০৭ নভেম্বর ২০১৯

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ শিক্ষানুরাগী সুফি শায়খ বোরহানুদ্দীন

সুফি শায়খ বোরহানুদ্দীন (রহ.) আধ্যাত্মিকতা, সমাজসেবা ও জ্ঞানের আলো বিকাশে ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। জানা যায়, চাঁদপুর ফরাযীকান্দির উয়েসিয়া শরীফের পীর সুফি শায়খ বোরহানুদ্দীন (রহ.)-এর পূর্বপুরুষ হযরত শাহজালাল ইয়েমেনী (রহ.)-এর অন্যতম সফরসঙ্গী হিসেবে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সুদূর দক্ষিণ আরব থেকে বাংলাদেশে হিযরত করেন। পরবর্তীতে ফরাযীকান্দি নামক গ্রামে বসতি স্থাপন করে ওই অঞ্চলে ইসলাম প্রচার, সমাজ সংস্কার ও শিক্ষা বিস্তারে বিশেষ অবদান রাখেন। শায়খ বোরহানুদ্দীন (রহ.)-এর পিতা মাওলানা আফাজুদ্দীন (রহ.)ও ছিলেন আধ্যাত্মিক কামেল ব্যক্তিত্ব।

শায়খ বোরহানুদ্দীন (রহ.) ১৯৪৩ সালে ত্রিশ বছর বয়সে ছতুরা শরীফের পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.) এর দাস্ত মুবারকে বায়াত গ্রহণ করেন। প্রফেসর সাহেব ছিলেন শাহ সুফি ছদর উদ্দিন আহ্মাদ শহীদ (রহ.) ও ফুরফুরা শরীফের আলা হযরত মুজাদ্দেদে জামান আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.) উভয়েরই খলিফা। পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.) সেরাজুস সালেকীন ও নবীজীবনী ছাইয়েদুল মুরছালিন কিতাবদ্বয়ের স্বনামধন্য লেখক।

শায়খ বোরহানুদ্দীন (রহ.) পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.)-এর কাছ থেকে কাদেরিয়া, চিশতিয়া (আলীয়া, সাবেরিয়া, নিযামিয়া), নকশবন্দিয়া, মুজাদ্দেদিয়া, মুহাম্মাদিয়া তরিকাসমূহের তালিম গ্রহণ করে কামালত ও খেলাফতপ্রাপ্ত হন। এ ছাড়া তিনি আরও বিভিন্ন তরিকায় কামালত হাসিল করেন। এ প্রসঙ্গে পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.)-এর একটি চিঠি প্রণিধানযোগ্য। চিঠিটি করাচী থাকাকালীন প্রফেসর সাহেবের অন্যতম খলিফা সুফি ফতেহ আলী মাস্টারকে লিখত। সেখানে উল্লেখ আছে- সুফি বোরহানুদ্দীন (রহ)-কে রুহানিভাবে হযরত ওয়ায়েছ কারানী (রা.) ওয়াইছিয়া তরিকার তালিম দিয়েছেন এবং সোহরাওয়ারদিয়া তরিকাও হযরত শিহাবুদ্দিন সোহরাওয়ারদী (রহ.) হইতে তালিম পেয়েছেন। (অধ্যাপক মাওলানা আব্দুল খালেক জীবন চরিত, পৃঃ ২৬০)।

পরবর্তীতে শায়খ বোরহানুদ্দীন (রহ.) তরিকায়ে আহমাদিয়া নামক একটি খাস তরিকাপ্রাপ্ত হন। এ জন্য তিনি ইমামুত তরিকত হিসেবেও সমধিক পরিচিত। এই তরিকায় সুলতানুল আযকার সুগরা ও কুবরা এবং লতিফায়ে খলা নামক একটি বিশেষ লতিফার সন্ধান পাওয়া যায়। লতিফায়ে খলা দশ লতিফা ও সত্তর হাজার লোমকূপের সঙ্গে সঙ্গে মানবদেহের অভ্যন্তরে অুণু-পরামণুর ফাঁকে ফাঁকে সকল শূন্যস্থানের মধ্যেও আল্লাহ তায়ালার যিকির জারি করার দীক্ষা দেয়। উপমহাদেশের বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. এম শমশের আলী সাহেব লতিফায়ে খলার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করে সুধী মহলে বিশেষ সমাদৃত হয়েছেন।

শায়খ বোরহানুদ্দীন (রহ.) আকিদায় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ও ফিক্হী মাযহাবে হানাফি ছিলেন। রবিউল আউয়াল উপলক্ষে ঈদ-ই- মিলাদুন্নবী (দ.) মাহফিল, তরিকতের সালেকদের জন্য খাস যিকিরের তালিমী মাহফিলসহ নিজ প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে বার্ষিক ইছালে সওয়াব মাহফিল আয়োজন করতেন।

শায়খ বোরহানুদ্দীন (রহ.) ছিলেন ‘হাদিয়ে কওম’ অর্থাৎ জাতির পথপ্রদর্শক। যুগশ্রেষ্ঠ আল্লাহর ওলী। তিনি ছিলেন মুহিয়ে সুন্নাহ ও সাচ্চা আশিকে রসূল। শরিয়তের ব্যাপারে অটল। তিনি হালাল-হারামের ব্যাপারে তাকওয়া অবলম্বন, তাহারাত ও পর্দা পুশিদার প্রতি বিশেষভাবে সচেষ্ট ছিলেন। কঠিন রিয়াজত সম্পন্ন এই সাধক ছয় বার হজব্রত পালন করেন। সেই সময়ে হজের সফর ছিল খুবই কষ্টের। তাঁর জীবনে বহু কারামত সংঘটিত হয় যা তাঁকে নিয়ে লেখা কিতাব পাঠে জানা যাবে (পরশমণির পরশে, আরেফা বিল্লাহ)।

শায়খ বোরহানুদ্দীন (রহ.) সান্নিধ্যে এসে অগণিত মানুষ আলোর পথের দিশা পেয়েছে। তাঁর তাওয়াজ্জুর ও ফায়েজে বহুলোক আল্লাহর ওলীতে পরিণত হয়েছে। শায়খ বোরহানুদ্দীন (রহ.)-এর সিলসিলায় সুন্নাতের বিশেষ পাবন্দি লক্ষ্য করা যায়। সুন্নাতী বাবরী চুল বিশিষ্ট সালেকগণ সর্বদা ঘুন্টি বোতামওয়ালা সুন্নাতী কুর্তা, সাদা গোল টুপি, পাগড়ি, তোহবন্দ পরিধান করেন।

চট্টগ্রামের এক সমাবেশে ফুরফুরার মুজাদ্দেদে যামানের বড় সাহেবজাদা হযরত কাইয়ুমে যামান আবু নছর মুহাম্মাদ আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.) বলেছিলেন ‘সুফি বোরহানুদ্দীনের জামায়াত ফেরেশতাদের জামায়াত।’ (মাওলানা ফরীদুদ্দীন আত্তার, নেদায়ে ইসলাম স্মরণিকা)। প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.) নিজেও শায়খ বোরহানুদ্দীন (রহ.)-কে লিখিত একটি চিঠিতে উল্লেখ করেছেন ‘আপনার সিলসিলা এক বিরাট মকবুল জামায়াতে পরিণত হবে’ (হাদিয়াতুছ ছালেকীন, পৃঃ ২১)।

সুফি বোরহানুদ্দীন (রহ.)-এর সিলসিলা আজ নানাভাবে বিকাশ লাভ করেছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান বিভিন্ন জায়গায় তাঁর খলিফারা রয়েছেন। খলিফাদের মধ্যে জামালপুরের ছালাম আবাদ শরীফের পীর সুফি ছাইফুল মালেক, চট্টগ্রামের সুফি শাহ মুহাম্মাদ এজায রাসূল, করটিয়া আহমাদাবাদ শরীফের পীর সুফি কারি বজলুর রহমান, যশোরের সুফি খবির উদ্দিন ওয়াইছি, মির্জাপুর সুফি আবাদের পীর সুফি আবদুছ ছবুর, নোয়াখালীর সুফি আবু বকর সিদ্দিকী, মোমেনশাহীর সুফি শেখ কলীমুদ্দীন, ভারতের অসমের মাওলানা সুফি কুতুব উদ্দিন, পশ্চিমবঙ্গে সুফি আব্দুছ সাত্তার ও আবদুর রাজ্জাক, পাকিস্তানের সিন্ধে সুফি আব্দুল গফুর প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। সুফি বোরহানুদ্দীন (রহ.)-এর জ্যেষ্ঠপুত্র শায়খ মানযুর আহমাদ (রহ.) পিতার সাজ্জাদানশীন ছিলেন। তিনি প্রজ্ঞাবান ও আশেকে রাসূল ছিলেন। প্রিয় নবীজীর শানে বহু কাসিদা লিখেছেন। তিনি মদিনা শরীফে ইন্তেকাল করেন এবং জান্নাতুল বাকীতে শায়িত হন।

ফুরফুরা সিলসিলার এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো বাংলা ভাষায় দীনি কিতাবাদি প্রণয়ন এবং মসজিদ, মাদ্রাসাসহ দীনি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। শায়খ বোরহানুদ্দীন (রহ.)-এর দাদা পীর মুজাদ্দেদে জামান আমীরুশ শরীয়ত হযরত মাওলানা শাহ সুফি আলহাজ আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.) উভয় বাংলায় প্রায় আট শ’ মসজিদ ও এগারো শ’ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। ফুরফুরা সিলসিলার উজ্জ্বল নক্ষত্র সুফি বোরহানুদ্দীন (রহ.)-এর সমাজ সংস্কারমূলক কর্মকান্ডে এর প্রতিফলন পাওয়া যায়। তাঁর স্বরচিত কিতাবসমূহ হলো হাদিয়াতুছ ছালেকীন, আখেরি নবী। তিনি ছিলেন তাসাওউফ বিশারদ তত্ত্বজ্ঞানী ও ইলমে লাদুন্নীর মুকাম্মেল ফয়েজপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব যা তাঁর স্বরচিত উক্ত কিতাবদ্বয় পাঠে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ ছাড়া তাঁর সিলসিলার মধ্যে শায়খ মানযুর আহমাদ (রহ.) ও মাওলানা ফরীদুদ্দীন আত্তার (রহ.) বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।

সুফি বোরহানুদ্দীন (রহ.) ছিলেন মানবদরদী। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে তিনি সবার কল্যাণে কাজ করে গেছেন। সৃষ্টির সেবাই স্রষ্টার সেবা এই আদর্শ বাস্তবায়নে তিনি ১৯৪৯ সালে নেদায়ে ইসলাম নামক একটি সেবা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন যার আওতায় ওয়াইছিয়া আলিয়া মাদ্রাসা, আল আমিন এতিমখানা, জিলানিয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল, খাজা গরীবে নেওয়াজ হাসপাতাল, পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক মেমোরিয়াল লাইব্রেরিসহ প্রায় বিশটির মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সুফি বোরহানুদ্দীন (রহ.) দীনি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠায় ফুরফুরা শরীফের সেই ধারাকেই অনুসরণ করে গেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় নেদায়ে ইসলাম পরবর্তীতে দেশে- বিদেশে বহু দীনি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে।

ইলম হচ্ছে মহাশক্তি, বড় সম্পদ (কুবরা) এবং আল্লাহর নিয়ামত (নিয়ামাতুল্লাহ)। এই সত্যটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন শায়খ বোরহানুদ্দীন (রহ)। তিনি দীনি শিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজী ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখায় পারদর্শী হতে গুরুত্ব দিতেন।

সুফি বোরহানুদ্দীন (রহ.) একটি আন্তর্জাতিক মানের আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। যে বিশ্ববিদ্যালয় দীনি, তাসাওউফ ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখায় শিক্ষা প্রদান করবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি জমি ক্রয়, ফান্ড তৈরিসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন কিন্তু হায়াতে থাকাকালীন সেটা শেষ করা সম্ভব হয়নি। তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র শায়খ মানযুর আহমাদ (রহ.) নেদায়ে ইসলামের একুশতম প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৬৫ সালে ঢাকা মহানগরীর প্রথম বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ‘শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন।

সুফি বোরহানুদ্দীন (রহ.) ১৯৬৪ সালের ৯ মে (২৭ জিলহজ রাতে) ৫১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মাজার শরীফ চাঁদপুর উয়েসিয়া শরীফ ফরাযীকান্দি কমপ্লেক্সে অবস্থিত। আধ্যাত্মিকতা, সমাজসেবায় ও শিক্ষাবিস্তারে সুফি বোরহানুদ্দীন (রহ.) যে আদর্শ স্থাপন করেছেন তার মাধ্যমে তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ