১০ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ট্রাইব্যুনাল থেকে তুরিন আফরোজ অপসারিত

ট্রাইব্যুনাল থেকে তুরিন আফরোজ অপসারিত
  • অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে ॥ আইনমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার ॥ পেশাগত অসদাচরণ, শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজকে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত প্রসিকিউশন টিমের মামলা ও অন্যান্য কাজ থেকে অপসারণ করা হয়েছে। সোমবার আইন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। সহকারী সচিব (জিপি/পিপি ) মোঃ আব্দুছ ছালাম ম-ল স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানা গেছে। এদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর পদ থেকে সদ্য অপসারিত ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তথ্য প্রমাণের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। এই পদক্ষেপ নেয়া জরুরী হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে তুরিন আফরোজ বলেছেন, যেখানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো। কিন্তু সেখানে আমাকে বলার জন্য ডাকা হলো না। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়নি। আমি ন্যায়বিচার পাইনি। তারপরও চাইবো যুদ্ধাপরাধের বিচার সফলতা পাক। সোমবার আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজকে শৃঙ্খলা ও পেশাগত আচরণ ভঙ্গ এবং গুরুতর অসদাচরণের দায়ে ২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রজ্ঞাপনে প্রদত্ত বাতিলক্রমে প্রসিকিউটর পদ থেকে অপসারণ করা হলো। এর আগে এক আসামির সঙ্গে বৈঠকের খবর প্রকাশ পাওয়ায় ২০১৮ সালের মে মাসে তুরিন আফরোজকে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের সব মামলা পরিচালনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু। ২০১৭ সালের নবেম্বরে পাকিস্তান আর্মির সাবেক ক্যাপ্টেন ও এনএসআই এর সাবেক ডিজি মোঃ ওয়াহিদুল হককে ফোন করে কথা বলেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। ওই অভিযোগ ওঠার পর প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ওয়াহিদুল ও তুরিনের কথোপকথনের রেকর্ড ও বৈঠকের অডিও রেকর্ডসহ যাবতীয় ‘তথ্য-প্রমাণ’ আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। ট্রাইব্যুনালের সব মামলা থেকে সরিয়ে দেয়া হয় তুরিনকে। ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ সে সময় অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি কোন জবাব দেননি। এক ফেসবুক পোস্টে নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও ওই গোপন বৈঠকের কথা তিনি অস্বীকার করেননি।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল তাদের বিচারের জন্য ২০১০ সালে গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর তিন বছরের মাথায় প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পান ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। তিনি বেশকিছু মামলা পরিচালনা করেছেন। সর্বশেষ এনএসআই এর সাবেক ডিজি ওয়াহিদুল হকের মামলার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল ২০১৭ সালের নবেম্বরে। ২০১৮ সালের মে মাসে ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সিনিয়র সমন্বয়ক সানাউল হক বলেছিলেন, ওয়াহিদুল হককে গ্রেফতার করার সময় গুলশান থানার ওসি তার মোবাইল ফোন জব্দ করেছিলেন। ওই মোবাইলে কথোপকথনের দুটি রেকর্ড ছিল। একটি কথোপকথন হয়েছে টেলিফোনে। সেখানে তুরিন আফরোজ আসামি মোহাম্মদ ওয়াহিদুল হককে দাওয়াত দিয়েছেন দেখা করার অনুমতি চেয়ে। ফোনটা তুরিনই করেছিলেন। অন্য রেকর্ডটি ছিল দুই ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের। এই কথপোকথনে মামলা সংক্রান্ত অনেক কথা রয়েছে এবং মামলার ডকুমেন্ট হস্তান্তরের কথোপকথন রয়েছে। ওসি এটা পাওয়ার পর সে মনে করল যে, আমাদের জানানো দরকার। আমরা এটা হাতে পাওয়ার পর প্রসিকিউশনকে দিয়েছি।

অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে

এদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সোমবার সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে এবং তার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। অপরাধীর সঙ্গে তিনি যে কথা বলেছেন তার রেকর্ড আমাদের কাছে আছে। সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মন্ত্রী আরও বলেন, তুরিন আফরোজ কেন এ কাজ করলেন আমরা বুঝতে পারছি না। আমি শুধু এটুকু বলবো এটা দুঃখজনক এবং তাকে ট্রাইব্যুনাল থেকে সরিয়ে ফেলার কাজটা যে খুশি হয়ে করা হয়েছে বিষয়টা তা নয়। তুরিন আফরোজ একজন আসামির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছিলেন। এই মামলা আলাপ-আলোচনা করার সময় তিনি এ ও বলেছিলেন, ‘এই মামলার কোন সারবত্তা নাই’। সেই কথোপকথন ট্যাপ বা রেকর্ড করা হয়। ট্যাপ করা কথোপকথন ও তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ চিফ প্রসিকিউটার ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইবুন্যাল সেটা আমাদের কাছে পাঠান। এটা নিয়ে সাক্ষীদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তুরিন আফরোজের সঙ্গে যতটুকু কথা বলা প্রয়োজন মনে করেছি হয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

তিনি (তুরিন আফরোজ) আগের যে মামলা পরিচালনা করেছেন সেই সব মামলা পরিচালনায় আমরা যথেষ্ট সন্তুষ্ট জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘অব্যাহতি দেয়ার আগ পর্যন্ত তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে গেছেন। কিন্তু এই বিষয়ে তার সেন্স অব জাজমেন্ট কাজ করে নাই। তার দিক থেকে যেসব বক্তব্য ধারণ করা হয়েছে, যেটা তার গলা বলে প্রমাণিত হয়েছে। যে মামলা নিয়ে কথা হচ্ছে সে মামলার কিন্তু চার্জ গঠন হয়ে গেছে। সেই কারণে এ বিষয়ে আমার মনে হয় যে আরও নিষ্পত্তি টানা দরকার ছিল, সেজন্য তাকে সরানো হয়েছে। তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তার সঙ্গে কথা হয়েছে এবং যেই প্রমাণ রয়েছে, সেটাকে যদি তিনি ডিফেন্স করতে চায় করতে পারে। কিন্তু ট্যাপ করা কথাবার্তা আমরা পেয়েছি তার বিরুদ্ধে নালিশ পেয়েছি। এরপর আমরা সার্বিকভাবে আলোচনা করার পরই তাকে অব্যাহতি দিয়েছি।’

আইনমন্ত্রী বলেন, আমরা আশা করি যে আইনজীবীরা এ কাজে নিয়জিত আছেন তারা তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। তাদের এ বিষয়ে নতুন সঙ্কেত দিতে হবে এটা আমি মনে করি না। তারা তাদের দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু এখানে যদি এই শৃঙ্খলার বাইরে কাজ করা হয় যেটা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালের কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে তার মান ক্ষুণœœ করতে পারে তাহলে আমাদের ব্যবস্থা তো নেবই এবং সে রকম ব্যবস্থাই নিয়েছি বলেও জানান তিনি।

ন্যায়বিচার পেলাম না

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর থেকে অপসারণের পর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজের প্রতিক্রিয়া কি জানতে চাইলে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, আমি বিশ্বাস করি, শতভাগ সততার সঙ্গে আমি কাজ করেছি। আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের বিষয়ে আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন সুযোগ দেয়া হয়নি। কারা, কিভাবে তদন্ত করে প্রমাণ পেল তা আমি জানি না। আমারও কিছু বক্তব্য আছে, সেটি কেউ শুনল না। সেদিন কি ঘটেছিল, আরও কেউ জড়িত আছে কিনা সেটিও জানতে চাইল না। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ন্যাচারাল জাস্টিসের বিরুদ্ধে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। আমার বিরুদ্ধে ২৫ কোটি টাকার দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাকে কিছু বলার সুযোগ দেয়া হয়নি। আমি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমি ন্যায়বিচার পেলাম না। তবু আমি চাই যুদ্ধাপরাধের বিচার সফলতা লাভ করুক। আমি বিশ্বাস করি, শতভাগ সততার সঙ্গে আমি কাজ করেছি। আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের বিষয়ে আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন সুযোগ দেয়া হয়নি।

নির্বাচিত সংবাদ