০৬ নভেম্বর ২০১৯

পোলট্রি খাতের দুঃসময়

পোলট্রি শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধ অগ্রযাত্রায় এক অনন্য সংযোজন। ক্ষুদ্র, মাঝারি খামারিদের মাধ্যমে এই ব্যবসার গতি ত্বরান্বিত হলে কালক্রমে তা দেশের আনাচে-কানাচে সম্প্রসারিত হয়। বড় বড় খামার তৈরিতেও বেগ পেতে হয়নি। এমনই রমরমা পোলট্রি ব্যবসা বর্তমানে অসম ব্যবস্থাপনার শিকার। দুর্ভোগ আর বিপন্নতার কবলে পড়ে ব্যবসায়িক সফলতাকে আগের মতো ধরে রাখতে পারছে না। এক সময় খামারজাত মুরগির চাহিদা ছিল অনেক বেশি। দেশী মুরগির তুলনায় এর মূল্য অপেক্ষাকৃত কম বলে সাধারণ নিম্ন এবং মধ্যবিত্তের মধ্যে এর প্রয়োজন ছিল খুব বেশি। চাহিদা না কমলেও বর্তমানে সরবরাহের ঘাটতি সংশ্লিষ্ট খামারিকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ক্ষুদ্র এবং মাঝারি খামারিদের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। শিল্পটি তার লক্ষ্যমাত্রা থেকে যেভাবে সরে যাচ্ছে, তা এই খামার ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সঙ্কট। খামারি মুরগির খাদ্য ঘাটতি ছাড়াও অত্যধিক মূল্য বৃদ্ধি, নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়া মুরগি, প্রতিষেধকের অপর্যাপ্ততা সার্বিক পরিস্থিতিকে বিপন্ন করে তুলছে। বড় বড় বিদেশী খামারিদের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় এই শিল্পের বিদ্যমান সঙ্কটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই সমস্যা কবলিত হচ্ছে, শুধু তাই নয়, বৃহৎ ব্যবসায়ীরাও এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রয়োজনীয় খাদ্য পুষ্টি মেটাতেই এই পোলট্রি শিল্প। আজ সে নিজেই পুষ্টিহীনতায় আক্রান্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। খামারে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিহিত, যার মধ্যে ৪০% নারী। বড় ধরনের ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পড়েছেন চরম বিপাকে। শিল্প ঋণ প্রদানেও রয়েছে হরেক রকম বাধা বিপত্তি, জটিলতা। খামারি মুরগির উপযোগী খাদ্য ঘাটতি ছাড়াও খাদ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য ঝুঁকির মতো রাসায়নিক পদার্থ চামড়াজাত বর্জ্য। উন্নত দেশের মানুষ বছরে ৪০ থেকে ৫০ কেজি মুরগির মাংস খায়। সেখানে আমাদের দেশে মাত্র ৬.৩ কেজি। এমনিতেই জনগণের মধ্যে মুরগির মাংস তথা প্রোটিন ঘাটতির পরিমাণ দৃশ্যমান তার ওপর যদি খামার শিল্পে এমন বেহাল দশা হয় তাহলে সাধারণ স্বল্প আয়ের মানুষের পুষ্টির জোগান কিভাবে সম্ভব? সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে এই শিল্পের উৎপাদন বাড়িয়ে এর সঙ্কট নিরসন সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যসম্মত খাবার সরবরাহ করা, যাতে রোগাক্রান্ত হয়ে মুরগি এবং খামারিরা বিপন্নতার শিকার না হল। যথার্থ রোগ প্রতিরোধ প্রতিষেধক অত্যন্ত জরুরী যাতে স্বাস্থ্যসম্মত আহার মানুষের শরীরে কোন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে না পারে।

পোলট্রি শিল্পে সাতটি বিদেশী কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। বিদেশী খামারগুলো বাইরে থেকে স্বল্প সুদে ৩-৪% ঋণ গ্রহণ করলেও বাংলাদেশের খামারিদের বেশি সুদে ঋণ নিতে হয়। চড়া সুদে ব্যাংক ঋণও বাংলাদেশের খামার ব্যবসায়ীদের খামারশিল্পকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ফলে ক্ষুদ্র এবং মাঝারিদের অবস্থা হয়েছে সঙ্কটাপন্ন। প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না ঋণের আবর্তে পড়ে। ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। তার ওপর ক্ষুদ্র খামারিদের ঋণ দিতেও অনীহা প্রকাশ করে ব্যাংকগুলো। এসব বৈষম্য দূর করতে না পারলে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সংশ্লিষ্টদের হিমশিম খেতে হবে। তাই এই মুহূর্তে জরুরী স্বল্প সুদে ঋণ, পুষ্টিকর খাবার। যাতে স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কা না থাকে। এ শিল্পে নজরদারি বাড়ানো সংশ্লিষ্ট উর্ধতনকর্তৃপক্ষের রয়েছে বিশেষ দায়বদ্ধতা।