০৮ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বুলবুলের মোকাবেলা

প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন পিছু ছাড়ছে না বাংলাদেশের, তাও আবার অসময়ে, শীত মৌসুম যখন আসন্ন। এবারে একেবারে ১০ নম্বর মহাবিপদ সঙ্কেত নিয়ে দেখা দিয়েছিল বুলবুল। শনিবার মধ্যরাত ও রবিবার সকাল নাগাদ বুলবুল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের পশ্চিমাংশ অতিক্রম করে গেছে। ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত করার সমূহ সম্ভাবনা ছিল জোয়ারের সময়। ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭-৮ ফুট বেশি জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিলেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। সেইসঙ্গে দেড় শ’ কিলোমিটার বেগের ঘূর্ণিঝড় নিয়ে ভয়ঙ্কর বাতাস। সে জন্য প্রবল ঝড়-ঝঞ্ঝা-বজ্র ও বৃষ্টিপাতের সমূহ আশঙ্কা ছিল। বুলবুলকে তুলনা করা হয়েছিল দশ বছর আগে সংঘটিত পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপ ও সুন্দরবন এলাকায় আঘাত হানা আইলা ও সিডরের সঙ্গে। সিডর-আইলার বিপদ ও ক্ষয়ক্ষতির কথা ভুক্তভোগীসহ অনেকের মনে আছে নিশ্চয়ই। সে সময়ের অনেক ক্ষত, বিশেষ করে উপকূলীয় বেড়িবাঁধের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যায়নি অদ্যাবধি। তবু মানুষ ঘুরে দাঁড়িয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাকের সঙ্গে লড়াই করে। এর জন্য বাংলাদেশ, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ প্রাণখোলা অভিনন্দনের দাবি করতেই পারেন। অবশ্য আশার কথাও শুনিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। বুলবুলের প্রকোপে বাতাসের গতিবেগ প্রবল এবং জলোচ্ছ্বাসের সম্ভাবনা থাকলেও প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে সুন্দরবন সামলে নেবে অনেকটাই। নিয়েছেও। সরকারসহ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সর্বোপরি স্থানীয় প্রশাসন মাঠপর্যায়ে প্রায় সব রকম প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। উপকূলবাসীদের ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রসহ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। মজুদ রাখা হয়েছে শুকনো খাবার ও পানি। সর্বোপরি জরুরী উদ্ধার তৎপরতায় অংশগ্রহণের জন্য সদা প্রস্তুত রাখা হয়েছে অর্ধলক্ষাধিক স্বেচ্ছাসেবককে। বাতিল করা হয়েছে জেএসসি, জেডিসি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রুটিন অনুযায়ী পরীক্ষার তারিখ।

প্রকৃতির লীলাখেলা সত্যিই বোঝা ভার! তবে ১০ বছর আগে সংঘটিত ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ‘সিডর-আইলার’ তুলনায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল ছিল বুলবুল। এর বাতাসের গতি, জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ও বিস্তৃতি, বৃষ্টি এবং বজ্রপাতের পরিমাণ ছিল অনেক কম। স্বস্তির কথা এই যে, রবিবার ভোরে সুন্দরবন উপকূলে আঘাত হেনে বুলবুল স্থলভাগ দিয়ে অতিক্রম করেছে বাংলাদেশের সীমানা। এটি সারাদেশে অল্পবিস্তর বৃষ্টি ঝরিয়ে স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়ে নিঃশেষিত হয়েছে। কয়েকজন নিহত ও আহত হয়েছেন গাছ চাপা পড়ে। ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ল-ভ- হয়েছে উপকূলীয় অঞ্চল। বিশেষ করে কাঁচা ঘরবাড়ি এবং গাছপালা ব্যাপকভাবে উপড়ে যাওয়ার খবর আছে। সমুদ্রে জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা কম হলেও ভাঙ্গা বাঁধ দিয়ে কিংবা বাঁধ উপচে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ফলে আমনের ক্ষেত, মাছের ঘের, লবণের জমিসহ কিছু সম্পদ স্বভাবতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ট্রান্সফরমার ও সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকা হয়ে পড়েছে বিদ্যুতবিহীন।

আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও আবহাওয়া বিভাগের প্রস্তুতি যথেষ্ট ভাল। তবে একে আরও আধুনিক ও সময়োপযোগী করতে হবে। ১০ নম্বর মহাবিপদ সঙ্কেত ঘোষণা করেই কেউ হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি। এর ভয়াবহ পরিণতি কি হতে পারে এবং মানুষের কি করণীয় সে সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে রেডিও-টিভিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম। কোস্টগার্ড, রেড ক্রিসেন্টসহ স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশংসার যোগ্য। তারা বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষকে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করেছেন। অতঃপর যত দ্রুত সম্ভব ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে পুনর্বাসিত হতে পারেন তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসনের। তাই বলে আত্মপ্রসাদের অবকাশ নেই। বাংলাদেশের অবস্থান যেহেতু প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় এবং আমরাও রয়েছি জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে, সেহেতু দক্ষতার সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবেলার অভিজ্ঞতা আমাদের অর্জন করতেই হবে।