১৪ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভূতের খেল

  • দিলরুবা শাহানা

টিনার সঙ্গে পরিচয়ের পরে ডোনার তাকে ভাল লেগে গেল। গল্পগুজব করার একজন বন্ধু পাওয়া গেল। নাটক-সিনেমা, বই বিষয়ে কথা বলতে বলতেই অনেক সময় কেটে যায় দু’জনের।

সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট কেন এত ইত্যাদি বিষয় ডোনাকে যেমন ভাবায় আর তেমনি ওকে আকর্ষণ করে গাছপাতা, ফুল। অন্যদিকে বইপড়া, ধারাবাহিক নাটক দেখা, ঘুরে বেড়ানো ছাড়া টিনার আগ্রহের বিষয় হচ্ছে ভূত।

ডোনা যদি ফুলের পাপড়ি মেলার নৈঃশব্দের সঙ্গীত শুনতে পায়। তবে টিনা বলে সে অদৃশ্য ভূতেদের উপস্থিতি ধরতে পারে। কখনও বা সে ভূতগুলো দৃশ্যমানও হয় তার কাছে।

বীজ থেকে মাটি ফুঁড়ে চারার মাথা তুলবার অদম্য আকুতি দেখে ডোনা আনন্দে ভেসে যায়। আর টিনা প্লানচেটে আত্মার বারতা পেতে আকুল হয়। টিনা বছরে এক আধবার ভূতপার্টিরও আয়োজন করে আগ্রহী বন্ধুবান্ধব নিয়ে। সেই পার্টিতে বাতি নিভিয়ে ঘর অন্ধকার করে এক একজনের বলে যাওয়া ভূতের গল্পে শিহরিত হতে ভাল লাগে। গল্পচ্ছলে টিনা বলেছিল একবার সে তার এক বান্ধবী নাকি তার এক জ্ঞাতি বোনকে নিয়ে প্লানচেটে আত্মাকে নামানোর আয়োজনে ছিল মগ্ন। তখন হঠাৎ আত্মা (প্রেতাত্মা বলাই সমীচীন) হাজির হয়ে নাকি স্বরে জানতে চেয়েছিল

-তুমি কে গো ভূতনি?

এই কথা শুনে ডোনার স্বামী জিজ্ঞেস করল

-ভূতনি কেন বলল

-ভূত প্রেতরা মানুষদের বোধহয় ওই বলে ডাকে, ওরা তো অন্ধকারের বাসিন্দা তাই আলোর প্রাণী মানুষদের ভয়ই পায়

মনে হয়

-হয়ত বা তাই

-তারপর শোন আরও ভয়ঙ্কর কা-!

-কি কা-?

-টিনাদের চোখের সামনে প্লানচেটের ছোট্ট টেবিলটাতে অদৃশ্য কেউ একজন এমন জোড়ে এক থাবা মারলো যে সঙ্গে সঙ্গে টেবিল ভেঙ্গে দুই খ-।

টিনা-ডোনার দু’জনের গল্পে মাঝে মাঝে অনেকের কথা আসতো। যেমন রবীঠাকুর প্লানচেট করতেন এটা বহু শোনা কাহিনী, আর সবারই মোটামুটি জানা লেখক শীর্ষেন্দু বাবু এখনও ভূতে বিশ্বাস করেন।

টিনার ভূত আসক্তি দেখে ডোনা মজা পেতো বেশ। ভৌতিক অভিজ্ঞতা ডোনার কখনও হয়নি যদিও তবে ডোনা ভয় কাতুরে মানুষ এটা বলা যায়।

একদিন ডোনার বাড়িতে ঘটল রহস্যময় এক ঘটনা। ঘটনা হলো এক রাতে খাওয়া দাওয়ার শেষে নিত্যদিনের অভ্যাস মতো দু’কাপ চা নিয়ে শোবার ঘরে ঢুকল ডোনা। স্বামীর সঙ্গে ভূত নিয়ে জমিয়ে গল্প শুরু হলো। নানা ভূতের গল্পের মাঝে টিনার আত্মা নামানোর গল্পও উঠে আসলো। বিষয়টা নিয়ে বেশ হাসাহাসিও হলো দু’জনে মিলে। এদিকে রাতও গভীর হয়ে আসছিল। এবার চায়ের খালি কাপ দুটো হাতে নিয়ে ডোনা রান্নাঘরে রাখবে বলে উঠল। শোবার ঘরের দরজা খুলেই সে চমকে গেল। দেখল ওর স্যান্ডেল জোড়া দরজার সামনে থেকে উধাও।

-আরে! আমার স্যান্ডেল নিল কে? দেখ দেখ তোমার স্যান্ডেল এখানে ঠিকই আছে।

-তুমি বোধহয় খালি পায়েই এসেছ

-অসম্ভব। আমি কখনও খালি পায়ে টাইলসে হাঁটি না তা তুমি ভাল করেই জান।

দৃঢ়কণ্ঠে ডোনা প্রতিবাদ করল। এবার স্বামীরও টনক নড়ল। সে জানে ডোনা খুব সহজে ঠা-াতে ভুগে কষ্ট পায়। তাই সারা বছরই প্রায় মোজা পরে থাকে। স্যান্ডেল ছাড়া ডোনা এক মুহূর্ত থাকে না। স্যান্ডেল খুঁজতে ডোনার স্বামীও বিছানা ছেড়ে নেমে আসল।

দু’জনে মিলে করিডর পার হয়ে রান্নাঘরে ঢুকল। কোথাও স্যান্ডেলের দেখা মিলল না। এবার ডোনা ভয় পেতে শুরু করল। মোজা পায়ে ডোনা স্বামীর হাত শক্ত করে চেপে ধরে খাওয়ার টেবিলের কাছে ধীরে ধীরে পৌঁছাল। ওখান থেকে ড্রয়িং রুমে যাওয়ার জন্য একটি দরজা আছে। সেই দরজার সামনে স্যান্ডেল জোড়া এমনভাবে রাখা যেন এই মাত্র কেউ পা থেকে স্যান্ডেল খসিয়ে ড্রয়িং রুমে ঢুকেছে। স্ত্রীর হাত ধরে রেখেই ড্রয়িং রুমে ঢুকল ডোনার স্বামী এবং লাইটগুলো জ্বালিয়ে দিল তক্ষুণি। নাহ্ সবকিছু পরিপাটি, গোছগাছ আছে। কেউ এখানে নেই। কেউ আসেনি এ ঘরে। শুধু স্যান্ডেলটাই রহস্যময়ভাবে কেউ একজন এনে দরজার সামনে রেখে গেছে।

ডোনা ভাবল ভূতেরা বোধহয় রেগে গেছে ওদের নিয়ে হাসিঠাট্টা করাতে। ভয়ে জমে গেছে ডোনার হাত-পা। স্যান্ডেল পায়ে গলিয়ে কোনমতে শোবার ঘরে ফিরল। স্বামীর হাত কোনমতেই ছাড়ল না সে।

সে রাতে ঘুম কখন এসেছিল জানতেই পারেনি। তবে সকালে জ্বরে বেঘোর ডোনাকে বাসায় একা রেখে অফিসে যাওয়ার ভরসা পেলনা ওর স্বামী। ধীরে ধীরে বেলা বাড়তে শুরু করলে জ্বর কমলো। ডোনা উঠল একসময়ে। তবে ভয় ভয় ভাবটা ওকে কেমন দুর্বল করে রাখল। চা-কফি খেয়ে একটু চাঙ্গা বোধ করার পর ও স্বামীর কাছে জানতে চাইল

-আচ্ছা এর কি ব্যাখ্যা বলতে পার?

-কিসের ব্যাখ্যা?

-ওই যে স্যান্ডেলটা

-স্যান্ডেলটা তো কি?

-কে সরালো দরজার কাছ থেকে স্যান্ডেলটা?

-শোন এটা ভুলে যাও তো

-কেন ভুলে যেতে বলছো? এর ব্যাখ্যা খুঁজতে অসুবিধা কোথায়?

-অসুবিধা নয়। কথা হচ্ছে পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যার ব্যাখ্যা সব সময় পাওয়া যায় না।

-যেমন?

-একটা ঘটনা আমার এখনই মনে পড়ছে

-কি ঘটনা

-গত বছর আমার এক কলিগ একটা পেপার কাটিং দেখিয়েছিল অফিসে। খুব ইন্টারেস্টিং খবর ছিল তাতে

-কি খবর?

-খবরটা আঁধি ভৌতিক বা রহস্যময় বলতে পার

-ভূমিকা বাদ দিয়ে খবরটা বল এবার

-নিউইয়র্কের মাউন্ট হোয়াইটফেস এ স্কি করতে গিয়ে নিখোঁজ হয় এক লোক। তাকে খোঁজে পুলিশ পুরো এলাকাতে তুলকালাম কা- করছিল। ছয়দিন পর ৪০০০ কিলোমিটার দূরে ক্যালিফোর্নিয়ার স্যাকরামেন্টোতে লোকটিকে পাওয়া গেল স্কির পোশাকেই তবে বিভ্রান্ত ও হতবুদ্ধি অবস্থায়।

-সত্যিই!

-আরে এটা নিউজ হিসাবে পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। মিথ্যা খবর তো পত্রিকায় ছাপা হয় না।

-তাই তো

উদাস স্বরে ডোনা বলল

-আচ্ছা তোমার কলিগের কাছ থেকে পেপারটা কাটিংটা আনা যাবে কি?

-শোন আমার কলিগের শখ বা হবি হলো এ ধরনের খবর সংগ্রহ করা। দেখি জিজ্ঞেস করে। ওর কাছে থাকলেও থাকতে পারে।

-যদি ওই পেপারটা আনতে পার খবরটা নিজে পড়ব। তবেই বুঝব আমার স্যান্ডেলটাও ব্যাখ্যার অতীত কোন কারণে উধাও হয়েছিল।

পরদিন ডোনার স্বামী অফিসের কলিগের কাছ থেকে পেপার কাটিংটা নিয়ে আসল। খবরটা ডোনা কয়েকবার পড়ল। তারপর জোড় গলায় বলল

-তবে আমি আর টিনার বাড়িমুখো হব না, কখনও না।

ভূতের খেল বন্ধুত্ব পড়ল হুমকির মুখে।

নির্বাচিত সংবাদ