১৫ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সেন্টমার্টিন ও টেকনাফে ১২শ’ পর্যটক আটকা

জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’। উত্তাল সাগরে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় দেশী-বিদেশী ১২শ’ পর্যটকসহ ১৮শ’ মানুষ আটকা পড়েছেন প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন ও টেকনাফ সদরে। বৃহস্পতিবার সেন্টমার্টিন ভ্রমণে যান ১২শ’ পর্যটক। ওঠেন দ্বীপের বিভিন্ন হোটেলে। সন্ধ্যায় ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের খবর প্রচার হলে তারা দুশ্চিন্তায় পড়েন। শুক্রবার সকাল থেকে সেন্টমার্টিন-টেকনাফ রুটের জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় ওই দ্বীপের স্থানীয় ছয় শ’ বাসিন্দাও নিত্যদিনের বাজার করতে এসে আটকা পড়েন টেকনাফ সদরে। এদিকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে সৃষ্ট বৈরী আবহাওয়ার কারণে সুন্দরবনের দুবলার চরে ঐতিহ্যবাহী রাসমেলা ও উৎসব বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় পুণ্যস্নানসহ শত বছরের ঐতিহ্য রাস উৎসব পালন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় কলাপাড়ার ১৫৩ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

জানা যায়, টেকনাফ উপকূলে ৪ নম্বর সতর্কতা সঙ্কেত জারি থাকায় শুক্রবার সকাল থেকে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ৩ নম্বর সঙ্কেত ঘোষণার পর বিকেলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ আশরাফুল আফসার পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত সেন্টমার্টিন নৌপথে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেন। পর্যটকরা শুক্রবার সকাল থেকে জাহাজ ঘাটা গিয়ে ট্রলারের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। তবে কোন ধরনের ট্রলার বা ইঞ্জিনচালিত নৌকা সাগরে নামছে না দেখে হতাশায় ভোগেন পর্যটকগণ। এদিকে বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল সাগরের কারণে টেকনাফ- সেন্টমার্টিন নৌপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় সেন্টমার্টিনে প্রায় এক হাজার দু’শ পর্যটক বিভিন্ন হোটেলে নিরাপদে থাকলেও তাদের মধ্যে এক প্রকার আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রতিদিনের ন্যায় জিনিসপত্র কিনতে এসে টেকনাফে আটকা পড়েছেন দ্বীপের স্থানীয় ছয়’শ বাসিন্দা। সেন্টমার্টিন ইউপি চেয়ারম্যান নুর আহমদ মুঠোফোনে জনকণ্ঠকে জানান, বৃহস্পতিবার বেড়াতে আসা পর্যটকদের অনেকে রাত যাপনের জন্য থেকে গেছেন। হঠাৎ বৈরী আবহাওয়ার কারণে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ায় তারা আটকে গেছেন। সেন্টমার্টিন থেকে স্থানীয় লোকজন বিভিন্ন বাজার করে দ্বীপে ফেরার প্রাক্কালে বৈরী আবহাওয়ার কারণে ৩নং সঙ্কেত জারি করে জেলা প্রশাসন। এতে টেকনাফ থেকে সাগরে যে কোন ধরনের ইঞ্জিনচালিত বোট বা ট্রলারকে যাত্রা না করার নির্দেশ দেয়। এতে সেন্টমার্টিনের ছয় শ’ লোক আটকা পড়ে টেকনাফে।

আটকাপড়া দেশী-বিদেশী পর্যটকদের সার্বিক সহযোগিতা চেয়ে দ্বীপের চেয়ারম্যান নূর আহমদ বলেন, দুর্যোগ না কাটা পর্যন্ত আটকাপড়া পর্যটকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কোন প্রকার হয়রানি না করার জন্য হোটেল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শুক্রবার সকাল ও বিকেলে হোটেলগুলোতে গিয়ে তিনি পর্যটকদের খোঁজ-খবর নিয়েছেন এবং আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য আশ্বস্ত করেছেন বলে জানান।

এ বিষয়ে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলকারী জাহাজ কেয়ারি সিন্দাবাদ ও কেয়ারি ক্রুজের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, সমুদ্রে ৪ নম্বর সতর্কতা সঙ্কেত জারি এবং সাগর উত্তাল থাকায় শুক্রবার সকাল থেকে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানায়, সাগরে এখন ৪ নম্বর সতর্কতা সঙ্কেত জারি করা হয়েছে। টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধসহ সমুদ্রে সব ধরনের নৌযানকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে নির্দেশ দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। তবে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ আঘাত হানার বেশি ঝুঁকির তালিকায় কক্সবাজার জেলার নাম নেই বলে জানা গেছে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে উপকূলবর্তী যে সাতটি জেলা অতি ঝুঁকির মধ্যে আছে সেগুলো হলো খুলনা, সাতক্ষীরা, বরগুনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ভোলা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডাঃ মোঃ এনামুর রহমান শুক্রবার বিকেলে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।

সুন্দরবনে রাস উৎসব বন্ধ ঘোষণা

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এর প্রভাবে বৈরী আবহাওয়ায় সুন্দরবনের দুবলার চরের আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসব মেলা এবার বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা শেষে এই তথ্য জানানো হয়েছে। সুন্দরবনের গভীরের দুবলার চরের আলোরকোলে শতবছর ধরে ঐতিহ্যবাহী এই লোকউৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর কার্তিক পূর্ণিমা তিথিতে এই উৎসব পালন করা হয়। তিথি অনুযায়ী, আগামী ১০ থেকে ১২ নবেম্বর পর্যন্ত এই উৎসব আয়োজনের কথা ছিল। পুণ্যস্নান ও উৎসব উপলক্ষে প্রতিবছর ৪০ থেকে ৫০ হাজার তীর্থযাত্রী ও দর্শনার্থী সেখানে যেত।

দুবলার চর রাস উৎসব জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে জনমালের নিরাপত্তার বিবেচনায় পুণ্যার্থী, পূজারি ও দর্শনার্থীদের এবার দুবলার রাস উৎসবে যাত্রা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়ে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে বড় ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কায় এবারের রাস উৎসব বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে উৎসব না হলেও সংক্ষিপ্ত পরিসরে মন্দিরে পূজা ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালিত হবে। রাস উৎসব অনুষ্ঠিত হয় দুবলারচরের আলোরকোলে সাগর তীরে। এই এলাকাটি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের অন্তর্গত এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চল। উৎসবে যেতে তাই বন বিভাগের অনুমতি লাগে। দুর্যোগময় আবহাওয়ার কারণে বন বিভাগও উৎসবে যেতে পাস (অনুমতি) বন্ধ করেছে। পাশাপাশি সুন্দরবন ও উপকূলে জেলেদেরও ফিরে আসতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

দুবলারচর রাস উৎসব জাতীয় কমিটি সহ-সহভাপতি বাবুল সরদার ও সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ বসু সন্তু বলেন, শুক্রবার সকাল থেকে সাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে, ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি বাড়ছে। সুন্দরবনের দুবলারচরের আলোরকোলে ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসবের এবারের আয়োজন অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে ‘অনুমতি না মেলায়’ বন্ধ ঘোষণা করা হচ্ছে। তবে পূজাসহ ধর্মীয় আচার যথানিয়মে চলবে।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোঃ মামুনুর রশীদের সভাপতিত্বে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরী সভায় পুলিশ সুপার পংকজ চন্দ্র রায়, জেলার নয়টি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা, ফায়ার সার্ভিস, পানি উন্নয়ন বোর্ড, রেড ক্রিসেন্ট, সিপিপিসহ বিভিন্ন দফতর, বিভাগ ও শ্রেণীপেশার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

জেলা প্রশাসক বলেন, সুন্দরবনের দুবলারচরের রাস উৎসব ছাড়াও দুবলারচরের বিভিন্ন চরে শুঁটকি মৌসুমকে ঘিরে কয়েক হাজার জেলে অবস্থান করছেন। সেখানে জেলেদের জন্য ৩টি সাইক্লোন শেল্টার আছে। ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগেই দুবলারচরের শুঁটকি পল্লীর জেলেদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে। এজন্য কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সহযোগিতা নেয়া হবে। পাশাপাশি সতর্ক সঙ্কেত বাড়লে উপকূলীয় লোকজনকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে তৃণমূলে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। প্রশাসনিক ছুটি বাতিল ও কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে, ইউনিয়ন পর্যায়েও মাইকিং করা হচ্ছে।

কলাপাড়ায় ১৫৩ আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ১২টি ইউনিয়ন ও দুইটি পৌরসভার ১৫৩টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন সকল আশ্রয় কেন্দ্রের চাবিসহ তাৎক্ষণিক লোকজন যেন আশ্রয় নিতে পারেন এ জন্য প্রস্তুতি রাখা হয়েছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মুনিবুর রহমান। দক্ষিণাঞ্চলের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসব কুয়াকাটায় আগামী ১১ নবেম্বর শুরু হওয়ার কথা। ইতোমধ্যে সকল প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে এ বছর রাস উৎসব ও সাগরে পুণ্যস্নান নিয়ে উদ্বিগ্ন আয়োজকরা। কলাপাড়া পৌরশহরের মদন মোহন সেবাশ্রমে ১৯২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া রাস উৎসবকে ঘিরে রয়েছে পাঁচদিনের আয়োজন, তা নিয়ে চিন্তিত আয়োজকরা। জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার্থীরাও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বিপাকে পড়েছেন। কুয়াকাটায় বেড়িবাঁধের বাইরের আবাসিক হোটেলগুলোতে অবস্থান নেয়া পর্যটকের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত কর্তৃপক্ষ।

নির্বাচিত সংবাদ