০৭ নভেম্বর ২০১৯

বীমা শিল্পের দায়বদ্ধতা

দেশে সরকারী বীমা সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারী পর্যায়ে অর্ধশতাধিক বীমা কোম্পানি ব্যবসা করলেও সেগুলোর তেমন সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানব কল্যাণ কর্মসূচী নেই। বীমা কোম্পানির মালিকদের সেক্ষেত্রে শুধু মুনাফার দিকে না তাকিয়ে এসব দিকেও সবিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। মিউনিক ইন্স্যুরেন্স ও মাইক্রোইন্স্যুরেন্স নেটওয়ার্কের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) আয়োজিত তিনদিনের আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্র বীমা সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী একথা স্মরণ করিয়ে দেন সংশ্লিষ্টদের। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ব্যক্তি, পরিবার ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতের অদৃশ্য ঝুঁকি হ্রাসে সহায়তা করে থাকে বীমা শিল্প। সম্ভাব্য ঝুঁকি কমিয়ে আর্থিক নিশ্চয়তা প্রদান করে নিরাপত্তা দেয় জীবন ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির। পাশাপাশি দেশের পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগ তহবিল সৃষ্টিতে সহায়তা দিয়ে থাকে। সর্বোপরি ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার জন্য প্রয়োজন রয়েছে বীমা ব্যবস্থার। দেশের প্রায় সর্বস্তরের মানুষের কাছ থেকে প্রিমিয়াম তথা সঞ্চয় সংগ্রহ করে সহায়তা দিয়ে থাকে বিনিয়োগ সৃষ্টি ও কর্মসংস্থানে। এত কিছুর পরও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দেশের বীমা শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশে আরও অনেক কিছু করণীয় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেই কথাটিই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বিশেষ করে বেসরকারী বীমা কোম্পানির মালিকদের। এর পাশাপাশি এও স্বীকার্য যে, এই শিল্পে অদ্যাবধি কিছু ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অবকাশ রয়েছে। এই যেমন, একজন গ্রাহক তার বীমার যত কিস্তি জমা দিয়ে থাকে, তার সব প্রধান কার্যালয়ে আদৌ জমা হয় কিনা, তা জানতে পারে না। এর ফলে বীমা শিল্পে গ্রাহকদের আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়, যা স্বাভাবিক ও সঙ্গত। এই সমস্যা দূরীকরণে সরকার একটি ঐক্যবদ্ধ বার্তা প্রদান প্ল্যাটফর্ম তৈরির সক্রিয় উদ্যোগ নিয়েছে। এর পাশাপাশি হাওড় অঞ্চলে আকস্মিক অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বীমা, শস্য বীমা, প্রবাসী কর্মীদের জন্য বীমা ব্যবস্থা সর্বোপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য বীমা চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে সক্রিয়ভাবে। উল্লেখ্য, এসব ক্ষেত্রে বীমা শিল্পের আশানুরূপ বিকাশ ঘটেনি দেশে। পর্যায়ক্রমে এসব বাস্তবায়িত হলে দেশে বীমা শিল্পের আরও বিকাশ ও উন্নয়ন হবে সুনিশ্চিত। এসব সুযোগ-সুবিধা ক্রমানয়ে অবারিত করতে হবে বীমা কোম্পানির মালিকদের।

আশার কথা, প্রবাসী কর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি এবং জাতিসংঘের তাগিদে অবশেষে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশীদের জন্য বাধ্যতামূলক জীবন বীমা ব্যবস্থা ও আর্থিক প্রণোদনা দেয়ার বিষয়টি। এ দুটি পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে বর্তমান সরকারের জনকল্যাণমুখী নীতির যথার্থ প্রতিফলন। ইতোমধ্যে প্রবাসীদের জীবন বীমার আওতায় আনার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে নীতিমালা। প্রবাসীদের সামর্থ্যরে বিষয়টি বিবেচনা করে দুই লাখ ও পাঁচ লাখ বীমা অঙ্কের জন্য প্রিমিয়ামও নির্ধারণ করা হয়েছে বেশ কম, যথাক্রমে এক লাখ ও দুই লাখ ৯২৫ টাকা। জীবন বীমা কর্পোরেশনের পাশাপাশি বেসরকারী বীমা কোম্পানিকেও দেয়া হবে এই দায়িত্ব। দাবি আদায় নিশ্চিতের জন্য বীমা কোম্পানিগুলোকে আধুনিক, গতিশীল, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা হবে। এর জন্য আপাতত নতুন করে অর্থ বরাদ্দের আবশ্যকতা নেই। প্রবাসী কল্যাণ তহবিলে বিদেশে কর্মরতদেরই প্রায় ১২শ’ কোটি টাকা পড়ে আছে। বিদেশে কোন কর্মী মৃত্যুবরণ করলে আপাতত এই তহবিল থেকে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করা হয়। যা হোক, প্রবাসীদের জন্য বীমা চালু করা হলে প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসনসহ নানা ক্ষেত্রে সাহায্য-সহযোগিতা করা যাবে।

এর পাশাপাশি হাওড় বীমা, শস্য বীমা, সবার জন্য স্বাস্থ্য বীমা, দুর্যোগ ও আপাতকালীন বীমাও পর্যায়ক্রমে চালু করা জরুরী ও অত্যাবশ্যক। তাহলে দেশের বীমা সেক্টর আরও সম্প্রসারিত হবে নিঃসন্দেহে।