১৪ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দারিদ্র্য রুখতে পারেনি মেহেরুনকে

  • মজিবুর রহমান

চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষায় উপজেলার একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী মেহেরুননেছা। এর আগে সমাপনী, জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় সে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিল। কখনও তাকে দ্বিতীয় হতে হয়নি। দারিদ্র্যতাকে পেছনে পেলে প্রতিটি ধাপে সে বাজিমাত করেছে। এখন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তার এই খবরে শিক্ষক এলাকাবাসী ব্যাপক উচ্ছ্বাসিত। তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে পরিবারের লোকজন। মেহেরুনের বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার উত্তর মুশুলী গ্রামে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষা জীবনে মেহেরুনের এতসব সাফল্যের পেছনের গল্পটা সুখের ছিল না। তার পিতা মিজানুর রহমান মিন্টু একজন ভেষজ ওষুধ ফেরিওয়ালা। বাবার সামান্য আয়ে চলে তাদের সংসার। মা জাহানারা আক্তার গৃহিণী। দরিদ্র পিতা-মাতার সন্তান সে। বাবার ছোট্ট খুঁড়ে ঘরটিতে ছিল না বিদ্যুতের আলো। তাই তো হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা করতে হয়েছে। জানা গেছে, নান্দাইল সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত অঞ্চল উত্তর মুশুলী গ্রাম। এই গ্রামের মুশুলী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সমাপনী, মুশুলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জেএসসি এসএসসি ও মুশুলী কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। তার এই অভাবনীয় সাফল্যে নিজের পরিশ্রম বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা ও নিয়মিত শ্রেণীকক্ষের পাঠদানে মনোযোগী হওয়াই একমাত্র কারণ।

মুশুলী স্কুল এ্যান্ড কলেজের সমাজকল্যাণ বিষয়ের প্রভাষক শফিউদ্দিন মুকুল বলেন, চলতি বছর এইসএসসিতে মেহেরুনের জিপিএ-৫ পাওয়া শুধু আমাদের কলেজের মান বেড়েছে তা নয়। সে উপজেলার অন্য কলেজগুলোর মানও রক্ষা করেছে। কারণ উপজেলায় একমাত্র সেই জিপিএ-৫ পেয়েছে। পারিবারিকভাবে দরিদ্রতা থাকলেও পড়ালেখার ক্ষেত্রে তার কোন ছোঁয়া লাগেনি মেহেরুনের জীবনে। মুশুলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, আমার বিদ্যালয় থেকেই মেহেরুন জেএসসি ও এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। সে সব সময় শ্রেণীকক্ষে মনোযোগি ছিল। এ জন্য আমরা (শিক্ষকরা) তাকে আলাদা নজরে রেখেছি। আমাদের বিশ^াস ছিল সে ভাল কিছু করবে। এখন সে প্রাচ্যের অক্সফোর্টখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। দারিদ্র্যতা যে ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মানে মেহেরুন তার জ্বলন্ত প্রমাণ। পড়াশোনা ছাড়াও সাহিত্য সংস্কৃতিতেও তার ছিল অবাধ বিচরণ।

মেহেরুনের মা জাহানারা আক্তার জানায়, তাঁর মেয়ে পড়াশোনা ছাড়া কখনও অন্য কিছুতে সময় নষ্ট করতো না। নিয়মিত স্কুল ও কলেজে যাওয়ার ক্ষেত্রে কখনও তাকে বলে দিতে হয়নি। অর্থের অভাবে আলাদা কোন প্রাইভেট পড়ানোর সুযোগ ছিল না। বিদ্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় বই ছাড়াও শিক্ষকরাই তাকে সব রকম সহযোগিতা করত। বাবা মিজানুর রহমান মিন্টু বলেন, স্ত্রী, দুই কন্যা ও এক ছেলে নিয়ে তার সংসার। বাজারে বাজরে ওষুধ বিক্রি করে যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার তেমন চলে না। সম্পদ বলতে বাড়ির ভিটাটুকুই সম্বল। মেয়ে ভাল লেখাপড়া করে এই দেখে নিজেরা খেয়ে না খেয়ে বইপত্রসহ সকল কিছু ধার-দেনা করে ব্যবস্থা করতাম। এখন মেয়ের এই সাফল্যে আমার সকল কষ্ট লাগব হতে যাচ্ছে। মেহেরুনের দাদি লায়লী বেগম বলেন, ‘হেই দিন বাড়িতে কারেন্ট আইছে, এর আগে পুরা গ্রাম ছিল অন্ধকারে। মোমবাতি ও হারিকেন জ্বালিয়ে আমার নাতি লেখাপড়া করছে। বালাই ফল পায়।’

নিজের সাফল্যের বিষয়ে মেহেরুন দৈনিক জনকণ্ঠকে বলেন, ভাল ফলাফল করতে দারিদ্র্যতা কোন বাধা হতে পারে না। প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি ও শিক্ষকদের সহযোগিতা ও বাবা-মায়ের আন্তরিকতাই তার এই সাফল্যের কারণ। বিশেষ করে মা জাহানারা আক্তার ও মুশুলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের জাহাঙ্গীর স্যারের গাইড লাইন না পেলে আমি হয়ত এই ফলাফল করতে পারতাম না। তাই তাদের প্রতি আমি বিশেষ কৃতজ্ঞ। ভাল ফলাফলের জন্য একজন শিক্ষার্থীকে কিভাবে চলাফেরা করা উচিত? এমন প্রশ্নের উত্তরে মেহেরুন বলেন, নিয়মিত অধ্যবসায়, মনোযোগ এবং নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে বিশেষ করে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষকদের পাঠদান মনোযোগ দিলেই একজন শিক্ষার্থী তার সাফল্যে পৌঁছাতে পারে।

নির্বাচিত সংবাদ