১২ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কৃষি জমির সুরক্ষা

বাংলাদেশ কৃষক লীগের দশম জাতীয় কাউন্সিলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও সবিশেষ জোর দিয়ে বলেছেন, শিল্প-কারখানা স্থাপন করতে কোনক্রমেই কৃষি জমি অধিগ্রহণ করা যাবে না। কেননা, কৃষি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অদ্যাবধি মূল চালিকা শক্তি। দেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষকে দৈনন্দিন আহার ও পুষ্টি নিয়মিত জুগিয়ে যাচ্ছে বাংলার কৃষক সম্প্রদায় উদয়াস্ত পরিশ্রম করে। সে অবস্থায় সর্বাগ্রে কৃষি জমির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিল্প কারখানা যদি স্থাপন করতেই হয়, তাহলে প্র্রাধিকার দিতে হবে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলকে। সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুত-গ্যাস-পানি-অবকাঠামো ও যথাযথ রাস্তাঘাটসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সহজলভ্য। এর পরও যদি শিল্প স্থাপনের প্রয়োজন পড়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য, তাহলে তা অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর অঞ্চলে, বড়জোর এক ফসলি জমিতে করা যেতে পারে। দেশের স্বার্থে এবং উন্নয়নের প্রয়োজনে শিল্পায়নে জোর দিতে হবে অবশ্যই। তবে তা কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নয়। বরং কৃষি ও কৃষককে যথাযথ সহায়তা দিয়েই এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে দেশের শিল্পায়ন ও অগ্রগতি। আর তাহলেই কেবল কৃষি ও কৃষক বাঁচবে। পাশাপাশি গড়ে উঠবে শিল্প কারখানা, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। এর জন্য যুগোপযোগী করতে হবে কৃষি আইন ও ভূমি সংস্কার।

নতুন আইন তৈরির পাশাপাশি ব্রিটিশ আমলে প্রণীত ভূমি সংক্রান্ত আইন ও বিধি সংস্কারের মাধ্যমে দেশের মানুষকে আরও গতিশীল ভূমিসেবা প্রদানই এর অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। উল্লেখ্য, দেশে ভূমিসংক্রান্ত আইন, বিধি, জটিলতা, বেচাকেনা, রেজিস্ট্রেশন, নামজারি, খাজনা প্রদানে নানা সমস্যা-সঙ্কট তদুপরি দেওয়ানি মামলার পাহাড় ও দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রায় সর্বস্তরের মানুষের অভিযোগের অন্ত নেই। এর পাশাপাশি উৎকোচ প্রদান, ঘুষ-দুর্নীতি, অনিয়ম অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তো আছেই। এসব অবসানের লক্ষ্যেই ভূমি আইন আধুনিক, সময়োপযোগী ও ডিজিটাল করা হচ্ছে।

১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনে গ্রামাঞ্চলে ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের অনুমতির বিধান থাকলেও সেটি প্রতিপালিত হয় না কোথাও। ফলে কৃষিজমিসহ ভূমির যথেচ্ছ ব্যবহার এমনকি অপব্যবহার বেড়েছে ক্রমশ। যে যেখানে খুশি মর্জিমাফিক গড়ে তুলেছে বসতবাড়ি কিংবা অন্যবিধ স্থাপনা। বাগানবাড়ি, পার্ক এমনকি শিল্প কারখানা। ফলে দিন দিন ভূমি বিশেষ করে কৃষিজমির পরিমাণ কমছে। অনেক স্থানে এমনও দেখা যায় যে, ধানের জমির মাঝখানে অথবা জলাশয় ভরাট করে গড়ে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন বাড়িঘর। অনেক ক্ষেত্রে নদ-নদীসহ অবৈধ দখলের অভিযোগও আছে। বেদখলে বনভূমিও উজাড় হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন কৃষিজমির পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে ভরাট হয়ে যাচ্ছে জলাশয়, লোপাট হচ্ছে খাসজমি ও বনভূমি।

এ রকম একটি যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন এবং তা মানার বাধ্যবাধকতা নিয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। সত্য বটে, বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নের মহাসড়কে অবস্থান করছে এবং শহর-বন্দরসহ নানা স্থানে শিল্প-কারখানাসহ নানা স্থাপনা নির্মাণ হচ্ছে। তবে এসবের অধিকাংশই অপরিকল্পিত, ভূমির ব্যবহার যথেচ্ছ এবং কোথাও বা অবৈধ। সরকারী খাসজমি এমনকি জলাশয়, নদ-নদী দখল করেও চলছে নির্মাণ পর্বের দক্ষযজ্ঞ। ভূমির পরিমাণ যেহেতু সীমাবদ্ধ ও সীমিত, সেহেতু তা অবশ্যই পরিকল্পিত উপায়ে ব্যবহারের দাবি রাখে। সেটাও হতে হবে সুষ্ঠু, সমন্বিত, সর্বোপরি পরিবেশবান্ধব। নতুন ভূমি আইনে তা নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন জমির অপরিকল্পিত ব্যবহার রোধ হবে, অন্যদিকে সুনিশ্চিত হবে উন্নয়নের গতি। অব্যাহত থাকবে খাদ্য উৎপাদন ও নিরাপত্তা। অনলাইনে অর্থ প্রদানের মাধ্যমে জমির খাজনা, নামজারিসহ রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা সম্পন্ন করা গেলে এসব প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত সহজে হয়রানি ব্যতিরেকে জনসেবা দিতে পারবে । পাশাপাশি কমবে কৃষকের অযথা হয়রানি, সময়ক্ষেপণ ও দুর্নীতি।