০৮ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আমাদের দায়মুক্তির তাগিদ

  • অধ্যাপক ডাঃ মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

বঙ্গভবনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সচিবের দফতরে সচিব মহোদয়ের সেক্রেটারিয়েট টেবিলের বাম পাশের দেয়ালে ঝোলানো দুটো অনার বোর্ড। আর দশটি সরকারী অফিসে যেমন থাকে সে রকমই বোর্ড দুটো। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যে ক’জন সরকারী কর্মকর্তা বঙ্গভবনে মুখ্য সচিব বা সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের নাম আর কর্মকাল ধারাবাহিকভাবে তালিকাবদ্ধ করা আছে বোর্ড দুটোতে। কৌতূহলবশতই আগস্ট ’৭৫ খুঁজতে গিয়ে চোখ আটকে গেল একটা নামে। বঙ্গভবনে এই পদটি সে সময়ে বাগিয়ে নিয়েছিল মাহবুবুল আলম চাষী। নামটা দেখতেই গা’টা কেমন যেন গুলিয়ে আসছিল। তবে চাষীর নাম দেখে আমার শরীর যতই ঘিনঘিন করে উঠুক না কেন আমি বাজি ধরে বলতে পারি আজকের প্রজন্মের বেশিরভাগের কাছেই এই নামটি অচেনা। ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর কিছুদিনের জন্য বঙ্গভবনে গেড়ে বসেছিল খন্দকার মোশতাক আহমদ আর মাহবুবুল আলম চাষীরা। সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনী সেনা কর্মকর্তারা। বঙ্গভবনকে পানশালা বানিয়ে নিত্য তারা জলসা বসাত সেখানে। বঙ্গভবন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এই ভবনটির ইতিহাসে এমনি কালো অধ্যায় আর এসেছে কিনা সন্দেহ। এমনকি ’৭১-এর ন’টি মাসেও না, যখন এখানে ছিল পাকিস্তানের দালাল গবর্নর ডাঃ মালেকের আখড়া। এই বঙ্গভবনে বসেই খুনীরা জেল হত্যাকা-ের নীলনক্সা করেছিল, যার পরিণতিতে ৩ নবেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নিরাপদ আশ্রয়ে নিহত হন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চার ভ্যানগার্ড সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও মোহাম্মদ কামারুজ্জামান। জিয়াউর রহমানের সময় বন্দুকের নল দিয়ে যে সংশোধিত সংবিধান রচনা করা হয়েছিল সেখানে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ সংযোজনের মাধ্যমে ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট আর ৩ নবেম্বরের খুনীদের বিচারের পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আবারও দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি রিপিল বিল পাস হয়। তার পরের ইতিহাসটা খুব বেশি পুরনো নয় বলে সবারই জানা। প্রচলিত আইনে বিচার হয়েছে আত্মস্বীকৃত খুনীদের। কার্যকরও হয়েছে অনেকের দ-, আবার অনেকে এখনও পলাতক। এই খুনীদের যে নামগুলো এখন মানুষের মুখে-মুখে, সেখানে কিন্তু নেই জিয়া-মোশতাক-চাষীদের নাম। কারণটাও আমরা জানি। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিলম্বিত এই বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই মৃত্যু হয়েছিল ’৭৫-এর নেপথ্যের অনেক কুশীলবের। কিন্তু শুধুমাত্র প্রত্যক্ষ হত্যাকারীদের বিচার সম্পন্ন করার মাধ্যমে ’৭৫-এর হত্যাকা-গুলোর বিচার পূর্ণতা পেতে পারে না। এতে যেমন অসম্মান দেখানো হয় ’৭৫-এর শহীদদের প্রতি তেমনি জাতির প্রতিও করা হয় বড় ধরনের অন্যায়।

যে কোন হত্যাকা-ই নিন্দনীয় আর একটি হত্যাকা- কখনই আরেকটির সাপেক্ষে বিচার্য হতে পারে না- এই বাস্তবতা মেনে নিয়েও এ কথা মানতেই হবে যে ’৭৫-এর হত্যাকা-গুলো কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা কিংবা কিছু বিপথগামী সেনা সদস্যের এ্যাডভেঞ্চারের ফসল ছিল না। এগুলো ছিল দীর্ঘদিনের সুপরিকল্পিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের ফল। পাশাপাশি ’৭৫-এর হত্যাকা-গুলোর রয়েছে বহুমাত্রিকতা। ১৫ আগস্ট আর ৩ নবেম্বর শুধুমাত্র কোন ব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিবর্গকে হত্যা করা হয়নি। বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশ একে অপরের সমার্থক। বঙ্গবন্ধু ছিলেন হাজার বছরের মধ্যে বাঙালী অধ্যুষিত কোন ভূ-খ-ের প্রথম স্বাধীন শাসক। পাশাপাশি বাংলাদেশ নামক অনন্য জাতি রাষ্ট্রটির স্বপ্নদ্রষ্টাও তিনি। তাই তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী। আর বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে জাতীয় চার নেতাই ছিলেন সমষ্টিগতভাবে বাঙালী স্বাধীনতার ভ্যানগার্ড। ’৭১-এর ন’টি মাসে বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানের কারাগারে অন্তরীণ, তখনই এই বিষয়টি নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। ’৭৫-এ কোন সেনা অভ্যুত্থান ঘটেনি, হত্যা করা হয়নি জাতীয় নেতৃত্বকে, ক্ষমতাচ্যুত করা হয়নি আওয়ামী লীগকেও। সেদিন হত্যা করা হয়েছিল বাংলাদেশকে আর ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল বাঙালীকে।

পাশাপাশি ’৭৫-এর হত্যাকা-গুলোর বহুমাত্রিকতাও বিবেচনায় আনতে হবে। মানবতাবিরোধী সব ধরনের অপরাধই সংগঠিত হয়েছিল সেই সময়টায়। হত্যাকা-ের শিকার হয়েছিলেন শেখ রাসেলের মতো নাবালক শিশু যার রাজনীতির সঙ্গে কোন ধরনের সংশ্লিষ্টতা ছিল না। হত্যা করা হয়েছিল এমনকি গর্ভবতী মাকেও। পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ বলে বিবেচিত যেই স্থান, সেই কারাগারে গুলি করার পর খানিক বিরতিতে বেয়োনেট চার্জ করে নিশ্চিত করা হয়েছিল জাতীয় চার নেতার মৃত্যু। আর তাই ১৫ আগস্টের খুনীদের বিচার করেই ‘জাস্টিস হ্যাজ বিন ডেলিভারড’ এই আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোন কারণই থাকতে পারে না। এটা কখনই মেনে নেয়া যায় না যে, বঙ্গভবনের দরবার হলে বঙ্গবন্ধু আর সৈয়দ নজরুল ইসলামের পোট্রেটের পাশে ঝুলবে মোশতাক আর জিয়ার পোট্রেটও কিংবা বঙ্গভবনে অনার বোর্ডে শোভা পাবে চাষীর নামও। আমাদের নির্লিপ্ততায় যাতে এসব নেপথ্যের নায়করা দুধ খেয়ে গোফ মুছে ফেলতে না পারে এটা অনাগত বাঙালীর কাছে আজকের দায়বদ্ধতা।

খুবই প্রয়োজন তাই একটি স্বাধীন সাংবিধানিক কমিশন গঠনের মাধ্যমে ’৭৫-এর নেপথ্যের দেশী-বিদেশী কুশীলবদের চিহ্নিত করা আর আইন সংশোধন করে তাদের প্রয়োজনে মরণোত্তর বিচারের মুখোমুখি করা। মৃত্যু কখনও অন্যায় থেকে দায়মুক্তির কারণ হতে পারে না। এই বিষয়টি আমার বিবেচনায় আজকের প্রেক্ষাপটে আগামীর বাংলাদেশের জন্য একটি পদ্মা সেতু কিংবা মেট্রোরেল কিংবা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের চেয়ে শত-সহ¯্রগুণ বেশি জরুরী। একদিন হয়ত বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে ছুটবে মেট্রোরেল আর আকাশ দাঁপিয়ে বেড়াবে আমাদের ডজন-ডজন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। কিন্তু ইতিহাসকে ইতিহাসের সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেয়ার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে আমরা যদি আজকে ব্যর্থ হই তাহলে একটি বিভ্রান্ত প্রজন্ম তৈরির দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের দায়মুক্তি কখনই হবে না।

লেখক : চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ