২০ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ক্রিকেটের আলোচিত যত নিষেধাজ্ঞা

  • শাকিল আহমেদ মিরাজ

ক্রিকেটে নিষেধাজ্ঞা অনেক রকমের হতে পারে। অসদাচরণের জন্য নিষেধাজ্ঞা, অবৈধ বোলিংয়ের জন্য নিষেধাজ্ঞা, মাদক নেয়ার জন্য নিষেধাজ্ঞা, মাঠে বিভিন্ন ধরনের ফিক্সিং ও অনৈতিক পন্থা অবলম্বেনের জন্য নিষেধাজ্ঞা। ম্যাচ পাতানো, টাকার বিনিময়ে স্পট ফিক্সিং, বলের আকৃতি পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে এ পর্যন্ত নিষিদ্ধ হওয়া ক্রিকেটারদের মধ্যে অনেক বড় বড় নাম রয়েছে। তার মধ্যে সেলিম মালিক, মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন, হ্যান্সি ক্রনিয়ে, সালমান বাট, মোহাম্মদ আমির, মোহাম্মদ আসিফ, শেন ওয়ার্ন, মোহাম্মদ আশরাফুলের নাম উল্লেখ্য। তারা প্রত্যেকে অনৈতিক কর্মকা-ে জড়িয়েছেন এবং সেটি প্রমাণিত হওয়ায় বিভিন্ন মেয়াদে নিষিদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু সাকিব আল হাসানের ঘটনা ব্যতিক্রম। বাংলাদেশ অধিনায়কের বিরুদ্ধে ম্যাচ পাতানো বা অন্য কোন ধরনের ফিক্সিংয়ের অভিযোগ নেই। ভারতীয় জুয়াড়ি দীপক আগরওয়ালের কাছ থেকে ক্রমাগত ‘নক’ পেয়ে সেটি তিনি ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির দুর্নীতিদমন বিভাগ কিংবা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) জানাননি। ফলে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছেন টাইগার অলরাউন্ডার।

এর মধ্যে এক বছর স্থগিত নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রথমিকভাবে এক বছর মাঠের বাইরে থাকবেন। নতুন করে কোন অপরাধে না জড়ালে এক বছর পরই ফিরতে পারবেন। আর অপরাধ করলে দুই বছর শাস্তি ভোগ করতে হবে। সাকিবের মতো এমন নিষেধাজ্ঞাও কিন্তু আরও অনেকে পেয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন লঙ্কান গ্রেট সনাথ জয়সুরিয়াও। ক্রিকেটার হিসেবে জয়সুরিয়ার জীবনে কোন কলঙ্ক লাগেনি। বরং লঙ্কান ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা তিনি। তবে নির্বাচক হওয়ার পর কালিমা লাগে তার নামের সঙ্গে। ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কা-জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে হওয়ার ওয়ানডে সিরিজের চতুর্থ ম্যাচে ফিক্সিংয়ের অভিযোগ ওঠে। তা নিয়ে তদন্তে নামে আইসিসি। সে সময়ের প্রধান নির্বাচক জয়াসুরিয়াকে তাদের সহযোগিতা করার জন্য বলা হয়। কিন্তু বার বার আইসিসিকে এড়িয়ে যাওয়া জয়াসুরিয়া ২০১৮-এর অক্টোবরে অভিযুক্ত হন। এই সময় আইসিসি তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে এড়িয়ে যান জয়াসুরিয়া। এছাড়া তার কাছে প্রমাণ চাওয়ার জন্য যোগাযোগ করা হলে নিজের মোবাইল ফোনটি নষ্ট করে ফেলেন। তাই আইসিসির সহযোগিতা না করা এবং আলামত নষ্ট করার অভিযোগে জয়াসুরিয়াকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়।

প্রায় একইভাবে জুয়াড়িদের কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়ার বিষয় গোপন করে নিষিদ্ধ হন হালের আরেক লঙ্কান অলরাউন্ডার কৌশল লোকুয়ারাচ্চি (২০১৪), ভারতের সিদ্ধার্থ ত্রিবেদী (২০১৩), দক্ষিণ আফ্রিকার থামি সোলেকিলে (২০১৫) ও হংকংয়ের ইরফান আহমেদ (২০১৬)। ফিক্সিং প্রস্তাব পেয়েছেন কিন্তু তাৎক্ষণিক যথাযথ কর্তৃপক্ষকে না জানানোর কারণে নিউজিল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার লু ভিনসেন্টকেও। ২০১৩ বিপিএলে ফিক্সিং প্রস্তাব পেয়েও তা না জানানোর অপরাধে ২০১৪ সালে ভিনসেন্টকে ৩ বছর ও লুকুয়ারাচ্চিকে ১৮ মাস নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু ভিনসেন্টের বিরুদ্ধে বিভিন্ন লিগে আরও ম্যাচ ফিক্সিং করার প্রমাণ মেলায় তাকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়। ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা দক্ষিণ আফ্রিকার দুই সাবেক ক্রিকেটার হেনরি উইলিয়ামস ও হার্শেল গিবসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ফিক্সিংয়ে জড়ানোর। কিন্তু অর্থ নিয়েও নির্ধারিত ম্যাচে জুয়াড়ির মনমতো পারফরম করেননি দুজন। বাজে খেলার বিপরীতে খুব ভাল করেছিলেন। এ কারণে আইসিসি তাদের সর্বনিম্ন ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞার সাজা দেয়।

ক্রিকেট ইতিহাসের সাড়া জাগানো কিছু ফিক্সিংকা- সেলিম মালিক- ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বপ্রথম নিষিদ্ধ হওয়া ক্রিকেটার সেলিম মালিক। সাবেক পাকিস্তান অধিনায়ক ১৯৯৪-৯৫ তে পাকিস্তানে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট সিরিজ চলাকালীন করাচী টেস্ট হারের জন্য দুই অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার শেন ওয়ার্ন ও মার্ক ওয়াহকে ঘুষ দেন। বিষয়টি প্রমাণ হলে ২০০০ সালে তাকে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়। এই অপরাধে জেলও খাটতে হয়েছিল মালিককে। অবশ্য রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে ২০০৮ সালে ক্রিকেট থেকে নিজের আজীবন নিষেধাজ্ঞা তুলতে সক্ষম হন মালিক। মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন- ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত নিষেধাজ্ঞা এটি। ১৯৯৬ সালে কানপুরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তৃতীয় টেস্টে ম্যাচ গড়াপেটার জন্য কোন এক জুয়াড়ির মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রনিয়েকে অর্থ দেয়ার অভিযোগ উঠে আজহারউদ্দিনের বিরুদ্ধে। অনেক তদন্তের পর ২০০০ সালে তাকে ক্রিকেট থেকে আজীবন নিষিদ্ধ করে আইসিসি। ২০১২ সালে অন্ধ্রপ্রদেশ উচ্চ আদালত এই রায়ের স্বপক্ষে কোন প্রমাণ খুঁজে পায়নি। তাই আজহারউদ্দিনের শাস্তি তুলে নেয়া হয়।

হ্যান্সি ক্রনিয়ে- আজহারউদ্দিনের ঘটনাতেই ফিক্সিংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে হ্যান্সি ক্রনিয়ের বিরুদ্ধে। ওই সিরিজের পর দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতের ফিরতি সিরিজে দলের ভেতরকার খবর প্রকাশের জন্য ক্রনিয়ে ৫০ হাজার ডলার পেয়েছেন বলে জানা যায়। ২০০০ সালেও বুকিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। সব অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করার পর জানা যায় ফিক্সিংয়ের সঙ্গে ক্রনিয়ের যুক্ত থাকার খবর। এ কারণে ক্রিকেট থেকে আজীবন তাকে নিষিদ্ধ করা হয় ২০০০ সালে। কিন্তু ২০০২ সালে বিমান দুর্ঘটনায় পৃথিবী থেকেই আজীবনের জন্য চলে যান ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই অধিনায়ক। বাট-আসিফ-আমির- একবিংশ শতাব্দীতে ক্রিকেটকে নাড়িয়ে দেয়া অন্যতম বড় ঘটনা এটি। ২০১০ সালে পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান বাটের নেতৃত্বে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টে ইচ্ছাকৃত নো বল করেন মোহাম্মদ আসিফ ও মোহাম্মদ আমির। পরে তাদের ফিক্সিং কেলেঙ্কারি তাদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতেই প্রমাণ হয়। যে কারণে আমিরকে ৫ বছর, আসিফকে ৭ বছর ও বাটকে ১০ বছর ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। পরে আসিফ ও বাটের নিষেধাজ্ঞাও ৫ বছরে নামিয়ে আনা হয়। নিষেধাজ্ঞার সময় কাটিয়ে তিন ক্রিকেটারই এখন ব্যাট-বলে ফিরেছেন। আমির বিশ্বকাপও খেলেছেন এবার। মোহাম্মদ আশরাফুল- বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ধাক্কা আশরাফুলের ফিক্সিংয়ে জড়িয়ে পড়া। আশরাফুল অবশ্য আন্তর্জাতিক ম্যাচে ফিক্সিং করেননি। ২০১৩ বিপিএলের একটি ম্যাচ গড়াপেটায় জড়িয়ে পড়েন তখনকার আলোচিত বাংলাদেশ তারকা। পরে নিজের স্বীকারোক্তির কারণে ৮ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হন। আপিল করে রেহাই পান ৩ বছর। ৫ বছর পর ক্রিকেটে ফিরলেও এখনও নিজের পুরনো রূপে ফিরতে পারেননি আশরাফুল।

সাকিব কোন ভুল করেননি; অপরাধ করেছেন। অন্যদিকে জুয়াড়িরা কিন্তু বহাল তবিয়তেই আছেন। বিশ্বের ক্রিকেট জুয়া প্রায় একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয় জুয়াড়িরা। তার পরেই রয়েছে পাকিস্তানী জুয়াড়িদের স্থান। জুয়াড়িদের সবাই ভারতীয় বা ভারতীয় বংশোদ্ভূত। আশঙ্কার ব্যাপার হলো, এখন পর্যন্ত কেবল খেলোয়াড়দেরই সাজা হয়েছে। জুয়াড়িদের কোন সাজা হয়নি। দেখলে মনে হবে, আইসিসি জুয়া বা পাতানো খেলার বিরুদ্ধে খুবই কঠোর। ক্রিকেটারদের বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ। কিন্তু আসলেই কি তাই? খোদ আইসিসির সদর দফতর দুবাইয়ে আস্তানা গেড়েছেন মাফিয়া কিং দাউদ ইব্রাহিম। এরপর থেকে বারবার অভিযোগ উঠেছে, আইসিসি জুয়াড়ি লালন করে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থাটির সঙ্গে ভারতের দহরম-মহরম সম্পর্কের কথা সবাই জানে। ভারতের কুখ্যাত জুয়াড়ি এন শ্রীনিবাসন বিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্টও ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ছিলেন আইসিসির চেয়ারম্যান। ক্রিকেটাঙ্গনের অনেক জায়গায় তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হলেও শ্রীনিবাসন এখনও দলবল নিয়ে বিসিসিআইয়ে দাপট দেখিয়ে যাচ্ছেন।

আইসিসি কোন পুলিশি সংস্থা নয়। তারা জুয়াড়িকে জেলে পাঠাতে পারে না। জেলে পাঠাতে দরকার ওই দেশের আইন। ভারতের জুয়া নিয়ে একটা তথ্য হলো এ রকম, এক সময় কেবল ভারত পাকিস্তানের ম্যাচকে কেন্দ্র্র করে মুম্বাইয়ে প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলারের জুয়া খেলা হতো! ইদানীং আইপিএল তো বটেই, বিপিএলের সময় বাংলাদেশে এসেও ধরা পড়ে ভারতীয় জুয়াড়িরা। এত টাকার লেনদেন যেখানে হয়, সেখানে ক্রিকেটারদের যে লোভনীয় প্রস্তাব দেয়া হবে তা বলাইবাহুল্য। সাকিব লোভ সংবরণ করেছিলেন, যা সবাই পারে না। ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা এবং নিউজিল্যান্ডে ক্রিকেট নিয়ে বাজি ধরা বৈধ।

কিন্তু শ্রীলঙ্কা ছাড়া এসব দেশে ফিক্সিংয়ের ঘটনা নিয়মিত ঘটে না। ভারতে জুয়া অবৈধ। কিন্তু জুয়াড়িরা এই দেশটিকেই স্বর্গরাজ্য হিসেবে বেছে নিয়েছে! অন্যদিকে দুবাইয়ে জুয়া নিষিদ্ধ হলেও হাস্যকরভাবে বিদেশীরা সেখানে জুয়া চালিয়ে যেতে পারেন! শুধু জুয়াই নয়; ক্রিকেটারদের ফাঁসিয়ে দিয়ে, তাদের জিম্মি করেও টাকা উপার্জন করেন এসব জুয়াড়িরা।

নির্বাচিত সংবাদ