১৬ অক্টোবর ২০১৯

১৫ বছর বয়সেই বাজিমাত কোকোর

জুনিয়র ক্যারিয়ারে আরও আগেই আলো ছড়িয়েছেন কোকো গফ। ১৩ বছর বয়সে আইটিএফ জুনিয়র সারকুইটে অংশগ্রহণ করেই বাজিমাত করেন তিনি। মাত্র চতুর্থ ইভেন্টেই ফাইনালের টিকিট কেটেছিলেন ৫ ফিট ১০ ইঞ্চি উচ্চতার এই আমেরিকান খেলোয়াড়। এরপর জিতেছেন দুটি জুনিয়র গ্র্যান্ডস্লাম টুর্নামেন্টও। সেই কোকো গফ এবার নিজেকে মেলে ধরলেন সিনিয়র ক্যারিয়ারেও। প্রথমবারের মতো ডব্লিউটিএ টুর্নামেন্টের ফাইনাল জয়ের স্বাদ পেলেন কোকো গফ।

সেই সঙ্গে গড়লেন নতুন ইতিহাস। ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সী খেলোয়াড় হিসেবে ডব্লিউটিএ টুর্নামেন্ট জয়ের নতুন নজির সৃষ্টি করলেন তিনি। রবিবার লিঞ্জ ওপেনের শিরোপা জিতেই অসামান্য এই কীর্তি গড়েন আমেরিকান তারকা কোকো। লিঞ্জ ওপেনের ফাইনালে তরুণ প্রতিভাবান এই খেলোয়াড় পরাজিত করেন জেলেনা ওস্টাপেঙ্কোকে। শিরোপা জয়ের লড়াইয়ে তিনি ৬-৩, ১-৬ এবং ৬-২ সেটে পরাজিত করেন ফ্রেঞ্চ ওপেনের সাবেক চ্যাম্পিয়ন ওস্টাপেঙ্কোকে। তার আগে সর্বকনিষ্ঠ টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে কোন ডব্লিউটিএ শিরোপা জয়ের রেকর্ড গড়েছিলেন নিকোল ভাদিসোভা। ক্যারিয়ারের প্রথম টুর্নামেন্ট জয়ের সময় তার বয়স ছিল ১৫। ২০০৪ সালে টাসখেন্ট ওপেনের চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন তিনি। এরপর গত দেড় দশক ধরেই এই রেকর্ডটাকে নিজের করে রেখেছিলেন চেক প্রজাতন্ত্রের সাবেক এই প্রতিভাবান খেলোয়াড়। এবার তাকে ছাড়িয়ে এই রেকর্ডটাকে নিজের করে নিলেন কোকো গফ।

এই জয়ে দারুণ খুশি গফ। তবে জয়টা সহজ ছিল না মোটেও। জয় দিয়ে প্রথম সেট শুরু করলেও দ্বিতীয় সেটে ঘুরে দাঁড়ান ফ্রেঞ্চ ওপেনের সাবেক চ্যাম্পিয়ন। শুধু তাই নয়, দ্বিতীয় সেটে লাটভিয়ার ওস্টাপেঙ্কো ৬-১ গেমে রীতিমতো উড়িয়েই দেন গফকে। আমেরিকান তারকার এমন হতাশার সময়েই কোর্টে নেমে এসে অনুপ্রেরণা জোগান তার বাবা এবং কোচ কোরি গফ। এ সময় তার বাবা কোকো গফকে বলেন, ‘হতাশ না হয়ে বরং স্বস্তিতে থাকো। এটা স্প্রিন্ট নয় যে দৌড়ে গিয়ে তোমাকে ফিনিশিং লাইন স্পর্শ করতে হবে। বরং তুমি হেঁটে হেঁটে চলো। তোমার শটের ওপর আস্থা রাখো। শান্ত থেকে তোমার মনোযোগ বাড়াও। শুধু নিজের খেলাটা খেলে যাও। নীতিবাচক কোন কিছুই ভেবো না বরং ইতিবাচক মানসিকতা নিয়েই এগিয়ে চলো।’ এরপরই যেন তৃতীয় সেটে গর্জে উঠেন কোকো গফ। শেষ সেটে তিনি ৬-২ গেমে উড়িয়ে দেন জেলেনা ওস্টাপেঙ্কোকে। বিশ্ব টেনিস র‌্যাঙ্কিংয়ের সাবেক শীর্ষ পাঁচ নম্বর খেলোয়াড় ওস্টাপেঙ্কোকে হারিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম সিনিয়র পর্যায়ের শিরোপা জয়ের স্বাদ পেলেন কোকো গফ। এই জয়ের উচ্ছ্বাসটা তাই স্বাভাবিকভাবেই বেশি। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে গফ বলেন, ‘বিস্ময়কর একটা সপ্তাহ কাটালাম। আশা করি এখানে আবারও ফিরে আসব। এখানকার স্মৃতি আমার বাকি জীবন মনে থাকবে।’

চলতি মৌসুমে বিশ্ব টেনিসে দাপট চলছে তরুণ খেলোয়াড়দের। জাপানের নাওমি ওসাকা, অস্ট্রেলিয়ার এ্যাশলে বার্টি কিংবা কানাডার বিয়াঙ্কা আন্দ্রেস্কর দিকে তাকালেই তার প্রমাণ মেলে। এ মৌসুমে প্রত্যেকেই কোন না কোন গ্র্যান্ডস্লাম টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন তারা। গত মৌসুমে ইউএস ওপেন জিতে লাইম লাইটে আসা ওসাকা নতুন বছরের প্রথম গ্র্যান্ডস্লাম টুর্নামেন্ট অস্ট্রেলিয়ান ওপেনেও চ্যাম্পিয়ন হন। এরপর ফ্রেঞ্চ ওপেনের শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছেন অস্ট্রেলিয়ান তরুণী এ্যাশলে বার্টি। সর্বশেষ ইউএস ওপেনেও বাজিমাত করেছেন কানাডার আরেক তরুণী। মাত্র ১৯ বছরেই ইউএস ওপেন জয়ের রেকর্ড গড়েন বিয়াঙ্কা আন্দ্রেস্কু। ওসাকা-আন্দ্রেস্কুর মতো মেজর কোন টুর্নামেন্টের শিরোপা না জিতলেও তরুণ খেলোয়াড় হিসেবে ২০১৯ সালে বিশ্ব টেনিসের পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে এসেছেন কোকো গফও। আমেরিকান তরুণী প্রথম আলোচনায় উঠে এসেছিলেন উইম্বলডনের মাধ্যমে। এই বয়সেই উইম্বলডনে খেলার যে রেকর্ড গড়েন তিনি। সেই সঙ্গে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে মূল পর্বে খেলার কীর্তি গড়েন তিনি।

শুরুটাও করেন চমকপ্রদ। স্বদেশী কিংবদন্তি ভেনাস উইলিয়ামসকে হারিয়ে। এরপর চতুর্থ রাউন্ডে জায়গা করে হইচই ফেলে দেন গোটা টেনিস দুনিয়ায়। কিন্তু চতুর্থ পর্বে সিমোনা হ্যালেপের কাছে হেরে বিদায় নেয়ার আগেই সমর্থকদের মন জয় করে নেন তিনি। উইম্বলডনের পরই ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ ১৪১ নম্বর র‌্যাঙ্কিংয়ে উন্নীত হন কোকো গফ। পারফর্মেন্সের সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে লিঞ্জ ওপেনেও। অসাধারণ পারফর্ম করে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেন ফ্লোরিডায় বসবাসকারী গফ। দুর্দান্ত খেলে সেমিফাইনালেরও টিকিট নিশ্চিত করেন তিনি। এর আগেই অবশ্য রেকর্ড বুকে জায়গা করে নেন কোকো গফ। ১৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সী খেলোয়াড় হিসেবে ডব্লিউটিএ টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেন তিনি। তার আগে এই কীর্তি গড়েছিলেন বুলগেরিয়ার সেসিল কারাতানচেভা। আমেরিকান তারকা শুধু এই রেকর্ড গড়েই থেমে যাননি। এরপর লিঞ্জ ওপেনের ফাইনালে উঠারও নজির গড়েন তিনি। তাও আবার বিশ্ব টেনিস র‌্যাঙ্কিংয়ের সাবেক শীর্ষ দশে থাকা খেলোয়াড় পেটকোভিচকে হারিয়ে। জার্মানির এই খেলোয়াড় লিঞ্জ ওপেনের সেমিফাইনাল খেলেছেন তিনবার। অন্যদিকে প্রথমবার সেমিফাইনালে উঠেই পেটকোভিচের বিপক্ষে জিতে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে নিলেন সেরেনা-ভেনাস-স্লোয়ান্সের উত্তরসুরি।

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাঘা বাঘা খেলোয়াড়দের হারিয়ে লিঞ্জ ওপেনের ফাইনালও জিতে নেন গফ। তাও আবার গ্র্যান্ডস্লামজয়ী জেলেনা ওস্টাপেঙ্কোকে হারিয়ে। লিঞ্জ ওপেনের শিরোপা জয়ের ফলে র‌্যাঙ্কিংয়েও ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে গফের। প্রথমবারের মতো এক’শর মধ্যে নাম উঠে যায় তার। নতুন করে প্রকাশিত র‌্যাঙ্কিয়ে তার অবস্থান এখন ৭১ নম্বরে। এর ফলে নতুন মৌসুমের প্রথম গ্র্যান্ডস্লাম টুর্নামেন্ট অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে সরাসরি খেলতে পারবেন তরুণ প্রতিভাবান এই খেলোয়াড়। শুধু তাই নয়, এখন থেকে সেরেনা উইলিয়ামস-মারিয়া শারাপোভা কিংবা সময়ের সব সেরা সেরা তারকাদের বিপক্ষে নিয়মিতই খেলতে দেখা যাবে কোকো গফকে।