২০ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য দূরীকরণ গবেষণায় এবারের নোবেল

  • জলি রহমান

প্রতিবছর অক্টোবরের শুরু থেকেই নোবেল বিজয়ীদের নাম প্রকাশ করা হতে থাকে। ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকী। তাই এ তারিখেই সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে আনুষ্ঠানিকভাবে নোবেল লরিয়েটদের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হয়। বৈশ্বিক দারিদ্র্য দূরীকরণের লড়াইয়ের উপায় নিয়ে গবেষণা করে চলতি বছরের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন এক ভারতীয়সহ তিন অর্থনীতিবিদ। ১৪ অক্টোবর স্টকহোমে দ্য রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস এই পুরস্কার ঘোষণা করে। অমর্ত্য সেনের পর ফের ইতিহাস রচনা বাঙালীর। ২০১৯-এর অর্থনীতিতে নোবেল পাচ্ছেন বাঙালী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। এস্থার ডাফলো, মাইকেল ক্রেমারের সঙ্গে অর্থনীতির সর্বোচ্চ সম্মান পাচ্ছেন অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য দূরীকরণ নিয়ে কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ নোবেল পেলেন তিন অর্থনীতিবিদ।

নোবেল সম্মান পাওয়ার খবরের প্রতিক্রিয়া হিসেবে অধ্যাপক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘এই সম্মান পেয়ে আমি গর্বিত। পৃথিবীর প্রায় ২০টা দেশ ঘুরে আমি গবেষণা করেছি। একাধিকবার আমার কাজের জন্যই অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাকে পশ্চিমবঙ্গের ছবিটাই ভেবে নিতে হয়েছে।’ ঘটনাচক্রে ২০১৯-এর আরেক নোবেলজয়ী এস্থার ডাফলো এবং অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় স্বামী-স্ত্রী। ডাফলো ফরাসী বংশোদ্ভূত। ৪৬ বছর বয়সে নোবেল জিতলেন ডাফলো। দ্বিতীয় নারী এবং সর্বকনিষ্ঠ অর্থনীতিবিদ হিসেবে নোবেল পেলেন তিনি। এই মুহূর্তে দুজনেই ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে অধ্যাপনা করছেন। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ডাফলো যৌথভাবে একটি বই লিখেছেন, যার নাম পুওর ইকোনমিক্স। ৫৮ বছরের অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্কুল জীবন কেটেছে কলকাতাতেই। সাউথ পয়েন্ট স্কুল থেকে পাস করে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা শুরু। ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক হন অধ্যাপক বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৮৩ সালে দিল্লীর জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাস করেন। ১৯৮৮ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই মার্কিন নাগরিক। অধ্যাপক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা দীপক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের অর্থনীতির কিংবদন্তি অধ্যাপক। আরেক নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ ক্রেমার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। প্রথম বাঙালী হিসেবে অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছেন অমর্ত্য সেন। ১৯৯৮ সালে দুর্ভিক্ষ, মানব উন্নয়ন তত্ত্ব, জনকল্যাণ অর্থনীতি ও গণদারিদ্র্যের অন্তর্নিহিত কার্যকারণ বিষয়ে গবেষণা এবং উদারনৈতিক রাজনীতিতে অবদান রাখার জন্য এই পুরস্কার পান ভারতীয় এই অর্থনীতিবিদ। এবার নোবেল পুরস্কারের ৯০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার ভাগ করে নেবেন তারা।

নোবেল কর্তৃপক্ষ বলেছে, ‘এ বছরের নোবেল বিজেতাদের গবেষণা দুনিয়াভর দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য আমাদের শক্তি বর্ধন করেছে। মাত্র দুই দশকে তাঁদের নতুন গবেষণাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি উন্নয়নের অর্থনীতিতে রূপান্তর এনেছে, যা বর্তমানে এক উদীয়মান ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ নোবেল পুরস্কারের মুখপাত্র বলেছেন- ‘এই অর্থনীতিবিদদের বৈশিষ্ট্য হলো, উন্নয়ন অর্থনীতির সমস্যাগুলো নিয়ে বিশেষ করে দারিদ্র্য দূরীকরণের ব্যাপারে তাঁরা সমস্যাজনক সেইসব অংশগুলোকেও ক্ষুদ্রতর অংশে ভেঙে নিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছেন কোন নীতি কাজ করছে, কোন নীতি কাজ করেনি।’ এছাড়াও তারা ব্যাখ্যা করেছেন, স্কুলে যেসব শিশুরা যাচ্ছে তারা যথেষ্ট শিখছে না কেন। অভিজিৎরা এ বিষয়টিকে ভেঙে নিয়ে দেখতে চেয়েছেন, আর কী দেয়া হলে, এ ব্যাপারে তাদের সাহায্য করা যায়। এক্ষেত্রে একটা জিনিস যেমন, পাঠ্যবই। কিন্তু তাঁরা এও দেখেছেন শুধু বই দেয়াই যথেষ্ট নয়, যদি না স্কুলগুলোকে বিনামূল্যে সংস্কারের ব্যবস্থা করা যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গির জন্য ফিল্ড এক্সপেরিমেন্টের প্রয়োজন হয়েছে এবং বোঝার প্রয়োজন হয়েছে যে একটি ক্ষুদ্র নীতির উদ্যোগগ্রহণ কার্যকরী হচ্ছে কি না, এবং যদি না হয়, তাহলে কেন তা হচ্ছে না। এভাবে সমস্যাকে দেখার ফলে সারা পৃথিবীতে কোন নীতি কাজ করছে এবং কোন নীতি পরিত্যাগ করা উচিত তা বোঝার ক্ষেত্রে গবেষকদের সুবিধে হয়েছে। এই ঘোষণার পরপরই ডাফলো বলেছেন ‘মানুষ দরিদ্রদের উপহাসের পাত্রে পরিণত করে ফেলেছেন, তাঁদের সমস্যার শিকড় না বুঝেই (আমরা স্থির করি) সমস্যা বোঝার চেষ্টা করব এবং প্রতিটি বিষয়কে বৈজ্ঞানিকভাবে এবং খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করব।’ উল্লেখ্য, আলফ্রেড নোবেল ১৯০১ সালে যখন নোবেল সম্মান দেয়া শুরু করেন, সে সময় চিকিৎসা বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, সাহিত্য এবং শান্তিতেই কেবল এই সম্মান প্রদানের রেওয়াজ ছিল। পরবর্তীতে অর্থনীতিতে পুরস্কার দেয়া শুরু করে নোবেল কর্তৃপক্ষ। ১৯৬৯ সাল থেকে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে এই পুরস্কারের পুরো নাম রাখা হয় ‘দ্য সেভেরিজেস রিক্সব্যাংক প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্সেস আন মেমোরি অব আলফ্রেড নোবেল।’ ২০১৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম ডি নর্ডহাউস এবং পল এম রোমার। বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল উন্নয়ন নিয়ে গবেষণা করায় এ সম্মান পেয়েছিলেন তারা ।

নির্বাচিত সংবাদ