২৩ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভুয়া বাবা সেজে জমি বিক্রির প্রতারক চক্র ধরল পিবিআই

  • দীর্ঘ ৭ বছর পর জানা গেল প্রকৃত ঘটনা

গাফফার খান চৌধুরী ॥ অভিনব কৌশলে মালিক সাজিয়ে তিন দফায় জমি বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া একটি প্রতারক চক্রকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআই। অথচ যাদের জমি, তারা জানেও না যে তাদের জমি বিক্রি হয়ে গেছে। দীর্ঘ সাত বছর পর প্রমাণ মিলল জমির প্রকৃত মালিকরা জমি বিক্রি করেননি। অথচ তারাই যে জমির প্রকৃত মালিক, তা প্রমাণ করতে ইতোমধ্যেই মালিকদের খরচ হয়েছে কমপক্ষে আধাকোটি টাকা। পথে বসার জোগাড় হয়েছে প্রকৃত মালিকরা। জমির চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আশি বছরের বৃদ্ধ গোলাম হোসেন। জমির মামলা লড়তে গিয়ে নিজের প্রতি খেয়াল রাখারও সময় পায়নি। তেমন চোখে ভাল দেখেন না। সম্প্রতি চোখ অপারেশন করিয়েছেন। পরিবারের সদস্যের কাছেও এক সময় অবিশ্বাসী বাবা বলে বিবেচিত হয়েছিলেন তিনি। সেই মানসিক কষ্ট তাকে কুরে কুরে খেয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি যে জমি বিক্রি করেননি, সে কথা মনে করে এখন আত্মতৃপ্তি পাচ্ছেন। সুখে চোখ বেয়ে গড়াচ্ছে আনন্দাশ্রু।

পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলছিলেন ঘটনাটি বেশ চমকপ্রদ ঘটনা। তিনি জানান, ঢাকার ডেমরা থানাধীন ডগাইর নতুন পশ্চিম পাড়ার হিজবুল্লাহ সড়কের ৭৮ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা গোলাম হোসেন। বয়স আশি পেরিয়েছে। বংশ পরম্পরায় ও ওয়ারিশদের কাছ থেকে সর্বমোট ৪৫ শতাংশ জমির মালিক হন তিনি। ১৯৯৭ সাল থেকে তিনি জমি ভোগ দখল করছেন, নিয়মিত খাজনা দিচ্ছিলেন।

’১২ সালে পারিবারিক প্রয়োজনে স্ত্রী সন্তানদের মতামত নিয়ে জমিটি বিক্রির উদ্যোগ নেন। স্থানীয় আব্দুল খালেক নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে জমি বিক্রির বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। এক কোটি ২০ লাখ টাকা দামও নির্ধারিত হয়। ক্রেতা ৫ লাখ টাকা নগদ দেন। আর ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে তোলার জন্য দেন ৪৫ লাখ টাকার চেক। ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের ভিত্তিতে বায়না দলিল হয়। বাকি টাকা তিন মাসের মধ্যে পরিশোধ করবেন চুক্তির শর্ত ছিল এমনটা।

গোলাম হোসেন ৪৫ লাখ টাকার চেক নিয়ে ব্যাংকে গেলে। চেক ডিজঅনার হয়। নিজের দখলে জমি থাকায় মানবিক কারণে চেক ডিজঅনারের মামলা না করে তিনি বিষয়টি আব্দুল খালেককে জানান। বলেন, দ্রুত টাকা পরিশোধ করে দিন। ক্রেতা আব্দুল খালেক পুরো টাকা জমির সাব কবলা দলিল হওয়ার সময় দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।

জমি মালিক অশীতিপর গোলাম হোসেন আব্দুল খালেকের চালাকি বুঝতে পারেননি। তিনি আব্দুল খালেকের কথায় বিশ্বাস করে জমি অন্যত্র বিক্রি না করে নিজের হেফাজতে রাখেন। নিয়মিত আব্দুল খালেকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন। আব্দুল খালেক তার সহযোগী সোহেল মিয়া, আব্দুল করিম, শিপন খান, সালাউদ্দিন মিয়া, তরিকুল ইসলাম, ফারুক হোসেন মাহমুদ, ভুয়া দলিল লেখক নুরুজ্জামান ও নূর হোসেন নামে প্রতারকদের সঙ্গে জাল দলিলে জমি নেয়ার কৌশল আঁটে।

সেই মোতাবেক তারা ’১২ সালের ৮ এপ্রিল এক ব্যক্তিকে জমির প্রকৃত মালিক গোলাম হোসেন সাজিয়ে ডেমরা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে হাজির করে। এখানেই শেষ নয়, সে বছরের ২২ জুলাই অপরিচিত তিন ব্যক্তি ও তিন নারীকে গোলাম হোসেনের তিন ছেলে গোলাম কিবরিয়া, গোলাম সোহেল ও গোলাম সগির এবং তিন মেয়ে নার্গিস আক্তার, ফেরদৌসী আক্তার ও রোজী আক্তার সাজিয়ে ডেমরা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে হাজির করে। পুরো প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেন না’গঞ্জের রূপগঞ্জের সাব রেজিস্ট্রার অফিসের দলিল লেখক নুরুজ্জামান। এভাবে ভুল ব্যক্তিকে জমির মালিক সাজিয়ে মোট ৪৬ শতাংশ জমির সাব কবলা দলিল করা হয়।

পরে শুরু হয় ওই জমির দখল নেয়ার প্রক্রিয়া। জমির দখল নিতে গিয়ে গোলাম হোসেনসহ পুরো পরিবার হতভম্ব। বাবার প্রতি সন্তানদের অবিশ্বাস জন্মে। এ নিয়ে পারিবারিক অশান্তি চরমে পৌঁছে। দায়ের হতে থাকে একের পর এক মামলা। দীর্ঘ সাত বছর বহু মামলা চলেছে। শেষ পর্যন্ত আদালত ওই মামলার তদন্তভাব দেয় পিবিআইকে।

পিবিআইর ঢাকা মেট্রোর উত্তরের বিশেষ পুলিশ সুপার মোঃ বশির আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, জমির মামলা এমনিতেই খুব জটিল। এজন্য মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করা হয়েছে। সাধারণত কোন মামলায় এত সময় লাগে না, যেমনটা এ মামলার ক্ষেত্রে লেগেছে। কারণ আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে সাব রেজিস্ট্রি অফিসের প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র আনা হয়েছে। সেগুলো পাঠানো হয় সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে। মামলার তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেন সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের আঙ্গুলের ছাপ ও হস্তলিপি বিশারদরা। একাধিক হস্তলিপি বিশারদ জব্দ আলামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। এতে দেখা যায় পুরো বিষয়টিই জাল। সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বেরিয়ে আসে প্রকৃত সত্য ঘটনা।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা মেট্রোর উত্তরের পরিদর্শক মোঃ কামাল হোসেন জনকণ্ঠকে জানান, দীর্ঘ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে প্রতারণার অভিনব কৌশল। এ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়া হয়েছে। চার্জশীটে আসামি করা হয়েছে প্রতারক মোঃ আব্দুল খালেক (৪৬), সোহেল মিয়া (৪০), না’গঞ্জ সাব রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল কম্পোজের দায়িত্ব পালনকারী আব্দুল করিম (৪৩), মোঃ শিপন খান (৪২), মোঃ সালাউদ্দিন মিয়া (৪৫), মোঃ তরিকুল ইসলাম তারেক (৩৯), ডেমরা সাব রেজিস্ট্রি অফিসের স্ট্যাম্প ভেন্ডার মোঃ ফারুক হোসেন মাহমুদ (৫৫) ও মোঃ নুরু হোসেনকে (৩৭)।

তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, মোট ৯ জনের চক্রটি ঘটনাটি ঘটিয়েছিল। এর মধ্যে না’গঞ্জের রূপগঞ্জ সাব -রেজিস্ট্রি অফিসের ভুয়া দলিল লেখক নুরুজ্জামান অন্যতম। তদন্তে দেখা গেছে, নুরুজ্জামান নামে এক দলিল লেখক সেখানে ছিলেন, যিনি ঘটনার দুই বছর আগে মারা গেছেন। তার নাম ব্যবহার করে ‘বর্তমান নুরুজ্জামান‘ দলিল লেখক সেজেছিল। পরে মামলা চলাকালে ভুয়া দলিল লেখকও মারা যান। এজন্য মামলার চূড়ান্ত চার্জশীট থেকে ভুয়া দলিল লেখক নুরুজ্জামানের নাম বাদ দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জমির প্রকৃত মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ঢাকার যাত্রাবাড়ীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গোলাম হোসেন বলছিলেন. দীর্ঘ সাত বছর পর আমি তৃপ্তি পাচ্ছি। কারণ জমি বিক্রি নিয়ে ইতোমধ্যেই আধাকোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে। তার চেয়েও বড় কথা হলো, জমি বিক্রি নিয়ে পরিবারে অশান্তির সৃষ্টি হয়েছিলÑ বলতে পারেন, আমি সন্তানদের কাছে একপ্রকার অবিশ্বাসী বাবায় পরিণত হয়েছিলাম। সন্তানদের সেই ভুল এখন ভেঙ্গেছে। এটিই আমার জীবনের শেষ আত্মতৃপ্তি। সিআইডি আর পিবিআই পুলিশের কল্যাণে আমি বিবেকের দায় থেকে মুক্তি পেয়েছি। কাঁদা বারণ তবু চোখের পানি সামলাতে পারছিলেন না বৃদ্ধ গোলাম হোসেন।