১৯ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রানীর সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাস

  • আহমেদ রবিন

এখনও আমি দাবা খেলাকে শুরুর দিনগুলোর মতো সমান উপভোগ করি। এজন্যই সাফল্য আসছে। খেলা শুরুর সময় সাধারণ একজন গৃহিণী ছিলাম। তবে দাবা চর্চা ছিল আগে থেকেই। ভাল লাগতো বলেই খেলতাম। এখনও ভাল লাগে বলেই খেলে যাচ্ছি। বর্তমানে যা কিছু পাচ্ছি এটা অতিরিক্ত হিসেবেই পাচ্ছি বলে মনে করি। সবচেয়ে বড় কথা মনের খোরাক, আনন্দ থেকেই অংশগ্রহণ করে যাচ্ছি প্রতিযোগিতায়। যতদিন শরীর মন টানবে খেলে যাব। তবে এ কথা সত্যি নতুন কেউ উঠে আসছে না বলেই এখনও আগ্রহ বা উৎসাহ পাচ্ছি। জয়ও পাচ্ছি প্রতিনিয়ত। যেমন আবারও চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেলাম গত মাসে জাতীয় পর্যায়ের আসরে।

শখ করেই বাবা সৈয়দ মমতাজ আলী মেয়ের নাম রেখেছিলেন রানী। ব্রিটিশ শাসন আমলের যে সময়টায় মেয়ের জন্ম তখন রাজ্য চালাতেন রানীরাই। মহারানী ভিক্টোরিয়ার ভক্ত ছিলেন বলেই হয়ত মেয়ের এমন নাম রাখলেন তিনি। ছোট্ট রানীকে রাজা-রানীর গল্প শোনাতে গিয়ে রাজ্য এনে দেয়ার প্রতিজ্ঞাও কি করেছিলেন কখনও? হবে হয়ত। তবে মমতাজ আলী-কামরুন্নেসা দম্পতিকে তাদের তৃতীয় সন্তানের জন্য রাজ্য এনে দিতে হয়নি। মেয়ে নিজেই তৈরি করেছেন নিজের রাজ্য। বিয়ের পর সৈয়দা জসিমুন্নেসা খাতুন নামটা সক্ষিপ্ত করে বাবার দেওয়া রানী নামটার সঙ্গে স্বামীর নাম যোগ করে পরিচিত হন রানী হামিদ নামে। পরে যে নামটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশ মহিলা দাবার প্রতিশব্দ।

বনানীর ডিওএইচএসের নিজ বায়াস যখন সাক্ষাতকার নিতে বসলাম, আড্ডা আর গল্পে গল্পে বেরিয়ে এলো তার দাবাডু জীবনের নানা জানা অজানা কথা। কিন্তু ইদানীং এই সাক্ষাতকার দিতেই যে তার ভাল লাগে না। বাসায় যাওয়ার আগে মুঠোফোনে যখন সময় চাওয়া হলো, অপারগতার কথা বলছিলেন বারবার। এই আলাপচারিতায় প্রথমেই তাই জানতে চাওয়া, কেন সংবাদ মাধ্যমকে এড়িয়ে চলতে চাওয়া? রানী হামিদ কোন অজুহাত দাঁড় করাতে চান না, বরং সরাসরিই বলে দেন নিজের মনের কথা, ‘আসলে এখন আর এসব ভাল লাগে না। কেমন যেন একঘেয়েমি মনে হয়।’ একঘেয়েমি মনে হওয়ারই কথা। এই বয়সে এখন একটু নিরিবিলি সময় কাটাবেন এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু কোথায় কি? রানী হামিদের আবেদন যে ফুরোয় না! ফুরোবে কি করে? জাতীয় দাবায় ২০ শিরোপা জেতা রানী হামিদ এখনও যে প্রতিযোগিতায় নাম লিখান, ঘরে ফিরেন নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। কিভাবে সম্ভব বছরের পর বছর এভাবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা? এই একটি প্রশ্নের উত্তরই তো খুঁজে বেড়ায় সবাই। রানী হামিদ উত্তর দেন এক কথায়, ‘এখনও আমি দাবা খেলাকে শুরুর দিনগুলোর মতো সমান উপভোগ করি। এজন্যই সাফল্য আসে।’

তার বসার ঘরের দুই পাশটা জুড়ে সাজিয়ে রাখা ক্যারিয়ারের নানা অর্জন আর স্বীকৃতির সব স্মারক দিয়ে। এত এত ট্রফি যে প্রতিটায় ভাল করে চোখ বুলাতে গেলে সময় লেগে যাবে কয়েক ঘণ্টা। ভেতরের কক্ষ থেকে একটু আগে যখন বসার ঘরটায় এসে ঢুকলেন রানী হামিদ সেই ট্রফিগুলো যেন ঝিলিক দিয়ে ওঠে। সমুচ্চারে ঘোষণা দিয়ে যায় রানীর শ্রেষ্ঠত্ব। অথচ রানী হামিদ নিজেও কখনও ভাবেননি এভাবে দাবায় নিজের ভুবন তৈরি করবেন, এমন রাজত্ব কায়েম করবেন, ‘কোন কিছু অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে খেলা শুরু করিনি। যখন খেলা শুরু করি তখন সাধারণ একজন গৃহিণী ছিলাম। ভালো লাগতো বলেই খেলতান। এখনও ভাল লাগে বলেই খেলে যাচ্ছি। এখন যা কিছু পাচ্ছি এটা অতিরিক্ত হিসেবেই আসছে আমার জন্য। কিন্তু আমি আমার মনের আনন্দেই খেলে থাকি সব সময়।’ শুধু মনের আনন্দে খেলেছেন বলেই কি সাফল্য এভারে ধরা দিচ্ছে হাতের মুঠোয়? এটাকে বড় কারণ বলে মানেন। তবে এক জনের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই রানী হামিদের, ‘এটা আমার সৌভাগ্য ছিল যে ক্যান্টনমেন্টের কোয়ার্টারে থাকার সময় (১৯৭৪-৭৫) তখনকার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন ড. আকমল হোসেন আমার প্রতিবেশী ছিলেন। তার সহযোগিতায় আমি দ্রুত উন্নতি করতে পেরেছিলাম দাবাতে।

ক্যারিয়ারে তার অর্জনের শেষ নেই। শুধু অর্জনের গল্পগুলো লিখতে গেলে পুরো একটি বই হয়ে যাবে সেটি। টানা ছয় বার জাতীয় দাবায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিরল রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন তিনি। ব্রিটিশ দাবায় তিন তিনটি শিরোপা জিতে (১৯৮৩, ১৯৮৫, ১৯৮৯) দেশকে তুলে ধরেছেন বিশ^ দরবারে। সাধারণ একজন গৃহবধূ থেকে হয়েছেন দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রের একটি অঙ্গনের রানী। একটি অঙ্গন কেন? আসলে পুরো ক্রীড়াঙ্গনেরই তো রানী তিনি। তারপরও কথা বলতে বলতে কিছু আক্ষেপ, বুকের কোনে চাপা একটা কষ্ট প্রতীয়মান হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের দাবা যে এগুচ্ছে না, ‘আমরা অনেক পিছিয়ে গেছি এবং ক্রমশও পেছাচ্ছি। ভারতের সঙ্গে একটা সময় সমানে সমানে লড়েছি আমরা। আর এখন তো কোন তুলানাই হয় না ওদের সঙ্গে।’ বলতে বলতে রানী হামিদের সদা হাস্যজ্জ্বল চেহারাও বিষণœতায় ছেয়ে যায়। খোলা চোখে যখন তাকান দাবার সামগ্রিক চিত্রের দিকে, তখন দেখেন মহিলারা আজও অবহেলিত সেখানে, ‘আমাদের সেই শুরুর সময়ের চিত্র এখনও বদলায়নি। সমানভাবে আমরা মূল্যায়ন পাচ্ছি না। এক কথায় বললে মহিলা দাবা আজও অবহেলিত। অবহেলার কারণে বাংলাদেশে দাবা এগুচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি, ‘বাংলাদেশে দাবাডু উঠে আসছে না এমনটা কিন্তু বলা যাবে না। দুই-একজন করে উঠে আসছে ঠিকই। কিন্তু তাদের ধরে রাখা বা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো কোন প্রচেষ্টা আমাদের নেই। টাকা পয়সা বা সুযোগ সুবিধা সবচেয়ে বড় ব্যাপার। আমরা সেই জিনিসটা দিতে পারছি না আমাদের মেয়েদের। দুই একটা ক্লাব হয়ত এগিয়ে আসছে। কিন্তু এতে হাতে গোনা কয়েকজনই আমরা সুবিধা পাচ্ছি। সামগ্রিক যে ব্যাপার থাকে সেই জিনিসটি কিন্তু নেই। তারপরও এখন চেষ্টা হচ্ছে, এমনটাই আমি শুনেছি। হয়ত পরবর্তীতে চিত্রটা বদলাবে। এখন যেহেতু একটু তোড়জোড় শুরু হয়েছে তাতে আশা করা যায় আগামী পাঁচ বছর পরে এর একটা ফল পাওয়া যেতে পারে।’

রানী হামিদের মতে দাবা কিংবা যেকোন খেলাতেই আর্থিক নিশ্চয়তা না থাকলে খেলোয়াড় উঠে আসবে না। কেউ যদি দাবাকে পেশা হিসেবে নিতে চায় তবে সেটা সম্ভব না। আমাদের খেলাধুলায় টাকা পয়সা এত কম যে এ কারণেই মূলত উন্নতি হচ্ছে না। কেউ খেলাধুলায় নিজেকে উজাড় করে দিবে ঠিক আছে। কিন্তু দিবে কিসের আশায়? এই যে আমি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছি, যেটা একটা বিরল সম্মান। কিন্তু সেই সম্মাননা দিয়ে ব্যবহারিক জীবনে তো লাভবান হতে পারছি না। এই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিগুলোর পাশাপশি যদি আমরা বড় বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলার জন্য সুযোগ-সুবিধা পেতাম। বিদেশে খেলতে যাওয়ার নিশ্চয়তা পেতাম তাহলে সেটা আমাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য বড় ধরনের ভূমিক হতো। সেগুলোর কিছুই তো আমরা পাচ্ছি না।’

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে চির তরুণী তিনি। এই বয়সেও লড়েন এখনকার প্রজন্মের সঙ্গে। যখন এই সময়ের খেলোয়াড়দের সঙ্গে লড়াইয়ে নামেন, কেমন অনুভব হয়? উত্তরে দিতে গিয়ে হাসলেন দাবার রানী। খুবই ভালো লাগে ওদের সঙ্গে খেলতে। নতুনরা অনেক বেশি জানে এবং বুঝে আমাদের থেকে। আমাদের সময় আমরা তো এত সুযোগ-সুবিধা পাইনি। এখন তারা ইন্টারনেটে সব কিছু দেখতে পাচ্ছে। সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েই তারা খেলতে আসে। আমাদের সময় তো আমরা এগুলোর কিছুই জানতাম না। দাবা খেলার জন্য যে বই পড়তে হয়। এটাও আমরা জানতাম না। হয়ত তখন তেমন কোন বইও ছিল না।’

দাবাডু রানী হামিদের ইতিহাস থেকে তাঁর ব্যক্তিজীবনের গল্পে প্রবেশ করলে দেখা যায় সেখানেও তাঁর সফলতায় ভরা। কিন্তু রানী হামিদ যে শুধু একজন সফল দাবাডুই নন, একজন সফল স্ত্রী এবং কি সফল মাও। সেখানে তাঁর পুরো পরিবারকে শুধু ক্রীড়া অন্তপ্রাণ বললেও ভুল বলা হবে। আসলে আগাগোড়াই তারা এক ক্রীড়া পরিবার। ১৯৫৯ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন যার সঙ্গে, তখনকার নৌবাহীর কর্তকর্তা (প্রয়াত) মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ শুধু একজন ক্রীড়া পাগল মানুষই ছিলেন না, ছিলেন একজন সফল ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়া সংগঠকও। তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর হয়ে সাঁতারে রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। সংগঠক হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সভাপতি। আর ছেলেদের মধ্যে সবার বড় কায়সার হামিদ তো বাংলাদেশ ফুটবলের উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলোর একটি। ছোট ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ক্যারিয়ার গড়লেও তিনিও খেলাধুলা করতেন নিয়মিত। সাংবাদিকতায় ¯œাতকোত্তর করা মেয়ে জেবিন হামিদ খেলতেন দাবা। রানী হামিদ ছেলে মেয়ের গল্প বললেন এভাবে, ‘কায়সার যখন খেলতো তখন একটা প্লেয়ার সব কিছুই খেলতো। সে যে শুধু ফুটবল খেলতো তা নয়। ক্রিকেট, হ্যান্ডবল থেকে শুরু করে আরও অনেক খেলাই খেলতো। আমার ছেলে-মেয়েদের আমি দাবাও খেলিয়েছি। স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হলে সেখানেও ওরা চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়ন হতো। আমার মেয়ে জেবীন হামিদ মিতা সাংবাদিকতায় পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে কিছু দিন সাংবাদিকতাও করেছে। ছাত্রী জীবনে সে হলিক্রস চ্যাম্পিয়ন ছিল দাবাতে।

একদিকে ক্রীড়াঙ্গনে নিজে একজন বড় তারকা। সেই সঙ্গে ছেলেও যখন বড় তারকা হয়ে উঠলেন কেমন উপভোগ করতেন সেই সময়টা? উত্তর দিতে গিয়ে স্মৃতি কাতর হয়ে পড়েন দাবার রানী, ‘খুবই উপভোগ করতাম ওই সময়। ওর বাবা আর আমি তো খেলা দেখতে নিয়মিত মাঠে যেতাম। মনে হয় আমিই একমাত্র মহিলা দর্শক হিসেবে ফুটবলের গ্যালারিতে থাকতাম তখনকার সময়ে। কায়সার যতদিন খেলেছে আমরা দুজন কোন খেলাই মিস করতাম না। মাঠের খেলার ভিডিও রেকর্ড এনে সেই খেলা আবার ঘরে বসে দেখতাম। ওর বাবা ভুল কোথায় কোথায় হয়েছে সেগুলো বলে দিত। তিনি কোনদিন পড়া নিয়ে ওদের সঙ্গে কথা বলেন নি। কোনদিন বলেনি কাল কি পরীক্ষা বা পড়াশোনা ঠিক মতো করছিস কিনা। বলটা এভাবে মারলে ভাল হতো বা ওখান দিয়ে মারলে গোলটা হতো এগুলোই কেবল বলতেন।’

নিজে একজন বড় খেলোয়াড় কিংবা বড় খেলোয়াড়-সংগঠকের মা কিংবা একজন খেলোয়াড় এবং সংগঠকের স্ত্রী হিসেবে যখন রানী হামিদ দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সামগ্রিক চিত্রের দিকে তখনও তার কণ্ঠে হতাশার প্রতিধ্বনি, ‘কায়সাররা যখন খেলতো তখন তো ফুটবলের মান অনেক উপরে উঠেছিল। প্রেসিডেন্ট কাপে একবার ইরানকে বোধহয় হারিয়ে দিল বাংলাদেশ। সেই ফুটবলের মান হঠাৎ করেই নিচে নেমে গেল। টাকা পয়সা চলে গেল, ফুটবলের মান নিচে নেমে গেল। এখান থেকে এই জিনিসটা ভালই বোঝা যায় যে টাকা পয়সা যদি আসে কোন খেলায়, তাহলে সেই খেলার মান উপরে উঠতে বাধ্য। তার উদাহরণই হলো ক্রিকেট। এ অবস্থায় সরকারের উচিত সব ফেডারেশনকে নির্দিষ্ট আয়ের ব্যবস্থা করে দেয়া।

আর কতদিন খেলে যাবেন? এমন একটা প্রশ্ন সব সময়ই জানার থাকে তার কাছে। রানী হামিদ বলেন যত দিন উপভোগ করবেন খেলে যেতে চান তিনি, ‘আর সবকিছুতেই ক্লান্তি আসে। কিন্তু দাবা খেলাতে আমার কোন ক্লান্তি নেই। যতদিন উপভোগ করব খেলে যেতে চাই।’ বাংলাদেশের দাবাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া রানী হামিদ দাবা খেলা উপভোগ করে যান আজীবন এটাই চাইবে সবাই।