১৪ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দিগি¦জয়ী সাহিত্যিক

  • হিমেল আহমেদ

গুন্টার গ্রাস। পুরো নাম গুন্টার ভিলহেলম গ্রাস। যার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে স্টাইলিশ গোঁফ আর মুখে মোটা তামাকের পাইপ গুজিয়ে রাখা সাদাসিধে একজন মানুষের প্রতিচ্ছবি। নোবেলবিজয়ী এই সাহিত্যিক জন্মগ্রহণ করেন ১৬ অক্টোবর ১৯২৭ সালে পোলেন্ডে। ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল জার্মানির লুবেকে ৮৭ বছর বয়সে ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। আর সেই সঙ্গে অবসান ঘটে জার্মান সাহিত্য তথা সারা বিশ্বসাহিত্যের একটি অধ্যায়ের। কিংবদন্তি এই সাহিত্যিক জন্মেছিলেন বিশ্ব সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে আর প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে সাহিত্যকে ব্যবহার করা শেখাতে। ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত তার প্রথম উপন্যাস ‘টিন ড্রাম’-এর জন্য তিনি বিপুল খ্যাতি অর্জন করেন। বহুল আলোচত ট্রিলজির স্রষ্টা তিনি। ক্যাট অ্যান্ড মাউস ও ডগ ইয়ারস এই ট্রিলজিতে অন্তর্ভুক্ত। টিন ড্রাম বইটি জার্মানির ডানজিগ শহরের পটভূমিতে লেখা, যে শহরটিতে তিনি জন্মেছেন ও বেড়ে উঠেছেন। তিনটি বইয়েই তিনি তুলে আনেন তার নিজের শহর ডানজিশে হিটলারের নাৎসী বাহিনীর উত্থান ও নির্মমতার কথা।

দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে জন্ম এই সাহিত্যিকের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে তার লেখা উপন্যাসসমূহ জনপ্রিয়তা পায়। তার এই তিনটি উপন্যাস যেন বিশ্ব জয় করে ফেলল! বিশেষ করে টিন ড্রাম উপন্যাসটি, যেখানে উঠে এসেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতার বাস্তব চিত্র। গুন্টার গ্রাস শুধু একজন মেধাবী ও বিশ্বমানের লেখক ছিলেন তা নয় তিনি একজন সমাজ বিশ্লেষক। তিনি একাধারে ছিলেন কবি, কথাশিল্পী, নাট্যকার, চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর। ছিলেন কঠোর প্রতিবাদী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন সর্বদা। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এর তীব্র সমালোচক ও বিরোধী ছিলেন এই সাহিত্যিক। তিনি মনে করতেন, বুশ এই যুদ্ধের নামে ধর্মকে ব্যবহার করছেন। এবং নিরীহ হত্যায় মেতে উঠেছেন। সর্বদা সত্যকে আঁকড়ে চলতে পছন্দ করতেন তিনি। একদা এক ইন্টাভিউতে বলেছিলেন; যতই বছর যাচ্ছে আমার উপলব্ধি হচ্ছে, দিনের পর দিন আমরাই স্বয়ং বিনাশের সম্ভাবনাকে প্রকটরূপ ধারণ করাচ্ছি, এমন অবস্থা কিন্তু পূর্বে বিরাজমান ছিল না : এটা বলা হচ্ছে যে প্রকৃতি দুর্ভিক্ষ, খরা সৃষ্টিকারী অথচ দায় রয়েছে অন্যত্র, দায়ী মানুষ, এই আমরাই। তিনি বলেন, এখন আর প্রকৃতি নয় প্রথমবারের মতো আমরাই দায়ী, মানুষের অপার সম্ভাবনা এবং ক্ষমতাও রয়েছে এই আমাদের নিজেদের স্বয়ং ধ্বংস বা বিনাশকরণে এবং আমরা এখনো কিছুই করছি না এই বিপদ এড়াতে। এ সবকিছু একসঙ্গে আমাকে উপলব্ধি করিয়েছে যে আমাদের সব কিছু সসীম অথচ আমাদের হাতে অফুরন্ত সময় নেই।

মানুষ যে স্বয়ং নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে তা খুব সূক্ষ্মভাবে উপলব্ধি করার চেষ্টা করতেন এই সাহিত্যিক। তাই তিনি আওয়াজ তুলেছিলেন বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। আফগানিস্তান যুদ্ধ ও ভিয়েতমান যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। ইহুদী রাষ্ট্র ইসরায়েলেরও কড়া সমালোচক ছিলেন তিনি। এজন্য ইসরাইল ও অপছন্দ করত গ্রাস কে। হিটলারের ইহুদী দমন মিশনে জড়িত থাকার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। এক কবিতায় তিনি বলেছেন, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হুমকি। ইসরায়েলের সমালোচনা করে ২০১২ সালে তিনি ‘হোয়াট মাস্ট বি সেইড’ নামের একটি গদ্য-কবিতা লেখেন। যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। যেখানে তিনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে লেখেন। ইসরায়েল তখন তার বিরুদ্ধে অ্যান্টি- সেমিটিজমের (ইহুদীবাদ-বিদ্বেষী) অভিযোগ এনে তাকে এবং তার কবিতাকে দেশটিতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ছোট্টবেলা থেকেই পরিশ্রমী আর মেধাবী ছিলেন গ্রাস। তিনি পড়াশোনা করেছেন ভাস্কর্য ও গ্রাফিকস নিয়ে। তবে তিনি ছিলেন শখের ভিজুয়্যাল শিল্পী। তার লেখা আর শিল্পে বারবার এসেছে জার্মানির অতীত ইতিহাস আর নির্মমতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। মার্কিন সেনাদের হাতে ধরা পড়ে ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত প্রায় দুই বছর তিনি বন্দী ছিলেন। পরে মুক্তি পেয়ে তিনি খামার শ্রমিকের কাজ করেন। পরবর্তীকালে তিনি চিত্রকলা নিয়ে পড়াশোনা করেন ডুসেলডর্ফ ও বার্লিনে। পিলিং দ্য ওনিয়ন’ নামে ২০০৬ সালে একটি আত্মজীবনী লিখেছিলেন এই নোবেলজয়ী সাহিত্যিক। সেখানে তিনি ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে নাৎসী বাহিনীর সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা গোপন রাখার ব্যাখ্যা দেন। এবং তিনিও যে ইহুদী বিরোধী তার প্রমাণ মেলে। তার লেখনি তার শক্তি। গ্রাস তার প্রতিবাদী লেখনির জন্য বিখ্যাত। সাহিত্যে সবচেয়ে গৌরবময় নোবেল পুরস্কার পান ১৯৯৯ সালে। পুরস্কারটি দেয়ার সময় সুইডিশ এ্যাকাডেমির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, গুন্টার গ্রাস তার সাহিত্যে নিপুণ হাতে ‘ইতিহাসের বিস্মৃত বাস্তব মুখচ্ছবি’ এঁকেছেন। বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে রচিত তার উপন্যাস টিন ড্রামের জন্য নোবেল পান তিনি। বিখ্যাত এই সাহিত্যিকের বাংলার প্রতিও ছিল অন্যরকম এক টান। পরপর দুইবার ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। ১৯৮৬ সালে প্রথমবার এসে তিনি পুরান ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকা পায়ে হেঁটে বেড়ান। এরপর ঢাকায় আসেন ২০০১ সালে। প্রথমবার তাঁর বাংলাদেশ সফরের সময় স্ত্রী উটে গ্রাসও তার সঙ্গে ছিলেন। ঢাকায় রিক্সা চড়েছিলেন শখ করে। সে সময় জাতীয় জাদুঘরে জয়নুল আবেদিনের ছবি দেখে তিনি মুগ্ধ হন তিনি। প্রশংসা করেন জয়নুল আবেদিনের চিত্রকর্মের। লালবাগ কেল্লা ঘুরে দেখেন। শহরের প্রাচুর্য ছেড়ে দেখতে যান গরিবের দরিদ্র জীবনের জলছবি। ঘুরে দেখেন মোহাম্মদপুরে বিহারী ক্যাম্প। বাংলার গ্রামের কুমার, তাঁতি এবং শহরের বস্তিবাসীদের জীবন তিনি খুব কাছে থেকে উপলব্ধি করতে চেয়েছিলেন হয়ত! তার মৃত্যুতে পুরো জার্মানি জুড়ে শোকের ছায়া নেমেছিল। তার মৃত্যুতে জার্মান প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন গুন্টার গ্রাসের কর্ম জার্মান জাতির ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য প্রতিবিম্ব এবং আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে। শুধু জার্মান নয় গুন্টার গ্রাস বিশ্বসাহিত্যের এক অন্যতম প্রাণ পুরুষ। তার অভাববোধ শুধু জার্মান নয় পুরো বিশ্ব অনুভব করছে। বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু বলা হয় গুন্টার গ্রাস কে। ৭১এ স্বাধীনতার যুদ্ধে বাঙালীর পক্ষে ছিলেন তিনি। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বর্বতার বিরোধিতা করেছিলেন। ভ্রমন প্রিয় এই সাহিত্যিক বাংলাদেশ ভ্রমণে এসেছিলেন তাই দুই দুই বার। বাঙালীদের প্রতি ছিল তার অগাধ প্রেম। তার শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নেই।

নির্বাচিত সংবাদ