১৪ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলাদেশে ডেইরি শিল্পের সম্ভাবনা

  • ড. মিহির কুমার রায়

বাংলাদেশের ডেইরি শিল্প দেশের মানুষের পুষ্টি, খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান রাখছে যা অনস্বীকার্য। আমাদের জনসংখ্যা রাড়ছে যার সঙ্গে দুগ্ধ সামগ্রীর চাহিদাসহ উৎপাদন রাড়ছে। বাংলাদেশ সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদফতর (২০১৮) এর তথ্যমতে দেশে প্রতি বছর ৯০ লাখ ২৪ হাজার টন দুধ উৎপাদন হচ্ছে কিন্তু চাহিদা রয়েছে ১ কোটি ৫৮ লাখ টন অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ টনের কিছু বেশি। এর মানে হলো বাংলাদেশ তার মোট প্রয়োজনের মাত্র ৬৩ শতাংশ উৎপাদন করছে এবং বাকি ৩৭ শতাংশ ঘাটতি পূরণের জন্য প্রতি বছর প্রায় এক হাজার পাঁচ শ’ কোটি টাকার দুধ আমদানি করছে। বিজ্ঞজনসহ সমাজ বিশ্লেষকগণ মনে করছেন যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা গুঁড়া দুধ আমদানিতে ব্যয় হয় তা যদি স্থানীয় দুগ্ধ উন্নয়নে ঋণ কিংবা প্রণোদনা হিসাবে ব্যবহৃত হতো তা হলে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে চাহিদার ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হতো। কিন্তু দেশে দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধির পথে প্রধান অন্তবায়গুলো হলো জমির দুষ্প্রাপ্যতা, গবাদি পশুর পর্যাপ্ত খাাবরের স্বল্পতা ও গরুর উৎপাদন ক্ষমতা। সাবির্ক ব্যবস্থাপনা তথা নীতি সহায়তা পেলে বাংলাদেশ যে দুগ্ধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে এ বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে একজন মানুষের প্রতিদিন ২৫০ মিলিমিটার দুধ পান করা প্রয়োজন অথচ সেখানে প্রতিটি মানুষের প্রাপ্তি মাত্রা ৪০ মিলিমিটার। সেই হিসাবে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মতে সারাদেশে প্রতিদিন মাথাপিছু দুধের চাহিদা ১৪ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন টন এবং একই সময়ে উৎপাদন হয় ৬ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন টন অর্থাৎ প্রতিদিনের ঘাটতি দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৫১ মিলিয়ন টন। এই বিশাল ঘাটতি পূরণের জন্য এখন আমদানি বাণিজ্যই একমাত্র ভরসা অথচ এই সকল পণ্যে যে স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে তা নিয়ে কেউ কোন কথা বলছে না, অথচ এই শিল্পের বিকাশে বাংলাদেশে যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে তা বাস্তবায়িত করা গেলে দেশ পুষ্টিতে স্বয়ম্ভর হবে।

বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের লক্ষ্য ভোক্তার কাছে মানসম্মত ও গ্রহণযোগ্য মানের দুগ্ধ উৎপাদন বাড়িয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং এ ব্যাপারে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর প্রাণিসম্পদ ও দুগ্ধ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। দুধকে একটি আদর্শ খাদ্য বলা হয় যেখানে পুষ্টির সকল গুণাবলীগুলো রয়েছে যা বিশেষ করে শিশুদের শারীরিক গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাই দুধের পবিত্রতা রক্ষা করা সকলেরই দায়িত্ব বিশেষ করে উৎপাদক ( চাষী), ব্যবসায়ী (ঘোষ) ও প্রক্রিয়াজাতকরণ (কোম্পানি) পর্যায়ে যার সঙ্গে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা/খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত রয়েছে। বর্তমান সময়ে খাদ্যে নিরাপত্তায় ভেজাল একটি বহুল আলোচিত বিষয় এবং পত্রিকার পাতায় কিংবা টেলিভিশনের টকশোতে একটি জনপ্রিয় ফিচার বলে আলোচিত। বর্তমান সময়ে মানুষ খুবই স্বাস্থ্য সচেতন বিশেষত ভোজালমুক্ত খাদ্য গ্রহণের ব্যাপারে এবং সম্প্রতি সরকার ৫২টি কোম্পানির পণ্যকে ভেজাল পণ্য হিসাবে নিষিদ্ধ করেছে। আরও মজার ব্যাপার যে, রমজান মাস এলেই এই সকল ভেজালবিরোধী অভিযানের নিবিড়তা বেড়ে যায় এবং বিভিন্ন কোম্পানিকে ভেজাল খাদ্যের জন্য লাখ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। বাংলাদেশ দুধ সঙ্কট ২০১৯ এই নামে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড এ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউশন তাদের জারিকৃত প্রত্যয়নের আওতায় দেশের যে চৌদ্দটি কোম্পানি পাস্তুরিত দুধের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে দৈবচয়নের মাধ্যমে দুধের নমুনা সংগ্রহ করে দেশের চারটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেমন জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা গবেষণাগার, বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদের গবেষণাগার, আসিডিডিআরবির গবেষণাগার ও বাংলাদেশ পানিসম্পদ ইনস্টিটিউটের গবেষণাগার ইত্যাদিতে পাঠিয়ে নির্ধারিত বিষয়ে আদলতে প্রতিবেদন দিতে হবে যে এই সকল কোম্পানির দুধে এ্যান্টিবায়োটিক, ব্যাক্টেরিয়া, ফরমালিন, ডিটারজেন্ট, কলিফর্ম, অম্লতা ও স্টেফাইলোকক্কাস- এসব ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে কিনা? এই কারণে বাজারে প্রচলিত পাস্তুরিত প্যাকেটজাত দুধের বিশুদ্ধতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সেই সময়ে বিভিন্ন ধরনের সন্দেহ ও নৈতিকতার প্রতি অবিশ্বাস থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টার ও ঔষধ প্রযুক্তি বিভাগ একটি গবেষণা শুরু করে বিগত জুন ২০১৯। দেশে বিদ্যাশিক্ষা ও প্রযুক্তির অনেক প্রসার হয়েছে, জাতীয় প্রবৃদ্ধি তথা আয় বেড়েছে, মানব উন্নয়ন সূচকে উর্ধগমন ঘটেছে কিন্তু ব্যবসায় লাভের আশায় দুধে ভেজাল মেশাতে আমাদের এতটুকু দ্বিধাদ্বন্দ্ব মনে হয় না যা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম শিশুদের সুস্বাস্থ্য নিয়ে রেড়ে উঠার জন্য বিশেষ হুমকি। পবিত্র রমাজান মাসে দুধ, ডিম, মাংস, মাছ, তরিতরকারি-শাক-সবাজি ইত্যাদি চাহিদা যেহেতু বেড়ে যায় তাই সেই সময়ে ভেজালভরা খাদ্য সামগ্রীতে কার্বাইড, ফরমালিন, তুতে হলোফেন ও বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি অনেকাংশে খাদ্য কলুষিত করছে। কেয়ার বাংলাদেশ এর আর্থিক সহায়তায় একটি প্রকল্প যার শিরোনাম Strengthening the Value Chain-এর আওতায় দুগ্ধ শিল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে দুধের অণুজীব বিজ্ঞান মান যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে বগুড়া, গাইবান্ধা, নীলফামারী, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, রংপুর এবং সিরাজগঞ্জ জেলার ১৮টি উপজেলায় এই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয় ৪৩৮টি নমুনা সংগ্রহের মাধ্যমে বিশেষত দুগ্ধ উৎপাদন, হিমাগার, স্থানীয় রোস্তরাঁ, কাঁচা দুধ থেকে। তা ছাড়াও বগুড়া ও ঢাকার বিভিন্ন দোকান থেকে বাণিজ্যিকভাবে প্রক্রিয়াজাতকৃত দুধের ৯৫টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা যায় প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী পর্যায়ে ৭২ শতাংশ এবং ৫৭ শতাংশ নমুনা যথাক্রমেÑ কোলিফম ও ফিক্যাল কোলিফম ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত নমুনা, ১১ শতাংশ উচ্চ বালাই দ্বারা দূষিত অথচ ফিক্যাল কোলিফম ব্যাকটেরিয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। উৎপাদনকারীদের থেকে দুধ সংগ্রহের নমুনায় দেখা যায় সেগুলো উচ্চসংখ্যক কোলিফম ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত ৯১ শতাংশ ও মল দ্বারা দূষিত ৪০ ভাগ উচ্চসংখ্যক ই-কোলাই দারা দূষিত। পাঁচটি জেলার ১৫ হিমাগারে সংগৃহীত নমুনাগুলোতে উচ্চ মাত্রার কোলিফম ও মলবাহিত কোলিফম পাওয়া গেছে যা ৬৭ শতাংশেই আক্রান্ত। গবেষণায় আরও দেখা যায় সর্বস্তর থেকে সরবরাহকৃত দুধে ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সর্বশেষে গবেষণা দলের প্রধান বলেন- বাজারে পাস্তুরিত কাঁচা দুধে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর অস্তিত্ব পাওয়া গেলে তা অবশ্য ভালভাবে ফুটিয়ে খেতে হবে। আবার দুধের প্রাথমিক উৎপাদনকারী পর্যায়ে দূষণের সঙ্গে গরুর প্রজনন প্রক্রিয়া, গরু থেকে প্রাপ্ত উৎপাদিত হারের পরিমাণ, দুধ দোহানের সময় এবং যিনি দুধ দোহান তার হাত ধোয়ার অভ্যাসের মতো বিষয়গুলো জড়িত। তাই সবার জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর দুধ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্যকরভাবে দুধ সংগ্রহ সংরক্ষণ ও পাস্তুরিত করার বিষয়ে যতœবান হতে হবে। এছাড়াও পানের জন্য দুধকে নিরাপদ রাখতে উৎপাদন স্থান থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত প্রত্যেকটি পর্যায়ে পাস্তারিত দুধকে নিরাবচ্ছিন্ন ভাবে শীতল রাখার পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এখন যে সকল প্রতিষ্ঠান এই কাজটির সাথে জড়িত তাদের ব্যবসায়িক নৈতিকতা এখন সবচেয়ে বড় বিষয়। অথচ এই বিষয়টি ব্যবসায়িক মুনাফার কাছে প্রতিনিয়তই হার মানছে যা মানুষ সৃষ্টি সম্যসা। কারন পুষ্টি মানের বিচারে দুগ্ধ পন্যের প্রয়জোনীয়তা অনস্বীকার্য হলেও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এই স্থবিরতা কাটিয়ে উঠার কোন লক্ষ্য দেখা যাচ্ছে না। এখন সরকার তাদের সপ্তম বার্ষিক পরিকল্পনায় প্রাণী সম্পদের সংখ্যা উল্লেখ করেছেন যথক্রমে- দুগ্ধবতী গাভী ২৩ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন, মহিষ ১ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন এবং ছাগল ২৫ দশমিক ৬০ মিলিয়ন। এই সকল প্রাণী থেকে বছরে দুগ্ধ উৎপাদন হয় ৬ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন টন যা চাহিদার তুলনায় কম। এর প্রধান কারণ বাজেটে অপযাপ্ত অর্থ বরাদ্দ ও বেসরকারী খাতে উদ্যোক্তার অভাব। তাই পরিকল্পনা মেয়াদে বেশ কিছু পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হচ্ছে যেমন ডেইরি খাতে সমবায়ের উপস্থিতি, ডেইরি চাষীদের উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহ, গবাদি পশুর খাদ্য উৎপাদন, প্রাণী স্বাস্থ্য রক্ষায় ভেটেরিনারি সেবা বৃদ্ধিকরণ ও ক্ষুদ্রকায় খামারিদের লোন সুবিধা প্রদানসহ বিপণন ব্যবস্থা জোরদারকরণ। এই বিষয়গুলোর সুষ্ট বাস্তবায়নে প্রয়োজন সরকারের নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা ও বাজেট বরাদ্দ।

দুগ্ধ থেকে তৈরি বিভিন্ন সামগ্রীর বিশাল বাজার সারাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে যার চাহিদা অফুরন্ত যদি তা ভেজালমুক্ত হয়। তাই আসুন আমরা সবাই মিলে এই ভেজালবিরোধী অন্দোলনের শরিক হই এবং একটি পুষ্টিকর জাতীয় বিনির্মাণে এগিয়ে আসি। আমাদের স্লোগান হোক ভেজালহীন পুষ্টি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ আর দুগ্ধশিল্প হোক তার প্রথম সারির কা-ারি কি কর্মহীনের কর্মসংস্থানে, আয় বৃদ্ধিতে ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া