১২ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সংস্কারমুখী কার্যক্রমে বিনিয়োগে আস্থা বৃদ্ধি

  • অর্থনৈতিক গতিধারার ওপর ঢাকা চেম্বারের প্রতিবেদন প্রকাশ

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে গত এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের অন্যতম এই সংগঠন বলছে প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় বাড়া ও দারিদ্র্যের হার ক্রমাগত হ্রাস এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে রোল মডেল। এই অর্জন সম্ভব হয়েছে জাতিরজনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে। সত্যিকার অর্থেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কাজ করছেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

শনিবার মতিঝিলের নিজস্ব কার্যালয়ে ‘বেসরকারীখাতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যত চিত্র’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে ডিসিসিআই। ওই সময় জানানো হয়, সরকারের বিভিন্ন সংস্কারমুখী কার্যক্রমের ফলে সহজে ব্যবসা করার সূচকে ৮ ধাপ উন্নতি করে ১৬৮তম অবস্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। এর ফলে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। গত বছর রেকর্ড অর্জন করে সর্বোচ্চ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশী বিনিয়োগ আসে এদেশে। তবে ধারাবাহিকভাবে এই অর্জন ধরে রাখতে বেশ কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছে বেসরকারীখাতের এই সংগঠনটি। তাদের মতে, দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা সংস্কার ও কর্পোরেট করের গ্রহণযোগ্য হার নির্ধারণ হওয়া প্রয়োজন। এছাড়া করহার না বাড়িয়ে নতুন করদাতা খুঁজে করের আওতা বাড়ানোরও সুপারিশ করেছে ডিসিসিআই। এছাড়া ব্যাংকিংখাত থেকে সরকারকে ঋণ না নেয়ারও পরামর্শ দেয়া হয়েছে। জোর দেয়া হয়েছে এডিপি বাস্তবায়নে।

সংবাদ সম্মেলনে ডিসিসিআই’র সভাপতি ওসামা তাসীর সাংবাদিকদের সঙ্গে অর্থনীতির বর্তমান চালচিত্র, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যত সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। ওই সময় তিনি আর্থিক নীতিমালা, মুদ্রানীতি, সামষ্টিক অর্থনীতি বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, বেসরকারী বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কর্মসংস্থান প্রভৃতি বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এছাড়া ডিসিসিআই সভাপতি কৃষিখাত, তৈরি পোশাক খাত, চামড়া, ওষুধ, বিদ্যুত ও জ্বালানি, ব্যাংকিং খাত, পুঁজিবাজার, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের ওপর আলোকপাত করেন। তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে টেকসই করতে বেসরকারী খাতের প্রতিবন্ধকতাসমূহ হ্রাসের জন্য কিছু নীতি সুপারিশ আকারে উপস্থাপন করেন। ডিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত ৬ বছর ধরে বেসরকারী বিনিয়োগ জিডিপি’র ২২-২৩ এর মতো হচ্ছে। বর্তমান সরকারের বেশকিছু সাফল্য যেমন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে রোল মডেল হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, ৯৫ শতাংশ মানুষকে বিদ্যুত সুবিধার আওতায় আনা, দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ১৮ শতাংশে হ্রাসকরণসহ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সক্ষমতা অর্জনের জন্য ডিসিসিআই সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের এ অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা স্বীকৃতি দিয়েছে।

এছাড়া বর্তমান সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পদ্মা বহুমুখী সেতু, মেট্রোরেল এবং মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুত কেন্দ্রের মতো বেশ কিছু বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে যা বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে বাংলাদেশের এ উন্নয়ন যাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বেসরকারী খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে ডিসিসিআই বেসরকারীখাতের অন্যতম বৃহৎ সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান ও ভবিষ্যত চালচিত্র, শক্তিমত্তা ও সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে এবং উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করবে। ডিসিসিআই যেসব বিষয়ের ওপর মতামত দিয়েছে-

একনজরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ॥ বিশ^ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পিপিপি’এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ পৃথিবীর ৩২তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ এবং নমিনাল হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৩তম। বর্তমানে পৃথিবীর দ্রুুত অগ্রসরমান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে একটি বাংলাদেশ, যার জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। এদেশের অর্থনীতি কৃষি নির্ভরতা থেকে সরে এসে শিল্প নির্ভরতার দিকে এগিয়ে চলছে। পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সেবা খাতও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপিতে শিল্প ও সেবা খাতের অবদান যথাক্রমে ৩৫ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং ৫১ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং কৃষিখাতের অবদান মাত্র ১৩ দশমিক ৬০ শতাংশ।

জাতীয় বাজেট ॥ সরকার রাজস্ব আয়ের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর আদায়ের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল যা মোট রাজস্বের প্রায় ৮৮.৪৪ ভাগ। অপরদিকে, বাজেট ঘাটতি মেটাতে জাতীয় সঞ্চয়পত্র এবং ব্যাংক খাত হতে সরকারের ঋণ গ্রহণের ফলে সরকারের ওপর ক্রমাগত ঋণের বোঝা বাড়ছে। যদিও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়নের হার আশাব্যঞ্জক, তবে বাস্তবায়নের গুণগত মানের বিষয়টি এখনও উদ্বেগের বিষয়। জাতীয় বাজেটে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ঢাকা চেম্বার মনে করে, বাজেট ঘাটতি মেটাতে কর আহরনের আওতা বাড়ানোর ওপর আরও বেশি গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন এবং সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো প্রয়োজন। বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ কমানোর জন্য এনবিআরকে অবশ্যই ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নতুন নতুন করদাতাকে করের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এছাড়াও গুণগত মান বজায় রেখে নির্ধারিত সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করার জন্য এডিপি বাস্তবায়নকারী সফল কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দকে বিশেষ প্রণোদনা প্রদান করা যেতে পারে। অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে, কারণ জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে অবকাঠামো সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

বেসরকারী বিনিয়োগ ॥ সরকার সহজে ব্যবসা করার সূচকে ২০২১ সালের মধ্যে ১০০তম অবস্থান নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। ২০২০ সালের রিপোর্টে সহজে ব্যবসা করার সূচকে ৮ ধাপ উন্নতি করে ১৬৮তম অবস্থান অর্জন করা উৎসাহব্যঞ্জক। এই রিপোর্টে বাংলাদেশ সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে এমন শ্রেষ্ঠ ২০টি দেশের মধ্যে একটি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই সংস্কার কার্যক্রমের কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে এবং এ কারণে ২০১৮ সালে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৩.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিদেশী বিনিয়োগ হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তৈরি পোশাকের রফতানি বৃদ্ধির ফলে বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে ১৪.৮ শতাংশ। রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণে ও নতুন নতুন রফতানি বাজার সম্প্রসারণে বিস্তৃত কৌশল অবলম্বন করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য বিশেষ করে বন্দরসমূহে টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। অপরদিকে শুল্ক বিষয়ক প্রতিবন্ধকতা কমানোর জন্য আমাদের ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি’-আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এছাড়া কর্মসংস্থান, কৃষিখাত, উৎপাদনশীলখাত, পোশাক শিল্প খাত, চামড়া শিল্প, ওষুধ শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, বিদ্যুত ও জ্বালানি, ব্যাংকিংখাত, পুঁজিবাজার, বন্দর পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং অনলাইন বাণিজ্যের ওপর জোর দেয়া হয়েছে।

ব্যাংকিংখাত ॥ ব্যাংকিং খাতের বিষয়ে বলা হয়েছে-২০১৯ সালের জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত শিল্পখাতে মেয়াদী ঋণ ২০১৮ সালের একই সময়ের তুলনায় সামান্য অর্থাৎ ০.৯৭ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি একই সময়ে এসএমই ঋণ প্রদান করা হয়েছে মোট ১৯ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা। বেশিরভাগ ব্যাংক এখনও ১১ থেকে ১৫ শতাংশ সুদ হারে ঋণ দিচ্ছে। খেলাপী ঋণ অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার এক অঙ্কের সুদহারে ঋণ প্রদানের বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে যা আশাব্যঞ্জক। তবে, এক অঙ্কের সুদহার বাস্তবায়নের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় সঞ্চয়পত্রের সুদহার হ্রাস এবং সুশাসন একান্ত জরুরী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগে একটি পদ্ধতি হাতে নেয়া যেতে পারে যার মাধ্যমে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপী এবং অনিচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপী শনাক্ত করা যেতে পারে। এতে করে খেলাপী ঋণ কমিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সুবিধা হবে।

এছাড়া পুঁজিবাজারে বন্ড মার্কেটের অনুপস্থিতি, ভাল প্রতিষ্ঠান এবং সুশাসনের অভাব পুঁজিবাজারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের অপার সম্ভাবনাকে সীমিত করে রেখেছে। ডিসিসিআই তাই দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের জন্য পুঁজিবাজারে বন্ড মার্কেট স্থাপন এবং স্পেশাল পারপাস ভেহিকেল হিসেবে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ব্যবহারকে উৎসাহিতকরণের আহ্বান জানাচ্ছে। উপরন্তু নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাসমূহের উচিত গ্রীন-ফিল্ড প্রকল্পসমূহকে অন্তর্ভুক্ত হয়ে মূলধন সংগ্রহ করার সুযোগ প্রদান করা। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এসএমই প্ল্যাটফর্ম কার্যকর ব্যবহার করে এসএমই প্রতিষ্ঠানসমূহ যাতে বাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করতে পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

নির্বাচিত সংবাদ