২০ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আর্থিক শৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা

  • মতিলাল দেব রায়

কোন দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা নির্ভর করে সেই দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা কতটুকু মজবুত ও স্থিতিশীল। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে সমাজের সর্বস্তরে নানারকম অস্থিরতা যেন বেড়েই চলেছে, যা কমার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সামাজিক অস্থিরতা নিরসনের জন্য দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দও নানারকম পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছেন। তারপরও এই অস্থিরতার হার কমছে না। মাদক, বিদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসন, অপসংস্কৃতি, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানুষ হত্যা, সন্ত্রাসী কার্যক্রম দিন দিন বেড়েই চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অক্লান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে, কিন্তু তেমন উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আমার ক্ষুদ্র চিন্তায় মনে হয় যে, সমাজে যে অরাজকতা, খুন-খারাবি, নারী ধর্ষণ, হত্যা, গুম ইত্যাদি হচ্ছে তার অন্যতম কারণ এক শ্রেণীর মানুষ অবৈধ পথে চাঁদাবাজি, ঘুষ, দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছে। যার দ্বারা দেশের মানুষ জ্যামিতিক হারে প্রভাবিত হচ্ছে, যা সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে। দুর্নীতিগ্রস্তদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দেশের প্রায় সর্বস্তরের মানুষ অবৈধ অর্থ কামানোর প্রতিযোগিতা দেখে নিজেরাও এই উপায়ে অর্থ কামানোর ধান্ধায় উৎসাহী হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে সমাজের অধিকাংশ মানুষ এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে এই প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে বের করতে পারেন না। তাই হাল্কা বা সহজ উপায়ে, বিনিয়োগ ছাড়া, পরিশ্রম ছাড়া টাকা কামানোর পথ যতদিন খোলা থাকবে, ততদিন এই অস্থিরতা বন্ধ হবে না। যার ফলে সমাজে খুন-খারাবি, নারী ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন চলতেই থাকবে।

একটি ছোট উদাহরণ এখানে তুলে ধরতে চাই। তা হলো, একটি গ্রামের দুটি মহিলা সমিতিকে আপনি কেস স্টাডি হিসেবে বিবেচনা করেন তা হলে দেখতে পাবেন, যে সমিতির টাকা লেনদেনের হিসাব, লোন দেয়ার হিসাব, সদস্য চাঁদা সংগ্রহের হিসাব, ব্যাংকে জমা দেয়ার হিসাব এবং ক্যাশ খাতা সঠিক লিপিবদ্ধ থাকে, সেই সমিতিতে টাকা-পয়সা নিয়ে কোন সমস্যা হয় না। সেই সমিতির সকল কার্যক্রম নিয়মিত চলে। অন্যদিকে যে সমিতির হিসাব ঠিক নেই, টাকা লেনদেনের হিসাব সঠিক লেখা থাকে না, সদস্য ফি আদায়ের কোন রসিদ বই নেই, অর্থাৎ যে সমিতির টাকা-পয়সার ওপর কোন নিয়ন্ত্রণ বা শৃঙ্খলা নেই, সেই সমিতি বেশিদিন চলে না। যে সংস্থায় আর্থিক নিয়ন্ত্রণ আছে সেই সংস্থার সকল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত থাকে। কোন কর্মচারী বিদ্রোহ হয় না। কোন অসন্তুষ্টি খুঁজে পাবেন না। যে সংস্থায় আর্থিক নিয়ন্ত্রণ নেই সেই সংস্থার কোন কিছুর ওপর ম্যানেজমেন্টের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কোন সংস্থায় যদি অবৈধ লেনদেন বেশি হয়, সেই সংস্থায় দেখবেন চেন অব কমান্ড একেবারেই ভেঙ্গে পড়ে। অর্থাৎ সেই সংস্থায় কাজকর্ম সঠিকভাবে হয় না। কারণ উর্ধতন কর্মকর্তার আদেশ তার অধস্তন কর্মকর্তা শোনেন না। সুতরাং দেশের সার্বিক অবস্থা নির্ভর করে দেশের আর্থিক ম্যানেজমেন্ট কতটুকু সঠিকভাবে পরিচালিত হয় তার ওপর। আর্থিক বিশৃঙ্খলা দেশের সামাজিক বিশৃঙ্খলা বা অস্থিরতার জন্য দায়ী। সমাজের নানারকম অশান্তি, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, বিচারে দীর্ঘসূত্রতা ইত্যাদি অবৈধ টাকার প্রভাবে বাড়ছে। একই কারণে অপরাধীরাও পার পেয়ে যাচ্ছে। সমাজ কালো টাকা বানানোর পক্ষে ধাবিত হচ্ছে।

সাড়া দেশে আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে দেশের ব্যাংক, বীমা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, সকল মন্ত্রণালয়, মাঠ প্রশাসন, পরিবহন সেক্টর, সিটি কর্পোরেশন, হিসাব সংরক্ষণ বিভাগসহ সব সরকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন যদি সঠিক এবং সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা আনা যায় এবং কাউকে হাল্কা বা বিনাশ্রমে টাকা কামানোর সুযোগ না দেয়া হয় তা হলে সমাজের মধ্যে অবৈধ টাকা বানানোর জন্য প্রতিযোগিতা কমে আসবে। পর্যায়ক্রমে ধীরে ধীরে সমাজে স্থিতিশীলতাও ফিরে আসবে।

সব প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা আনতে হলে প্রতিটি সংস্থার হিসাব-নিকাশ আর্থিক বছরের সমাপনান্তে ক্লোজ করে যথাসময়ে ইন্টারনাল ও এক্সটারনাল অডিট সম্পন্ন করতে হবে। সব প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে না। কোন অবস্থায়ই প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো যাবে না। সব প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে হিসাবের খাতা ক্লোজ করে দিতে হবে এবং যথাসময়ে ইন্টারনাল ও এক্সটারনাল অডিট সম্পন্ন করে কর্তৃপক্ষকে জমা দিতে হবে। কোন অডিট অসমাপ্ত রাখা যাবে না।

চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, আদম ব্যবসা, ক্যাসিনো ব্যবসা, পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি, লঞ্চঘাটে চাঁদাবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারী রিলিফ সামগ্রী আত্মসাত, প্রকল্পে পুকুরচুরি, নৌপথে, সড়কপথে, আকাশপথে চোরাচালান, মানুষ পাচার, মাদক চোরাচালান, ব্যাংক থেকে ঋণ খেলাপী, রাজনৈতিক চাঁদাবাজি, বিদেশে টাকা পাচার, অবৈধ উপায়ে বিদেশ থেকে টাকা পাঠানো, মানব পাচার, হুন্ডি ব্যবসা ইত্যাদির মাধ্যমে প্রচুর অবৈধ টাকা একশ্রেণীর মানুষের কাছে আসে, যারা ধরাকে সরা জ্ঞান করে। এই টাকার বলে দেশে নানারকম অসামাজিক ঘটনার জন্ম দেয়, যা জ্যামিতিক হারে সংক্রমিত হয় যুব সমাজের মধ্যে। সেখান থেকেই কলুষিত হয় দেশ এবং সমাজ।

বাজারে অবৈধ বা কালো টাকা কিছু মানুষের কাছে থাকলে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়, অসম প্রতিযোগিতা বেড়ে যায়, মানুষে মানুষে বৈষম্য বেড়ে যায়। কালো টাকার দাপটে সুস্থ অর্থনীতির বিকাশ অসম্ভব হয়ে ওঠে। সমাজে ক্রাইম বেড়ে যায়। অফিস-আদালতে দুর্নীতি বেড়ে যায়। টাকায় সব কেনা যায় সমাজে এরকম ধারণা জন্মায়।

সমাজের অযোগ্য মানুষের কাছে যদি অবৈধ টাকা থাকে তখন তার চিন্তাধারায় সমাজের গতি-প্রকৃতিও বদলে যায়। যুব সম্প্রদায় বিপথে পরিচালিত হয়। বয়স্করা নীরব ভূমিকা পালন করেন। কারণ তারা জানেন যে, যুব সমাজকে এই বিপথ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাই তারা এ ব্যাপারে সক্রিয় হতে চান না। তখন সামাজিক দুষ্কৃতকারীদের ইচ্ছায় চলে সমাজ এবং তাদের টাকার প্রভাবে সমাজ বিভিন্নভাবে কলুষিত হয়। কালো বা অবৈধ টাকা বানানোর উৎস যতদিন বন্ধ না হবে ততদিন সামাজিক অস্তিরতা, খুন, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন বন্ধ হবে না বলে আমাদের বিশ্বাস। সমাজকে প্রভাবিত করে কালো টাকা। সহজ উপায়ে টাকা তৈরির সঙ্গে সামাজিক দুর্বৃত্তায়নের একটি গভীর যোগসূত্র আছে। তাই এ বিষয়টিকে চিন্তায় রেখে যদি সকল অবৈধ টাকার উৎস সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা যায় তাহলে সামাজিক স্থিতিশীলতা আসবে। মনে রাখতে হবে, সামাজিক স্থিতিশীলতা দেশের উন্নয়নের পূর্ব শর্ত।

লেখক : আমেরিকা প্রবাসী

নির্বাচিত সংবাদ