১৪ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ও আমাদের করণীয়

  • ড. সৈয়দ মোঃ এহসানুর রহমান

বিশ্বব্যাপী সমাদৃত বেশ কয়টি অনলাইনভিত্তিক প্রকাশনা সংস্থা রয়েছে যারা প্রতি বছরই স্কোরিংয়ের ভিত্তিতে বিশ্বের প্রায় ১০০০ বা ততোধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাঙ্কিং প্রকাশ করে থাকে। আর এই স্কোরিং করা হয় বেশ কিছু মানদণ্ড বা সূচকের ওপর যেমন; মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা, ছাত্রছাত্রীর অনুপাত, শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা/কর্মচারীর অনুপাত, শিক্ষার্থী-শিক্ষকের অনুপাত, শ্রেণীকক্ষের আকৃতি (একটি শ্রেণীকক্ষে একসঙ্গে পাঠ নেয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা), পিএইচডি ডিগ্রীধারী গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা, পিএইচডি ডিগ্রীধারী শিক্ষকের সংখ্যা, গ্র্যাজুয়েটরা কি ধরনের প্রতিষ্ঠানে কাজে নিয়োজিত আছেন, বিদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা, বিদেশী শিক্ষকদের সংখ্যা, বিগত পাঁচ বছরে সায়েন্স সাইটেশন ইনেডেক্সড জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধের সংখ্যা, গবেষণা প্রকাশনার কতগুলো বিশ্বের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কোলেবরেশন হয়েছে তার সংখ্যা, প্রকাশিত বই বা প্যাটেন্টের সংখ্যা, শিক্ষা ও গবেষণার সার্বিক পরিবেশ, সাইটেশন, ইউনিভার্সিটি-ইন্ডাস্ট্রি লিঙ্কেজ ইত্যাদি নানা বিষয়ের ওপর। ১০০ পয়েন্টে কোন্ বিশ্ববিদ্যালয় কত পেল তার ওপর ভিত্তি করে র‌্যাঙ্কিং তৈরি করা হয়। উল্লেখ্য, ১০০ এর মধ্যে ৯০ পয়েন্টই নির্ধারিত হয় শিক্ষা ও গবেষণা সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই র‌্যাঙ্কিং আমরা জানতে পারব লন্ডন ও আমেরিকাভিত্তিক বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য ওয়েবসাইট থেকে যেমন Times Higher Education World University Rankings, UK; QS World University Rankings, UK; US News Education.

এখন প্রশ্ন হলো আমাদের পাবলিক/প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উপরোল্লিখিত সমস্ত তথ্যাদি সন্নিবেশিত করে নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটটি হালনাগাদ করেছেন? আমরা যদি সব শিক্ষকদের গবেষণা প্রবন্ধগুলো ওয়েবসাইটে না দিই তাহলে র‌্যাঙ্কিং কর্তৃপক্ষ আমাদের প্রকাশনা ও সাইটেশন জানবে কি করে? বিশ্বব্যাপী গবেষণা প্রকাশনা ছড়িয়ে দিতে আমাদের এড়ড়মষব ংপযড়ষধৎ, ঝপড়ঢ়ঁং, জবংবধৎপয এধঃব, খরহশবফওহ, ঙৎপরফ ইত্যাদিতে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিংস-২০২০ এ আমাদের ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশের তুনামূলক চিত্র দেখা যাক। বাংলাদেশ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১০০১+, ভারতের ৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয় ৩০১ থেকে ১০০১+ এ, পাকিস্তানের ১৪টির অবস্থান ৪০১ থেকে ১০০১+ এ, শ্রীলঙ্কার আছে ২টি ৪০১ থেকে ১০০১+ এ, নেপালের একটি ১০০১+ এ, মালয়েশিয়ার ১৩টি ৩০১ থেকে ১০০১+ এ। মিয়ানমার, ভুটান ও মালদ্বীপের কোন বিশ্ববিদ্যালয় এই র‌্যাঙ্কিংয়ে নেই। উল্লিখিত দেশগুলোর শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে আলোকপাত করা যাক। ইউনিভার্সিটি অফ মালয় (৩০১ থেকে ৩৫০), প্রতিষ্ঠা সাল ১৯০৫; ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স (৩০১ থেকে ৩৫০), ১৯০৯; কাইদ-এ-আজম ইউনিভার্সিটি, পাকিস্তান (৪০১ থেকে ৫০০), ১৯৬৭; ইউনিভার্সিটি অব পেরাদেনিয়া (৪০১ থেকে ৫০০), শ্রীলঙ্কা-১৯৪২; আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে যার অবস্থান র‌্যাঙ্কিংয়ে ১০০১+ এ। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালয়েশিয়াতে শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ ও ব্যয় বাংলাদেশ থেকে বেশি, এই দেশগুলোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোন রাজনীতি চর্চা নেই এবং এই দেশগুলোতে শিক্ষকদের বেতন ও সম্মান অন্য পেশার তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর হতে পায় না বসার জায়গা, থাকার জায়গা, কম্পিউটার, যথাযথ সম্মান ও বেতন-ভাতাদি। এমনকি বিদেশে উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থাটিও নিজেকেই করতে হয়। ভুটানে সবচেয়ে বেশি বেতন ও সম্মান ডাক্তার ও শিক্ষকতা পেশায়।

আজকে সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনীতিক, আমলা, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, টিভি মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সবার মুখরোচক আলোচনার বিষয়বস্তু : ভিসি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, অভিন্ন নীতিমালা, ছাত্রবিক্ষোভ ইত্যাদি। কিন্তু গভীরে প্রোথিত সমস্যার কারণ ও এর সমাধানের উপায় নিয়ে কেউ বলছেও না, ভাবছেও না। যদি শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন নিয়ে সত্যিই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও সরকারী আমলারা সুচারুরূপে ভাবতে পারত তাহলে বিগত তিন বছর সময় নিয়ে এমন একটি পশ্চাদমুখী অভিন্ন নীতিমালা সুপারিশ করত না। প্রস্তাবিত নীতিমালায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আমলাতন্ত্রের বেড়ি পরিয়ে অবদমিত করার বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

অপর দিকে, প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ই (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট ব্যতীত) নীতিমালার সংশোধনী ও শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ এর গ্রেড অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির/ বৃদ্ধির সুস্পষ্ট কোন দিকনির্দেশনা না দিয়েই নীতিমালাটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। শিক্ষক সমাজের আন্দোলনের/সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন রেখেই আমার বিশ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ও তদসংলগ্ন বিদেশের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় হতে লব্ধ অভিজ্ঞতা আলোকপাত করতে চাই। আমরা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার পাশাপাশি বা কিছু কিছু ক্ষেত্রে মেধার থেকেও বেশি বিবেচনা করি অঞ্চল, ভোটার, কোন সুপারভাইজার এর ছাত্র ও ক্ষেত্র বিশেষে লেনদেন। ফলে অনেক সময় বিভাগের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তিটিই নিয়োগ লাভে বঞ্চিত হয়। সেক্ষেত্রে নিয়োগের ক্ষেত্রে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই পিএইচডি ও পোস্ট ডক্টরাল অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রার্থীদেরই অগ্রাধিকার দেয়া হয় গবেষণা প্রকাশনা ও অভিজ্ঞতা যাচাই করে। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার ও দেশ উপকৃত হবে অনেক দিক বিবেচনায়। বর্তমান প্রচলিত পদ্ধতিতে অনেকেই মাস্টার্স অধ্যয়নরত অবস্থায় প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান ফলে উনি কি শিক্ষা ও গবেষণায় আত্মনিয়োগ করবেন নাকি নিজের অধ্যয়ন সম্পন্ন করবেন, উপরন্তু ব্যস্ত হয়ে যান বিদেশে উচ্চ শিক্ষার বন্দোবস্ত করতে। এভাবেই একজন প্রভাষক বা সহকারী অধ্যাপকের জীবন থেকে বেশ কয়েকটি বছর চলে যায়। অপরদিকে ধরা যাক, দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বমোট ৫০০০ প্রভাষক বা সহকারী অধ্যাপক এমএস/পিইচডির জন্য পাঁচ বছর স্ববেতনে বিদেশে অবস্থান করবেন যার আর্থিক ব্যয়ভার বিশ্ববিদ্যালয় তথা রাষ্ট্র বহন করছে আনুমানিক গড়ে ৫০,০০০ঢ৫০০০ জনপ্রতি মাসে ২৫ কোটি টাকা ও প্রতি বছরে ৩০০ কোটি টাকা। আমাদের দেশের অনেক ছেলেমেয়ে ওয়ার্ল্ড র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে থাকা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ও পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা করছেন তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রভাষক / সহকারী অধ্যাপক/ সহযোগী অধ্যাপক পদে নিযুক্ত করা যেতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ স্থাপনও ত্বরান্বিত হবে। বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ গবেষক নিয়োগের ফলে গবেষণার মান ও প্রকাশনা সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে। যেহেতু হঠাৎ করেই সংশ্লিষ্ট বিভাগে প্রয়োজনের সময় পিএইচডি ও পোস্ট ডক্টরাল অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রার্থী পাওয়া নাও যেতে পারে তাই প্রভাষক নিয়োগে মাস্টার্স সম্পন্ন প্রার্থীদের মেধার ভিত্তিতে (টপ ৫%) নিযুক্তির প্রক্রিয়াটিও চালু রাখতে হবে। তবে প্রমোশনের ক্ষেত্রে ফি বছর ১টি করে আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে (SCI/SCIE Journal) First A_ev Corresponding author হিসেবে প্রকাশনা বাধ্যতামূলক করতে হবে প্রতি শিক্ষককে বাৎসরিক ন্যুনতম পাঁচ লক্ষ টাকা গবেষণা বরাদ্দ প্রদান সাপেক্ষে এবং প্রকাশনার ব্যয়ভার প্রয়োজন সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়কে বহন করতে হবে। শিক্ষকতার প্রতিটি ধাপে ন্যূনতম দুটি করে আর্ন্তজাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণের ব্যয়ভার বিশ্ববিদ্যালয় বহন করবে। শিক্ষকদের প্রতিটি স্তরেই বেতন-ভাতাদি ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করত: একটি স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রদান করতে হবে। সহযোগী প্রফেসর অথবা প্রফেসর হওয়া মাত্রই ব্যক্তিগত গাড়ি ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিনা সুদে ঋণ ও মাসিক ভাতা প্রদান করতে হবে। বিনা সুদে বাড়ি নির্মাণ বা ফ্ল্যাট ক্রয়ের জন্য ঋণ এর ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে যে ধারায় রাজনীতি চর্চা চলছে তাতে রাজনৈতিক দল, সরকার ও দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। মধ্যখানে কিছু সুবিধাবাদী ও দুর্বৃত্ত লাভবান হতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। রাজনীতি, অঞ্চল ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হচ্ছে অনিয়ম , দূর্নীতি ও নিয়োগের হাটবাজার। কর্মচারী, কর্মকর্তা, শিক্ষক এমনকি ভিসি নিয়োগেও বিশেষ মহল আর্থিক লেনদেনে জড়িত এমন শ্রুতি আছে। এহেন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য সব ধরণের রাজনীতি চর্চা বন্ধ করা যায় কিনা এ বিষয়টিও ভেবে দেখা দরকার। শিক্ষকতা পেশার সম্মানটুকু আমরা শিক্ষকেরাই ধরে রাখতে পারিনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা জতিকে দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরগুলিকে বিষয়ভিত্তিক পরার্মশ দিয়ে থাকে। আর বাংলাদেশে আমরা শিক্ষকেরা রাজনীতি/অঞ্চল/গোষ্ঠী এসব ব্যানারে থেকে পেশার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন অনেক কাজে জড়িত হয়ে পড়ছি, যার ফলে শিক্ষ ও গবেষণার উৎকর্ষ সাধনের সময় কোথায়? উপরন্তু আমাদের শিক্ষা ও গবেষণা কর্মকান্ডের মূল্যায়ন ও পেশাগত জবাবদিহিতারও অনেকটা ঘাটতি রয়েছে। কাজেই টেকসই সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে যেন আমরা প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার সকল স্তরকেই ঢেলে সাজাতে পারি ও স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো ও যোগোপযোগী নীতিমালা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারি সেই লক্ষ্যে শিক্ষাবান্ধব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এ প্রত্যাশা জাতির।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যলয় এবং

গবেষক, চিনতাও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

সানডং প্রভিন্স, চীন

ehsan_bau@yahoo.com

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া