১৫ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিএনপিতে পদত্যাগের হিড়িক

  • তারেকের প্রতি অনাস্থা

শরীফুল ইসলাম ॥ বিএনপিতে পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে। লন্ডন প্রবাসী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান ও ভাইস চেয়ারম্যান এম মোরশেদ খানসহ দল ছেড়েছেন ক’জন সিনিয়র নেতা। আরও বেশ ক’জন সিনিয়র নেতা পদত্যাগের অপেক্ষায় রয়েছেন। এসব দলত্যাগীরা আগে থেকে দলের বাইরে থাকা সংস্কারপন্থী নেতাদের নিয়ে বিএনপিকে ব্র্যাকেটবন্দী করতে পারেন বলেও গুঞ্জন চলছে।

সূত্র জানায়, আগে থেকেই বিএনপির রাজনীতিতে তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ নিয়ে দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে একটি বড় অংশের আপত্তি ছিল। আর ওয়ান-ইলেভেনের সময় মূল ধারার বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ করে দলের অধিকাংশ সিনিয়র নেতা মিলে যে সংস্কারপন্থী বিএনপি গঠন করেছিলের তার মূল কারণ ছিল দলে তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ সহ্য করতে না পারা। পরে খালেদা জিয়া সুকৌশলে সংস্কারপন্থী কিছু নেতাকে দল থেকে সরিয়ে দিয়ে এবং বাকি নেতাদের কাছে টেনে সংস্কারপন্থী বিএনপির বিলুপ্তি ঘটিয়ে দলে ঐক্য ফিরিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু গতবছর ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কারাবন্দী হওয়ার পর তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে লন্ডনে বসে বিএনপির পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়ায় এবং তার কথা ছাড়া দলের কোন কাজ না হওয়ায় আবারও ক্ষুব্ধ হতে থাকেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তারেক রহমান সিনিয়র নেতাদের কোন মতামত না নিয়ে তার একক সিদ্ধান্তে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দিতে গিয়ে অনেক সিনিয়র নেতার বিরাগভাজন হন। এ ছাড়া খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকে তারেক রহমান দলের বিভিন্ন কমিটি গঠন থেকে শুরু করে সকল সিদ্ধান্ত এককভাবে নিয়ে সে সিদ্ধান্ত সিনিয়র নেতাদের ওপর চাপিয়ে দেন। এসব কিছু নিয়ে মাহবুবুর রহমান তারেক রহমানের প্রতি চরম ক্ষুব্ধ ছিলেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান এম মোরশেদ খানসহ অনেক নেতা মনোনয়ন বঞ্চিত হন। তখনই বেশ ক’জন নেতা দল থেকে পদত্যাগ করতে চাইলে কারাগার থেকে খবর পেয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া তাদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে পদত্যাগ না করে ধৈর্য্য ধরতে বলেন। তাদের ধারণা ছিল খালেদা জিয়া জামিনে মুক্তি পেয়ে বাইরে এলে হয়তো দলে তাদের মূল্যায়ন হবে তাই তারা তখন পদত্যাগ করেননি। কিন্তু খালেদা জিয়ার শীঘ্র কারাগার থেকে বাইরে আসার সম্ভাবনা না দেখে তারেকের প্রতি ক্ষুব্ধ নেতারা একে একে পদত্যাগ করতে শুরু করেন।

মোর্শেদ খান ॥ বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে তার ছেলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের কারণে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খান ৫ নবেম্বর রাতে তার ব্যক্তিগত সহকারীকে পাঠিয়ে নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন। দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বরাবরে লেখা পদত্যাগপত্রটি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে পাঠান তিনি। এই পদত্যাগপত্রের খবর শুনে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পরে পদত্যাগের বিষয়ে মোরশেদ খান ৬ নবেম্বর সাংবাদিকদের কাছে বলেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার কাছে লেখা পদত্যাগপত্র আমার ব্যক্তিগত সহকারীর (পিএস) মাধ্যমে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে পাঠিয়েছি। কিন্তু রহস্যজনক কারণে বিএনপি নেতারা এই পদত্যাগের বিষয়টি গোপন করে। এ বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমি মোরশেদ খানের পদত্যাগের বিষয়ে কিছুই জানি না। তবে আমি বিভিন্ন মাধ্যমে মোরশেদ খানের পদত্যাগের বিষয়টি শুনেছি। বিএনপির দফতরের দায়িত্বে নিযোজিত সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও মোরশেদ খানের পদত্যাগের বিষয়টি চেপে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

৬ নবেম্বর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এম মোরশেদ খান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিএনপির রাজনীতিতে এখন আর রাজনীতি নেই। এরা স্কাইপের মাধ্যমে রাজনীতি করতে চায়। এটি করে দেশের রাজনীতিতে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই আমি বিএনপির রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তিনি বলেন, বিএনপি এতবড় একটা রাজনৈতিক দল। দেশের মানুষের কাছে এ দলের বিশাল জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগতা রয়েছে। সেই দলটি এখন স্কাইপের মাধ্যমে চলছে, এটা বেদনার, এটা ক্ষোভের। আমি মনে করছি, এই দলে এখন আমার কনট্রিবিউশন করার মতো কিছু নেই।

মোরশেদ খানের পদত্যাগপত্রের বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যেই লন্ডনে অবস্থানরত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তারেক রহমান মির্জা ফখরুলকে বলেছেন, মোরশেদ খানের সঙ্গে কথা বলে তাকে যেন ম্যানেজ করার চেষ্টা করা হয়। এরপর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির আরও ক’জন নেতা মোরশেদ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করে পদত্যাগ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছেন। পরে তারেক রহমান নিজেও মোরশেদ খানের সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু মোরশেদ খান তার অবস্থান থেকে সরবেন না বলে বিএনপি নেতাদের জানিয়ে দিয়েছেন।

জানা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৮ আসনে মনোনয়ন না পাওয়ায় দলের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন মোরশেদ খান। সেখানে তার পরিবর্তে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আবু সুফিয়ানকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রামে দলের রাজনীতিতে তার অনুসারীদের বিভিন্ন পদ থেকে বাদ দেয়া হয়। তার সংসদীয় এলাকার বিএনপি ও বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কমিটিগুলোতে মোরশেদ খানের অনুসারীদের প্রাধান্য না দিয়ে আবু সুফিয়ানের অনুসারীদের গুরুত্ব দেয়া হয়। এসব নিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে মোরশেদ খানের দূরত্ব তৈরি হয়। তাই ক্ষোভ ও হতাশা থেকে তিনি দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও মনোনয়ন না পেয়ে ক্ষোভে তিনি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। তখন বিএনপির ক’জন সিনিয়র নেতা তাকে বুঝিয়ে পদত্যাগ করা থেকে বিরত রাখেন। তবে এবার আর দলের কোন নেতা তাকে থামাতে পারেননি।

মাহবুবুর রহমান ॥ ওয়ান-ইলেভেনের সময় সাইফুর রহমান ও মেজর (অব) হাফিজউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন সংস্কার পন্থী বিএনপির অন্যতম নেতা লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান। এ কারণে তার ওপর চরম ক্ষুব্ধ ছিলেন তারেক রহমান। কিন্তু খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন হওয়ায় তারেক রহমান লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমানকে কোণঠাসা করতে পারেননি। তবে খালেদা জিয়া কারাবন্দী হওয়ার পর তারেক রহমান সাবেক সেনা প্রধান মাহবুবুর রহমানকে বিভিন্নভাবে অপদস্ত করতে শুরু করেন। এ পরিস্থিতিতে আস্তে আস্তে দলে নিষ্ক্রিয় হতে থাকেন মাহবুবুর রহমান।

জানা যায়, লন্ডনের এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তার পিতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে জাতীয়তাবাদী জাতির পিতা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। রাজনীতিতে ক্লিন ইমেজের অধিকারী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সেনা প্রধান লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান তারেক রহমানের এ কথা মেনে নিতে পারেননি। তাই তিনি এর বিরোধিতা করেন। এ ছাড়া তিনি মাঝেমধ্যে তারেক রহমানের সমালোচনা করে বক্তব্য রাখতেন। এক সময় তিনি বলেন, রাজনীতি করতে হলে তারেক রহমানকে দেশে এসে করতে হবে। এর পর ২ মাস আগে তারেক রহমান তাকে পদত্যাগ করতে বললে মাহবুবুর রহমান গুলশান কার্যালয়ে একটি পদত্যাগপত্র জমা দেন। তবে তার শালা বিএনপি মহাসচিব তার পদত্যাগের বিষয়টি গোপন রেখে তাকে দলে ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তারেক রহমান তার প্রতি নমনীয় না হওয়ায় মোরশেদ খানের পদত্যাগের মাত্র ১ দিন পর মধ্যরাতে মিডিয়াকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সেনা প্রধান লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান দুই মাস আগে পদত্যাগ করেছেন বলে জানিয়ে দেন। তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের অন্য নেতারা তার পদত্যাগের বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করেন।

এ ব্যাপারে জনকণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে পদত্যাগী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, আমি ২ মাস আগেই পদত্যাগ করেছি। আমার পদত্যাগের সিদ্ধান্তও সঠিক ছিল। কি কারণে, পদত্যাগ করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিএনপিতে এখন গণতান্ত্রিক চর্চা হয় না। এ দলে যেভাবে রাজনীতি চলছে সেভাবে রাজনীতি করা যায় না। তাই আমি পদত্যাগ করেছি।

একজন সাবেক সেনা প্রধান, রাজনীতিতে ক্লিন ইমেজের অধিকারী ও খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমানের পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে খোদ বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যেই নানামুখী প্রশ্ন দেখা দেয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লন্ডনের এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তার পিতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে জাতীয়তাবাদী জাতির পিতা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। রাজনীতিতে ক্লিন ইমেজের অধিকারী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সেনা প্রধান লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান তারেক রহমানের এ কথা মেনে নিতে পারেননি। তাই তিনি এর বিরোধিতা করেন। এ ছাড়া তিনি মাঝেমধ্যে তারেক রহমানের সমালোচনা করে বক্তব্য রাখতেন। এক সময় তিনি বলেন, রাজনীতি করতে হলে তারেক রহমানকে দেশে এসে করতে হবে। লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমানের এ ধরনের কথা শুনে তারেক রহমান ক্ষুব্ধ হন। ২ মাস আগে দলের একটি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তারেক রহমান মাহবুবুর রহমানকে পদত্যাগ করতে বলেন। তারেক রহমানের এ কথা ধরে আরও ক’জন স্থায়ী কমিটির সদস্য তাকে পদত্যাগ করতে বলেন। এ পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে মাহবুবুর রহমান হাতের লেখা একটি পদত্যাগপত্র বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেন। এর পর থেকে স্থায়ী কমিটির আর কোন বৈঠকে তিনি উপস্থিত হননি।

সূত্র মতে, খালেদা জিয়া কারাবন্দী হওয়ার আগে দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠককালে বলেছিলেন, তার অনুপস্থিতিতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা সমন্বয় করে দল পরিচালনা করবেন। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়ে লন্ডনে বসে দলে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে থাকেন। মাহবুবুর রহমান তারেক রহমানের নেতৃত্ব মেনে নিতে পারেননি। তিনি চেয়েছিলেন দেশে অবস্থান করেন এমন কোন সিনিয়র নেতা এ পদে থাকুক। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মাহবুবুর রহমান বলেন, এ নির্বাচনে গিয়ে বিএনপি ভুল করেছে। এ নিয়ে তারেক রহমান তার ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন বলেও জানা যায়।

আরিফুলসহ ৪ কেন্দ্রীয় নেতা ॥ মোরশেদ খান ও লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমানের আগে ২ নবেম্বর সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীসহ বিএনপির ৪ কেন্দ্রীয় নেতা দল থেকে পদত্যাগ করেন। আরিফুল হক চৌধুরী ছাড়াও অন্য তিন নেতা হলেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এমএ হক, তাহসীনা রুশদীর লুনা ও দলের কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্র ঋণবিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক। তাদের পদত্যাগপত্র গৃহীত হলে তাদের অনুসারী আরও বেশ ক’জন নেতার পদত্যাগ করার প্রস্তুতিও নিয়ে রাখা হয়েছিল। তাদের পদত্যাগের কারণ ছিল, তাদের মতামত না নিয়ে একজন প্রবাসীকে সিলেট যুবদলের সভাপতি করা। তারেক রহমানই এ কমিটি করে দিয়েছেন বলে তাদের ক্ষোভ ছিল তারেক রহমানের প্রতিই। নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিলেও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাদের ম্যানেজ করে পদত্যাগ থেকে বিরত থাকেন। তবে পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার বিষয়ে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেছিলেন লন্ডন থেকে যুবদলের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ কারণে রাজপথে যারা আন্দোলন-সংগ্রাম করছেন, তাদের জেলা ও মহানগর যুবদলের কমিটিতে মূল্যায়ন করা হয়নি। এমনকি যারা দলের পক্ষে আন্দোলন করে নির্যাতিত হয়েছেন, তাদেরও মূল্যায়ন করা হয়নি।

খালেদা জিয়া কারাবন্দী থাকায় এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান গ্রেফতারের ভয়ে লন্ডন থেকে দেশে না ফেরায় বিএনপিতে এখন চরম নেতৃত্ব সঙ্কট চলছে। কারাবন্দী হওয়ার পরও প্রথম কয়েকমাস খালেদা জিয়া তার সঙ্গে সাক্ষাত করতে যাওয়া দলীয় নেতা ও আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে দল পরিচালনার বিষয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দিতেন। কিন্তু পরে অসুস্থ হয়ে পড়ায় আর নির্দেশনা দিতে পারছেন না। আর বিদেশ থেকে দল পরিচালনা করতে গিয়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় বার বার হোঁচট খাচ্ছেন তারেক রহমান। এ ছাড়া তারেক রহমানের কারণে, দেশে অবস্থান করা দলের সিনিয়র নেতারাও পরস্পরের প্রতি আস্থা রেখে কাজ করতে পারছেন না। এ কারণে বর্তমানে দলটির সর্বস্তর চলছে চরম বিশৃঙ্খলা। খালেদা জিয়া কারাবন্দী হওয়ার আগে দলের সকল কর্মকান্ড তার নির্দেশেই পরিচালিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তিনি সিনিয়র নেতাদের মতামত নিতেন। কিন্তু তারেক রহমান তা করেন না বরে জানা গেছে। তারেক রহমান লন্ডনে বসে যখন যে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন তাই দলে কার্যকর হয়। এ নিয়ে সিনিয়র নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও দলের পদ হারানোর ভয়ে অনেকেই সরাসরি প্রতিবাদ করছেন না। তবে মোরশেদ খান ও লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে দল ত্যাগ করে সাহসের পরিচয় দিয়েছেন বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন।

খালেদা জিয়া কারাবন্দী হওয়ার পর তারেক রহমানের রাজনীতির প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে এর আগে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী, শমসের মবিন চৌধুরী, মোসাদ্দেক আলী ফালু, জাসাস সভাপতি মনির খানসহ বেশ ক’জন কেন্দ্রীয় নেতা দল ত্যাগ করেন। বিএনপি থেকে আরও যারা পদত্যাগ করতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, আবদুল্লাহ আল নোমান, মেজর (অব) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ। এ ছাড়া সারদেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার অনেক নেতা পদত্যাগ করতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা জনকণ্ঠকে জানান, তারেক রহমান লন্ডনে বসে দলে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করার বিষয়টি কেউ কেউ মেনে নিতে পারছেন না। তাই দলের নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করে পদত্যাগ করছেন। আবার কেউ কেউ চাপা ক্ষোভ ধারণ করে আপাতত সহ্য করে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ সবকিছু মেনে নিয়ে দল করছেন। তবে প্রায় ৬০০ সদস্যের বিএনপির নির্বাহী কমিটির ২, ৪ কিংবা ১০, ২০ জন নেতা চলে গেলে সাময়িকভাবে দলের তেমন কোন ক্ষতি হবে না। তবে দল দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির মুখে পড়বে।

নির্বাচিত সংবাদ