১০ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পোল্ট্রি ফিড নিয়ে এ কেমন গবেষণা!

  • চামড়ার গুঁড়া মাত্র দুটি মুরগিকে খাইয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ লাগামহীনভাবে বেড়েছে পোল্ট্রি ফিড (হাঁস-মুরগির খাবার) তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামালের দাম। গত ১২ বছরে (২০০৭-১৮) কাঁচামালভেদে সর্বনিম্ন ২৭ থেকে ৩১৬ শতাংশেরও বেশি দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে খামারিদের কাছে সম্ভাবনাময় পোল্ট্রি শিল্প ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প হয়ে উঠছে। আর এই ঝুঁকির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে পোল্ট্রি ফিড নিয়ে ২০১৪ সালে করা এক গবেষণা। অথচ পোল্ট্রি ফিড নিয়ে কখনও গবেষণা করেননি, এমনকি ফিড তৈরিতে কী কী উপকরণ থাকে সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। অথচ বাংলাদেশের পোল্ট্রি ফিড হাজারীবাগের চামড়া দিয়ে বানানো হচ্ছে প্রচার করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের এক অধ্যাপক। অনুসন্ধানে জানা যায়, হাজারীবাগ থেকে সংগৃহীত চামড়ার গুঁড়া মুরগিকে খাইয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন তিনি। যা বাংলাদেশের পোল্ট্রি ফিডের উপর গবেষণা বলে উপস্থাপন করা হয়। এ ধরনের বিভ্রান্তিকর গবেষণা না করারও আহ্বান জানিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। পাশাপাশি শতভাগ ট্যানারির বর্জ্য যেন ট্যানারিতেই ধ্বংস করা হয় এবং বিষাক্ত এ বর্জ্য যেন কোনভাবেই পোল্ট্রি ও মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতে না পারে সেজন্য সরকারের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন তারা।

জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল হোসেন ‘এক্সেস আমাউন্ট অব ক্রোমিয়াম ট্রান্সপোর্ট ফ্রম ট্যানারি টু হিউম্যান বডি থ্রু পোল্ট্রি ফিড ইন বাংলাদেশ এ্যান্ড কারসিনোজেনিক ইফেক্টস’ শিরোনামে একটি গবেষণা করেন। ২০০৮ থেকে শুরু করে এটি শেষ করেন ২০১৩ সালে। এরপর ২০১৪ সালে ভারতের একটি জার্নালে প্রকাশ করেন গবেষণা প্রতিবেদনটি। এতে বলা হয়, হাজারীবাগের ট্যানারি বর্জ্যে তৈরি পোল্ট্রি ফিডের মাধ্যমে ক্রোমিয়াম পোল্ট্রি মুরগির মাধ্যমে মানুষের শরীরে যাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে দুই শতাধিকের বেশি পোল্ট্রি ফিড রয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক রয়েছে বাণিজ্যিক ফিড প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। মূলত মুরগি ও মাছের খাবার তৈরিতে ১০/১২টি উপকরণের মধ্যে ৮৫ ভাগই আসে ভুট্টা ও সয়াবিন মিল থেকে। কিন্তু এসব পোল্ট্রি ফিড পরীক্ষার আওতায় না এনে হাজারীবাগের ট্যানারির বর্জ্যে উচ্চমাত্রায় ক্রোমিয়াম থাকার পরও চামড়ার বজ্যের গুঁড়া মুরগিকে খাওয়ানো হয়। গবেষণায় ট্যানারির বর্জ্যরে গুঁড়াকে পোল্ট্রি ফিড হিসেবে চিহ্নিত করে সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিভ্রান্তি ছড়ায় জনমনে। তবে হাজারীবাগের চামড়ার বিষাক্ত গুঁড়া, পোল্ট্রি ফিড বা মুরগির খাবার তৈরিতে ব্যবহার হয় কিনা তাও নিশ্চিত করে বলা হয়নি গবেষণায়। গবেষণায় প্রথমে মাত্র দুটি মুরগিকে ট্যানারির বর্জ্য খাওয়ানো হয়েছিল। যার প্রথমটি মারা যায় ১৫ দিনের মধ্যে, দ্বিতীয়টি আরও কিছুদিন পর। তাই পরবর্তীতে চামড়ার গুঁড়ার সঙ্গে বাজার থেকে খোলা কিছু খাবার, ধান, গম মিশিয়ে মুরগিকে খাওয়ান তিনি। কিন্তু গবেষণায় উল্লেখ নেই কতদিন এবং কী পরিমাণ খাবার দিনে কতবার খাইয়েছেন। অন্য কোন খাবার ঐ সময় খাওয়ানো হয়েছিল কী না তাও উল্লেখ করা হয়নি গবেষণায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, পোল্ট্রি ফিডে হাজারীবাগের চামড়ার বর্জ্য ব্যবহার হয় কী না আমার জানা নেই। তবে হতেও পারে। দেশে দুই শতাধিক ছোট-বড় ফিড মিল থাকার পরও দেশে উৎপাদিত কোন ফিড মিল থেকে নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করেননি বলে তিনি জানান। নিজস্ব পরীক্ষায় ক্রোমিয়াম ৩ ও ক্রোমিয়াম ৬ উভয়ই পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি। তবে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ক্রোমিয়াম ৬ এর উপস্থিতি পায়নি খোদ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)।

এ খাতের একাধিক উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, সারাদেশে প্রচুর খামারি এ গবেষণার বলি হয়ে খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকে ঋণে জর্জরিত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ফিড প্রস্তুতকারকগণও। তাদের ইমেজ নষ্ট হয়েছে, ব্যাংকের কাছে দেনায় পড়েছেন, ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কারণ গবেষণা প্রতিবেদনটি গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার পর ডিম ও মুরগির মাংসের ভোক্তাদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। অসংখ্য ভোক্তা পোল্ট্রি ডিম ও মাংস খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তারা বলছেন, পুষ্টি উন্নয়নে দেশ যেভাবে ধীরে ধীরে এগুচ্ছিল, গবেষণা প্রতিবেদনের কারণে সে উন্নতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ ধরনের বিভ্রান্তিকর গবেষণা না করারও আহ্বান জানিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। পাশাপাশি শতভাগ বর্জ্য যেন ট্যানারিতেই ধ্বংস করা হয় এবং বিষাক্ত এ বর্জ্য যেন কোনভাবেই পোল্ট্রি ও মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতে না পারে সেজন্য সরকারের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন তারা।

নির্বাচিত সংবাদ