১৪ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলাদেশের ফুটবলের প্রাণভোমরা প্রবাসী বাঙালী জামাল

  • মজিবর রহমান

প্রতিভা কখনও ঝাঁকে ঝাঁকে জন্মায় না। সময়ের বিবর্তনে তারা আসেন কালেভদ্রে। জামাল ভূঁইয়া তেমনি এক প্রতিভাবান ফুটবলার। যার হাত ধরে নতুন করে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের ফুটবল। অথচ তিনি কখনও ভাবেননি বাংলাদেশে খেলবেন। বাংলাদেশ জাতীয় দলের নেতৃত্ব দেবেন। হয়ে উঠবেন লাল-সবুজ জার্সির বড় তারকা, উজ্জ্বল এক নক্ষত্র। কারণ তার জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা ডেনমার্কে। আসলে সৃষ্টিকর্তা কখন কাকে কোথায় নিয়ে যায় কেউ তা জানে না। যেমনটা কল্পনা করেননি জামাল, তিনি বাংলাদেশের হয়ে মাঠ মাতাবেন। এটাই এখন বাস্তব সত্য, বাংলাদেশী বাবা-মায়ের প্রবাসী সন্তান বর্তমানে এ দেশের সেরা ফুটবলার। জামালের জন্ম কোপেনহেগেনে। কিন্তু পৈত্রিক নিবাস কিশোরগঞ্জে। ডেনমার্কেই তার ফুটবলে হাতে খড়ি। ফুটবলার হয়ে ওঠা এফসি কোপেনহেগেন ক্লাবের হয়ে। কিন্তু তাতে কী? ভাগ্য নামক নিয়তি যে তাকে নিয়ে এসেছে সবুজ জমিনে লাল সূর্য আঁকা পতাকার বাংলাদেশে। এটাই এখন তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। তার জীবনের সবকিছুই এখন এদেশের ফুটবলকে ঘিরে। বাংলাদেশের ফুটবলের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন প্রায় আট বছর হতে চলল। এই আট বছরে ঘরোয়া ফুটবলে বড় দলে খেলার পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছেন জাতীয় দলে। বাংলাদেশ জাতীয় যুবদলের জার্সি জড়িয়েও সুনাম কুড়িয়েছেন। এখন তিনি জাতীয় দলের আস্থার প্রতীক। আপন যোগ্যতায় জাতীয় দলের অধিনায়কের ‘আর্মব্যান্ড’ বাহুতে জড়িয়েছেন এই প্রবাসী ফুটবলার। দেশের সবচেয়ে দামী ফুটবলারও এখন তিনি। সর্বোচ্চ ৬৬ লাখ টাকা পারিশ্রমিকে গত মৌসুমে খেলেছেন বিপিএলের শক্তিশালী দল সাইফ স্পোর্টিংয়ে। শুরু হয়েছে ফুটবলারদের দল বদল। গুঞ্জন আছে, এবার পারিশ্রমিক আরও বাড়তে পারে জামাল ভূঁইয়ার।

যদিও এই চৌকস মিডফিল্ডার ভাল বাংলা বলতে পারেন না এখনও। শুরুতে তো একদমই বলতে বুঝতে পারতেন না। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, এদেশের ফুটবলের সঙ্গে জড়িয়ে রপ্ত করেছেন বাংলা। তবে পরিষ্কারভাবে নয়। সবার সঙ্গে কথা বলেন বাংলা-ইংরেজীর মিশেলে। এ নিয়েই নিজেকে গর্বিত মনে করেন জামাল। দেশমাতৃকার টানে ছুটে আসার পর এদেশের ফুটবল হয়ে উঠেছে তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ডেনমার্ক ছেড়ে বাংলাদেশে আসা, কোপেনহেগেনের রাস্তায় সন্ত্রাসীর গুলি খাওয়া, ফের ফুটবল নিয়ে মেতে ওঠা, বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে স্বপ্ন, অনেক আম্লমধুর স্মৃতির সাক্ষী হয়ে স্থান করে নিয়েছেন এদশের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে।

ভারতে বিশ্বকাপ বাছাই খেলতে যাওয়ার পর তার বাংলায় কথা বলার ধরন শুনে স্থানীয় মিডিয়ার অনেকেই প্রশ্নই করেছিলেন, আপনি তো বাংলাদেশী নন। তবে জামাল বেশ ভালভাবেই বুঝিয়ে দেন বাংলাদেশের জার্সিটা তিনি গায়ে জড়িয়েছেন এদেশের একজন গর্বিত সন্তান হিসেবে। বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত ড্যানিশ নাগরিক বিষয়টা মন থেকে মুছে ফেলেছেন। পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন বাংলাদেশই এখন তার সবকিছু। হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা পুরোপুরিই এখন বাংলাদেশ ঘিরে।

বিদেশে নানা প্রশ্নই উঠতে পারে খেলতে গেলে। এসব নিয়ে এখন ভাববার সময় নেই। নিজেই বলে দিলেন, আমি এসব নিয়ে ভাবি না। আমার দেশই আমার ভালবাসার ঘর। কারণ আমার বাবা-মা দু’জনই বাঙালী। বিদেশে অনেক ফুটবলার আছেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজ দেশে জন্মগ্রহণ করেও অন্য দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে সেদেশের হয়ে খেলছেন। আবার অন্য দেশে জন্ম নিয়ে নিজ দেশের হয়ে খেলছেন। আমিও তাদের মতো। জামাল আবারও বললেন, আমি বাঙালী। বাংলা আমার ভাষা। গর্বিত নাগরিক হিসেবে আমি বাংলাদেশের হয়ে খেলছি। পরিপূর্ণ একজন পেশাদার ফুটবলার হওয়ার পেছনে বাংলাদেশের জার্সিই আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। যদিও স্কুল পড়ুয়া অবস্থায় আমার ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু ডেনমার্কে। আমার বাবা-মা বাড়িতে বাংলায় কথা বলতেন। পরিবেশের কারণে আমি তখন বাংলায় কথা বলা রপ্ত করতে পারিনি। কিন্তু আমার প্রিয় বাংলাদেশে আসার পর চেষ্টা করি একজন স্বার্থক বাঙালী হওয়ার। ঢাকায় ক্লাব পর্যায়ে খেলা শুরুর পরই বেশি বাংলা শিখেছি। যদিও এখনও কিছুটা জড়তা রয়ে গেছে। তাতে কিছু যায় আসে না। আমি বাংলাদেশী, এটাই আমার গর্ব। যেটুকু বলতে পারি তাতেই আমি খুশি।

আমি এফসি কোপেনহেগেন যুবদলে খেলতাম। প্রথম ম্যাচেই খুব ভাল খেলেছিলাম। প্রত্যাশিত নৈপুণ্যের পর ওই ক্লাব আমার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে। ক্লাবটি আমার খুব প্রিয় ছিল। এই দলের হয়ে খেলতে ভাল লাগত। কারণ সেটা ডেনমার্কের সবচেয়ে বড় ক্লাব। জামাল বললেন, আমার বয়স তখন প্রায় ১৭। একদিন আমি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। কোপেনহেগেনে আমরা যে এলাকায় থাকতাম সেখানকার পরিবেশ তেমন ভাল ছিল না। আসলে খারাপ-ভাল বড় কথা নয়। কার কখন বিপদ ঘটবে কেউ বলতে পারে না। আমার ক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছে। পথ চলার সময় একটা শপিংমলের সামনের রাস্তায় সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলা। অন্য অনেকের সঙ্গে আমিও গুলিবিদ্ধ হলাম। আমার শরীরে চারটি গুলি লাগে। একদিকে গুলির আঘাত, অন্যদিকে ভয়ে প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসা নিতে হয়েছে বেশ কয়েক মাস। উন্নত চিকিৎসার পর শরীর সুস্থ হলেও মনোবল বলতে কিছুই ছিল না। সব সময় ভয় কাজ করত মনের মধ্যে, আবার না কোন বিপদ ঘটে যায় এই ভেবে। ফুটবলের প্রতিও একটা অনীহা সৃষ্টি হলো।

ফুটবল খেলা ছেড়ে দেয়ার চিন্তাও মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। যদিও ড্যানিশ ফুটবলের মান খুব উঁচু। কিন্তু মনে হচ্ছিল আমি আর পারব না। আমাকে দিয়ে আর হবে না। তাই পড়াশোনা ভালভাবে চালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবলাম। কিন্তু সেটাও হয়ে ওঠেনি। আবার ফিরে এলাম মাঠে, ফুটবলের দুর্নিবার আকর্ষণে। পুনরায় ফুটবল শুরুর পেছনে আমার দলের কোচ জন লারসেনের ভূমিকাই মুখ্য। তিনি সাহস দিয়ে বললেন, অতীত ভুলে যাও। মানুষের জীবনে কত ঘটনাই তো ঘটে। তাই বলে কি একটা ভুবনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দিতে হবে? কোচের কথায় সাহস পেলাম। অনুপ্রেরণা পেলাম। তিনি পরামর্শ দিলেন আবার চেষ্টা করার জন্য। কোচ আস্থা রেখেই আমাকে বললেন, আমার বিশ্বাস চেষ্টা করলে তুমি পারবে। লারসেনের পরামর্শে আবার ঠিকানা খুঁজে নিলাম ফুটবলের মাঠে। দুর্ঘটনার প্রায় ছয়/সাত মাস পর শুরু করলাম অনুশীলন। অটুট মনোবল নিয়ে আবার ফিরে পেলাম ফুটবল জীবন। সেখানে পুনরায় শুরুর কিছুদিন পরই বাংলাদেশে চলে এলাম। জামাল বললেন, ঢাকায় আসার পর জানতে পারলাম জাতীয় দলের সাবেক কোচ লুডভিক ডি ক্রুইফ বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে নাকি পরামর্শ দিয়েছিল অনেক প্রবাসী আছেন যারা ভালমানের ফুটবলার। বিভিন্ন দেশে খোঁজ নিয়ে তাদের দলভুক্ত করা যায় কিনা চেষ্টা করার। সম্ভবত ক্রুইফের প্রস্তাবের পরই ২০১২ সালে কোচ সাইফুল বারী টিটু প্রথমে তাকে বাংলাদেশে খেলার আমন্ত্রণ জানান। তখন সম্ভবত তিনি জাতীয় দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আমার খেলার ভিডিও দেখেই তিনি অফার দিলেন। মূলত টিটু ভাইয়ের বদৌলতে বাংলাদেশে আসা। নয় তো ডেনমার্কেই খেলতে হতো। বাংলাদেশে আসার পর শুরুতে কিছুটা জড়তা কাজ করত আমার মধ্যে। কারণ, কারও সঙ্গে পরিচয় নেই। আমি কাউকে চিনি না। আমাকেও কেউ চেনে না। টিটু ভাইয়ের সঙ্গে আলাপের পর আবার ডেনমার্কে ফিরে গেলাম। মানসিক প্রস্তুতি নিলাম বাংলাদেশে খেলার। মুখে ইপ্সিত হাসির রেখা টেনে বললেন, সেই যে এলাম, তারপর তো পুরোপুরি বাঙালী হয়ে গেলাম। এখন আমার দেশ বাংলাদেশ। এখানকার মানুষ, প্রকৃতি ও পরিবেশকে একান্তই আপন করে নিয়েছি। তবে শুরুতে একটু সমস্যা হয়েছিল। ডেনমার্ক আর বাংলাদেশের আবহাওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন। শীতের দেশে জন্ম আমার। আর বাংলাদেশে গরম। তবে এখন আর কোন সমস্যা হয় না। কিশোরগঞ্জের সন্তান জামাল বললেন, বাংলাদেশের পরিবেশের সঙ্গে পুরোপুরিই খাপ খাইয়ে নিয়েছি। শুধু জাতীয় দলই নয়। ঢাকার ঘরোয়া লীগ চলাকালীন ক্লাবের হয়েও যে কোন পরিবেশে খেলতে পারি। গরম, ঠা-া, বৃষ্টি এমনকি কর্দমাক্ত মাঠেও।

বিশ্বকাপ বাছাইয়ে অংশ নেয়া তিন ম্যাচ প্রসঙ্গে জামাল বললেন, এখনও আমরা জয় পাইনি। তবে সুযোগ যে আসেনি তা নয়। আসলে যে কোন খেলায় ভাগ্য একটা বড় ‘ফ্যাক্টর’। তিনটা ম্যাচেই পয়েন্ট পাওয়া উচিত ছিল। আমি মনে করি, আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে আমাদের জেতা উচিত ছিল। কিন্তু ম্যাচ ফসকে গেছে খেলার ধারার বিরুদ্ধে গোল খেয়ে। আমরা একাধিক সুযোগ পেয়ে গোল করতে পারিনি। আর আফগানরা একটা সুযোগ কাজে লাগিয়েই তিন পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ল। ঘরের মাঠে কাতারের বিরুদ্ধেও ভাল খেলেছি। অনন্ত পয়েন্ট পাওয়া উচিত ছিল। যদিও গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ কাতার। তারপরও আমরা সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারিনি। আর কলকাতার সল্টলেকে তো ভারতের বিরুদ্ধে জিততে জিততে ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়তে হলো। জয়ের সবচেয়ে বড় সুযোগ ছিল ভারতের বিরুদ্ধে। ৮৮ মিনিট পর্যন্ত এগিয়ে থেকেও এই ড্র দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু নয়। একাধিক সুযোগ নষ্ট হয়েছে। প্রাপ্ত সুযোগের অর্ধেক কাজে লাগাতে পারলেও ভারতের বিরুদ্ধে জয় নিয়ে দেশে ফিরতে পারতাম। প্রশ্নের উত্তরে জামাল বললেন, সুযোগ সন্ধানী বা অভিজ্ঞ গোলদাতার আভাব তো রয়েছেই। তারচেয়ে বড় কথা আমাদের দলটা তারুণ্য নির্ভর। অভিজ্ঞতায় প্রতিপক্ষ দলগুলোর চেয়ে আমরা পিছিয়ে। আর এ কারণে প্রত্যাশিত রেজাল্ট পাচ্ছি না ভাল খেলেও। এখানে কাউকে দোষ দেয়ার সুযোগ নেই। যদিও এটা হতাশার। ফুটবল গোলের খেলা। গোল করে জিততে না পারলে ভাল খেলার কোন মূল্য নেই। তিন ম্যাচেই আমরা ভাল খেলেছি। কিন্তু মানুষ সেটা মনে রাখবে না। এটাই স্বাভাবিক। তবে আমাদের রক্ষণভাগ এ মুহূর্তে খুবই পরিণত। খেলতে খেলতে আক্রমণভাগও এক সময় ঠিক হয়ে যাবে।

ডেনমার্ক ছেড়ে বাংলাদেশের খেলতে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিয়েছেন বাবা। পেশায় তিনি চাকরিজীবী। প্রথম প্রস্তাব পাওয়ার পরই বাবা বলেছিলেন, যাও দেশের জন্য কিছু করার চেষ্টা কর। তোমার জন্ম কোপেনহেগেনে হলেও তুমি বাংলাদেশের সন্তান। আমি খুবই খুশি হব তুমি বাংলাদেশ জাতীয় দলে নিয়মিত খেলার সুযোগ করে নিতে পারলে। বাবার ইচ্ছা আমি পূরণ করতে পেরেছি। ফোনে যখন কথা হয় বাবা আমাকে আরও ভাল খেলার তাগিদ ও অনুপ্রেরণা দেন। আমি বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়ক। দায়িত্ব পাওয়ার পরই রাতে বাবাকে ফোন করেছিলাম। তিনি তো মহাখুশি। আমাকে আশীর্বাদ করে বললেন, এগিয়ে যায়। এটাই তোমার সেরা সময় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার। এগিয়ে নাও তোমার মাতৃভূমিকে। যদিও ডেনমার্ক ছেড়ে আমি বাংলাদেশে ফুটবল খেলি তা চাচ্ছিলেন না মা। তিনি একটা বিষয় নিয়ে বেশি বলতেন, তুমি লেখাপড়া ছেড়ে ফুটবল খেলবে? তাও বাংলাদেশে। ডেনমার্কেই তো বেশ ভাল ছিলে। পড়াশোনা-খেলা দু’টোই এক সঙ্গে চালাতে পারতে। কিন্তু বাবার কথা একটাই, আমি যেন বাংলাদেশেই ফুটবল ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠা করতে পারি। এ নিয়ে বাবা-মা’র মধ্যে কোন ঝগড়া হতো কিনা জানতে চাইলে জামাল বলেন, একদম না। আমি বুঝতে শেখার পর থেকে দেখে আসছি তাদের দু’জনের মধ্যে অনেক মিল ও সুসম্পর্ক। আসলে খেলা নিয়ে মায়ের কোন আপত্তি ছিল না। তার প্রত্যাশা ছিল আমি যেন পড়াশোনায় বেশি জোর দেই। তবে আমি মাকে বুঝাতে চেষ্টা করতাম, বাবার ইচ্ছাটাই আমি পূরণ করতে চাই। মা তখন হাসতেন, মন খারাপ করতেন না কখনও।

প্রসঙ্গত, জামাল ভূঁইয়াকে এখন বাংলাদেশের ফুটবলের ‘প্রাণ ভোমরা’ বলা যায়। জাতীয় দল, ক্লাব ফুটবল, সবখানেই তার রাজত্ব। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশকে ঐতিহাসিক জয় উপহার দিয়েছিলেন গত বছর জাকার্তা এশিয়ান গেমসে। তার দেয়া একমাত্র গোলেই শক্তিশালী কাতার যুবদলকে হারিয়ে এশিয়ায় বাংলাদেশের ফুটবলকে আলোচনায় নিয়ে আসেন তিনি। ওই আসরে বাংলাদেশ জাতীয় যুবদলের অধিনায়ক ছিলেন জামাল। অধিনায়কের দায়িত্ব প্রসঙ্গে জামাল মনে করেন, একটু কঠিনই। আবার মনের জোর থেকে চিন্তা করলে তেমন চাপের নয়। তবে অধিনায়ক মানেই দল নিয়ে বাড়তি চিন্তা করতে হয়। ম্যাচ চলার সময় মাঠে গোটা দলকে নির্দেশনা দিতে হয়। অনেক সময় দেখা যায় একজন প্লেয়ার নিজের পজিশন ছেড়ে ওপরে বা নিচে নেমে পড়েছে, খেলার ধারা অনুযায়ী তখন তাকে পজিশন ঠিক রাখার কথা বলতে হয়। যদিও ম্যাচের রণকৌশল কোচই নির্ধারণ করে থাকেন। কোন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কিভাবে খেলতে হবে ফর্মেশনটা তিনিই তৈরি করেন। যা আমরা মাঠে প্রয়োগ করার চেষ্টা করি। খেলার সময় মাঠের দায়িত্ব থাকে অধিনায়াকের ওপর। কোচের ছকটা আমরা ধরে খেলছি কিনা লক্ষ্য রাখতে হয়। কেউ ভুল করলে তাকে নির্দেশনা দিতে হয়। কোন পজিশনে প্রতিপক্ষের কোন খেলোয়াড়কে কিভাবে মার্কিং করতে হবে সেদিকেও নজর রাখতে হয়। বলতে পারেন একটু বাড়তি দায়িত্ব-বললেন জামাল।

আপনি ক্যাম্প বা অনুশীলনে সতীর্থদের সঙ্গে পারতপক্ষে কথা বলতে চান না, একটু কম মিশেন, প্রশ্নের উত্তরে জামাল মৃদু হেসে বললেন, এটা তো শুরুর দিকের কথা। তখন দলের কারও সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। ফলে আমার সঙ্গে কথা বলতে ওরাও একটু জড়তায় ভুগত। আমি নিজেও তাই। সেটা ভাষাগত সমস্যার কারণে। আমি তখন বাংলা বুঝতাম না। এখন আর এসব সমস্যা নেই। বিদেশী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলা শুরুর আগে জাতীয় সঙ্গীত বাজত। সতীর্থদের সঙ্গে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আমি সুর মিলিয়ে গাইতে পারতাম না। চুপ করে থাকতাম। খুব খারাপ লাগত নিজের কাছে। এই সমস্যাও এখন নেই। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’-দিব্যি গাইতে পারি। খুবই ভাল লাগে জাতীয় সঙ্গীত শোনার সময়, দেশপ্রেম জাগ্রত হয়। যদিও আমি কথা কম বলতে পছন্দ করি। কিন্তু ক্লাব বা জাতীয় দল যে জার্সিতে যখন খেলি সবার সঙ্গে আন্তরিক থাকার চেষ্টা করি। অধিনায়ক হওয়ার পর মেলামেশা বেশি করতে হয়। সবার সঙ্গে পরামর্শ, টিম মিটিং করতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা অনেকদিন তো হয়ে গেল আমি বাংলাদেশে খেলছি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সবার সঙ্গে সম্পর্কটা জোরালো হয়ে গেছে। তা না হলে তো অধিনায়কত্ব করতে পারতাম না। সবার সঙ্গে আন্তরিক হতে না পারলে এই গুরু দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হতো না। এখন একটা বিষয়ে আমাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হয়। সেটা নিজের পারফর্মেন্স। অধিনায়ক যদি মাঠে অন্যদের চেয়ে বেটার খেলতে না পারে তাহলে দলের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। গোটা দল চাঙ্গা রাখতে অধিনায়ককে তার সেরা নৈপুণ্য উপহার দিতে হয়। পরিশ্রমী হতে হয় মাঠে। আমি এ বিষয়টা মাথায় রেখে খেলার চেষ্টা করি। এখন দর্শক, টিম ম্যানেজমেন্ট ভাল বলতে পারবে আমি কতটা সফল।

প্রায় আট বছরের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি বাংলাদেশের ফুটবল আগের চেয়ে অনেক বদলে গেছে। একজন তরুণ হিসেবে আমি যাদের সঙ্গে লাল-সবুজ জার্সি পরে খেলা শুরু করেছিলাম তাদের প্রায় সবাই ছিটকে গেছেন। সিনিয়রদের মধ্যে কেবল গোলরক্ষক আশরাফুল ও ফরোয়ার্ড মামুনুল টিকে আছেন। বয়সের দিক থেকে এ দু’জনের পরেই আমি। আমার বয়স এখন ২৮ চলছে। আমার আগে অধিনায়কত্ব করতেন মামুনুল। তিনি অনিয়মিত হয়ে পড়ায় এই দায়িত্ব এখন আমার কাঁধে। গোলরক্ষক বাদে আমার সঙ্গে যারা বর্তমানে জাতীয় দলে খেলছে তারা বয়সে তরুণ। তবু ওরা খুবই ভাল খেলছে। গতি, ছন্দ, ফিটনেস-কোনকিছুর ঘাটতি নেই। আর এ কারণেই দিনকে দিন ভাল খেলছে বাংলাদেশ। বর্তমান টিমটা অনেকদিন সার্ভিস দিতে পারবে জাতীয় দলকে। খেলতে খেলতে অভিজ্ঞতার ঝুলিটা যখন ভরে যাবে তখন অন্য এক বাংলাদেশকে দেখবে ফুটবলবিশ্ব। এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস। এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ব্রিটিশ কোচ জেমির (জেমি ডে)। বিগত এক/দেড় বছরে তার হাত ধরে জাতীয় দলে জায়গা করে নেয়া তরুণরা বেশ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে মাঠে। ফুটবল মেধা, ভাল খেলার তাড়না আছে সবার মধ্যে। জেমি দায়িত্ব নেয়ার আগে আমি আরও দু’জন বিদেশী কোচ টম সেইন্টফিট ও লুডভিক ডি ক্রুইফের অধীনে খেলেছি। ওই দু’জনের চেয়ে জেমি অনেক কৌশলী, সাউন্ড ট্যাকনিক্যাল।’ আমরা সবাই অবগত, জেমির দিক নির্দেশনা অনুযায়ী ভাল খেলতে না পারলে দল থেকে বাদ পড়তে হবে। জেমির সবচেয়ে বড় গুণ তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। দল বা একাদশ নির্বাচনে অন্য কারও নাক গলানো পছন্দ করেন না। স্পষ্টবাদী, ব্যক্তিত্ববান এই ব্রিটিশের অধীনে খেলতে খুব ভাল লাগছে। এই কোচ ধরে রাখতে পারলে আগামী দুই বছরের মধ্যে পাল্টে যাবে দেশের ফুটবলের চিত্র। শুধু প্রশিক্ষণ বা টিম মিটিংয়েই নয়। গোটা দলের মধ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় অনেক ভূমিকা রাখেন জেমি। তার সহযোগী বা কোচিং স্টাফদের দায়িত্ব পালন নিয়েও তিনি সিরিয়াস। ফিটনেস, ডাক্তারি পরীক্ষা, ঠিক সময়ে খাবার খাওয়া সবকিছু ঠিকঠাক মতো হচ্ছে কিনা সব খবরই তিনি রাখেন। জেমির ভালভাবেই বুঝতে পারেন বর্তমানে আমাদের দৌড় কোন পর্যন্ত। আর এ কারণে প্রতিপক্ষ বুঝে কৌশল নির্ধারণে তার কোন সমস্যা হয় না। যার ফসল ঘরে তুলছে বাংলাদেশ দল। যদিও আহামরি কিছু অর্জন করতে পারিনি। তবে আগামীতে যে কোন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমরা আরও ভাল খেলতে পারব। আগেই বলেছি, ভাল কিছু করার জন্য জেমিকে ধরে রাখতে হবে। তাকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

জামাল যোগ করলেন, অধিনায়ক হিসেবে আমি সব সময় সতীর্থদের একটা কথাই বেশি বলে থাকি, জাতীয় দলে ভাল খেলতে পারলেই নিজের ভবিষ্যত উজ্জ্বল করা সম্ভব। বড় তারকা হওয়ার সেরা মঞ্চ হচ্ছে জাতীয় দল। এই জার্সিতে সেরাটা দিতে পারলে বিশ্বকে দেখাতে পারব আমরা প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে ভাল খেলতে পারি। আমি যখন বাংলাদেশে প্রথম আসলাম তখন এখানকার ফুটবল, তথা খেলোয়াড় সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। মনের জোর, আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে চেষ্টা করেছি। আমার পরিশ্রম বৃথা যায়নি। অন্যদের মতো সাধারণ খেলোয়াড় হিসেবে শুরু করে নিজের যোগ্যতাবলে আমি বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়ক। যদিও অধিনায়ক হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে শুরু করিনি। চেষ্টা, পরিশ্রমই আমাকে এই আসনে স্থান করে দিয়েছে।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক ক্লাব কাপ ফুটবল। এই আসরে স্বাগতিক চট্টগাম আবাহনীর অধিনায়ক এ মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে আলোচিত ফুটবলার জামাল ভূঁইয়া। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের দল সাইফ স্পোর্টিংয়ের এই অধিনায়ককে ধারে খেলাচ্ছে আবাহনী যোগ্য মর্যাদা দিয়ে। সুনামের সঙ্গে খেলে জামাল প্রথম পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন ২০১৪ সালে, শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাবের জার্সিতে। ভুটানের কিংস কাপে চ্যাম্পিয়ন হয় শেখ জামাল। টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলার মনোনীত হন জামাল। একই বছর দেশে অনুষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপেও তিনি হয়েছিলেন সেরা ফুটবলার। জামালের বড় গুণ, তিনি নিজে খেলেন, গোটা দলকে খেলাতে পারেন। নেতৃত্ব দিতে পারেন দারুণভাবে। কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ বাছাই ম্যাচে প্রায় মাঝমাঠ থেকে নেয়া তার চোখ ধাঁধানো ফ্রি কিক ভারতের গোলরক্ষক গুরুপ্রীতি সিং সান্ধুকে বোকা বানিয়ে গোলমুখে পড়লে দর্শনীয় হেডে গোল করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়েছিলেন সাদউদ্দিন। ভারতীয় মিডিয়ায় জামালের এই অসাধারণ ফ্রি কিক দারুণ প্রশংসা পায়। যদিও শুধু ফুটবল নয়, কোন খেলায় ভারতীয় মিডিয়া নিজেদের ছাড়া কিছুই বুঝে না। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের প্রশংসা না করায় অভ্যস্ত সেই ভারতীয় মিডিয়ায় জামালের এই শটের মূল্যায়ন করেছে। ‘বিষমাখা’ এক অবিশ্বাস্য বাঁক খাওয়ানো শট হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এ থেকে সহজেই অনুমেয় জামাল কত বড় মাপের ফুটবলার। এক কথায় তিনি এখন বাংলাদেশের গৌরব।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া