২৩ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ষড়যন্ত্র ॥ ৭ নবেম্বর

  • ফনিন্দ্র সরকার

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সংগ্রামী জীবনের মহান সাফল্য স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। রক্তে রঞ্জিত ইতিহাসের বাঁক পেরিয়ে যে সাফল্য আমরা পেয়েছি তা সত্যি বিস্ময়কর ও অভাবনীয়। আমাদের মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান জন্মেছিলেন বলেই আত্মমর্যাদাশীল একটি জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছি। আমাদের বীরগাথা রক্তাক্ত ইতিহাস বিশ্ব সমাজে অবিস্মরণীয়। আধুনিক, মানবিক ও প্রগতিশীল একটি সমাজ বিনির্মাণে বঙ্গবন্ধু এগিয়ে যাচ্ছিলেন কথিত পরাশক্তিকে ভ্রুকুটি করে। বাঙালীর অন্তরের সুপ্ত সাধনা অর্থনৈতিক মুক্তি, যা বাস্তবায়নে নেয়া হয়েছিল বহুমুখী কর্মসূচী, ঠিক সেই সময় ঘটে যায় এক কলঙ্কজনক ঘটনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি বঙ্গবন্ধুকে তাঁর বাসভবনে সপরিবারে হত্যা করে। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্য পৈশাচিকভাবে হত্যা করে ইতিহাসের চাকা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেয়। নারকীয় এই হত্যাকান্ডকে কতিপয় বিপথগামী সেনা অফিসারের দায় হিসেবে প্রচার করা হলেও এটা ছিল সদূরপ্রসারী একটি ষড়যন্ত্রেরই অংশ। স্বাধীনতাকে যারা মানেনি, মুক্তিযুদ্ধকে যারা স্বীকার করেনি সেই পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির প্রতিশোধপরায়ণ একটি জঘন্য কর্মকান্ডেরই অংশ হচ্ছে আগস্ট হত্যাকান্ড। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা মানেই বাংলাদেশ, বাঙালী জাতিসত্তাকে হত্যা করা। রক্তাক্ত ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অর্জিত স্বাধীনতাকে মুহূর্তে বিপন্ন করে দেয়া হয়। ঘটে যায় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির আনুষ্ঠানিক উত্থান। অবশ্য বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্র শুরু হয় যুদ্ধকালীন সময় থেকেই, সেই ষড়যন্ত্রের খলনায়কদের চেহারা উন্মোচিত হয় ’৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে। তারপর ২১টি বছর নানাভাবে তাদের বীভৎস চেহারা জাতি দেখেছে। ’৯৬ থেকে ২০০১ এই পাঁচটি বছর ব্যতীত ২০০১-এর এক অক্টোবর থেকে আবার প্রতিক্রিয়াশীলদের ভয়ঙ্কর মূর্তি এ জাতিকে পরিবীক্ষণ করতে হয়েছে। নানা ঘটনা, নানা ইতিহাসের তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বাঙালী জাতিকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে যে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্থান ঘটেছিল সেই শক্তির গতিপ্রবাহ ছিল টর্নেডোর মতো। বর্তমানে সে গতি পুরোপুরি রুদ্ধ না হলেও অনেকটা স্তিমিত।

১৯৭৫ সালের ৭ নবেম্বরকে একটি গোষ্ঠী সিপাহী বিপ্লব ও জাতীয় সংহতি দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। আমাদের পবিত্র মাতৃভূমিতে যারা এমন দিবস পালন করার ধৃষ্টতা দেখায়, তাদের শিকড় অনেক গভীরে। বাস্তবে দিবসটি কলঙ্কিত ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে। দেশপ্রেমিক জনতা ও সেনাবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল অবদানকে চপেটাঘাত করার ষড়যন্ত্র হিসেবেই চিহ্নিত গোষ্ঠী বিপ্লব দিবস হিসাবে পালন করে। ৭ নবেম্বরকে ঘিরে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারকে হত্যা করা হয়। সেই হত্যার নায়ক জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে নব্য পাকিস্তানে পরিণত করে শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থারও পরিবর্তন ঘটায়। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকা-, ৩ নবেম্বরের জেলহত্যা ও ৭ নবেম্বরের ঘটনা বিভিন্নভাবে একেরই পুনরাবৃত্তি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। সাধারণ মানুষের ছিল না স্বাভাবিক নিরাপত্তা। ক্রমাগত হত্যাকান্ড, ক্যু-পাল্টা ক্যু রাজনৈতিক নানা সমীকরণে সুস্থ রাজনীতি পথ হারিয়ে ফেলে। কেননা, যে দলটি স্বাধীনতার নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেই দল আওয়ামী লীগ ছিল বিপর্যস্ত। নেতৃত্বের শূন্যতায় শাসনের ভিন্নতায় জনভীতির সংস্কৃতির গ্যাঁড়াকলে জাতি ছিল অবরুদ্ধ। ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি জেঁকে বসেছিল মহান বাঙালীর ওপর। ৩ নবেম্বর বঙ্গবন্ধুর পরীক্ষিত সৈনিক তথা সহচর জাতীয় চার নেতাকে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা জেলখানায় হত্যা করা হয় নির্বিচারে। ঘাতক চক্রের প্রধান শয়তান খন্দকার মোশতাক তার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতেই জেলখানায় চার নেতাকে হত্যার নির্দেশ দেন। এখানে উল্লেখ করতে হচ্ছে, গুটিকয়েক বিশ^াসঘাতক ছাড়া আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতারা ঘৃণাভরে মোশতাককে প্রত্যাখ্যান করেন। মাত্র সাড়ে তিন মাসেই মোশতাকের পতন ঘটলেও জিয়ার নেতৃত্বে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির পুনরুত্থান ঘটে। এ এক জাতীয় ট্র্যাজেডি। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানী, মজলুম জননেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানী অবৈধ মোশতাক সরকারের সমর্থক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেই ক্ষান্ত ছিলেন না, পরবর্তীতে জিয়ার কর্মসূচীকেও সমর্থন জুগিয়েছিলেন। রাজনীতির নানা সমীকরণে কর্নেল ওসমানী নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের সমর্থনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তারপরও ওসমানী ইতিহাসে ধিক্কৃত নাম হিসেবে চিহ্নিত হবেন। এ কথা বলছি এ কারণে যে, ৩ নবেম্বর থেকে ৭ নবেম্বর মধ্যবর্তী এই কয়টা দিন বঙ্গভবনের ভেতর নাটকীয় ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কর্নেল ওসমানী যদি দেশের স্বার্থে বীরোচিত ভূমিকা পালন করতেন তবে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির গতিপ্রবাহে একটা উচ্ছেদ ঘটত। তিনি তা না করে জিয়াকে রক্ষা করেছেন। সেই থেকে জিয়ার নেতৃত্বে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির গতি ছিন্নভিন্ন করে দেয় বাঙালীর সব অর্জন।

৭ নবেম্বর সিপাহী জনতার অভ্যুত্থানের পটভূমিতে জিয়ার ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান। বিচারপতি সায়েমকে নামমাত্র প্রেসিডেন্ট বানিয়ে সামরিক শাসনের বুলডোজারে ধ্বংস করে দেয়া হয় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। জিয়াউর রহমান ধীরে ধীরে তার ক্ষমতা প্রলম্বিত করতে রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে থাকেন। জিয়া বুঝতে পারেন যে, ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে শুধুমাত্র সেনাবাহিনীর ওপর ভর করলে চলবে না। এ জন্য দরকার রাজনৈতিক প্লাটফর্ম। তিনি পাকিস্তানী রূপ ও ভাব কল্পে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন রাষ্ট্রীয় খরচে। বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে স্বাধীনতাবিরোধী, মানবতাবিরোধী ও বঙ্গবন্ধুর খুনীদের রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন। তিনি মুসলিম লীগ নেতা স্বাধীনতাবিরোধী শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে নিজে রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষে ৯৫৩ জন রাজনৈতিক নেতা ও বিচারাধীন বন্দীকে মুক্তি দেন। ভাগ্যচক্রে আওয়ামী লীগের প্রথম সারির অনেক নেতাও সে সময় মুক্তি পান। ফলে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিপরীতে আওয়ামী লীগ তথা প্রগতিশীল শক্তিও ঘুরে দাঁড়াতে থাকে। ১৯৭৮ সালে ৩, ৪, ৫ এপ্রিল তিনদিনব্যাপী আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হলে আবদুল মালেক উকিল ও আবদুর রাজ্জাক যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগ মালেকের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। অর্থাৎ, বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে না দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৩৯ আসন লাভ করে। জিয়ার দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়। জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী দলে রাষ্ট্রীয় অপরাধী, যুদ্ধাপরাধী, সন্ত্রাসী, কালোবাজারি, অনৈতিক ব্যবসায়ী শিল্পপতিগণ যোগ দিয়ে রাজনীতিক হয়ে যান এবং হয়ে যান সংসদ সদস্যও। জিয়ার বহুদলীয় গণতন্ত্রের চেহারা বিশ্ববাসী দেখতে থাকেন, কীভাবে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোকে ধ্বংস করা হয়, কীভাবে জাতীয়তাবোধকে নষ্ট করে দেয়া হয়, কীভাবে ছাত্রসমাজ, যুব সমাজের মূল্যবোধকে নষ্ট করে দেয়া হয়। এদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগকে চিরতরে ধ্বংসের পথ বেছে নেন। বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগ যখন ৩৯টি আসন লাভ করে, তখন জিয়া বুঝতে পারে আওয়ামী লীগ আবার ঘুরে দাঁড়াবে। তাই আওয়ামী লীগ ধ্বংস করাই ছিল জিয়ার মূল এজেন্ডা।

মালেক উকিলের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নতুন করে পথ চলা শুরু। জিয়াউর রহমানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে থাকে এবং আন্দোলন ও জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করে। সে সময় একাধিক সফল হরতালও পালিত হয়। কিন্তু দলের অভ্যন্তরে অনৈক্য এবং পারস্পরিক অবিশ^াস-অনাস্থার কারণে আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিল। আসলে নেতৃত্বের কোন্দলে আওয়ামী লীগে স্থবিরতা বিরাজ করছিল। নেতৃত্বের মধ্যে দলাদলি, ভয়ভীতি, সুবিধাবাদ এবং গা বাঁচিয়ে চলার মনোভাব বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগকে পোষমানা পার্টিতে পরিণত করা হয়েছিল। সে সময় সর্বজনগ্রহণযোগ্য ও দূরদর্শী নেতার অভাবে কর্মী সমর্থকরা ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছিল। এ অবস্থায় ১৯৮১ সালে ১৩-১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। ওই কাউন্সিলেই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচন করা হয়। সেটি যে দেশ রক্ষার যুগান্তকারী ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত, আজকের বাস্তবতায় তা প্রমাণিত হয়েছে। শেখ হাসিনা সভাপতি নির্বাচিত হলেও তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের অনিশ্চয়তায় নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়। ক্ষমতাসীন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি চাইছিল না যে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসে রাজনীতি করুক। নানা টানাপোড়েন এবং নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি নিয়েই অবশেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনার বীরোচিত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন যেন গণতন্ত্রেরই প্রত্যাবর্তন। সেদিন প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি হয়েছিল। সেই ঝড়-বাদল উপেক্ষা করে লাখ লাখ বাঙালী ঢাকার রাজপথে নেমে প্রিয় নেতা মুজিব কন্যাকে সংবর্ধিত করে। এ যেন বঙ্গবন্ধুরই ফিরে আসা। আবেগাপ্লুত বাঙালী যেন শেখ হাসিনার মধ্যেই খুঁজে পায় বঙ্গবন্ধুকে। বাংলাদেশে ইতিহাসের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমায় শেখ হাসিনা এ জাতির নেতৃত্ব দিয়ে আজ বাংলাদেশকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। এই বাস্তব ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাঙালী জাতিকে এখনও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির মোকাবেলা করে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। ৭ নবেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে দিবসটি ইতিহাসের আরেকটি কালোদিন হিসাবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

phani.sarker@gmail.com