১০ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লণ্ডভণ্ড উপকূল ॥ বুলবুলের আঘাতে প্রাণহানি ১৪

লণ্ডভণ্ড উপকূল ॥ বুলবুলের আঘাতে প্রাণহানি ১৪
  • ক্ষতিগ্রস্ত দশ জেলা ;###;খাম্বার ওপর গাছ পড়ে অনেক এলাকা এখন বিদ্যুত বিচ্ছিন্ন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে ল-ভ- হয়ে গেছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের উপকূলীয় ১০ জেলার বিস্তীর্ণ জনপদ। এতে ১৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। কয়েক লাখ গাছপালা ও বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এছাড়া আমন ধানসহ উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ভেসে গেছে বহু মাছের ঘের। বিদ্যুতের খাম্বার ওপড়ে গাছ পড়ে পুরো এলাকা বিদ্যুত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এছাড়া গাছপালা পড়ে অনেক এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করা হয়েছে। এদিকে সোমবার থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে লোকজন নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছে।

এবারও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন দেয়াল হিসেবে বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হয়েছে। ঝড়টি মূলত সুন্দরবনের ওপর আছড়ে পড়ে। এরপর বনের ওপর প্রায় তিন ঘন্টা ধরে চালায় তা-ব। পরে দুর্বল হয়ে খুলনা ও বাগেরহাটের স্থলভাগের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। তখন এর গতিবেগ অনেক কম ছিল।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল শনিবার রাত নয়টার পরে দেশের সুন্দরবন ও খুলনা উপকূলে আঘাত হানা শুরু করে। আস্তে আস্তে পুরো সুন্দরবনের ওপর আছড়ে পড়ে। আবহাওয়া অফিস জানায়, শনিবার রাত তিনটায় উপকূল পেরিয়ে স্থলভাগের ওপর আঘাত শুরু করে বুলবুল। এ সময় প্রায় ৯০ কিলোমিটার বেগে ঝড়োহাওয়া বয়ে যায়। রবিবার ভোরনাগাদ বুলবুলের তা-ব চলে। এটি পরে দুর্বল হয়ে মিজোরামের দিকে চলে যায়।

আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান জনকণ্ঠকে বলেন, শনিবার মধ্যরাতে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ৯০ থেকে ১১০ কিলোমিটার বেগে দক্ষিণ-পশ্চিমের খুলনা, সুন্দরবন, সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় ১০ জেলার স্থলভাগে আঘাত হানতে শুরু করে। রবিবার ভোর ছয়টার পর এটি দুর্বল হতে থাকে। স্থলভাগে আঘাত হানার পর প্রায় ৩ ঘণ্টার তা-ব চালায় সুন্দরবনের ওপর। ছয়টার দিকে এর শক্তি কমে ৫০ থেকে ৬০ কিমির মধ্যে চলে আসে। বিকেল ৩টানাগাদ এটি আরও দুর্বল হয়ে ওইদিনই বিকেল ৩টার দিকে কুমিল্লার দক্ষিণ ও ফেনীর উত্তর দিক দিয়ে মিজোরামের দিকে চলে যায়। সোমবার বেলা বারোটার পর বাংলাদেশের স্থলভাগ পেরিয়ে ভারতের মিজোরামের দিকে চলে যায়।

আবহাওয়া অফিস জানায়, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল বাংলাদেশ অতিক্রমের পর থেকে সব ধরনের সতর্কতা তুলে

নেয়া হয়েছে। ফলে দেশের উপকূল এবং সমুদ্র বন্দরসমূহে কোন ধরনের ঝড়োহাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। বুলবুলের প্রভাব কেটে যাওয়ার পর সোমবার সকাল থেকে সারাদেশের আবহাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। অভ্যন্তরীণ নৌ-বিমান ও বন্দরসমূহের কাজও স্বাভাবিক হয়। আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রিত মানুষজনও নিজ নিজ বসত বাড়িতে ফিরে যায়।

রক্ষাকবচ সুন্দরবন

আবহাওয়া অফিস জানায়, শনিবার মধ্যরাতে শক্তিশালী সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপের কাছে উপকূল অতিক্রম করে স্থলভাগে উঠে আসে। পরে আরও উত্তর-পূর্ব দিকে সরে এসে সুন্দরবনের ওপর আছড়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা জানান, সুন্দরবনের ওপর আছড়ে পড়ায় এটি রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়ায়। সুন্দরবনের ওপর তিনঘণ্টার তা-ব শেষে এটি দুর্বল হতে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারও সুন্দরবন ঘূর্ণিঝড়ের হাত থেকে রক্ষার দেয়াল হিসেবে কাজ করেছে। ফলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তারা বলেন, এই বন না থাকলে উপকূলে বড় ধরনের তা-ব হতো। সুন্দরবনের কারণে প্রবল শক্তির এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব সেভাবে পড়তে পারেনি। বনের গাছপালা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ বাধাপ্রাপ্ত হয়ে অপেক্ষাকৃত কম গতি নিয়ে খুলনা বাগেরহাট স্থলভাগে উঠে আসে। সুন্দরবনে ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ যেখানে ঘণ্টায় একশ’ কিলোমিটার ছিল, বন পার হয়ে লোকালয় যেতে যেতে তা শক্তি হারিয়ে দমকা বাতাসে রূপ নেয়। অপর দিকে এই বাধায় জলোচ্ছ্বাস লোকালয়ে পৌঁছানোর আগেই ঢেউয়ের উচ্চতা অনেক কমে যায়।

উপকূলে ক্ষয়ক্ষতি

তবে ঝড়ের প্রভাবে দমকা হাওয়ায় গাছ ও ঘর চাপা পড়ে এবং আশ্রয়কেন্দ্রে অসুস্থ হয়ে দশ জেলায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এর মধ্যে খুলনা , বরগুনা ও গোপালগঞ্জে দুজন করে এবং পটুয়াখালী, ভোলা, শরীয়তপুর, পিরোজপুর, মাদারীপুর, বরিশাল ও বাগেরহাটে একজন করে মারা গেছেন। তবে জনকণ্ঠের প্রতিনিধিদের পাঠানোর খবরের ১৪ জনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৃতদের মধ্যে কয়েকজন রয়েছে যারা প্রশাসনের আদেশ নির্দেশ উপক্ষো করে ঝড়ের সময় নিজ বাড়িতে অবস্থানের সময় গাছ চাপা পড়ে মৃত্যুর শিকার হন। এর মধ্যে পটুয়ালীর মির্জাগঞ্জের মৃত হামেদ সরকারকে জোর করে আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ জন প্রশাসনের লোকজন। পরে ঝড়ের কবলে গাছচাপা পড়ে মৃত্যু হয় তার।

এদিকে জনকণ্ঠের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে সাতক্ষীরায় ৪৫ হাজার ঘরবাািড় বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ৩শ’ কিলোমিটার বিদ্যুতের লাইন, ৬ হাজার মৎস্য ঘের ভেসে গেছে। বাগেরহাটে ২ নারী নিহত হয়েছেন, ৪৪ হাজার ঘরবাড়ির বিধ্বস্ত হয়েছে। ২ লাখ গাছপালা ভেঙ্গে পড়েছে। মংলায় ১৩ হাজার কাঁচাঘর ১ হাজার ৬৮০টি চিংড়িঘের প্লাবিু হয়েছে। দুদিন ধরে বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। পটুয়াখালীতে নিহত হয়েছেন ১ জন। নিখোঁজ রয়েছে ১২, ৩ হাজার ঘরবাড়ি- বিধ্বস্ত হয়েছে। বরিশালে ৩ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। খুলনায় ৪৭ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও দুজনের প্রাণহানি ঘটেছে। বরগুনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং ১৫ জেলে নিখোঁজ রয়েছে। বাগেরহাটের ৪৪ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে।

খুলনা ॥ ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তা-বে ল-ভ- হয়েছে বিভিন্ন এলাকা। জেলার ৪৭ হাজার বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাছচাপা পড়ে মারা গেছে ২ জন। মৃতরা হলো দাকোপ উপজেলার দক্ষিণ দাকোপ গ্রামের সুভাষ ম-লের স্ত্রী প্রমিলা ম-ল (৫২) ও খুলনার দীঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি গ্রামের আলমগীর হোসেন (৩৫)। ঝড়-বৃষ্টিতে কৃষি, মৎস্যখাত ব্যাপক ক্ষতির কবলে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদ্যুত লাইন, মিটার, ফিডারসহ নানান যন্ত্রপাতি। গ্রাম্য রাস্তাঘাট, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধেরও ক্ষতি হয়েছে। সার্বিক ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। খুলনা জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যালয় সূত্রে জানা যায় ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে ২ লাখ ৯৭ হাজার ৫শ’ মানুষ। এছাড়া কয়েক লাখ ছোট-বড় গাছ ভেঙ্গে পড়েছে। গ্রামীণ সড়ক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধেরও ক্ষতি হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ২ লাখ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল, যারা সবাই নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক পঙ্কজ কান্তি মজুমদার জানান, বুলবুলের আঘাতে আমন ক্ষেতসহ সবজিতে ক্ষতি হয়েছে।

সাতক্ষীরা ॥ ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ঘূর্ণিতে ল-ভ- সুন্দরবনসহ সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদ। প্রবল শক্তি নিয়ে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। শনিবার রাত ৩টার দিকে বুলবুলের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়ে যায় সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদ। জনপদের চারদিকে শুধু বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। বুলবুলের ঘূর্ণিতে গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ৮০ শতাংশ কাঁচা ও আধাপাকা ঘরবাড়ি বিধ্বস্থ হয়েছে। দুর্গাবাটি, দাঁতিনাখালি ও চৌদ্দরশি বাঁধ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। রাস্তায় গাছ পড়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পল্লীবিদ্যুতের ১৩শ’ কিলোমিটার বিদ্যুত লাইন। গত তিনদিন ধরে উপকূলীয় এলাকা বিদ্যুতবিহীন। ২৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মৎস্যঘের ভেসে গেছে ৫ হাজার ৭শ’ ১৯। গাবুরা, পদ্মপুকুর, আটুলিয়া, কাশিমারিসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের শত শত একর চিংড়িঘের, আমনধান ও রবি শস্যের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।

বাগেরহাট ॥ ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুলে’র তা-বে রবিবার দুপুরে বাগেরহাটে ২ নারী নিহত হয়েছেন। ফকিরহাট উপজেলার বেুাগা ইউনিয়নের চাকুলী গ্রামে হিরা বেগম ও রামপালের ভরসাপুর গ্রামে সামিয়া খাতুন (১৫) নামে এক কিশোরী গাছচাপায় নিহত হয়েছে। হিরা বেগম গ্রামের মাসুম শেখের স্ত্রী। এর আগে, সকালে রামপাল উপজেলার ভরসাপুর গ্রামে গাছচাপা পড়ে সামিয়া খাতুন (১৫) নিহত হন। সামিয়া দরপোনারায়ণপুর গ্রামের বাবুল শেখের মেয়ে। জেলা প্রশাসক মামুনুর রশীদ বলেন, নিহত দুই জনের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা বাবদ ২০ হাজার করে টাকা দেয়া হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’র তা-বে বাগেরহাটে ৪৪ হাজার ৫৬৩ ঘরবাড়ি, ১৮ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ, ৩৫ হাজার ৫২৯ হেক্টর ফসলি জমি এবং সাত হাজার ২৩৪টি মৎস্য ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে, ৩৫ হাজার ৭৭৫টি আংশিক এবং আট হাজার ৭৮৮টি ঘর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই লক্ষাধিক গাছগাছালি ভেঙ্গে পড়েছে। অর্ধ-শতাধিক বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙ্গে উপড়ে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২০ কিমি বিদ্যুত লাইন। রবিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তা-বে জেলায় এসব ক্ষতি হয়। শনিবার রাত থেকে জেলাব্যাপী বিদ্যুতবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

মংলা ॥ বুলবুলের তা-বে ১ হাজার ৩৭০টি কাঁচা ঘরবাড়ী বিধ্বস্ত হয়েছে। এছাড়া পানিতে ভেসে গেছে ১ হাজার ৬শ’ ৮০টি ঘেরের বাগদা চিংড়ি ও সাদা মাছ। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে সরকাররের পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে ত্রাণ সহায়তা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ রাহাত মান্নান। এছাড়া ঝড়ে গাছপালা পড়ে বৈদ্যুতিক লাইন ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় টানা দুইদিন ধরে মংলায় বিদ্যুত সরবরাহ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

বরিশাল ॥ ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে রবিবার দুপুরে জেলার প্রতিটি উপজেলার কাঁচা ঘরবাড়ি, গাছপালা, আমন ক্ষেত, বিদ্যুত লাইন ও মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বুলবুলের তা-বে জেলার উউপজেলার দক্ষণ মাদার্শী গ্রামে আশালতা মজুমদার (৬৫) নামের এক বৃদ্ধা নিজ বসতঘরের নিচে চাপা পড়ে মারা গেছেন। এছাড়াও প্রায় দুই শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ঘূর্ণিঝড়ের তা-বে কয়েক সহ¯্রাধিক গাছপালা উপড়ে পড়েছে। কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে গত তিনদিনের বৃষ্টিতে ও রবিবার দুপুরের ঝড়ে পাকা ও আধাপাকা আমন ক্ষেত এবং পানের বরজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

গোপালগঞ্জ ॥ গোপালগঞ্জে বুলবুলের আঘাতে পৃথক স্থানে তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে। জেলার অধিকাংশ এলাকা রয়েছে বিদ্যুতবিহীন। সোমবার সকালে ঝড়ে ভেঙ্গে যাওয়া গাছের ডাল পড়ে কোটালীপাড়ার কান্দি গ্রামের সুখরঞ্জন বৈদ্যের মেয়ে সাথী বৈদ্যের (৬) মৃত্যু ঘটে। এর আগে রবিবার দুপুরে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার খাটিয়াগড় গ্রামের মৃত বাবন কাজীর স্ত্রী মাজু বেগম (৮৫) রান্নাঘর চাপায় মারা যান এবং বিকেলে কোটালীপাড়া উপজেলার বান্ধাবাড়ি গ্রামে রাস্তার পার্শ্ববর্তী গাছ পড়ে সেকেল হাওলাদার (৭৫) নামে আরেক বৃদ্ধ মারা যান। বুলবুলের আঘাতে গোপালগঞ্জ শহর সহ জেলার আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সড়কে প্রচুর পরিমাণে গাছ পড়ে গিয়েছে। বিভিন্ন উপজেলার আভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে যান চলাচলও প্রায় বন্ধ রয়েছে। উপড়ে পড়েছে বিদ্যুতের খুঁটি। বহু স্থানে বিদ্যুদ-সংযোগ এখনও বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

বরগুনা ॥ ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে বরগুনা জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মারা গেছে দুই জন, আহত ১৭ জন। প্রায় ৬ হাজার বাড়িঘড় বিধ্বস্ত, বহু গাছপালা উপড়ে গেছে। বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে উঠতি আমন ধান ও রবি ফসলের। পানিতে ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। বৈদ্যুতিক তার বিচ্ছিন্ন হয়ে সঞ্চালন লাইন বন্ধ হয়ে গেছে। বঙ্গোপসাগরে নিখোঁজ রয়েছে ১৫ জেলে। রবিবার ভোর পাঁচটায় ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আঘাত হানে বরগুনায়। থেমে থেমে তা-ব চলে বেলা ১২টা পর্যন্ত।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাতে বরগুনা সদর উপজেলার এম, বালিয়াতলী ইউনিয়নের বানাই গ্রামের হালিমা খাতুন ( ৬৬) নামের এক মহিলা মারা গেছে। তিনি উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের ডিএল কলেজ আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়ে ছিলেন। অন্য দিকে সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের ছোট লবণগোলা গ্রামের মাওলানা মহিবুল্লা (৪০) রবিবার দুপুরে ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময় গাছ কাটতে গিয়ে মারা গেছে। মৃত দুজনকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সোমবার সকালে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

শরীয়তপুর ॥ রবিবার রাতে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ডিঙ্গামানিক ইউনিয়নের দেওজুড়ি গ্রামে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তা-বে বসতঘরের ওপর ভেঙ্গে পড়া গাছচাপায় মোঃ আলীবক্স ছৈয়াল (৬৮) নামে এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছে। মোঃ আলীবক্স ছৈয়াল দেওজুড়ি গ্রামের মৃত জমিরউদ্দিন ছৈয়ালের ছেলে। তিনি ভ্যানচালক ছিলেন। তার চার ছেলে এক মেয়ে। স্থানীয় সূত্র জানায়, রাতে আলীবক্স ছৈয়াল তার চৌচালা টিনের ঘরে শুয়ে ছিলেন। হঠাৎ ঘূর্ণিঝড়ের তা-বে পাশের একটি কড়াই গাছ তার ঘরের ওপর ভেঙ্গে পড়লে তিনি চাপা পড়েন। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

পটুয়াখালী ॥ ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তা-বে ল-ভ- হয়ে গেছে উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালী। বিধ্বস্ত হয়েছে ২ হাজার ৮১০ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, একজন নিহত আরও ২ জন আহত হয়েছে। এছাড়াও কলাপাড়ায় মাছ ধরার ট্রলারসহ ১২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এছাড়াও ২৮ হাজার ৫০৮ হেক্টর ফসলের ক্ষয়ক্ষতি, গবাদিপশু নিখোঁজ ও ক্ষতি ২০টি, হাঁস মুরগির ক্ষতি ১ হাজার ৪২৮টি, ২ লাখ ১ হাজার ৩০০টি গাছপালার ক্ষতি হয়েছে।

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের উত্তর রামপুরা হামেদ ফকির (৬৫) নামে এক বৃদ্ধ গাছচাপা পড়ে নিহত হয়েছেন। দুমকি উপজেলায় ২ জন আহত হয়েছে। কলাপাড়া পূর্ব ধানখালী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সাইক্লোন শেল্টারে রিজিয়া বেগম (৬৫) মারা গেছে।

সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা

স্টাফ রিপোর্টার বাগেরহাট থেকে জানান, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তা-বে প্রাণী ও প্রাণবৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত কাটিয়ে উঠার স্বার্থে সুন্দরবনে পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বন বিভাগ। সোমবার বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন খুলনা রেঞ্জের বন সংরক্ষক কর্মকর্তা মাইনুদ্দিন খান।

তিনি জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনুসন্ধানে বন বিভাগের ৬৩ দল কাজ করছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে।

এর আগে, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তা-বে সুন্দরবনের বেশ কিছু প্রাণী ও প্রাণবৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং সুন্দরবনের কিছু জায়গায় গাছপালা ভেঙ্গে গেছে। এখন ওই এলাকার প্রাণীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে জানায় বন বিভাগ। সুন্দরবনের প্রাণী ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করছে বন বিভাগের অনুসন্ধানী দল।

এদিকে, সোমবার সন্ধ্যায় সুন্দরবনে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে আংশিক রিপোর্ট দাখিল করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তা-বে বাগেরহাটে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জে রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ কোন বন্যপ্রাণী মারা যায়নি। তবে ছয়টি আবাসিক, ১৭টি অনাবাসিক, ১০টি জেটি ও ১৯টি নৌযানের আংশিক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ ৩৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা। দুই রেঞ্জ কর্মকর্তা সরেজমিন বন ঘুরে দেখে সোমবার সন্ধ্যায় তাদের প্রতিবেদন বাগেরহাটে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোঃ মাহমুদুল হাসানের কাছে জমা দিয়েছেন। তবে, কি পরিমাণ বনের ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণের কাজ এখনও শেষ হয়নি বলে জানানো হয়েছে।

বাগেরহাটে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে বনের কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা খতিয়ে দেখতে শনিবার চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মোঃ শাহিন কবির ও শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মোঃ জয়নাল আবেদীনকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তারা, স্ব স্ব রেঞ্জ এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে সোমবার সন্ধ্যায় আমার কাছে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে, বনের অরণ্যের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ এখনও চলছে।

তিনি আরও জানান, প্রতিবেদনে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তা-বে বাগেরহাটে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জে রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ কোন বন্যপ্রাণী মারা যায়নি বলে তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন। তবে ছয়টি আবাসিক, ১৭টি অনাবাসিক, ১০টি জেটি ও ১৯টি নৌযানের আংশিক ক্ষতি হয়েছে বলে তারা জানিয়েছে। ঝড় হলে গাছপালার কিছু ক্ষতি হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবার বন বিভাগের সতর্কতাবস্থার জন্যই বন ও বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

নির্বাচিত সংবাদ