২০ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঝরঝরি ট্রেইল

  • মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

বাড়ির পাশে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য লুকানো রয়েছে। দূরের ভ্রমণপিপাসুর দল জানলেও ঘরের পাশের মানুষ খুব একটা মনোযোগ হয় না। তেমনি একটি উপজেলা সীতাকু-। যার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে প্রকৃতির সব অপার রহস্য। মিরসরাই আর সীতাকুন্ড বার বার ছুটে যাওয়া ভ্রমণ পাগলাদের প্রতি মিষ্টিমধুর টিপ্পনি কেটে হয়ত খোদ সেসব অঞ্চলের মানুষরাই বলে ওঠে, কেন যায় তারা সেখানে এত কি আছে একই জায়গা এতবার দেখার! আমি ভ্রমণপিপাসুদের পক্ষ নিয়ে বলব চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার ভূমি, প্রকৃতির এমন একটি দান যেখানে একবার-দুবার নয় অন্তত যেতে হবে পঞ্চাশবার। তাহলে হয়ত সীতাকুন্ডের নানান রূপ কিছুটা হলেও দেখা সম্ভব হতে পারে। বৃষ্টি আর ঝর্ণার প্রকৃতি মেলে ধরে নিজেকে নতুন রূপে। পাহাড়ি ঝর্ণায় যাওয়ার পথগুলো হয় রোমাঞ্চ প্রিয় ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অন্যরকম ভাললাগার। যা এক কথায় মনোমুগ্ধকর হাইকিং-ট্রেইল। সেই রূপের নির্যাস নিতেই বর্ষায় পর্যটকরা ছুটে যান বুনো ঝর্ণার ধারে। জোঁক ও পথের পাথুরে পিচ্ছিলতা এনে দেয় ভিন্নরকম শিহরণ। এই সময়টায় ট্রেইলের জন্য সর্বদাই মুখিয়ে থাকে দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের দামাল পরিবারের ছোট-বড় সবাই। বাংলাদেশের অন্যতম ভ্রমণ সংগঠন ‘দে-ছুট’ ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা ঘুরে বেড়ায় গহীন ঝোপ-জঙ্গলে, লোক চক্ষুর অন্তরালে থাকা প্রকৃতির সন্ধানে। প্রশাসনিক জটিলতায় বান্দরবানের গহীনে যাবার নিষেধাক্কা থাকায় ইদানীং কাছে ধারেই ঘুরে বেড়াই। সেই ঘুরে-বেড়ানোর মাঝেই অদ্ভুত আশ্চর্য রকম সৌন্দর্যময় প্রকৃতি চোখে ধরা দেয়। যা ভাবতেও অবাক লাগে যে, এ রকম জায়গায় এত সুন্দর মায়াময় প্রকৃতি আপন খেয়ালে সেজে-গুজে রয়েছে। অথচ এর পাশ দিয়ে কত শতবার গিয়েছি পার্বত্য জেলাগুলোতে। গাড়ির জানালা দিয়ে শুধু মিরসরাই আর সীতাকু-ের পাহাড় মালাগুলোই দেখতাম। কিন্তু কখনও ভাবিনি বা ভাবার চেষ্টাও করিনি, এর মাঝেও যে লুকিয়ে থাকতে পারে আশ্চর্য সুন্দর নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক রূপ লাবণ্য। কথায় আছে না মক্কার লোক হজ পায় না। ব্যাপারটা অনেকটা সে রকমই। যখন নানা মাধ্যমে খবর পেলাম চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ড উপজেলার পন্থিছিলার হাজীপাড়া গ্রাম পেরিয়ে এগিয়ে গেলে, পাহাড়ের গভীরে মূর্তি নামক একটি ঝর্ণা রয়েছে। যা সচরাচর সাধারণ ভ্রমণপিপাসুরা ঝরঝরি ট্রেইল হিসেবেই চিনে। কিন্তু মূর্তি ঝর্ণা পর্যন্ত যাওয়া হয় না অনেকেরই। কিন্তু আমরা যাব বলেই গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে রওনা হই। রাতে রওনা দেয়ার কারণও ছিল। যেন ভোর পাঁচটার মধ্যেই পৌঁছে যাই। কিন্তু একি হায়!

ঢাকাবাসীর নিত্য সঙ্গী যানজট এখন মহামারী আকার ধারণ করে আশপাশের মহাসড়কগুলোতেও আছড়ে পড়েছে। তাই ভোর পাঁচটা-ছয়টার বদলে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা লেটে সকাল সাড়ে দশটায় পন্থিছিলা পৌঁছাই। আগে থেকেই গাইড অপেক্ষায় ছিল। তাই দেরি না করেই রেল লাইনের পাশে গাড়ি পার্ক করেই শুরু করি হাইকিং। মনে বেশ সংশয়। মিশন পূর্ণ করার পর্যাপ্ত সময় পাবত। নানা সবজি বাগানের পাশ কেটে দ্রুত হেঁটে চলছি। একটা সময় মাথার ওপর তেজোদীপ্ত সূর্যটাকে পেছনে ফেলে ঢুকে যাই আলো-ছায়ার জঙ্গলে। এবার পাহাড়, ঝিরিপথে হাইকিং-ট্র্যাকিং চলছে সমান তালে। চারপাশে সবুজ আর সবুজ। যেন সবুজের চাদরে মোড়ানো পথ দিয়েই হেঁটে চলছি। মাঝে মধ্যে বিশাল বিশাল গাছতলায় বসে জিরিয়ে নেই। চলার পথে ছোট-বড় অনেকগুলো ক্যাসকেড পড়ে। ক্যাসকেডের জমানো পানি চোখে-মুখে ছিটিয়ে ক্লান্তি দূর করি। প্রকৃতির মোহে পড়ে ভুলে যাই সময়-জ্ঞান। নানা হাস্যরস আর প্রকৃতিক রূপের পসরা দেখতে দেখতে গিয়ে পৌঁছাই ঝরঝরি ঝর্ণার সামনে। সাধারণ পর্যটকরা ঝরঝরি ঝর্ণা ঘিরে বেশ জটলা পাকিয়েছে। চলছে বেশ হৈ-হুল্লুড়। খুব বেশি উঁচু থেকে নয় তবে বেশ খানিকটা জায়গাজুড়ে ঝরঝরির পানি অবিরাম ঝরে পড়ছে। পানি পড়ার কারণে সামনে একটা মোটামুটি সাইজের জলাশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। সেখানেই আগন্তুকের দল জলকেলিতে মেতে ওঠে। তবে জায়গাটার প্রাকৃতিক আবহ বেশ চমৎকার। আমরাও সেখানে কিছুক্ষণ বসে নুডলস খেয়ে নেই। এর পর আবারও হাঁটা। মানুষের জটলা কমে আসে। ধীরে ধীরে নৈঃশব্দ আমাদের গিলে ফেলে। যতই এগিয়ে যাই ততই মুগ্ধতা ভর করে। কোথাও কোথাও প্রাকৃতিকভাবেই সিঁড়ি তৈরি হয়েছে। আমরা উপরের দিকেই উঠছি। সত্যিই অনেক সুন্দর নান্দনিক একটা ট্রেইল। এবার সামনে পড়ল খুব সুন্দর একটা খুম। খুম মানে গর্ত। যেখানে পানি জমে থাকে। তবে এই গর্ত কিন্তু সাধারণ কোন গর্ত নয়। বলা যায় পাহাড়ের ওপর সুইমিংপুল। স্থির থাকা খুমের পানি গাড় সবুজ। গাছের পাতা আর পানির রং যেন মিলে মিশে একাকার। এক কথায় অসাধারণ সৌন্দর্যের খুম। ফটোসেশন পর্ব শেষে আবারও হাঁটা। এবার কিছুটা পিচ্ছিল পথে জঙ্গল মাড়িয়ে, লতাগুল্ম ধরে পাহাড়ের আরেকটু উপরে উঠতে হবে। ওঠার সময় বেশ থ্রীল একটা ভাব অনুভূত হলো। ওঠার পর সাবধানে এগিয়ে চলা। সামান্য পা পিছলে গেলেই সোজা গভীর খুমে। তবে বেশিটা পথ নয়। খুব সামান্য দূর এগুতেই কানে ভেসে এলো রিমঝিম শব্দ। চোখে ধরা দিল দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বড় বড় বোল্ডার বিছানো সরু পথ। পাহাড়ের দু’পাশ লতাগুল্ম দিয়ে ঘেরা। আরেকটু আগাতেই নজরে এলো শুভ্র সাদা ফেনা তোলা আছড়ে পড়া ঝর্ণার পানি। ওয়াও! পেয়ে গেছি। ইতোমধ্যে বড় এক লড়া [বিচ্ছু] আমার বুকে জড়িয়েছে পরম মমতায়। কিন্তু খেয়াল করার সময় কোথায়। বেশি কিছু বোঝার আগেই গাইড ফেলে দিল। পাথরের বোল্ডার টপকিয়ে-খুম পেরিয়ে সোজা গিয়ে বসলাম ঝর্ণার কূলে। আহ্ পরম শান্তি। যে পাথরের কারণে ঝর্ণাটির নাম মূর্তি হয়েছে সেই পাথরের সঙ্গে গাল মিলালাম। প্রাকৃতিকভাবেই একটি পাথর ঠিক মানুষের মাথা, চোখ, নাক, কপালের আকৃতি ধারণ করে আছে। অনেকটা ছোটবেলায় শোনা ব্ল্যাক ম্যাজিকের কাহিনীর মতো। থাক সে সব ভাঁওতাবাজির কাহিনী। আমরা ভিজে নেই মন ভরে। ডুব দেই খুমের পানিতে। মূর্তি ঝর্ণাটি খুব বেশি চওড়া নয়। পনিও খুব একটা উঁচু থেকে পড়ে না। তবে গড়িয়ে পড়া পানির ক্ষিপ্রতা বেশ। সব মিলিয়ে চমৎকার এক ভৌতিক বুনো পরিবেশ। দিনে দিনে ঘুরে আসার মতো অসাধরণ এক বন-জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ী ঝিরি-ঝর্ণার ঝরঝরি ট্রেইল।

চলুন যাই : ঢাকা হতে চট্টগ্রামের বাসে বা রেলে চড়ে সিতাকুন্ডের পন্থিছিলা। সেখান থেকে হাজীপাড়া গ্রামের রেললাইন পার হয়ে কানীছড়া ধরে এগিয়ে যাবেন। পন্থিছিলা হতে যাওয়া-আসা ও নানা স্থানে বসে জিরিয়ে সব মিলিয়ে সময় লাগবে ৬-৭ ঘণ্টা।

ভ্রমণ তথ্য : এখানকার ঝর্ণাগুলোর চাইতে পথের সৌন্দর্যই অসাধারণ। নিরাপদ ট্রেইলের জন্য রেললাইনের পাশে থাকা দোকানিদের সাহায্য নিন। তারাই আপনাকে ভাল গাইডের খোঁজ দিতে পারবে। গাইড ছাড়াও যাওয়া যাবে তবে তা অনেক সময় পথ হারাবার জন্য যথেষ্ট। গাইড চার্জ আপনার খুশির ওপর নির্ভর।