০৯ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কচুরিপানার সঙ্গে নিবিড় সখ্য সাদা বকের, অপরূপ মুগ্ধতা

কচুরিপানার সঙ্গে নিবিড় সখ্য সাদা বকের, অপরূপ মুগ্ধতা
  • উত্তরে হেমন্তের প্রকৃতিতে মনোরম দৃশ্য

তাহমিন হক ববী ॥ বিস্তীর্ণ খাল বিল জলাশয়। সবুজের মধ্যে সাদা, হালকা গোলাপি আর বেগুনির মিশেলে ফুটে আছে রাশি রাশি ফুল। দেখে মনে হচ্ছে শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোন ছবি। কচুরিপানার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়েছে ঝাঁকে ঝাঁকে সাদা বকের দল। পাখি শিকারে এ অঞ্চলের প্রশাসনের চরম কঠোরতায় সাদা বকগুলো এখন নিরাপদেই খাবারের সন্ধানে বিল নদী জলাশয়ে অবস্থান করছে। গ্রামের পানি শুকিয়ে যাওয়া খাল বিল নদী নালায় জমেছে অসংখ্য কচুরিপানা। সেই সঙ্গে সাদা বকের বিচরণ যেন প্রকৃতিকে অপরূপে সাজিয়ে দিয়েছে।

ঝাঁকে ঝাঁকে সাদা বকের বিচরণ দেখলে মনে পড়ে যায় খান মুহাম্মদ মইনুদ্দীনের সেই ছড়াটি ‘কানা বগীর ছা’-। পথচারীরাও সাদা বক দেখতে পেয়ে বিড়বিড় করে বলেই ফেলে ‘ঐ দেখা যায় তাল গাছ, ঐ আমাদের গাঁ, ঐ খানেতে বাস করে কানা বগীর ছা । এখন যেন সাদা বক গ্রামে গ্রামে বাসা বেঁধে ফেলেছে। বাস্তবতার কবিতা, সাহিত্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে একটা জায়গা দখল করে আছে বিভিন্ন রকমের বক। এখন বজ্রপাতের হাত রক্ষায় গ্রামে গ্রামে তাল গাছ রোপণও মনকাড়ে।

হেমন্তে হাল্কা শীতে প্রকৃতি যখন সাজছে নবরূপে ঠিক এমন সময় অপার সৌন্দর্য নজর কাড়ছে সাদা বক মাঠের বিচরণে মাঠ শস্য ক্ষেত। আমনের ধান ক্ষেত সেই সঙ্গে শাক-সবজিসহ নানা ফসলে ভরা মাঠ। কৃষকের চোখে মুখে হাসির ঝিলিক। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের গ্রামগুলোকে। ঋতু পরিক্রমায় প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে।

উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগের নীলফামারীসহ আট জেলার গ্রামগুলো জুড়েই অপরূপ দৃশ্য কচুরিপানার ফুল। ফুলটি কোন সুবাস না ছড়ালেও এর নান্দনিক রূপে মুগ্ধ এলাকার মানুষজন। তার ওপর আবার সেখানে দল বেঁধে জড়ো হয়েছে সাদা বকের ঝাঁক।

স্থানীয় লোকজন জানান, প্রতি বছর এ সময় কচুরিপানার ফুল ফোটে। কিন্তু পাখি শিকারিদের কারনে ভিড়তে পারেনি সাদা বক। পাখি শিকার না করার জন্য এলাকাগুলোতে বিভিন্ন বিভিন্ন সংগঠনের সচেতনতার বিষয়ে প্রচারণা এবং প্রশাসনের কঠোরতা ও নজরদারি বৃদ্ধির কারণে এখন শীতের অতিথি

পাখিসহ সাদা বকগুলো নতুন ভাবে প্রাণ পেয়েছে। তারা ভয়ডর উর্ধে রেখেই নিরাপদেই এখন উড়তে ও বসতে পারছে।

জলাশয় ও বিলের অধিকাংশ স্থানে পানি না থাকায় এ সময় সাদা বক, কানি বক, নিশি বক বিচরণ করে জলাভূমিতে। দীর্ঘ গলা ও পা বিশিষ্ট সাদা বকের পালক প্রাচ্যের পোশাকাদি ও টুপির শোভা বর্ধনে ব্যবহৃত হত। আট প্রজাতির সাদা বকের মধ্যে আমাদের দেশে রয়েছে পাঁচ প্রজাতির সাদা বক। আকারে ৪৫ থেকে ১শ ৫০ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। পা ও লম্বা ঠোঁট ছাড়া এদের সারা দেহ সাদা পালকে আবৃত। গাছে বাসা বেঁধে রাতে সেখানে বসবাস করলেও দিনের বেলায় খাদ্যের অন্বেষণে এরা নদী পুকুর খাল বিল জলাশয়ে ছুটে বেড়ায়।

নীলফামারীর ডোমার সড়কের হরিণচড়া অভিমুখী মেঠো কাঁচা সড়ক ধরে কিছুদূর এগুতেই চোখে পড়ে বিল। সেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে হেঁটে চলা সাদা বক নজর কারে। এ গ্রামের তরুণ নিশাদ হোসেন বলেন, প্রতিবছর এ বিলের শোভা বাড়ায় সাদা ধূসর বিভিন্ন রঙের বক। পাখি শিকার নিষিদ্ধ হওয়ায় এখন শিকারিরাও বের হয়না। কেউ পাখি শিকারের চেষ্টা করলে এলাকাবাসীই বাধা দেয়। বাধা না শুনলে গ্রামবাসী মোবাইলে প্রশাসনকে অবগত করে। তখনি শিকারিরা সটকে পড়েন। ফলে সাদা বকসহ বিভিন্ন জাতের শীতের অতিথি পাখিরা এখন নির্বিঘ্নে উড়ছে বসছে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

কিশোরীগঞ্জ উপজেলার দুরাকুটি গ্রামের অনার্সের ছাত্রী লিপি হোসেন বললেন, কচুরিপানার সবুজের মধ্যে সাদা, হালকা গোলাপি আর বেগুনির মিশেলে ফুটে থাকা কচুরিপানার ফুল আর সেখানে সাদা বকের আনাগোনা দেখে ভারতের প্রয়াত শিল্পী মান্নাদের কণ্ঠের চিরচেনা একটি গান ও কেন এত সুন্দরী হলো, অমনি করে ফিরে তাকালো-দেখে তো আমি মুগ্ধ হবোই- আমি তো মানুষ—- কচুপানার সঙ্গে বকের সৌন্দর্য দেখে অভিভূত না হয়ে পারি না। লিপি আরও জানায় আমি আমার সেলফোন নিয়ে ছবি তুলে যাই সে সময় বকগুলো গানটির মতোই ফিরে তাকিয়েছিল। সাদা পালক ঝাপটে বকগুলো একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছিল। মনে হলো পৃথিবীটা যেন একটুখানি বদলে গেছে। পথে চলার সময় হঠাৎ এমন বিনা কাজে বকগুলো যখন সামনে এলো তখন দেখে তো আমি মুগ্ধ হবোই।

আসলেই গ্রামের মানুষজনের মাঝেও প্রকৃতির সৌন্দর্যের মুগ্ধতা এসেছে। এ জেলার শিমুলবাড়ি গ্রামের কৃষক হামিদুল ইসলাম বললেন কচুরিপানার ফুল আর সাদা বকের ঝাঁকে ঝাঁকে আনাগোনা আমাদের মুগ্ধ করে রেখেছে। তাই এখন আমরা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সেখানে ফুল ছিঁড়তে নিষেধ করেছি। এ ছাড়া কচুরিপানা বেশি হলে আমাদের কৃষকদের উপকার বেশি। আমরা এখন কচুরিপানার জৈব সার ফসলের মাঠে ব্যবহার করছি। আবার কচুরিপানা শুকিয়ে তৈরি করছি দড়ি। কচুরিপানার দড়ি সবজি চাষের ঝাঙ্গির কাজে ব্যবহার করছি।

নীলফামারী সরকারী কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আব্দুস সালাম বলেন, কচুরিপানা জলজ ভাসমান উদ্ভিদ যা খুব দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। এটি প্রচুর পরিমাণে বীজ তৈরি করে, যা ৩০ বছর পরও অঙ্কুরোদগম হতে পারে। পানি পেলে কচুরিপানার ফুল প্রায় সারা বছরই ফোটে। তবে বেশি দিন স্থায়ী হয় না। নাজুক এ ফুল কা- থেকে আলাদা করলে খুব দ্রুতই নুয়ে পড়ে। তাই এ ফুল জলাশয়ে যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণই মুগ্ধতা ছড়ায়।

নীলফামারী সদরের গড়গ্রাম মডেল কলেজের ছাত্রী সেলিনা জাহানা বললেন কচুরিপানার ফুলে যে এত মনোমুগ্ধকর পরিবেশ তৈরি হতে পারে, তা আগে বুঝতে পারিনি। এখন দেখছি গ্রামের পর গ্রামে এই কচুপানার ফুল আর সেখানে খাদ্য সংগ্রহের জন্য ছুঁটে আসা সাদা বকের ঝাঁক আমাদের মনকে উৎফুল্ল করে তুলেছে। তাইতো রবি ঠাকুর লিখেছেন ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরাতাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা সে যে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে যে স্মৃতি দিয়ে ঘেরা- এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি- তাই সেলিনা জাহানের হৃদয়ে এটাই আমাদের বাংলাদেশ।