২০ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দিল্লী কাঁপিয়ে দিলেন মুশফিক

  • মোঃ মামুন রশীদ

অযুত লড়াইয়ে নিযুত ভয় কিংবা অদৃশ্য এক ‘জুজু’তে আক্রান্ত হয়ে বার বারই যেন তীরে গিয়ে তরী ডুবছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের। ওয়ানডে ক্রিকেটে ভারতের বিপক্ষে বেশ কয়েকটি জয় এসেছে, আবার অনেক জয় আসেনি এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে পিছিয়ে থাকার কারণে। টি২০ ক্রিকেটে বেশ কয়েকবার হাতের মুঠোয় পেয়েও মানসিক বাঁধায় আটকে ভারতের কাছে হেরে গেছে বাংলাদেশ দল। ২০১৬ টি২০ বিশ্বকাপে মহা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ব্যাঙ্গালুরুতে ১ রানের পরাজয়টি সবচেয়ে দুর্বিষহ, হৃদয়ে রক্তক্ষরণের। সেই হতাশায় পুড়েছেন সবচেয়ে বেশি মুশফিকুর রহীম। তিনিই অবশেষে রাজধানী দিল্লীতে ভারতীয় দলের দর্পচূর্ণ করেছেন ৪৩ বলে ৬০ রানের হার না মানা বিধ্বংসী ইনিংস খেলে। সেই সুযোগে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ তরুণ শিভম দুবেকে ছক্কা হাঁকিয়েই ভারতের বিপক্ষে টি২০ ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম জয় এনে দিয়েছেন। সেই ম্যাচটিও আবার টি২০ ক্রিকেটের ইতিহাসে অনন্য এক মাইলফলকের। ১০০০তম আন্তর্জাতিক টি২০ ম্যাচ ছিল এটি। টানা ৮ ম্যাচ ভারতের কাছে হেরে অবশেষে এই জয়ে ভারতের বিপক্ষে অদৃশ্য ‘জুজু’ তাড়িয়েছে বাংলাদেশ দল।

ভারতের বিপক্ষে বরাবরই মুশফিকের ব্যাট চওড়া ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। আন্তর্জাতিক টি২০ ক্যারিয়ারে নিজের সেরা অপরাজিত ৭২ রানের ইনিংসটি ভারতের বিপক্ষেই খেলেছিলেন। আর সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল ও মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের মতো সেরা পারফর্মাররা দলে না থাকায় এবার ভারত সফরে মুশফিকের ওপর নির্ভরতা আরও বহুগুণে বেড়ে যায় দলের। সেই আস্থার প্রতিদান প্রথম ম্যাচেই দেয়ার সুযোগ পেয়ে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। ভারতের বিপক্ষে এর আগে কোন দ্বিপাক্ষিক টি২০ সিরিজ খেলেনি বাংলাদেশ দল। দু’দলের দেখা হয়েছে টি২০ বিশ্বকাপ, টি২০ এশিয়া কাপ ও নিদাহাস ত্রিদেশীয় টি২০ সিরিজে। এ কয়েকটি ইভেন্টে ৮ বারের মোকাবেলায় প্রতিবারই হেরেছে বাংলাদেশ দল। এর মধ্যে অন্তত তিনবার নিশ্চিত জয়ের সুযোগ পেয়েও হাতছাড়া করেছে বাংলাদেশ। সবচেয়ে হতাশাজনক ও দুর্বিষহ পরাজয়টি ২০১৬ টি২০ বিশ্বকাপে ব্যাঙ্গালুরুতে। ভারতের করা ৭ উইকেটে ১৪৬ রানের জবাবে বাংলাদেশের শেষ ওভারে প্রয়োজন ছিল ১১ রানের। তখনও হাতে উইকেট ৪টি, ক্রিজে অভিজ্ঞ দুই ব্যাটসম্যান মুশফিক-মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। বরাবরই এ দু’জন দলের নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান হিসেবে স্বীকৃত। ওভারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বলে হার্দিক পান্ডিয়াকে টানা দুই চার হাঁকিয়ে সমীকরণটাকে সহজ করে ফেলেন মুশফিক, ৩ বলে প্রয়োজন ২ রানের। তাই উল্লাসে ফেটে পড়েন মুশফিক, উদযাপনও করেন। কিন্তু পরের বলেই তুলে মারতে গিয়ে তিনি এবং পঞ্চম বলে একভাবে রিয়াদ ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন। শেষ বলে জয়ের জন্য ২ রান দূরের কথা কোন রানই আসেনি, রানআউট হয়েছেন মুস্তাফিজুর রহমান। নাটকীয়ভাবে ১ রানে হেরে বাংলাদেশীদের হৃদয় ভেঙ্গে যায়। সেই একই পরিস্থিতি যেন দিল্লীতে সাড়ে ৩ বছর পর মঞ্চায়িত হচ্ছিল। শেষ ওভারে ৪ রান প্রয়োজন, ক্রিজে সেই মুশফিক-মাহমুদুল্লাহ। এবার তারা ভুল করেননি, দু’দলের রানে সমতা আসার পর শিভম দুবেকে ছক্কা হাঁকিয়ে জয় নিশ্চিত করেছেন মুশফিক। মুশফিক বলেন, ‘বড় ব্যাপার হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরেই এমন পরিস্থিতি থেকে আমাদের জিতে আসাটা মানুষ মনে রাখেনি। এই ম্যাচও যদি আমরা হেরে যেতাম, দীর্ঘদিন তারা মনে রাখত। ব্যাঙ্গালুরুতে আমরা শেষ দুই ওভারে অনেক ভাল অবস্থানে ছিলাম। কিন্তু এমন উইকেটে যেখানে রান করাটা খুবই কঠিন, সেখানে আমরা অবশ্যই কঠিন পরিস্থিতিতে ছিলাম। শেষ দুই ওভার নিশ্চিতভাবেই চ্যালেঞ্জিং হতে যাচ্ছিল। বাউন্ডারি হাঁকানোর মতো সহজ রাস্তাই পাচ্ছিলাম না।’

আরেকটি বড় সুযোগ হারিয়েছে দল গত বছর নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে। শেষ বলে ছক্কা হজম করে পরাজিত হয় দল। এসব অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে মুশফিকের। তা ছাড়া সম্প্রতিই বাংলাদেশের ক্রিকেটে ঘটে গেছে অনেক অযাচিত ঘটনা। জুয়াড়িদের কাছে ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব তিনবার পেয়েও তথ্যটা গোপন করে সাকিব ২ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হন আইসিসি থেকে। তাই শেষ মুহূর্তে আসতে পারেননি ভারত সফরে। সন্তান সম্ভবা স্ত্রীর পাশে থাকতে নাম প্রত্যাহার করে নেন অপরিহার্য ওপেনার তামিম ইকবাল, ইনজুরিতে ছিটকে যান সম্প্রতি উজ্জ্বল পারফর্মার পেস অলরাউন্ডার মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। ধর্মঘটে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সঙ্গে ক্রিকেটারদের মন কষাকষির রেশও থেকে গেছে। এই পরিস্থিতিতে ঠিকমতো প্রস্তুতিও নিতে পারেনি দল এবং ভয়ানক বায়ু দূষণের নগরী দিল্লীতে এসেও পুরোপুরি স্বাচ্ছন্দ্যে থেকে অনুশীলন করতে পারেনি দল। সব মিলিয়ে এবার ভারতের বিপক্ষে জয় পাওয়ার চিন্তাটাও করেননি বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা। কিন্তু মুশফিক দেশ ছাড়ার আগে বলেছিলেন, ‘আমি দেশ ছাড়ার আগে সাংবাদিকদের বলেছি যে, দেশের ক্রিকেট সঠিক অবস্থানে ফিরিয়ে আনার জন্য একমাত্র উপায় ভারতে গিয়ে একাধিক জয়। সেটাই শুধু দলের সবাইকে এবং জাতিকে শান্ত-সুস্থির করে হাসি ফিরিয়ে আনতে পারবে। আমি চাই তরুণরা ৮-১০ বছরেই এমন অবস্থানে পৌঁছাক যেখানে পৌঁছতে আমার ১৫ বছর লেগে গেছে।’ অর্থাৎ এখন আরও জয়ের আশা করছে বাংলাদেশ দল। একটি জয় আত্মবিশ্বাসের পারদটাকে অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছে স্বাভাবিকভাবেই।

মুশফিক ব্যাঙ্গালুরু আর কলম্বোর দুঃখটা ভুলেছেন দিল্লীতে এসে। সেটাও কঠিন মুহূর্তে ব্যাট করতে নেমে। ভারতের করা ৬ উইকেটে ১৪৮ রানের জবাবে ৫৪ রানেই ২ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল দল। পেরিয়ে গেছে ৮ ওভার! ১২ ওভারে আরও ৯৫ রান করতে হবে। মুশফিক সেই পরিস্থিতিতে সৌম্য সরকারের সঙ্গে তৃতীয় উইকেটে ৬০ রানের জুটি গড়েন। সৌম্য বিদায় নিলেও থেকেছেন শেষ পর্যন্ত। শেষ ২ ওভারে তবু কঠিন হয়ে গিয়েছিল জয় তুলে আনা। ২২ রান প্রয়োজন ছিল ২ ওভারে। ১৯তম ওভারে খলিল আহমেদকে শেষ চার বলে টানা বাউন্ডারি হাঁকিয়ে সমীকরণ সহজ করেন মুশফিক। শেষ ওভারে ৪ রান প্রয়োজন, সেখানে ৪ বলে ১ রানে নেমে আসার পরই দুবেকে ছক্কা হাঁকিয়ে বাংলাদেশের জন্য ভারতের বিপক্ষে টি২০ ক্রিকেটে প্রথম জয় এনে দেন রিয়াদ। ৪৩ বলে ৮ চার, ১ ছক্কায় ৬০ রানের অপরাজিত ইনিংসে বিজয়ীর বেশে মাঠ ছাড়েন মুশফিক নীরবেই। কারণ, এখন সিরিজ জিততে পারলে তবেই উদযাপন করবেন। ক্যারিয়ারে ৫টি অর্ধশতক আছে তার আন্তর্জাতিক টি২০ ক্রিকেটে। এর মধ্যে ভারতের বিপক্ষেই দুটি। ভারতের বিপক্ষে ৯ টি২০ ম্যাচের সবটিতেই খেলে ৪৫.০০ গড়ে তিনি ২২৫ রান করেছেন। স্ট্রাইকরেট ১২২.২৮। অথচ ৮২ টি২০ খেলে তার ক্যারিয়ার রান ১১৯.৭৫ স্ট্রাইকরেট ও ২০.৬৭ গড়ে ১২৬১। ভারতের বিপক্ষে তার এমন সমীকরণই এখন সিরিজ জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। নিঃসন্দেহে সে জন্য মুশফিকের ব্যাটের ওপরই ভরসা করতে হবে বাংলাদেশ দলকে।

নির্বাচিত সংবাদ