২০ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ব্যবসা জগতের কিংবদন্তি সোয়ার্জম্যানের স্মৃতিকথা

  • এনামুল হক

আমেরিকার ব্যবসা জগতের কিংবদন্তি পুরুষ স্টিফেন সোয়ার্জম্যানের স্মৃতিকথা ‘হোয়াট ইট টেকস্ : লেসনস্ ইন দ্য পারস্যুট অব এক্সেলেন্স’ সম্প্রতি আত্মপ্রকাশ লাভ করেছে। স্বনামধন্য অর্থলগ্নিকারক এবং বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিকল্প-সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোরের যুগ্ম প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও সিইও সোয়ার্জম্যান জীবন ও কর্মজগতে কিভাবে সাফল্য অর্জন করা যায় এই গ্রন্থে তাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। বলাবাহুল্য এটাই তাঁর রচিত প্রথম গ্রন্থ।

নেতৃত্ব কিভাবে দিতে হয়, কিভাবে অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হয়, কিভাবে ব্যর্থতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়, কিভাবে বিকাশমান একটা টিম গড়ে তুলতে হয় এবং কর্মক্ষেত্র ও অভিজ্ঞতার স্তর যেটাই হোক না কেন কিভাবে জীবন ও কর্মে সাফল্য অর্জন করতে হয় সেই কৌশলগুলো জানার ব্যাপারে এই বইটি একটি আকর গ্রন্থ। ছোট ছোট ঘটনা ও কাহিনীর মধ্য দিয়ে গল্প বলার মুন্সিয়ানার দ্বারা সোয়ার্জম্যানের জীবন ও ক্যারিয়ারের কষ্টার্জিত ও অমূল্য শিক্ষাগুলো তুলে ধরা হয়েছে এতে। ফিলাডেলফিয়ায় বেড়ে উঠেছিলেন সোয়ার্জম্যান, সেখানে বাবার দোকান ‘কারস্টেইনস এ্যান্ড লিনেনস’-এ বৃদ্ধাদের কাছে রুমাল বিক্রি করার খ-কালীন চাকরি করতেন। কিন্তু সে চাকরিটা ঘোরতর অপছন্দ ছিল তার। সান্ত¦না হিসাবে কল্পনা করতেন কিভাবে তাদের এই কোম্পানিকে যুদ্ধোত্তর আমেরিকাজুড়ে সম্প্রসারণ করা যায়Ñ যেমনটি ঘটেছিল শিয়ার্সের ক্ষেত্রে। কিন্তু বাবা আগ্রহী ছিলেন না। একটা বাড়ি, দুটো গাড়ি এবং কিছু টাকাকড়ি এই নিয়েই সন্তষ্ট ছিলেন তিনি। ব্যবসায় উদ্যোক্তার মন তার ছিল না। কিন্তু তরুণ সোয়ার্জম্যান বাবার মতো ছিলেন না। ব্যবসায় উদ্যোক্তার মনই তাকে উর্ধে ঠেলে দিয়েছিল। কালক্রমে তিনি ব্ল্যাকস্টোন কোম্পানির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হন এবং ১৮০০ কোটি ডলারের মূলধনসহ আধুনিক যুগের পুঁজিবাদের অন্যতম পুরোধায় পরিণত হন। গ্রন্থে ব্যক্তি হিসেবে মাত্র বারকয়েক তিনি উল্লিখিত হয়েছেন এবং তার পরই আবার দ্রুত অন্তরালে চলে গেছেন। ক্ষুদ্র চিন্তার মানুষদের নিয়ে তাঁর বইয়ে তেমন কোন কথা নেই। কর্তাব্যক্তি ও শ্রমিক- কর্মচারীদের মধ্যে সম্পদের ব্যবধান নিয়ে অন্য অর্থলগ্নিকারীরা কুণ্ঠিত বোধ করলেও সোয়ার্জম্যান করেন না। তিনি আমেরিকার ব্যবসায় জগতের একজন বিরল নির্বাহী যিনি সম্প্রতি শেয়ারহোল্ডার নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদের মডেলের অবসান ঘটানোর আহ্বান সংবলিত একটি সনদে স্বাক্ষর দেননি। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে ভোগবিলাসের অন্ত ছিল না। বিলাসবহুল পার্টি ও গ্ল্যামার ছিল তার নিত্যসঙ্গী। পাঁচজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, চারজন ফরাসী প্রেসিডেন্ট ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নাম তিনি দায়সারাভাবে উল্লেখ করেছেন। গ্রন্থটির বৃহত্তর এক উদ্দেশ্য আছে। বইটির বক্তব্য বিষয়ের নির্গলিতার্থ হচ্ছে ‘কিভাবে একটা উত্তরাধিকার গড়ে তোলা যায়।’ ৭২ বছর বয়সে এসে এটাই হলো তাঁর অন্বেষা এবং এ ব্যাপারে তিনি একদম নাছোড়বান্দা। তার অর্থ নিজের ঐশ্বর্য্যরে একটা অংশ দান করে দেয়া যাতে করে সোয়ার্জম্যানের নাম রকফেলারের মতো লাইব্রেরিতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ও স্কলারশিপ কর্মসূচীতে উৎকীর্ণ থাকে। এর এমনও অর্থ হতে পারে এমন একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যা তাঁকে ছাড়িয়ে গিয়ে স্থায়ী হয়। অর্থলগ্নি জগতের প্রতিচ্ছবিটা বড়ই নিষ্ঠুর ও বর্বর। তাই বলে এই জগতটা সংস্কৃতিমুক্ত নয়। সোয়ার্জম্যান এক সময় লেহম্যান ব্রাদার্সে কাজ করতেন। সেই লেহম্যান ব্রাদার্সের একটা সুনাম ছিল মানুষের পিঠে ছুুরিকাঘাত করা নয় বরং সামনে থেকে ছুরি মেরে বসা। সোয়ার্জম্যানের ব্ল্যাকস্টোনকে একইভাবে কখনও কখনও যুদ্ধের এক বিশাল সরঞ্জাম হিসেবে চিত্রিত করা হয়। তবে তিনি মনে করেন তার কোম্পানির একটা উদ্দেশ্য আছে এবং তা হলো বিনিয়োগকারীদের জন্য ভাল মুনাফা সৃষ্টি যার মধ্যে পেনশন তহবিলও অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে ব্ল্যাকস্টোন যেসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে সেগুলোতে ৫ লাখ লোকের চাকরির সংস্থান করা। সোয়ার্জম্যানের বইয়ের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ব্যবসায়ে সাফল্য পেতে গেলে নির্মম উচ্চাভিলাষ, অপ্রত্যাশিত ন¤্রতা ও নিরহঙ্কারবোধ এবং প্রচ- আনুগত্যÑ এই তিনটি জিনিস এবং এগুলোর মধ্যে মিথষ্ক্রিয়া থাকতে হয়। উচ্চাভিলাষ দিয়েই শুরু করা যাক। ব্ল্যাকস্টোন কুণ্ঠাহীনভাবে আভিজাত্যরোধে আকীর্ণ। আর সবাইকে ছাড়িয়ে বড় হওয়ার আকাক্সক্ষার ব্যাপারে সোয়ার্জম্যানের কোন রাখঢাক নেই। ১৯৮৫ সালে তিনি ৪ লাখ ডলার দিয়ে ব্ল্যাকস্টোন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তারপর তিনি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আরও অর্থ সংগ্রহে নেমে পড়েন। এখন এই কোম্পানির ব্যবস্থপনার অধীনে রয়েছে ৫৪ হাজার ৫শ’ কোটি ডলার। এ বছর ব্ল্যাকস্টোন বিশ্বের এযাবতকালের বৃহত্তম প্রাইভেট ইকুইটি ও প্রপার্টি ফান্ড গড়ে তুলেছে। এর অংশীদারী কাঠামো বাতিল করে ব্ল্যাকস্টোন চলতি বছর একটি কর্পোরেশনে পরিণত হয়েছে এবং এর বাজারমূল্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি। ব্ল্যাকরকের বাজারমূল্য থেকে এটা বেশি দূরে নয়। ব্ল্যাকরক আগে ব্ল্যাকস্টোনের অংশ ছিল। ১৯৯০ এর দশকের মাঝামাঝি এটি ব্ল্যাকস্টোন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং নিজ পরিম-লের একটি শক্তিধর প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায় ব্ল্যাকরকের সঙ্গে সোয়ার্জম্যানের এক ধরনের মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে তাঁর দৃষ্টি আগামী দিনের এলিটদের ওপর। এই প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের সঙ্গে ভারসাম্য হিসেবে যোগ হয় বিস্ময়কর রকমের ন¤্রতা। ব্ল্যাকস্টোন তার ভুলভ্রান্তি থেকে তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষা নেয়। সোয়ার্জম্যানের নিজেরই বেশ কিছু ভুলভ্রান্তি আছে এবং তা থেকে তিনি শিক্ষা নিয়েছেন। সবচেয়ে বেদনাদায়ক ভুলটি ঘটেছিল ১৯৮৯ সালে যখন তিনি অনেক অভিজ্ঞ সহকর্মীর বিরোধিতা সত্ত্বেও ইস্পাত কারখানা এজকম্ব বিনিয়োগের ব্যাপারে ঝুঁকি নিতে একজন নতুন কর্মচারীকে সমর্থন যুগিয়েছিলেন। ওটা ছিল এক দারুণ ভুল এবং তার জন্য ভাল মাশুল গুনতে হয়েছিল তারপর থেকে তিনি নির্দেশ দেন যে বিনিয়েগের সিদ্ধান্তগুলো অবশ্যই সমষ্টিগতভাবে নিতে হবে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নির্ধারণী বৈঠকগুলো দারুণ সুফল বয়ে এনেছিল। তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে আনুগত্য। আর্থিক সঙ্কটের সময় বোর্ডের সদস্যরা যে পদক্ষেপের দ্বারা লভ্যাংশ বজায় রাখার জন্য তাঁর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন সে পদক্ষেপ তিনি নিয়েছিলেন। তাদের পরামর্শ শুনে আনুগত্যের পরিচয় দিয়েছিলেন সোয়ার্জম্যান। বিয়ার্স স্টার্নস নামে একটি বিনিয়োগ ব্যাংক ডুবতে শুরু করার সময় ব্যাংকের প্রধান জিমি কেইনকে সোয়ার্জম্যান বলেছিলেন ‘কখনও কখনও সময় আসে যখন আপনাকে ¯্রফে উঠে দাঁড়িয়ে একটা চেক লিখতে হয়।’

অন্য কথায় বলতে গেলে যাদের অর্থের দায়িত্বভার আপনার হাতে তাদের প্রতি বিশ্বস্ততা ও আনুগত্যের পরিচয় দিয়ে নিজের সুনাম রক্ষা করুন। মি. কেইন তার কথা শোনেননি। সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

নির্বাচিত সংবাদ