০৮ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকার দিনরাত

  • মারুফ রায়হান

মশার উৎপাত কি বেড়ে গেল আবার? ভেবেছিলাম আমাদের উত্তরাতেই বোধহয় মশা বেড়েছে। তা নয়। সেদিন বনানীতে ক’জন বন্ধু আড্ডায় বসেছিলাম। রাত গভীর হয়ে যাওয়াতে বারিধারায় এক বন্ধুর বাসায় থাকলাম। বনানীতেও মশা দংশন করছিল, আড্ডার আনন্দে গায়ে মাখিনি। কিন্তু বারিধারায় ওয়াশরুমে রীতিমতো বিশাল সাইজের মশার সঙ্গে সাক্ষাত হলো। এডিস নয় তো? সকালে গৃহকর্মী মশা মেরে হাতে করে নিয়ে এসে আমার ভয় ভাঙালেন। বললেন, স্যার ডেঙ্গু মশার গায়ে কালো কালো ডোরা থাকে। এইটার নাই।

লালবাতি সবুজবাতি

নতুন সড়ক আইন কার্যকর হওয়ার পর এখনও কড়াকড়িভাবে আইন প্রয়োগ শুরু হয়নি। কিছু কিছু মহড়া চলছে মাত্র। আর তাতেই কিছুটা হলেও নড়েচড়ে বসেছেন গাড়িচালকেরা। সতর্কতামূলকভাবে ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যাও কম দেখা যাচ্ছে সড়কে। বলতে পারি মহাযানজটের শহরে যানজট বোধহয় অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে কিছুটা উন্নতি ঘটিয়েছে। কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়। একটি শহরের সড়কব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক বাতি অপরিহার্য। আমাদের ঢাকা শহরের কী অবস্থা? লক্ষ্য করলে ঢাকা মহানগরীর কোন কোন সড়কের মোড়ে ট্রাফিক সঙ্কেতবাতি জ্বলতে-নিভতে দেখা যায়। অবশ্য যানবাহনের চালকরা সেগুলো দেখতে পান কি না আমরা জানি না। আমরা দেখি, ওই সব রঙিন বাতির জ্বলা ও নেভার ওপর যানবাহনের থামা ও চলা নির্ভর করে না। যদি নির্ভর করত, তাহলে লাল বাতি জ্বলছে এবং যানবাহনও চলছে- এমন দৃশ্য দেখতে পাওয়া অসম্ভব হতো। ওই বাতিগুলো স্থাপন করা হয়েছিল স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সঙ্কেতব্যবস্থা হিসেবে। কিন্তু সেগুলোর কল্যাণে স্বয়ংক্রিয় কোন ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু হয়নি। এই মহানগরে যানবাহন চলে ও থামে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের হাতের ইশারায় ও হুইসেলের শব্দে। যানবাহনের চালকদের একটা বড় অংশ এতই অধৈর্য ও বেপরোয়া যে ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় তারা যান থামাতে চান না, তাদের দিকে তেড়ে যেতে হয় লাঠি উঁচিয়ে; কোন কোন চালক বাঁশ ফেলে পথরোধ না করা পর্যন্ত যান থামান না। ফলে সড়কের মোড়ে মোড়ে কদর্য বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার বিপদ ওত পেতে থাকে। আমরা আশা করব, সড়ক আইন তো চালু হলো। এবার সড়কের লালসবুজ বাতিগুলোও তার মর্যাদা ফিরে পাবে।

আশ্চর্য স্মৃতিগন্ধী এক দিবস

‘আজ ছিল অল সোলস ডে বা মৃত লোকদের পর্ব। এ দিনে আত্মীয়স্বজনরা চলে যাওয়া আপনজনদের ভালবাসায় স্মরণ করতে কবরস্থানে যায়। আমারও খুব ইচ্ছে ছিল বাবা, জ্যেঠা, পিসীমা, দাদু দিদিমাসহ বন্ধু প্রিয়জনদের কাছে যাব। কিন্তু শরীরটা এতটাই বিগড়ে ছিল যে যাওয়া হলো না।’

আমার এক বন্ধুর লেখা। তার লেখাটি না পড়লে আশ্চর্য স্মৃতিগন্ধী এই দিবসটির কথা মনেই পড়ত না। বিশেষ কৌতূহলীরা পৃথিবী জুড়ে হেমন্তেই কেন হয় মৃত্যু-উদযাপন সে বিষয়ে জেনে নিতে পারেন ইতিহাস থেকে। তার কিছু অংশ পাঠকদের জন্য এখানেও তোলা রইল।

লাতিন আমেরিকা থেকে ইউরোপ, ভারত, দক্ষিণ এশিয়া- সব অঞ্চলের ধর্মীয় বিশ্বাসেই রয়েছে এক অতীতের ফিরে ফিরে আসা। সব সংস্কৃতিতেই বিশ্বাস, এই সময়ে মৃত ব্যক্তিদের আত্মা ঘুরে ফিরে বেড়ান আমাদের মাঝেই। প্রাচ্যের মার্কন্ডেয় পুরান বলে পিত্রু অর্থাৎ পূর্ব পুরুষ তাঁর শ্রাদ্ধাচারে সন্তুষ্ট হয়ে উত্তরসূরির দীর্ঘায়ু, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সমৃদ্ধি কামনা করেন। আবার পাশ্চাত্যের ফরাসী ঔপন্যাসিক মারগুয়েরিট ইওরসেনার বলেছিলেন, ‘পূর্বপুরুষদের স্মরণের এই অনুষ্ঠান পৃথিবীর আদিতম উদযাপন। শস্য তোলা হয়ে গেলে ফাঁকা ফসলবিহীন মাঠে আত্মারা শুয়ে থাকেন, তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সময়ে হয় স্মৃতির উদযাপন।

২ হাজার বছর আগে রোমানদের মধ্যেও একটা উৎসবের প্রচলন ছিল-‘লেমুরিয়া’। মৃতজনদের কবরে গিয়ে কেক এবং ওয়াইন ভাগ করে নিতেন রোমানরা। পেগান ধর্মের এই রীতিই পরে আপন করে নেন খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা।

বাংলা, অসম এবং ওড়িশ্যায় যে কালী পূজা হয়, তার সঙ্গেও রয়েছে মৃতদের জড়িয়ে থাকা। কালী পূজার আগের দিন ভূত চতুর্দশীতেও স্মরণ করা হয় পূর্বজনদের। এই দিন ১৪ রকমের শাক খাওয়ার চলও রয়েছে অনেক জায়গাতেই। আর ভাইফোঁটা তো আসলে যমের দুয়ারে কাঁটা দেওয়ার উদযাপন।

বেশি নয়, দু-তিন দশক আগেও কার্তিক মাস পড়লেই সন্ধ্যে হলে বাংলার ঘরে ঘরে জ্বলে উঠত আকাশ প্রদীপ। হেমন্তের বুক ঝিম করা ভাব, মন কেমন, উত্তরে হাওয়ার কাছে আসতে থাকা, দিন ছোট হয়ে আসা, ভোর বেলা ঘাসের আগায় জমে থাকা শিশির, সবের সঙ্গে মিশে আছে দিন ফুরোলে বাড়ির চাল অথবা ছাদের ওপর বাঁশের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া একটা প্রদীপ। আকাশ প্রদীপ। গ্রাম বাংলার বড় চেনা ছবি ছিল আকাশ প্রদীপ।

ব্রাজিলে দিনটি উদযাপিত হয় ফিনাদোস হিসেবে। কম্বোডিয়ায় চুম বেন পালিত হয় মাসখানেক আগে। চীন, সিঙ্গাপুরে ‘মন্থ অব হাংরি ঘোস্টস’ হিসেবে পালিত হয়। সেপ্টেম্বরে কোরিয়ায় চুসিয়কের উদযাপন হয়। নানা দেশেই প্রয়াতদের নানামুখী স্মৃতির উৎসব হয়তো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একদিন আমরাও অতীত হয়ে যাব।

মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান

মুক্তিযোদ্ধা রুহেল খানের সঙ্গে সেদিন পরিচয়। বয়সকে উপেক্ষা করে তারুণ্যদীপ্ত তিনি। তার গল্প আরেকদিন শোনা যাবে। তার ফেসবুক টাইমলাইনে মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের কথা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্দেশে তিনি একটি পোস্ট শেয়ার করেছেন। রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ সাইদুল ইসলাম সাঈদের লেখা পোস্টটি এখানে তুলে দিচ্ছি।

প্রতিনিয়ত নানান নতুন অভিজ্ঞতা জমা হচ্ছে। এর দু’একটি না বলে কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছি না।

প্রতিদিনের মতো আজও আমার চেম্বারের দরজাটা খোলাই ছিল। কি একটা কাজ করছিলাম, চোখ ছিল টেবিলে ফাইলের দিকে। দু’জন মানুষ সরাসরি ঢুকে পড়লেন। বললাম-

- জি বসেন

একজন বসতে বসতে বললেন- বাবা আমরা মুক্তিযোদ্ধা।

উঠে দাঁড়িয়ে সরাসরি তাকালাম চোখের দিকে। ষাটোর্ধ পাকা দাড়িওয়ালা দু’জন মানুষ। হাত মিলিয়ে বললাম

-বসেন।

-কি করতে পারি আপনাদের জন্য একটু বলবেন প্লিজ?

-আমার একটা মিসকেসের তদন্ত অনেক দিন ধরে নায়েবের কাছে আছে।

-জি। কত নম্বর মিসকেস? কোন মৌজা?

-...নম্বর মিসকেস... মৌজা

ফোন করলাম...( সময় নষ্ট করার সময় কোথায়!)

-নায়েব সাহেব...নম্বর মিস কেসের তদন্ত রিপোর্ট পাঠিয়েছেন?

-স্যার একটু দেখে বলি স্যার?

- জি দেখেই বলেন।

-(একটু পর) পাঠাইনি স্যার।

- ড়শ. কাল অবশ্যই সরেজমিন তদন্ত করতে যাবেন। পরশু আমার কাছে রিপোর্ট পাঠিয়ে দেবেন। আর হ্যাঁ- জনাব... একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এটা উনার নিজের মিস কেস।

- জি স্যার জি স্যার

সামনে বসা একজন ভদ্রলোক বলে উঠলেন অনেক ভাল লাগল স্যার।

- জি থ্যাংক ইউ।

আমার অফিস সহযোগীকে ডাকলাম

- এই সায়েম

- জি স্যার

-আমাদের চা দাও। সঙ্গে বিস্কিটও দিও।

সায়েম অবাক হয়ে চোখ সরু করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ঘটনাটা কিছুই নয়। পূর্বাঞ্চল সিটি, জলসিঁড়ি প্রকল্প ও শিল্প এলাকা হওয়ার সুবাদে প্রতিদিন এখানে প্রশাসন, পুলিশ, জুডিশিয়ারি ও সেনাবাহিনীর অনেক উর্ধতন কর্মকর্তা এসে থাকেন। অধিকাংশ সময় তাদের কাউকেই এক কাপ লাল চায়ের বেশি কিছুই আপ্যায়ন করানো হয় না। এই প্রথম কাউকে চায়ের সঙ্গে বিস্কিটও দিতে বলা হলো- সেটাই সায়েমের চোখ সরু হবার কারণ, বুঝলাম। সে দাঁড়িয়েই ছিল। জিজ্ঞেস করলাম-

- তুমি কি জান, আমি এই চেয়ারে কেন বসে আছি?

সে নিরুত্তর।

আবার বললাম- তুমি কি জান, কেন তুমি চাকরি পেয়েছ?

সায়েমের চোখ আরও সরু হলো। কিন্তু নিরুত্তর। উত্তরটা আমি নিজেই দিলাম। বললাম-

এই মানুষগুলোর জন্য। উনারা যদি সেদিন জীবনবাজি না রাখত তাহলে হয়ত কোনদিন এই চেয়ারে আমার বসা হতো না। তোমারও চাকরি হতো না। যাও খুব ভাল করে চা বানাও, সঙ্গে বিস্কিটও দাও।

এবার তাকালাম সামনে বসা মানুষ দুটোর দিকে, খুব অবাক হলাম। একজন শুধু হাত দিয়ে অন্যজন পাঞ্জাবির কোনা দিয়ে চোখ মুছছেন। পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক করতে মুক্তিযুদ্ধে আমার মায়ের একান্ত ব্যক্তিগত লড়াইয়ের গল্পটা বলতে শুরু করলাম। মার্চের শেষ দিকে আমার মা তখন গর্ভবতী। মেঝো ভাইকে পেটে নিয়ে কত জায়গায় যে পালিয়ে বেড়িয়েছেন, তার কোন ইয়ত্তা নেই। শেষ দিকে মা গরুর গাড়ি ছাড়া কিছুতেই চলতে পারতেন না। একদিন তীব্র শীতের এক মধ্যরাতে গাঢ় অন্ধকার একটি বাঁশঝাড়ের ভেতর জন্ম নিল মেঝো ভাই। চারদিকে নিঃশব্দ নিস্তব্ধ নীরবতা। থেকে থেকে শুধু ঝিঁ ঝিঁ পোকা আর গুলির আওয়াজ। সেই ভয়াল রাতে সব কিছু নিরাপদ রাখতে- আমার মা তার অজস্র কষ্টের ফসল সদ্যজাত সন্তানের প্রথম কান্না মুখে হাত দিয়ে চেপে রেখেছিলেন কিনা, আজও আমি তা জানতে চাইনি!

আমার গল্প শেষ হবার আগেই সামনে বসা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ভেজা চোখে তাঁর পাঞ্জাবির বোতাম খুলে বাঁ কাঁধে বুলেটের দাগ দেখালেন। কি একটা বলতে বলতে উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দিলেন তিনি। আমার চোখও ভিজেছিল কিনা জানি না শুধু জানি, হে বাংলাদেশ! এই মানুষগুলোর ঋণ তুমি কোনদিন শোধ করতে পারবে না। সম্ভব নয়।

marufraihan71@gmail.com