১৬ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার প্রত্যাশা

  • আল নাহিয়ান

চলছে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা এখনও বাকি আছে পরীক্ষার্থীরা সেগুলোতে অংশগ্রহণের অধীর অপেক্ষায় দিন গুনছে। এই পরীক্ষাসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় পর্যবেক্ষণে একটি প্রয়োজনীয়তার কথা প্রায়শ সামনে আসছে। আর তা হলো বিশ্ববিদ্যাগুলোর সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ। সুশীল সমাজের অনেকেই এই পদ্ধতি চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা আগে থেকেই বলে আসছেন, এখনও বলছেন। আমাদের দেশে বর্তমানে শুধু মেডিক্যাল কলেজগুলোতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা প্রচলিত। এবার কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তা কার্যকর হয়েছে। কিন্তু কয়েক বছরের চেষ্টাতেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা গ্রহণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি।

মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর অন্যতম হলো শিক্ষা লাভের অধিকার। শিক্ষাই মানুষকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে গড়ে তোলে। রাষ্ট্রে সুশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্যÑএ উপলদ্ধি চিরন্তন সত্য। এ সত্য উপলদ্ধির পরিধি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের মাঝে। আজকাল মানুষের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান যাই হোক না কেন, সকলেই নিজে কিংবা তার পরিবারের সদস্যদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে জীবনে বহুদূর এগিয়ে যাবার স্বপ্ন দেখছেন। এর বাস্তব চিত্র হলো, আমাদের দেশে দিন দিন শিক্ষার হার বাড়ছে। এরই প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তুলনামূলক তীব্র হয়ে উঠছে শিক্ষার্থীদের ভর্তি হওয়ার প্রতিযোগিতাও। এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা স্বপ্ন দেখে দেশের নামী-দামী প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা অর্জনের। এই স্বপ্ন সহজেই ধরা দেয়ার নয়, একথা সবারই জানা। তারপরও ভর্তিযুদ্ধে তীব্র আকাক্সক্ষা ও প্রাণপণ চেষ্টার ঘাটতি খুব কম শিক্ষার্থীর মাঝেই দেখা যায়। তাই ভর্তিযুদ্ধে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত তথা দেশের প্রায় সকল শ্রেণী-পেশার পরিবারের শিক্ষার্থীই অংশগ্রহণ করে থাকে।

দেশের প্রায় সব বিভাগেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সময় সম্মুখীন হতে হয় নানা বিড়ম্বনার। পরীক্ষায় ছেলে-মেয়ে উভয় ধরনের পরীক্ষার্থীই অংশ নিয়ে থাকে। মেধা ও মননের দিক থেকে এসব শিক্ষার্থী যেমন ভিন্ন, তেমনি তাদের পারিবারিক কাঠামো ও অর্থনৈতিক কাঠামোও স্বতন্ত্র। ফলে দেখা যায় বিত্তবান পরিবারের পরীক্ষার্থীরা আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন না হলেও দূর-দূরান্তে যাতায়াত সংক্রান্ত বিড়ম্বনায় পড়েন এবং মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা আর্থিক ও আনুষঙ্গিক উভয় সমস্যায় পড়েন। আবার বড় পরিবারের শিক্ষার্থীদের পারিবারিক সদস্য সংখ্যা তুলনামূলক বেশি থাকায় পরিবারের কোন একজন সদস্য বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষার্থীকে নিয়ে যেতে পারেন, খুব একটা বেগ পেতে হয় না। কিন্তু যেসব পরিবারের সদস্য সংখ্যা কম, তাদের এক্ষেত্রে হিমশিম খেতে হয়। অনেক সময় অচেনা জায়গায় শিক্ষার্থীদের বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে কিংবা একা একা পরীক্ষা দেয়ার জন্য যেতে হয়। পরীক্ষাকেন্দ্রের স্থানে কোন আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিত কেউ না থাকলে সৃষ্টি হয় চরম আবাসন সঙ্কট। এমনও অনেক গল্প শোনা যায় যে, কোন কোন পরীক্ষার্থী রেলস্টেশনে রাত যাপন করে পরীক্ষা দিয়েছেন। আরও একটি সমস্যা হলো একই সময় একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে স্বভাবতই শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও যে কোন একটি বিশ্ববিদ্যায়ের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে কোন কোন মেধাবী শিক্ষার্থী সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে পারে না। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকে পরিবারের খুব কষ্টে অর্জিত টাকায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। তাছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে যাওয়াটা মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য এখনও বেশ চ্যালেঞ্জিং। ফলে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের শতভাগ উপস্থিতিও থেকে যায় অনিশ্চিত। কাজেই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যাতায়াতের সময়টুকু লেখাপড়ায় ব্যয় করতে পারত, ভর্তি কার্যক্রমের দীর্ঘসূত্রতাও কমে আসত। একটি মাত্র রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমেই একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ থাকায় এবং দূরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্রমণের প্রয়োজন না থাকায় অভিভাবকদের অর্থনৈতিক ভোগান্তিও অনেকাংশে কমে আসত। অভিভাবকরা সেক্ষেত্রে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে পারতেন। এক্ষেত্রে শুধু সময় ও অর্থ বাঁচত তা-ই নয়, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে মেয়েদের ক্ষেত্রে দেখা যায় পরিবারের কাউকে না কাউকে সঙ্গে যেতে হয়। বাড়তি এই খরচও কমে আসত। তাছাড়া পরিবারের যে লোকটি ভর্তি পরীক্ষার স্থানে পৌঁছে দিতে শিক্ষার্থীর সঙ্গী হন, তাকে তার নিজের কাজ ফেলে রেখেই যেতে হয়। সমন্বিত পরীক্ষা হলে এই বিড়ম্বনা থেকেও অভিভাবকদের মুক্তি মিলত।

এক্ষেত্রে সরকার এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছাই এই সমস্যার সহজ ও দ্রুত সমাধানের পথ সৃষ্টি করতে পারে। আমাদের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনতিবিলম্বে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করুক- এই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক