানিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির সঙ্গে দেশের সবচেয়ে বড় দুই অপারেটরের পাওনা নিয়ে দ্বন্দ¦ এখন লাইসেন্স বাতিলের নোটিসের পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাকি অপারেটরগুলোর সক্ষমতা ফাইভ-জি চালুর অনুকূলে নেই। ৯০ শতাংশ গ্রাহক এখনও ফোর-জির আওতার বাইরে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে ফাইভ-জি চালুর সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবসম্মত?’ প্রাসঙ্গিকভাবে প্রতিবেদক উল্লেখ করেন, ‘বিটিআরসির প্রধান কার্যালয়ে গতকাল মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশে ফাইভ-জি চালুর জন্য পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা ও নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়। বিটিআরসির জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) মোঃ জাকির হোসেন খান জানান, গত ৪ আগস্ট গঠিত ওই কমিটিতে সরকার, বিটিআরসি ও অপারেটরগুলোর প্রতিনিধিরা রয়েছেন। তারা আগামী জানুয়ারি নাগাদ ফাইভ-জি চালুর রূপরেখা, সম্ভাব্য তরঙ্গ, তরঙ্গমূল্য এবং বাস্তবায়ন সময়কাল প্রভৃতি বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা ও নীতিমালা তৈরি করবেন বলে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে।’ একই সঙ্গে প্রতিবেদক মুঠোফোন গ্রাহক সমিতির সভাপতি মহিউদ্দিনের একটি বক্তব্য উল্লেখ করেছেন, যাতে মহিউদ্দিন বলেছেন, এদিকে যেখানে থ্রি-জি সেবাই ঠিকমতো পাওয়া যায় না, সেখানে দেশে ফাইভ-জি চালুর সিদ্ধান্তকে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা মাত্র... ফাইভ-জি চালুর সিদ্ধান্তে সবচেয়ে খুশি হওয়ার কথা আমাদের। কিন্তু খুশি না হয়ে আতঙ্কিত হচ্ছি। কারণ ফোর-জি চালুর ১৭ মাস পার হলেও সারাদেশে ফোর-জি তো দূরের কথা, থ্রি-জি সেবাও সঠিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। সেইসঙ্গে বর্তমানে যোগ হয়েছে ৬৪ ভাগ মার্কেট দখলকারী গ্রামীণফোন ও রবির বিরুদ্ধে পাওনা নিয়ে ঝামেলা। বিটিআরসি তাদের এনওসি বন্ধ করার ফলে গ্রাহকরা কাক্সিক্ষত সেবা থেকে এমনিতেই বঞ্চিত। নিয়ন্ত্রক সংস্থা একদিকে পাওনা আদায়ের জন্য অপারেটর দুটির লাইসেন্স বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, আবার অন্যদিকে ফাইভ-জি চালুর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। বিষয়টি এমন, যে ডালে বসে আছেন সে ডালই আপনি কাটছেন। এনওসি বন্ধের ফলে অপারেটর দুটি আর নতুন করে স্পেকট্রাম কিনতে পারবে না। তবে ফাইভ-জি কাদের মাধ্যমে চালু করা হবে সে প্রশ্ন তোলেন তিনি। বর্তমান সময়ে কোয়ালিটি অব সার্ভিস যদি মাপা হয় তা হলে দেখা যাবে যে কোন সময়ের চাইতে তা অনেক নিম্নমানের। নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। রাষ্ট্রীয় অপারেটর টেলিটক এখনও ফোর-জি চালু করতে পারেনি। গ্রাহকদের ৯০ শতাংশ এখনও ফোর-জি সেবাই গ্রহণ করেননি। অন্যদিকে ফাইভ-জির ডিভাইসও দেশে পর্যাপ্ত নয়। ফাইভ-জির উপযুক্ত সেট হবে অনেক বেশি মূল্যের। ফাইভ-জি চালুর ক্ষেত্রে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, অপারেটরদের এখন পর্যন্ত স্পেকট্রাম আছে ৩৫ মেগাহার্জ। অথচ ফাইভ-জি করতে লাগবে প্রায় ১০০ মেগাহার্জ। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকার বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা গ্রাহকদের সঙ্গে কোন আলোচনা করেনি। এ অবস্থায় ফাইভ-জি চালু করা হলে তা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।’

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, বুয়েটের অধ্যাপক ড. কায়কোবাদ ফাইভ-জি চালুর পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে মনে করেন। তিনি একে গরিবের ঘোড়া রোগ বলেও চিহ্নিত করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ড. কায়কোবাদের মতো পন্ডিত ব্যক্তির এই মন্তব্য আমাকে অন্তত হতাশ করেছে। বরাবরই তিনি প্রযুক্তিতে সামনে যাওয়ার মানুষ। তিনি ৫জি নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন সেটি কেবল প্রতিবেদকই লিখলেন। দেখা হলে জেনে নেব বিষয়টি সত্যি কিনা। আমি যে কায়কোবাদ স্যারকে জানি তিনি কোনকালেই প্রযুক্তির অগ্রযাত্রাকে পেছনে টেনে নেয়ার মানুষ নন। তিনি ৫জিকে গরিবের ঘোড়া রোগ বলেছেন সেটি বিশ্বাস করা আমার জন্য অসম্ভব। তবে তিনি প্রথম বাক্যটিতে যে কথাটি বলেছেন সেটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি ৫জি চালু করার ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে বলে মনে করেন। ধন্যবাদ তাকে এই ধারণাটি পোষণ করার জন্য। সত্যিকারভাবেই ৫জি চালুর উদ্দেশ্য ভিন্ন। ফোনে চলমান অবস্থায় কথা বলা বা ইন্টারনেটে বিচরণ করাই ৫জির একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। এটি মোবাইল প্রযুক্তি বলে ৫জি দিয়ে এই দুটি কাজ তো করা যাবেই, করা যাবে আরও অনেক কিছু। অন্যদিকে ড. কায়কোবাদের কথামতো প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাওয়া যদি গরিবের ঘোড়া রোগ হয় তবে মোবাইল প্রযুক্তিতে আমাদের ৩জি-৪জি চালু করা উচিত হয়নি, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা মোটেই উচিত হয়নি। উচিত হয়নি সাবমেরিন কেবল লাইন বসানো, পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন বা দেশব্যাপী টেলিকম নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা অথবা দেশব্যাপী দ্রুতগতির ফাইবার অপটিক্স কেবল বসানোর। সবই তো গরিবের ঘোড়া রোগ। এমনকি কি দরকার আছে কম্পিউটার বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ইত্যাদি পড়ার সুযোগ তৈরি করার বা এসব নবীনতম প্রযুক্তি অনুশীলনের জন্য অত্যাধুনিক ও ব্যয়বহুল ল্যাব প্রতিষ্ঠা করার? আমরা তো এখনও সুযোগ পেলেই ক্ষমতার বাইরে বিনিয়োগ করে বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে নবীনতম বা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের গবেষণাগার তৈরি করছি। এসবও কি তা হলে গরিবের ঘোড়া রোগ? আমি আশা করেছিলাম ড. কায়কোবাদ এটি অনুভব করবেন যে, ৫জি প্রযুক্তি ২জি, ৩জি বা ৪জির মতো কথা বলার বা ফেসবুক ব্রাউজ করার প্রযুক্তি নয়। ৫জি দিয়ে কি করা হবে সেটি অন্তত ড. কায়কোবাদের জানার কথা। আর গরিবের ঘোড়া রোগ নিয়ে তো তিনিই বসবাস করছেন। নইলে কম্পিউটার বিজ্ঞান তার ছাত্রদের না পড়িয়ে বাংলা সাহিত্যে সীমিত থাকলেই হতো। প্রযুক্তিতে ৩২৪ বছর পিছিয়ে পড়া না হয় আরও ১০০ বছর পিছিয়ে যেত।

আমার নিবন্ধটি প্রতিবেদনের শেষ অনুচ্ছেদ থেকে শুরু করতে চাই। অনুচ্ছেদটি এমন- ‘বর্তমানে প্রচলিত মোবাইল গ্রাহক হিসেবে শুধু মানুষকে বিবেচনা করা হলেও ফাইভ-জি প্রযুক্তির অন্যতম প্রধান সেবা হলো ‘ইন্টারনেট অব থিংস-আইওটি’, যেখানে যন্ত্র থেকে যন্ত্রে যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত ডিভাইসগুলোকেও গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন ফাইভ-জি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।’

প্রতিবেদনে উল্লিখিত কতগুলো বিষয় আমরা স্বীকার করি। মোবাইল অপারেটরদের সেবার মান খুবই নিম্নমানের। বিশেষ করে সবচেয়ে বড় অপারেটর জিপি বা তার পরের অপারেটর রবির সেবার মান ভয়ঙ্করভাবে খারাপ। জিপির সঙ্কট স্প্রেকট্রামে। তাদের সাড়ে সাত কোটি গ্রাহক থাকলেও যে স্পেকট্রাম আছে তা দিয়ে এর অর্ধেক গ্রাহককেও সেবা দেয়া সম্ভব নয়। ফলে তাদের কলড্রপ থেকে শুরু করে এখন নেটওয়ার্ক না থাকার মতো অবস্থায় পৌঁছেছে। মুঠোফোন গ্রাহক সমিতির সভাপতির অভিযোগ সত্য নয় যে, তারা স্পেকট্রাম কিনতে পারছে না। বরং কাহিনীটা উল্টো। সরকার জিপিকে স্পেকট্রাম কেনার জন্য বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তারা এখন আর কোন বিনিয়োগ করছে না। বরং নানা অজুহাতে দিনের পর দিন সময়ক্ষেপণ করে তাদের গ্রাহকসেবা আরও খারাপ করেছে। কোন সতর্ক বাণী এদের জন্য কাজে লাগছে না। আলোচনা দেখে মনে হচ্ছে মহিউদ্দিন সাহেব জিপি আর রবির পক্ষে ওকালতি করতে সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন। তিনি যদি জিপি ও রবিকে আনতে পারেন তবে তাদের ১০০ মেগাহার্টজের বেশি করে স্পেকট্রাম দেয়ার ব্যবস্থা করা যাবে। রবির স্পেকট্রামের সমস্যা এতটা খারাপ না হলেও তাদের নেটওয়ার্কও মানসম্মত নয়। তারা গ্রাহকদের চাহিদাকে গুরুত্ব দিচ্ছে এমনটি মনে হচ্ছে না। বাংলা লিঙ্কের নেটওয়ার্ক দুর্বল। টেলিটকের নেটওয়ার্কও দুর্বল। বাংলা লিঙ্কের বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা হচ্ছে স্পেকট্রাম বাড়াও এবং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করো। টেলিটকের বিষয়টি হলো এই সরকারী সংস্থায় যথাযথ বিনিয়োগ ছিল না। ১৮ সাল অবধি এতে বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৩ হাজার কোটি টাকা অথচ জিপির বিনিয়োগ ছিল ৪০ হাজার কোটি টাকা। তবে সেইদিন এখন আর নেই। টেলিটকের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলছে। আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি যে, ২১ সাল নাগাদ টেলিটক বর্তমান দুরবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াবে।

প্রতিবেদনে সরকারকে দায়ী করা হয়েছে, কেন জিপি ও রবিকে লাইসেন্স বাতিলের কারণ দর্শাও নোটিস দেয়া হয়েছে। মোবাইল ফোন গ্রাহক সমিতির সভাপতির উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে এজন্য পরোক্ষভাবে সরকারকেই দায়ী করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের একজন নাগরিক এই কথাটি ভেবে দেখলেন না যে, ৯৭ সাল থেকে ২২ বছর যাবত জমে ওঠা ১২৮০০ কোটি টাকার জাতীয় পাওনা পরিশোধ না করে জিপি দেশের ১৬ কোটি মানুষের সম্পদ আটকে রেখেছে। আমাদের কি অধিকার আছে যে, এই জাতীয় পাওনা তাদের কাছে আটক রেখে আমরা নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকব। রবির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এমন যদি হতো যে, তারা সরকারের টাকা বিলম্বে দিলেও সেই টাকা গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে সেবার মান বাড়াতে বিনিয়োগ করেছে তবে তাতেও একটু স্বস্তি পেতাম। জিপির জন্য অপরাধটি বেশি গুরুতর। কারণ তারা বিপুল মুনাফা করে টাকা বিদেশে নিয়ে যায়। অন্যদিকে তাদের ভুলের জন্য দেশের সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা তাদের মূলধন হারাচ্ছে। ৪জির প্রসার তেমনটা হয়নি এটিও সত্য কথা। কিন্তু মহিউদ্দিন সাহেব যে জিপি বা রবির উমেদারী করেছেন তিনি তো জানেন যে, বিনিয়োগটা জিপি ও রবিরই করার কথা। টেলিটকের মোবাইল প্রজন্মের ইতিহাস :

সক্ষমতায় দুর্বলতা আছে বলে প্রতিষ্ঠানটি ৪জির প্রসার ঘটাতে পারেনি। তবে টেলিটকের নেটওয়ার্ক একেবারেই নেই তা তো নয়। আমাদের প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে এবং আমরা আমাদের সঙ্কট কাটিয়ে উঠব।

৫জি মানেই নতুন সভ্যতা, নতুন বিপ্লব : এবার আসি ৫জির কথায়। এই কথাটি আগেই বলেছি যে, ৫জি কেবল কথা বলার বা সাধারণ ডাটা ব্যবহারের নেটওয়ার্ক নয়, এটি একটি সভ্যতার মহাসড়ক। এই নতুন সভ্যতা যাকে ডিজিটাল সভ্যতা বলতে পারেন, চতুর্থ বা পঞ্চম শিল্প বিপ্লব বলতে পারেন, তার মূল ভিত ৫জি। ৫জির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আসছে নবীন প্রযুক্তি, যেমন : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, আইওটি, ব্লক চেইন বিগ ডাটা ইত্যাদি। বস্তুত ৫জির মধ্য দিয়ে দুনিয়া একটি অভাবনীয় রূপান্তরের মুখোমুখি হয়েছে। রূপান্তর ঘটবে উৎপাদন ব্যবস্থার। বদলে যাবে জীবনধারা। আমরা ৫জির প্রভাবকে যেভাবে আঁচ করছি তাতে পৃথিবীতে এর আগে এমন কোন যোগাযোগ প্রযুক্তি আসেনি যা সমগ্র মানবসভ্যতাকে এমনভাবে আমূল পাল্টে দিতে পেরেছে। যদিও প্রতিটি শিল্প বিপ্লবের স্তরকেই আমরা যুগান্তকারী বলি এবং মানবসভ্যতার বিকাশে এই রূপান্তরকে ছোট করে দেখার কোন অবকাশই নেই, তবুও প্রায় সকলেই একমত যে, ৫জি যা নিয়ে আসছে তা এর আগে দুনিয়ার কোন প্রযুক্তি সমন্বিতভাবে আনতে পারেনি। ব্রিটেনের ভোডাফোন ১৯ সালের মে মাসেই ৫জি চালু করেছে। ৫জি চালু করার তালিকায় ওপরে যাদের নাম তার মাঝে জাপানও আছে। আমাদের সময়সীমা ২১-২৩ সাল। ২০২০ সাল নাগাদ এই প্রযুক্তি বিশ্ববাসী ব্যাপকভাবে ব্যবহার করবে বলে আশা করা যায়। মোবাইলের এই প্রযুক্তি ক্ষমতার একটু ধারণা পাওয়া যেতে পারে এভাবে যে, আমরা এখন যে ৪জি প্রযুক্তি ব্যবহার করছি তার গতির হিসাব এমবিপিএস-এ। অন্যদিকে ৫জির গতি জিবিপিএস-এ, মানে হাজার গুণ বেশি। আমরা মহিউদ্দিন সাহেবদের মোবাইলে কেবল গল্প করার জন্য ৫জি আনছি না, আমরা গ্রামের কৃষকের কাছে আইওটি, টেলি স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল শিক্ষা, রোবোটিক্স এবং উৎপাদনের নতুন ধারা প্রবর্তনের জন্য ৫জি চালু করছি। ১৪৫৪ সালে আবিষ্কৃত মুদ্রণ প্রযুক্তি বাংলাদেশে এসেছিল ১৭৭৮ সালে। মহিউদ্দিন সাহেবরা এই দেশটাকে যদি ৩২৪ বছর পেছনে রাখতে চান তবে সেটি আমরা মানতে পারি না। এজন্য ১৮ সালে ৫জি পরীক্ষা করেছি। ২০ সালে পথনকশা তৈরি হবে এবং ২১-২৩ সালে ৫জি চালু হবে। মহিউদ্দিন সাহেব যে ৫জি ফোন সেটের অভাবের কথা বলেছেন সেটির জবাবটা হলো ৫জি আইটি, স্বাস্থ্যসেবা, রোবোটিক্স, ডিজিটাল শিক্ষা দিতে গিয়ে হয়ত হ্যান্ডসেট চাইবেই না। আর সে সময় যে সেট দুনিয়াতে প্রচলিত হবে তখন আমরা সেই সেট বাংলাদেশেই বানাব। আমরা এতদিন সফটওয়্যার বা হার্ডওয়্যার বা উৎপাদনের যন্ত্রপাতি আমদানি করেই আমাদের সমৃদ্ধির সন্ধান করে এসেছি। ৫জি চালু করার সময় আমাদের প্রত্যাশা আমাদের মেধা আমরা আমাদের কাজেই লাগাব এবং আমরা আমদানিকারক দেশ থেকে উৎপাদক ও রফতানিকারক দেশে পরিণত হব।

ঢাকা ॥ সর্বশেষ আপডেট ১১ অক্টোবর ১৯

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাসের চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কী-বোর্ড ও সফটওয়্যার-এর জনক